পুরুষদের নবাবী সত্ত্বা বনাম আধুনিক নারী

নার্গিস মুননী:

রাজা-রাজড়াদের একটি গল্প দিয়ে শুরু করি।
এক দেশে ছিল এক রাজা। রাজার ছিল তিন রাণী। পাটরাণী, মায়ারাণী, ঠাটরাণী।
পাটরাণী ছিলেন খুব সুন্দরী। যেমন রূপ তেমনি তার রুপের পরিচর্যা। আতর, গোলাপ, চন্দন মাখিয়ে, ওষ্ঠ রাঙ্গিয়ে, কেশবিন্যাস করে, বাহারি গয়নায় নিজেকে সজ্জিত করে রাজার মনোরঞ্জন করাই ছিল তার একমাত্র কাজ। এতে রাজা বেশ ফুরফুরে মেজাজে থাকতো।

এই দিকে মায়ারাণী সুন্দরী ছিলেন বটে, তবে সৌন্দর্যকে ছাপিয়ে বেশী প্রকাশ পেতো তার মায়ার ফল্গুধারা। মন তার মায়ায় ভরা। রাজবাড়ীর সবার মনের অগোচরে লুকিয়ে থাকা বাসনাগুলোকে খুঁজে বের করা এবং তা পূরণ করাই যেন তার একমাত্র কাজ। সবার মঙ্গল কামনায় একনিষ্ঠ ছিল তার মন। কোথায় কে অযত্নে আছে, কোথায় কার অসুখ হলো, কোথায় কাকে কীভাবে সহযোগিতা করতে হবে এ ব্যাপারে মায়ারাণীর জুড়ি মেলা ভার। রাজা তাকে নিয়ে খুশি ও গর্বিত।

অন্যদিকে ঠাটরাণী সদা ব্যস্ত তার ঠাটবাট নিয়ে। রূপ নেই তাতে কী? প্রশাসনিক দক্ষতায় সে ছিল সেরা। রাজ্য পরিচালনায় সে ছিল রাজার ডান হাত। রাজা তার মন্ত্রী, সেনাপতি, উজির, নাজির সবাইকে পরিচালনা করতো ঠাটরাণীর বুদ্ধিতেই। এছাড়া রাজকন্যা, রাজপুত্র থেকে শুরু করে বাড়ীর দাস-দাসী সবাই রুটিন মাফিক কাজ করছে কিনা, কাজের গতি কতটা বেগবান, কতখানি ফাঁকি দিল, কাজে ফাঁকির শাস্তি দেয়া সব কিছুই নিপুণ হাতে পরিচালনা করতো। এ ব্যাপারে রাজাও নিশ্চিন্তে থাকতেন।

তিন রাণী তাদের তিন ধরনের সেবা দিয়ে রাজাকে বেশ সুখে রাখলেন। দেশের রাজা সুখী তো প্রজা সুখী আর প্রজা সুখী তো রাজ্য ও সুখী।

এতো গেল রাজরাজড়াদের ব্যাপার। পলাশীর প্রান্তরে নবাব সিরাজউদদৌলার পতনের মধ্য দিয়ে বাংলার নবাবী আমল শেষ হওয়ার সাথে সাথে রাজরাজড়াদের ব্যাপার স্যাপারও শেষ। এখন রাজ্য আছে তো রাজা নেই, দরবার আছে তো উজির, নাজির নেই। ঘোড়াশালে ঘোড়া নেই, হাতীশালে হাতী নেই, আছে কেবল পুরুষদের সেই আদি নবাবী সত্ত্বা। বহু রাণীর নানা বৈশিষ্ট্যের তীব্র আকাঙ্খা।

যুগযুগ ধরে সমাজপতিরা যত নিয়মই প্রতিষ্ঠা করে গেছেন সবেই তো পুরুষদের এই নবাবী সত্ত্বার পক্ষে। যে পরিবারে পুরুষদের যত বেশী রাগ, যত বেশী দম্ভ, যত বেশী আধিপত্য বিস্তার সে পরিবাই যেন বেশী বনেদি। আমাদের সমাজে এ রকম পরিবারে মেয়েদের বিয়ে দিতে পারাটাই যেন বাবা-মায়ের চরম সার্থকতা। আর এই সার্থকতার আড়ালে যে কিছু নারীর জীবন প্রদীপ বেলুনের মতো চুপসে যায় তা আমরা বুঝতে চাই না। পুরুষদের রাগ, দম্ভ আর আধিপত্যের বেড়াজালে মেয়েরা নিভে যায় কিছু প্রাণ চাঞ্চল্যে ভরা, হাসিখুশি মেয়ের উচ্ছলিত জীবন।

এরকম একটি পরিবারে কোনো মেয়ে যদি ভালবেসেও পা দেয় তো মরেছে। সেই পরিবারের নিয়ম মেনে চলতে গিয়ে তাদের কপালের টিপ, হাতে কাঁচের চুড়ি, নেলপলিস, লিপষ্টিক সব বিসর্জন দিতে হয় শ্বশুরের মুখ চেয়ে। হাত পুড়িয়ে, কালি মেখে রান্নায় পটু হতে হয় শাশুড়িকে খুশি করতে। ঘরদোর গুছানো, মেহমানদারি করা, সবার চাহিদা বুঝে সময়মতো সবার সব কিছু তদারকি করার কৌশল শিখতে হয় স্বামীর মন রক্ষা করতে আর এই সবকিছু রপ্ত করতে গিয়ে কখন তারা কখন যে নিজের অস্তিত্ব বিলীন করে ফেলে তা তারা নিজেরাও জানে না।

টানটান করে শাড়ী পরা ভুলে যায়, মাথায় ফুল গুঁজতে ভুলে যায়, গান শোনা ভুলে যায়, আবৃত্তি করা ভুলে যায়। এমনকি মন খুলে হাসতেও ভুলে যায়। কারণ কোথায় কতটুকু হাসতে হবে সেটাও পরিবার থেকে নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। তারা রপ্ত করে কাকে কোন মাছের টুকরোটা দিতে হবে, কোন রান্নায় কতটুকু ঝাল দিলে স্বাদটা একটু বেশী হবে, কার জন্য কোন তরকারিটা তুলে রাখলে কে কতটা বেশী খুশি হবে। যেন সবাইকে মায়ায় আগলে রেখে “মায়ারাণী“ হওয়াটাই তাদের জীবনের একমাত্র ব্রত। এরপরও শ্বশুরবাড়ির চাহিদা থেকেই যায়, আরও একটু দক্ষ হলে ভাল হতো। সংসারের মঙ্গলের জন্য আরও মিতব্যয়ী, আরও হিসেবী হলে সংসারটা আরও বেশী গতিময় হতো।

মায়ারাণীর ভূমিকায় নিজেকে আরও জোরালোভাবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য যুদ্ধ করতে করতে একসময় তাদের চোখে মুখে দারিদ্রতার ছাপ পড়ে, ঘষা-মাজার অভাবে চেহারায় আসে মলিনতা, চুলে আসে রুক্ষতা। অনেকেই তাদের দিকে হয়তো করুণার দৃষ্টিতে তাকিয়ে মনে মনে বলে আহারে! কেমন ছিল আর কেমন হয়েছে। তবুও সে তারা নিজেদের নিয়ে খুব সুখী কারণ ততদিনে তাদের সদাচারণে, আতিথেয়তায় সবাই তাদের প্রচণ্ড ভালবেসে ফেলেছে। আর এই ভালবাসাকেই শ্রেষ্ঠ সম্পদ ভেবে যখন তারা আত্মতৃপ্ত হয়, ঠিক তখনই তারা জীবনের কঠিন বাস্তব রূপটি দেখতে পায়।

যখন বুঝতে পারে স্বামী নামক পুরুষরা মায়ারাণীদের হাতের মুঠোয় পেয়ে, তাদের সেবা যত্ন নিয়ে, সুস্বাদু রান্না খেয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলে আর মনে মনে পাটরাণীদের খুঁজে বেড়ায়। হয়তো এক সময় স্বামী বেচারারা নিজ মুখেই বলে বসে, দেখছো, অমুকের বউটা কতো ফিটফাট হয়ে চলে, কতো সম্টার্টলি কথা বলে! তুমি কী জানো, কী বোঝো?
মায়ারাণীরা অবাক হয়ে দেখে অন্যের বউয়ের সাথে কথা বলার সময় স্বামীদের চোখে মুখে কতটা খুশির ঝলক, রসবোধ আর সাজসজ্জার এক উচ্ছসিত প্রশংসা। সমাজ, দর্শন, সাহিত্য, রাজনীতি নিয়ে আলাপচারিতায় বুঝিয়ে দেয় তার নিজেদের বউগুলো কত্ত সেকেলে! তারা বুঝতে পারে পারিপার্শ্বিক এবং সামাজিক মাধ্যমে সাজগোজ করা অনেক পাটরাণীরা স্বামীদের কীভাবে আকৃষ্ট করছে!

মায়ারাণীরা তখনই দিশেহারা পড়ে। ভাবে, একি হলো? বিবাহিত জীবনের এতোগুলো বছর যুদ্ধ করলাম তোমাদের সংসারটাকে সুন্দরভাবে টিকিয়ে রাখার জন্য আর আজ পাটরাণীকে খুঁজছো আবেগময় কথা বলার জন্য? আমরা কি এতোটাই অযোগ্য!

ততদিনে অনেকটা সময় পেরিয়ে যায়। এখন আর তাদের মধ্যে সেই প্রাণচাঞ্চল্য নেই। ততদিনে তারা মধ্য বয়সে পৌঁছে যায়। হাত পায়ে শিকড় গেড়ে যায়। তখন তারা কয়েক সন্তানের মা। নিজেকে নতুন করে সাজাবার সময় থাকে না। বয়সের ছাপে চেহারায় সাজগোজও তেমন একটা মানায় না। তারা বোঝে এখন আর এলোচুলে কানের কাছে ফুল গোঁজা শোভা পায় না। মনে মনে ভাবে তবে পুরুষ কেন তার বয়সটাকে মাথায় রাখে না, নিজেদের পাকা চুল, কপালের ভাঁজ, সবকিছুকে উপেক্ষা করে পাটরাণীদের সাথে এতো রসবোধ, এতো আবেগি কথা, এতো মাখামাখি?
আর এই সময়গুলোতেই মায়ারাণীরা নিরুপায় হয়ে স্বামীদের ভালবাসা পাবার চেষ্টায় আরেকবার সচেষ্ট হয়। চেষ্টা করে নিজেদের বদলানোর। চেষ্টা করে নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কার করার। হেয়ার স্টাইল বদলায়। পোশাক-আশাকে নতুনত্ব আনে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজের আত্মপ্রকাশে সচেষ্ট হয়। বোঝাতে চেষ্টা করে আমরাও কম নই। মনে মনে নিজেদের বলে – নারী তুমি এখনো ফুরিয়ে যাওনি, শেষ হয়ে যাওনি, তোমাদের ভেতরকার সত্ত্বাকে জাগ্রত করো। তোমার ভেতরে যা আছে তা প্রকাশ করো। তুমি যা কিছু ভালবাসো তা দিয়েই নিজেকে উন্মোচিত কর।

ফুল, পাখি, নদী, সবুজ ঘাস ভালবাসো, তার কথা লেখো। সংসার ভালবাসো, তার কথা লেখো। স্বামী-সন্তানদের ভালবাসো, তার কথা লেখো, বয়োজ্যাষ্ঠদের, গরীব অসহায়দের কথা লেখো। কোথায় তোমার সংকোচ? নিজের আত্মতৃপ্তির জন্য কিছুটা সময় বের করো। তোমরা আবার বেঁচে ওঠো। তোমরা মরে যাওনি। মনের কথা শুনে তারা। অনবরত লিখে যায় তাদের মনের সব কথা, সব। শীতে পাতা ঝরার কথা, বসন্তে কচকচে সবুজ পাতার কথা, আম্র-মুকুলের কথা, শরতের সাদা মেঘ ভেসে বেড়ানোর কথা, কাশ ফুলের কথা, আর বর্ষায় তার অনুভূতির কথা।

পুরুষরা এবার অবাক হয়! অবহেলিত বউদের ভেতরকার এই সৌন্দর্যতা ও নিজস্ব স্বকীয়তায় তারা কিংকর্তব্যবিমূঢ়! তবুও এতটুকু প্রশংসা করার মতো এতোটুকু ভাষা তাদের থাকে না। যারা এক সময় বলতো এতোকিছুই যদি জানতে তবে তো হতোই। এখন বলে, “নেই কাজ তো খই ভাজ”।

এবার স্বামীদের চাহিদা তোমরা তো মায়ারাণী। এতো মায়া দিয়ে সব চলে? তোমাদের তো সবাই ঠকায়। তোমরা কেন ঠাঁটরাণী নও! ঠাঁটরাণীর মতো কাউকে পেলে এতোদিনে আমাদের অনেক উন্নতি হতো। আমার সবকিছু সামলাতে পারতো। ছেলেমেয়ে থেকে শুরু করে বাড়ীর গৃহকর্মী সবাই কেন তাদের ভয় পায় না। সবাই কেন তাদের কথায় ওঠ-বস করে না। কথায় কথায় বলতে শুরু করে- এইজন্যই নেপোলিয়ন বলেছিলেন- “আমাকে একটি মা দাও, আমি তোমাদের একটি জাতি দেব।”

বলা বাহুল্য এইসব নারীদের সন্তানরা যে অমানুষ তা নয়, এই নারীরা যে পুরুষদের অবর্তমানে সংসারের বাজারঘাট থেকে শুরু করে বাইরের সব কাজ করে না, তা নয়, এই নারীরা যে দুই টাকা বাঁচানোর জন্য কোথায় কোন জিনিষটি কম দামে ভালো পাওয়া যায় তার খবর রাখে না তা নয়। তবুও এটা স্বামী নামক পুরুষদের একটা সহজাত অভ্যাস। নারীকে একটু দাবিয়ে না রাখতে পারলে যেন তাদের নবাবী সত্ত্বাটা চাঙা থাকে না।

পুরুষদের এসব কথায় নারীরা তখন মনে মনে হাসে——

হে পুরুষ,
একি কথা শুনালি
মায়ার শরীর বলে একদিন যারে ভালবাসিলি
ভালবাসাময় সংসারের আশায়
সব ভালবাসা কাড়িলি।
ভালবাসা দিতে গিয়ে হলাম কাঙালি
তুই এখন পাটরাণীর কাছে গিয়ে
মুখ লুকালি।
রুপ আর গুণের অভাব দেখিয়ে
মুখ ফিরালি
আবার এখন নতুন করে
ঠাঁটের অভাব দেখালি।

হে পুরুষ,
তোমরা জানো না —
যে নারীর মধ্যে ভালবাসা আছে সে শুধু তোমার পরিবার নয় সবাইকে ভালবাসবে এমনকি পথের ভিখারীকেও।
যে দু:শাসন ভালবাসে সে তোমার জন্মদাতা মা-বাবাকেও দুঃশাসনে রাখবে।
আবার যে সবার কথা ভেবে যত্ন করে রাঁধবে তার কখনও নেলপলিশ লাগানোর কথা মনে থাকবে না।
আবার যে সেজেগুজে পাটরাণী হয়ে বসে থাকবে সে কখনও দিনের পর দিন সবাইকে নিবিড়ভাবে যত্ন করার কথা ভাববে না।

তোমরা মায়ারাণী, ঠাটরাণী, পাটরাণী, সবার গুণাগুণ একজনের মধ্যে পাবে না। তাই নবাবী সত্ত্বা বাদ দিয়ে যেকোনো একজনকে বেছে নাও। এতে জীবনের মানে খুঁজে পাবে। জীবনে অনেক সুখী হবে।

শেয়ার করুন:
  • 373
  •  
  •  
  •  
  •  
    373
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.