আমার বাবিন কি ছেলে বা পুরুষ হয়ে বড় হবে?

সুচিত্রা সরকার:

বাবিনের জেন্ডার ছেলে বলেই হয়তো আল্ট্রার ডাক্তার নিজ থেকেই বলে দিয়েছিল।

আরেক ডাক্তার বলেছিল, ঠিক আছে, বুঝতে পারছি আপনার কথা। তবে বয়স করে প্রথম বাচ্চা ছেলেই ভালো। বেশি অপশন তো নেই!

প্রথমে কাউকেই বলিনি। কারণবশত অনেকে ভেবেছিলো মেয়ে হবে, তাই চেপে যাচ্ছি।
অনাদরও একটু টের পাচ্ছিলাম সেসব মহল থেকে।

কিন্তু কাউকেই বোঝাতে পারিনি, বাবিন আমার সন্তান। না ছেলে, না মেয়ে।

তবে সকলে যখন জানলো, আমার কদর হঠাৎ বেড়ে গেল।
হাসিগুলো বিস্তৃত। অনাদর থেকে আদরে উন্নতি!

ছেলে বাবিনকে কোলে নিয়ে লেখক সুচিত্রা

যারা অনেকদিন ধরে যোগাযোগ রাখেনি, তারাও ফোন করা শুরু করলো।

তারপর বাবিন হলো। সে শুধু সন্তান নয়, সে আমার আরাধ্য, পুত্র সন্তান, এইমত সকলে বুঝিয়ে দিল।

পৃথিবীর আলো দেখতে দেখতেই একটা শিশু কীভাবে পুরুষ হয়ে ওঠে, চাক্ষুষ করছি প্রতিনিয়ত।

ছেলে হলে সাতবার আজান, মেয়ে হলে তিন।
হিন্দুমতে যজ্ঞেরও নিয়ম আছে। মেয়ে হলে সাত, ছেলে হলে নয়দিন।
মেয়ে হলে একুশ, ছেলে হলে ত্রিশ দিন।

ছেলের মা বহুত দামী ব্যাপার, লাউ বা পেঁপে আড়াআড়ি কাটা যাবে না। লম্বালম্বি কাটতে হবে। এরকম বহুত নিয়ম শোনা যাচ্ছে আশপাশ থেকে।

সকলের চোখ, ছেলে শোনা মাত্রই এক হাজার ওয়াটের বাল্বের মতো জ্বলে উঠছে।

বাবিন ছেলে বলে বিরাট এক সম্পদ সে। তাই টানাটানিও চলছে বেশ!
আচ্ছা মেয়ে হলে কি এই মানুষরা এমন করতো? কক্খনো না। হতেই পারে না।

এর বাইরে আরও আছে। বাবিনের জামা যারাই দিচ্ছে, হয় শার্ট, নইলে ফতুয়া।
আমি কিনলে নিমা, গেঞ্জি বা টাইস কিনছি, যা সকলেই পরতে পারে। ফ্রকও কিনবো সামনের মাসে।

আমি সংসারের প্রথম সন্তান। দাদু প্রথমে ব্যাপারটা ভালভাবে নেয়নি। পরে আমাকে কোল থেকে নামাতে চাইতো না।
অংকুরকে বাবা অতোটা চায়নি। খুকুমনিই যথেষ্ট তার। অবশ্য অংকুর হবার পর পুত্রস্নেহের প্রাবল্যে আমি ভেসে যাচ্ছিলাম।

সেই বাবা আমাকে ফ্রকও দিয়েছেন। আবার প্যান্ট, পাঞ্জাবীও। অংকুরের আর আমার একই শার্ট, একই গেঞ্জি, একই পাঞ্জাবী সেট। শুধু রঙ আলাদা।

একটা চকলেট দেখলাম, মেয়েদের গোলাপী রঙের, ছেলেদের চকলেট রঙের।

খেলনায়ও বিভাজন। ছেলেদের গাড়ি, বন্দুক। মেয়েদের পুতুল।

স্কুলে যখন ভর্তি করবো, কম্বাইন্ড স্কুলের পাশাপাশি বয়েজ স্কুলও পাবো অনেক। ও আলাদা করে পুত্রের মাহাত্ম্য বুঝবে।

ও যে পরিবেশে বড় হবে, বেশ ভয়ে আছি তা নিয়ে। ও যে ছেলে হয়ে, কিছু না করেও বিরাট কিছু অর্জন করে বড় হয়েছে, সেটা বুঝে যাবে।

সে দেখবে একটা মেয়ের চে তার কদর বেশি। সে দেখবে সম্পত্তি আইনে তার দামটা উচ্চে তোলা। সে দেখবে মেয়েদের অধিকার লড়ে নিতে হয়, তারও একটা দিবস আছে। বাকি সব দিন ছেলেদের।

দেখবে, সে সকলকে ভরসা দিতে পারে, মেয়েরা পারে না।

এমনি করে করে প্রতিনিয়ত আমার মানুষ বাচ্চাটা, পুরুষ হয়ে উঠছে, উঠবে।

আমার ভালো লাগার কথা।
মেয়ে হিসেবে, লাঞ্ছনা, গঞ্জনা কম দেখিনি জীবনে। একজন মা একটা পুত্রের জন্য কীভাবে হা হা করে ফেরে, এরকম ডজন উদাহরণ আশপাশে।
নিজেও পদে বিপদে প্রচুর ভোগ করেছি মেয়ে হবার কুফল।

এক জন্মে দুই অনুভূতি, দুই অবস্থা, কজনের ভাগ্যে জোটে!

যে আমি মেয়ে হবার জন্য রাষ্ট্রের প্রতিটা ব্যবস্থায় হেয় হয়েছি, সেই আমিই শুধু এক্স ক্রোমোজমকে ঠিকঠাক আরেকটা ওয়াই ক্রোমোজমকে এইমতে মানাতে পেরেছি যে, এসো দুজনে মিলে আমরা একটি প্রাণ সৃষ্টি করি। আর তাতেই আমার দামটা বেড়ে গেছে ধাই করে।

ছেলের মা, বিরাট ব্যাপার!

আমি সুখ পাচ্ছি না। ভয় পাচ্ছি এই ফালতু পুরুষ পুরুষ গন্ধওলা সমাজে বাস করে বাবিন না ক্রমশ মানুষ থেকে পুরুষ বনে যায়।
এই পচা গলা সমাজ ওকে হয়তো মানুষ হতেই দেবে না। ও আমায় বলবে, ‘মানা করছো কেন মা? করবোই তো! আমি না ছেলে! আমিই তো সমাজের বীরপুরুষ, যে তোমাকে সকল ‘ডাকাতসময়’ থেকে উদ্ধার করবে! তোমার প্রিয় রবি ঠাকুর বলে গেছে তাই!’

ভয় পাচ্ছি, ভয়!
প্রার্থনা করছি, আমার কষ্টের সন্তান যেন মানবিক মানুষ হয়, আর কিছু নয়।
শুধু মানবিক মানুষ, জজ বেরিস্টার না।

২৯. ০৯. ২০১৯
সকাল ৯. ২৪ মিনিট
ললিত মোহন দাস লেন

শেয়ার করুন:
  • 77
  •  
  •  
  •  
  •  
    77
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.