নারীবাদী আন্দোলনকে প্রশ্নবিদ্ধ করবেন না প্লিজ!

সুমু হক:

কোনো একটি সামাজিক কিংবা রাজনৈতিক আন্দোলনে অংশ নেবার প্রথম ধাপটিই হলো সমাজকে এবং জীবনকে নিজের ক্ষুদ্র ব্যক্তিগত সত্ত্বার বাইরে গিয়ে সামগ্রিকভাবে দেখতে শেখা। ব্যক্তিগত ইগোর ঊর্ধ্বে উঠে আন্দোলনের মূল লক্ষ্যকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবার ক্ষমতা কারো না থাকলে তাকে দিয়ে আর যাই হোক, কোনো সামাজিক কিংবা রাজনৈতিক আন্দোলন সম্ভব নয়।

নারীবাদ কারও পৈতৃক সম্পত্তি নয়।

এর লক্ষ্য মানুষে মানুষে সমতার ভিত্তিতে একটি নতুন সমাজ তৈরি করা আর তার জন্যে দেশ-কাল এবং রাজনৈতিক বাস্তবতার ভিত্তিতে আন্দোলনের গতিপথ এবং প্রায়োরিটি নির্ধারণ করা। এখানে ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব তৈরি হলে সেই দ্বন্দ্বকে কখনোই আন্দোলনের ঊর্ধ্বে স্থান দেয়ার কোনো অবকাশ নেই।

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশী নারীবাদীরা যে হাস্যকর ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব এবং অত্যন্ত নোংরা পুরুষতান্ত্রিক ছকে একে অন্যকে ব্যক্তিগত অপমান করে চলেছেন তা থেকে ক্রমাগতই স্পষ্ট হয়ে উঠছে যে হিন্দি সিরিয়ালের টিপিক্যাল বৌ-শাশুড়ির ঝগড়ার যে স্টিরিওটাইপ দেখে আমরা অভ্যস্ত, তার বাইরে আর কোনো কিছু করার কোনো ক্ষমতা এদের কারোরই নেই।
যেকোনো মানুষ তখনই হিংস্র হয়ে ওঠে যখন সে হীনমন্যতা কিংবা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে।

এই সমস্ত তথাকথিত নারীবাদীদের প্রত্যেকেই নিজেদের ব্যক্তিগত চারিত্রিক এবং আরো অনেক দুর্বলতা নিয়ে এতই হীনমন্যতায় ভোগেন যে এর বাইরে এসে সামগ্রিকভাবে সমাজকে বিশ্লেষণের ক্ষমতা কিংবা যোগ্যতা কোনটাই এদের নেই।
দুঃখজনক হলো যে এদের অনেকেরই নারীবাদ নিয়ে যথেষ্ট পড়াশোনা কিংবা জীবন থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতা এবং সম্ভাবনা ছিল। এদের কাছে আমাদের প্রত্যাশাও ছিল অনেক।

সুমু হক

একটা দুর্নীতিগ্রস্থ দেশে, যেখানে ৮০% মানুষ দারিদ্রের ভেতর ধুঁকছে, যেখানে একদিকে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দুর্নীতি এবং অন্যদিকে ধর্মান্ধতা এবং পুরুষতান্ত্রিকতার বিষ মানুষগুলোকে পিষে মারছে, সেখানে যে কজন হাতে গোণা মানুষের ওপর ভরসা রাখা যেতো, যাদের কাছে অনেক প্রত্যাশা ছিল, তারা যখন সুক্ষ্ম ইগো, ভুল বোঝাবুঝি কিংবা সামান্য চিন্তার পার্থক্য আর ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বকে প্রাধান্য দিয়ে আসল লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হোন, আমাদের আসল প্রতিপক্ষ যে মূলত একটাই, এটা ভুলে গিয়ে দলাদলি এবং ব্যক্তিগত আক্রমণের পর্যায়ে নেমে যান, খুব হতাশ লাগে।

আমাদের মূল লক্ষ্য তো একটাই, তাতে কী আসে যায় কে ডানদিক দিয়ে সেই লক্ষ্যে পৌঁছুতে চাইছেন, আর কে বাম দিক দিয়ে হেঁটে, যদি না তাতে করে আমাদের মূল লক্ষ্য অর্জনে বাধার সৃষ্টি হয়?

যেকোনো লড়াইয়ে নিজেদের ভেতরের ভেদাভেদগুলোকে নির্মোহভাবে বিশ্লেষণ করে নিজেদের ভেতর বোঝাপড়ায় আসা ভীষণ জরুরি।
অভ্যন্তরীণ অন্তর্ঘাত যখন প্রকাশ্যে চলে এসে প্রতিপক্ষের সামনে মুক্তচিন্তার লড়াইয়ের দুর্বলতাগুলোকে স্পষ্ট করে তোলে, তখন সেই আন্দোলনটিকে ধ্বংস করতে আর বাইরের শত্রুর প্রয়োজন হয় না।

আমাদের সবরকম মুক্তচিন্তার এবং মানুষের মাঝে সমতার লড়াইয়ের ব্যর্থতার দায় একমাত্র আমাদের নিজেদের।
কে কার সাইটে কতগুলো হিট পেলো, কে তার ব্যক্তিগত জীবনের নিরাপত্তাহীনতার কারণে দেশের বাইরে গিয়ে কতখানি সুবিধার জীবনযাপন করছে, কার ব্যক্তিগত জীবনের নিরাপত্তাহীনতা আর হীনমন্যতাবোধ তাকে তার সবটুকু সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করতে দিচ্ছে না বলে তার কোনো নেতৃত্বের অধিকার নেই, কিংবা কার দল কত ভারী, এই নিয়ে কথা অবশ্যই বলা হবে, কিন্তু সেই সময় বোধ হয় এখন নয়, আর সে আলোচনার স্থান ফেসবুকের দেয়াল নয়!

আর যে জীবনটাকে আপনাদের কাছে আপাতদৃষ্টিতে খুব সহজ এবং স্বচ্ছল মনে হচ্ছে, সেই জীবনের পেছনের অশ্রু-ঘাম কিংবা রক্তক্ষরণের ইতিহাস যখন আপনি ব্যক্তিগতভাবে দেখেননি, সে নিয়ে তর্ক না করাই শ্রেয়।

প্রতিটি মানুষের সামাজিক এবং আদর্শিক লড়াইয়ের সাথে সাথে একটা ব্যক্তিগত লড়াইয়ের জায়গাও থাকে, আপনার আমার কাছে আমাদের নিজেদের ব্যক্তিগত লড়াইটাই সবচেয়ে ভয়ংকর মনে হচ্ছে বলেই আমরা আরেকজনের জীবনযাপনের ধরনটাকে অসম্মান করবো, সে অধিকার কিন্তু আপনার কিংবা আমার কারোরই নেই।

প্রশ্ন উঠতেই পারে, তাহলে কি আমরা কোনো সহযোদ্ধার অন্যায় আচরণের প্রতিবাদ করবো না?
অবশ্যই করবো, কিন্তু পরিপ্রেক্ষিতটি যখন একটি সামাজিক আন্দোলন, তখন সেই আলোচনাটিও প্রাপ্য়মনষ্কতার সাথে যুক্তি দিয়ে, গঠনমূলক সমালোচনার ভেতর দিয়েই করতে হবে।

আপনি যে ভাষায় যে শব্দগুলো ব্যবহার করে কিছু বলছেন কিংবা লিখছেন, সেই ভাষার পরিপ্রেক্ষিতেই আপনার বক্তব্যের বিচার হবে, এটাই স্বাভাবিক।
অন্যায়ের প্রতিবাদ করা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, কোন ভাষায় তা করছেন, কিংবা একটি অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে আপনি প্রতিপক্ষকে রেসিস্ট, সেক্সিস্ট অথবা অন্য কোনভাবে ব্যক্তিগত আক্রমণ করছেন কিনা, তার ওপরই নির্ভর করছে আপনার প্রতিবাদ আদৌ অর্থবহ হবে কিনা!

যারা এসব বিষয়ে একাডেমিক শিক্ষা কিংবা ব্যক্তিগতভাবে পড়াশোনার সুযোগ পাননি, তাদের কথা আলাদা।
কিন্তু আপনি যখন একটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করেন, এবং এ বিষয়ে আপনার যথেষ্ট পড়াশোনা আছে এটাও খুব স্পষ্টই বোঝা যায়, তারপর কিন্তু আর অজ্ঞানতা বিবেচনা করে আপনার সেক্সিস্ট, রেসিস্ট ভাষার ব্যবহার কিংবা কারো মতাদর্শের ভিন্নতার কারণে তাকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করাকে অগ্রাহ্য করা যায় না!

আবার আপনার সেই রেসিস্ট কিংবা সেক্সিস্ট ভাষার ব্যবহারের প্রতিবাদ করতে গিয়ে যদি আমি আপনার ভাষার ব্যবহার নিয়ে কথা না বলে আপনার ব্যক্তিগত জীবনযাত্রার ধরনকে কেন্দ্র করে ব্যক্তিগতভাবে আপনাকে আক্রমণ করি, তাহলে একইভাবে আমিও কিন্তু একটি অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে আরেকটি অন্যায় করছি।

ব্যক্তিগত ইগো, ঈর্ষাবোধ আর একে অন্যকে ব্যক্তিগত আক্রমণ করে সবার সামনে টেনে নামানোর চেষ্টারই ঊর্ধ্বে আজ পর্যন্ত উঠতে পারলাম না, আমরা বদলাবো সমাজ!

হাতেগোণা গুটিকয়েক নারী ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বের কারণে কে কাকে কীভাবে অপমানিত করছেন, কে কার চরিত্র নিয়ে অত্যন্ত রুচিহীনভাবে নর্দমায় বসে কাদা ছোঁড়াছুড়ি করছেন তাতে আমার বিন্দুমাত্র যায় আসে না। কিন্তু এইসব খেলো আচরণের কারণে বাংলাদেশের মতো একটি পটভূমিকায়, যেখানে সমাজের ৯৫% মানুষই অত্যন্ত নারীবিদ্বেষী ধর্মীয় কিংবা সামাজিক অনুশাসনে বেড়ে উঠেছেন এবং নারীবাদ কিংবা যেকোনো সামাজিক সমতার বিরুদ্ধে, সেখানে এই ৯৫% মানুষের সামনে নিজেদের এইসব খেলো ব্যক্তিগত ঝগড়া এবং কাদা ছোড়াছুড়ির কারণে এরা নিজেদের দুর্বলতা দেখিয়ে দিয়ে নিজেদেরকে অত্যন্ত হাস্যকর পর্যায়ে নামিয়ে তো আনলেনই, তার সাথে সাথে বাংলাদেশে নারীবাদের ধারাটিকে অন্ততপক্ষে কয়েকটি দশক পিছিয়ে দিলেন। দুঃখ এবং হতাশাটা এখানেই।

দুঃখজনকভাবে এর দায় আমার খুব ভালোবাসার কিছু মানুষের এবং আমার তো অবশ্যই, কারণ আমি তাদেরকে এই পুরুষতান্ত্রিক কাদা ছোড়াছুড়ির বাইরে নিয়ে আসতে পারিনি।

নিজের বাড়ির কাজের মেয়েদেরকে মারধোর করে, তাদেরকে মৌলিক মানবিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করে যেমন কর্মজীবী নারীদের অধিকার নিয়ে কথা বলা অত্যন্ত হাস্যকর, ঠিক তেমনি আমার একজন সহযোদ্ধাকে পুরুষতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ব্যক্তিগত আক্রমণ করে আমি যদি নিজেকে ‘নারীবাদী’ বলে দাবি করি সেটাও যার পর নেই হাস্যকর।

অনুগ্রহ করে এবার আপনারা থামুন, ব্যক্তিগত ঝগড়ার (একে আদর্শের দ্বন্দ্বের অপেক্ষাকৃত সম্মানজনক পর্যায়েও ফেলতে পারছি না, তার কারণ এই ব্যক্তিগত চুলোচুলি শেষ পর্যন্ত শুধু ঝগড়াই, এর বেশি কিছু নয়) ভেতর টেনে এনে নারীবাদের মতো একটি আন্দোলনকে প্রশ্নবিদ্ধ করা থেকে বিরত থাকুন।

নারীবাদী হওয়া তো দূরের কথা, আপনারা এখন পর্যন্ত পরিপূর্ণ, প্রাপ্তমনষ্ক মানুষের পর্যায়েও পৌঁছাতে পারেননি।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.