রাফায়েলের ম্যাডোনা

কল্যাণী রমা:

লোপার এই ছবি দুটো আমার কাছে রাফায়েলের আঁকা ‘ম্যাডোনা এন্ড চাইল্ড’ থেকেও প্রিয়। ছবি দুটো লোপার দু:সহ ক্যান্সার যুদ্ধের সাক্ষী। সোনার টুকরো ছেলে দীপ্ত মা-কে চুমু দিচ্ছে। যেন মা’র বেদনা ও সবটুকু শুষে নেবে। আমিও ছেলেপুলে মানুষ করেছি। তবে লোপার মতো নয়, পিঠে পুলির মতো। শুধুমাত্র ভিতরে ক্ষীর ভরেছি, নারকেল ভরেছি, নয়তো খেজুরের রসে ডুবিয়ে রেখেছি। কিন্তু মূল্যবোধ শেখাতে ভুলে গেছি।

আমেরিকায় বড় হওয়া দীপ্ত বাংলায় কথা বলে, সেতার বাজায়,খুব ভালোভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের কথা জানে, কারা রাজাকার তা জানে, জানে বীরাঙ্গনাদের কথা। আর এইসব ও জানে লোপা ওর চারপাশে যে পৃথিবী তৈরী করেছিল, সেখানে নি:শ্বাস নিতে নিতে। একদিন লোপা যদিও বলেছিল, ‘কী জানি রমা, ঠিক করছি কিনা। দীপ্তকে এতো বাংলাদেশের কথা বলি!ও খুব কষ্ট পায়। একে তো মা’র মরণ অসুখ। তার উপর দেশের এই পরিস্থিতি,কোন তো সুখের কথা নয়। আর দশটা ওর বয়েসী ছেলে-মেয়ের মত করে তো ওকে বড় করে উঠতে পারলাম না। হাসিখুশি,উচ্ছল।’

সেদিন বলতে পারিনি, ‘লোপা, দীপ্ত মানুষ হয়েছে। গরমের ছুটির তিনমাস যেটুকু সময় ভলেন্টিয়ার আওয়ার্স করতে হয় সেটুকু বাদে বাকিটা সময় ও মা’র কাছ ঘেঁষে শুয়ে থেকেছে। আমেরিকায় বড় হওয়া কোন্‌ ঊনিশ বছরের ছেলে এমন করবে?’

দীপ্ত আর আমার প্রথম সন্তান তিন মাসের ছোট বড়। আমার হাই রিস্ক প্রেগনেন্সি ছিল বলে চাকরি বাকরি ছেড়ে বহুমাস বিছানায় শুয়ে ছিলাম। প্রতিদিন লোপার সাথে কথা হত। “কেমন আছিস আজ? কিছু কি খেতে পারলি?” মাতৃত্বের পথ কঠিন জানতাম, এত কঠিন জানতাম না। সেই পথে লোপা আমার পথ চলার সাথী ছিল। সাহস দেওয়ার সাথী ছিল। প্রতিদিনের অভিজ্ঞতা ভাগ ক’রে নেওয়ার বন্ধু ছিল।

জন্মদিন লিখে রাখবার জন্য আমার কোন ডায়েরি নেই। মাথার ভিতর যে জন্মদিনগুলো গেঁথে গেছে, সেগুলোই আমার সম্পদ। দীপ্ত-র জন্মদিন ৮ই ফেব্রুয়ারি। অন্যদিন যেমন তেমন, গত ১৯ বছর ধরে ৮ই ফেব্রুয়ারি লোপাকে ফোন করেছি। দীপ্তকে জন্মদিনের আদর জানাতে। লোপার জন্মদিন ১৩ই জুন। আমার ভুলো মন সেটাও ভুলে যায় নি কখনো। ফোন পেয়েই লোপা হেসে বলত,”এ বছরও ভুলিস নি? কিভাবে মনে রাখিস এসব এত ব্যস্ততার মধ্যে?” সামনের বছর ১৩ই জুন-এও আমি ভুলব না। কিন্তু ফোনের ওই পাশে কেউ ফোন তুলবে না। বলবে না,’এবারও ভুলিস নি? ৫৩ বছর বয়স হতে চলল যে আমাদের!’ লোপা আমার ক্লাশ টু থেকে বন্ধু।

ছেলেবেলাতেও লোপার খুব কঠিন কঠিন অসুখ হতো। ওর অ্যাপেনডিক্স অপারেশন হলো। ধরা পড়লো রিউমেটিক ফিভার। কী হিংসাই যে করতাম লোপাকে তখন। এতো মস্ত বড় বড় অসুখ বানিয়ে ফেলেছে এই এতটুকু বয়সে? William Golding-এর Lord of the Flies বই-এর Piggy-র মত হ’য়ে যেতাম তখন আমি। দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য নিজের কেটে যাওয়া আঙ্গুলটা তুলে ধরতে চাইতাম সকলের সামনে। ছেলেবেলার দিনগুলো পিছনে ফেলে এসে আজও আমি চাইতাম লোপার ক্যান্সারটা কেন আমার হলো না? এবার অবশ্য সকলের সহানুভূতি পাওয়ার জন্য নয়। এবার লোপাকে ভালোবেসে।

গত তেরোটা বছর ধরে চাইছি। দীপ্তর যখন ছয় বছর বয়স, তখন লোপার ক্যান্সার ধরা পড়ে। লোপা যখন চলে গেল দীপ্তর উনিশ বছর বয়স। অথচ কী ভীষণ বাঁচবার সাধ ছিল ওর। ও কোনদিনই আমাদের ছেড়ে চলে যেতে চায় নি।
আর লোপার বিপরীতে আমার তো পা চিরদিনই মৃত্যুর দিকে।
আমি লেকের দিকে গাড়ি চালিয়ে দিয়েছি। বাইপোলার ডিসঅর্ডার আমার।
লোপা খুব কষ্ট পেত আমার জন্য। ‘দেখ কী অদ্ভুত! তুই বেঁচে থাকতে চাস না, আর আমাকে দেখ। আমি কোনদিন চলে যেতে চাই না। অন্ততঃ পক্ষে হুইল চেয়ারে করে হলেও আমি দীপ্তর হাই স্কুল গ্র্যাজুয়েশন দেখে যেতে চাই।’

লোপা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে বাঁচিয়ে রাখবার জন্য ওর সাধ্যের অতীত করেছে। মুক্তিযোদ্ধাদের, বীরাঙ্গনাদের টাকা দিয়ে, সময় দিয়ে, হাত ধরে থেকে। ও বলতো, ‘আমি চাইনা দীপ্ত কোন পাকিস্তানি ছেলে-মেয়ের সাথে এক বেঞ্চিতে বসুক।’ আমি ওকে বলতাম, ‘লোপা, পাকিস্তানি মানেই সে কিন্তু জল্লাদ নয়। নোবেল বিজয়ী অগ্নিকন্যা মালালা ইউসাফজাই পাকিস্তানি। চারপাশের নিকাব পড়া, বোরখা পড়া পাকিস্তানি মেয়েদের মাঝে মালালাই একমাত্র মেয়ে যার মুখ পর্দায় ঢাকা নয়। আমেরিকার মাটিতে যে ডাক্তার আমায় গত একুশ বছর ধরে বাঁচিয়ে রেখেছে সে পাকিস্তানি। যখন বাংলাদেশ এটমিক এনার্জি কমিশনে চাকরি করতাম, তখন একজন পাকিস্তানি ভাবী ছিলেন। শুনেছি তাঁর বাবা একজন নামকরা, প্রগতিশীল পাকিস্তানি কবি।’

লোপা বলতো, ‘রমা, তুই তোর বাবার হত্যাকারীকে ক্ষমা করে দিতে পারিস, আমি পারি না। আমাদের পারা উচিত নয়।’ বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে যখন আমার বাবাকে হত্যা করা হয়, আমার বয়স ছিল চার। আমি রাতে ঘুমাতে পারতাম না। দুঃস্বপ্নে দেখতাম আমার দেশের মানুষদের পাকিস্তানিরা চটের বস্তায় ভরে মুখ সেলাই ক’রে আগুনে ছুঁড়ে ফেলছে। অত ছোট মানুষ জেগে আছে!আমার ছোটমাসী, আমার মণিমা-ও জেগে থাকত। আমাকে গান শেখাত, নাচ শেখাত, কবিতা আবৃত্তি শেখাত। গভীর রাতের ভিতরও বেঁচে থাকতে শেখাত।

আমার প্রাণপ্রিয় বন্ধু সুস্মি লোপার সাথে কখনো কোন তর্কে, বিতর্কে যেত না। ও প্রতিদিন লোপাকে ফোন করেছে গত তেরোটা বছর ধরে। কিছুদিন আগে ও বাংলাদেশ থেকে ঘুরে এসেছে। ফিরে আসবার পর লোপার প্রধান প্রশ্ন, ‘আর কাকে কাকে দেখলি হিজাব পড়তে?’ খুব কষ্ট দিত লোপাকে বাংলাদেশের এই ক্রমশঃ অন্ধকারে ঢুকে যাওয়াটুকু।

যখন প্রথমবার লোপার ক্যানসার ছড়িয়ে পড়বার কথা শুনি, আমি বাচ্চাদের রেখে একাই পোর্টল্যান্ডে যাই। লোপাকে দেখতে। বাচ্চারা ছোট ছিল। সেটা একটা মাদারস ডে উইক-এন্ড ছিল। আমার খুব ভয় হচ্ছিল। কেবলই মনে হচ্ছিল মাদারস ডে তে ওর চলে যাওয়া ঠিক হবে না। লোপা লড়াকু মেয়ে। তারপর বহু মাদারস ডে ও দীপ্ত-র সাথে পার করেছে। আমার ছোটবোন শ্যামা পোর্টল্যান্ডে থাকে। ফলে শ্যামার কাছে গেলেই লোপার সাথে দেখা হয়। ওর বাসায় একবার আমাদের সবার নিমন্ত্রণ থাকে। আর তারপর শ্যামার বাসায় ওদের নিমন্ত্রণ থাকে। বহুবার ওর বাড়িতে অন্যান্য নানা পদের সাথে ওর সিগনেচার ডিশ খেয়েছি। লেবুর রস দিয়ে, হার্ব দিয়ে আস্ত স্যামন বেক।

আর লোপার বাড়ি? সে তো বাংলাদেশের যাদুঘর। কাচের বিশাল প্যাটিও ডোরে পর্দার বদলে নকশী কাঁথা ঝুলছে। কিংবা জামদানী। চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে সাজানো তালের পাখা, মোড়া, শিকা, রিক্সা, ঢোল, একতারা। দেয়ালে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন-এর আঁকা ছবির রেপ্লিকা…এতদিন ওর বাড়ি দেখে মুগ্ধ হয়েছি, কিন্তু জেনেছি ওই সাজিয়ে রাখে। কিন্তু এবার গিয়ে তো আমি হতবাক। লোপা একেবারেই বিছানায়। কিন্তু সব সেরকমই সাজানো। লোপার প্রিয় অর্কিডেরা ফুটে আছে। এমন কি বাইরের বাগানে গন্ধরাজও। মিজান শুধু লোপাকেই ভালোবাসে নি। লোপার ভালোবাসাকেও ভালোবেসেছে। সবকিছু যত্ন করে লোপার মত করেই গুছিয়ে রেখেছে।
ধীরে ধীরে লোপা আর সেভাবে রাঁধতে পারত না, তবু আমাদের খাওয়াবেই। পিজ্জা নিয়ে আসত। লোপার মুখ দেখে তো বোঝা যেত না যে ছুরি দিয়ে তরমুজ কাটবার শক্তিটুকুও ওর নেই। দীপ্ত খুব তরমুজ ভালোবাসে। মিজান কেটে দিত।

শ্যামাদের বাসায় মা রান্না করতো পাঁচমিশালি লাবড়া, মুগডাল, করলা-আলু ভাজি, বেগুন দিয়ে মুসুরির ডাল ভাজি। মিজান খুব ভালোবাসতো এসব। আর দীপ্ত ভালোবাসতো ছানার ডালনা।

এ বছর জুলাই মাসে যখন গেলাম, লোপার আর শ্যামাদের বাসায় আসবার মত অবস্থা না। আমি গিয়ে দেখি নীচের টিভি রুমে ওর বিছানা করা হয়েছে। ও সারাদিন নীচেই থাকে। ওয়াকার নিয়ে বাথরুমে যায়। ওর পুরো শরীরটা চাদরে ঢাকা। একটা হাত বাইরে বের করা। আমার হাতটা ও চাপ দিয়ে জোরে ধরে থাকলো।

কেমন যেন মনে হলো ওর শরীরটা বুঝি ছোট হয়ে গেছে। দিনের পর দিন না খেয়ে কি? আমার মনে হ’ল এটাই আমাদের শেষ দেখা। আমি জানি লোপারও তেমনই মনে হয়েছিল।

ফিরে এসে সুস্মিকে বিস্তারিত বললাম লোপাকে কেমন দেখেছি। সুস্মিটা কী যে বুঝলো! অক্টোবর মাসের চার তারিখে পোর্টল্যান্ড যাওয়ার টিকিট কেটে ফেললো। অফিস থেকে ছুটি নিল। ও নাকি গিয়ে লোপাকে ওর পছন্দের খাবার রেঁধে খাওয়াবে। লোপাকে নিয়ে গাড়ি করে বাইরে ঘুরতে যাবে। নানা পরিকল্পনা। আমি সুস্মিকে বলতে পারলাম না, ‘সুস্মি, অক্টোবর মাস পর্যন্ত লোপা মনে হয় থাকবে না।’ ২৩শে সেপ্টেম্বর, ২০১৯, সোমবার ধীরে ধীরে লোপা চলে গেল। সুস্মি সে খবর শুনে অফিস থেকে কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি এসে প্রথম যে প্লেন পেল তাতে চেপে লোপাকে দেখতে গেল। সুস্মি আমায় বলে লোপা নিষ্পাপ ফুলের মতো ঘুমিয়ে আছে। কিন্তু ওর শরীর ফ্রিজে ধাতব চামচ রাখলে যেমন ঠাণ্ডা হয়ে যায়, ঠিক তেমন।

দেশবিদেশ থেকে সবাই ফেসটাইম করে লোপার মুখটা দেখেছে। শ্যামা সুস্মিকে বলেছিল, ‘সুস্মি আপা, দিদিভাইকে কি একটু লোপা আপার মুখটা দেখাবা?’ বুদ্ধিমতী সুস্মি বললো, ‘না থাক। আমরা সবাই এখানে ফিউনারেল হোমে হাত ধরাধরি করে, কেঁদেকেটে লোপাকে দেখছি। রমা তো বাড়িতে একা। ও সহ্য করতে পারবে না।’ লোপার শেষ সময়ের মুখটুকু আমার দেখা হয়নি।

শুক্রবার, সাতাশে সেপ্টেম্বর সকালবেলা লোপার কবর দেওয়া হবে। খুব সুন্দর নাকি সেই সেমেটারি। পাহাড় দেখা যায়। পোর্টল্যান্ড তো এমনিতেই ছবির মতো। মাউন্ট হুড, ঝরণা, কলম্বিয়া নদী, গর্জ। শুনলাম মিজানও নাকি লোপার পাশেই নিজের জন্য একটা স্পট নিয়েছে। পরে যদি না পাওয়া যায়!

আজ বিকালে মিজানের সাথে ফোনে অনেকক্ষণ কথা হলো। স্বল্পভাষী মিজান যে এতো কথা বলতে পারে জানতাম না। মিজান বলছিল ‘লোপার মতো একজন মানুষ আমাকে যে তার সাথী করেছিল সেটাই শুধু আমি খালি ভাবছি’। আর আমি ভাবছিলাম প্রথম যখন লোপা মিজানের প্রেম হয় তখনকার কথা।

লোপার বয়স ছিল পনেরো, মিজানের ষোলো। ওরা হাই-স্কুল সুইটহা্র্ট। এদেশে মধ্য বয়সে পৌঁছানো কিছু কিছু হাই-স্কুল সুইটহা্র্ট কাপল দেখেছি আমি। খুব বেশি না। আমেরিকাতে মতের মিল, মনের মিল না হলে দেশের মত দাঁত চেপে বাকি জীবন একসাথে সাধারণত থাকে না কেউ। তাই হাই-স্কুল সুইটহা্র্ট কাপল দেখলে সবাই একটু মাথা নেড়ে মিষ্টি হাসে।

আমরা তখন ক্লাশ নাইনে পড়তাম। মিজানের চিঠি আসলেই লোপা আমাদের পড়তে দিত। শাওনদের ছাদে বা শুচিদের ছাদে গিয়ে বাবা, মা-কে লুকিয়ে সেইসব চিঠি পড়তাম আমরা। যদি ঝমঝম করে বৃষ্টি শুরু হয়ে যেত, তবু কিশোরী জীবনের সরলতা আর ঔৎসুক্য হার মানত না। যেভাবেই হোক চিঠি আমাদের পড়া চাই ই চাই। এক সময় চিঠি শেয়ার করা বন্ধ হলো। দেখি লোপা আর খুব একটা উচ্চবাচ্য করছে না। বুঝতে পারলাম ওর এবার বন্ধুদের সম্মতির প্রয়োজন ফুরিয়েছে । প্রেম প্রগাঢ় হয়েছে।

লোপা চলে যাওয়ার পর চেনা, অচেনা অনেক মানুষ যোগাযোগ করেছে। সবাই কাঁদছে। আমি কাঁদতে পারিনি একটুও। লোপা কী ভীষণ বাঁচতে চেয়েছিল! আমার হাতের ভিতর এখনও ওর হাতের উত্তাপটুকু রয়ে গেছে। কী জোরে চাপ দিয়েছিল। লোপা হাত ছেড়ে দেবে না।

শেয়ার করুন:
  • 1.1K
  •  
  •  
  •  
  •  
    1.1K
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.