তেজস্বী গ্রেটা

সুপ্রীতি ধর:

গ্রেটা থুনবার্গ ১৬ বছরের এক কিশোরী মেয়ে। চোখে-মুখে কী ভীষণ তেজ, কী দৃঢ়তা, কথা বলার মাঝে কী এক শৈল্পিক ভাব, এসবই মুগ্ধ করে রেখেছে গত কয়েকটি দিন। বিশ্বের গণমাধ্যমগুলোতেও এখন সব খবর ছাপিয়ে গ্রেটাই হয়ে উঠেছে প্রধান খবর, আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।

আসলে আমরা খুবই ক্লান্তিকর চরম বন্ধ্যা সময় পার করছি। কোথাও কোনো আশার বাণী কেউ শোনাতে পারছে না, না জাতীয় পর্যায়ে, না আন্তর্জাতিক। ফলে আমরা খড়কুটোর মতোন আঁকড়ে ধরেছি এই কিশোরী মেয়েটিকে, যেন ওই পারবে আমাদের এই অন্ধকার গহ্বর থেকে বের করে নিয়ে যেতে।

এরই মধ্যে বিশ্বের যেকোনো মানুষেরই জানা হয়ে গেছে মেয়েটি কে! কী চাই তার! নিজে বাঁচতে চায়, বাঁচাতে চায় ভবিষ্যত প্রজন্মকে। আর তাই তার সঙ্গী হয়েছে বিশ্বের কোটি কোটি কিশোর-তরুণ প্রজন্ম। আমরা বয়োবৃদ্ধরা বার বার চোখ মুছছি একটুখানি আশার পরশ পেয়ে। নিজেদের ব্যর্থতায় এভাবেই বুঝি জীবন ফিরে পায় কেউ কেউ!

জাতিসংঘে রাষ্ট্রপ্রধানদের উদ্দেশ্যে দেওয়া বক্তব্যে কিশোরী গ্রেটার সেই সাহসী উচ্চারণ, যা শুনে প্রতিটি মানুষের ভিতরে সুপ্ত থাকা প্রতিবাদী সত্তাটা জেগে উঠেছে, আমি নিশ্চিত।

“আমি জানাতে চাই– আমরা তোমাদেরকে নজরদারিতে রেখেছি। তোমাদের সব কিছুই ভুয়া। আমার এখানে আসার কথা নয়। সমুদ্রের ওপারে স্কুলে ফিরে যাওয়ার কথা আমার। তোমরা আমাদের মতো তরুণদের কাছে আশার কথা শুনতে এসেছো। তোমাদের সাহস কতো?

তোমরা আমার স্বপ্নগুলোকে চুরি করেছো। চুরি করেছো আমার শৈশবকে। দিয়েছো একটি শূন্য পৃথিবী। আর এখন পর্যন্ত আমি ভাগ্যবতীদের একজন। মানুষ কষ্টে আছে। মানুষ মারা যাচ্ছে। বাস্তুজগৎটা ভেঙে পড়ছে। আমরা বিপুল ধ্বংসের মুখে আছি। আর তোমরা টাকা পয়সা নিয়ে গালগল্প করছো। ভুয়া অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিয়ে মিথ্যে গল্প বলছো। তোমাদের সাহস কতো?

তোমরা আমাদেরকে ব্যর্থ করে দিচ্ছো। কিন্তু তরুণরা তোমাদের বিশ্বাসঘাতকতাকে ধরে ফেলেছে। ভবিষ্যতের মানুষের চোখগুলো তোমাদের দেখছে। যদি তোমরা আমাদেরকে ব্যর্থ করে দিতে চাও, আমি বলছি, তবে আমরা কখনোই তোমাদেরকে ক্ষমা করবো না…..”

জাতিসংঘের সদর দপ্তরে সাধারণ পরিষদের ৭৪তম অধিবেশনের অংশ হিসেবে আয়োজিত ‘জলবায়ু ব্যবস্থা গ্রহণ শীর্ষ বৈঠকে’ আমন্ত্রিত বক্তা হিসেবে একথা বলেছে গ্রেটা।

এর আগে গ্রেটার আহ্বানে বিশ্বের ১৫০টিরও বেশি দেশে গত শুক্রবার লাখ লাখ মানুষ জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় বিশ্ব নেতৃবৃন্দের ব্যর্থতার প্রতিবাদে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে।

নিউইয়র্কে বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারী কয়েক লাখ ছাত্রছাত্রীর দিকে তাকিয়ে গ্রেটা
প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, ‘বিশ্ব নেতৃবৃন্দ আমাদের কথা শুনতে পান না। কিন্তু আমি তাঁদের আমার কথা শুনিয়ে ছাড়বো।’

সোমবার জাতিসংঘের অধিবেশনে গ্রেটা বলে, ‘আপনারা আমাদের রক্ষায় ব্যর্থ হচ্ছেন। কিন্তু আমি এখানে এসেছি শুধু এই কথা বলতে, মনে রাখবেন, আপনারা কী ব্যবস্থা গ্রহণ করেন, আমার তার ওপর নজর রাখবো।’

গত একবছর ধরেই শুনছি গ্রেটার নাম। সুইডেনে থাকার সুবাদেই হোক বা বিশ্বের খবরাখবর রাখার কারণেই হোক, ছোট্ট গ্রেটার একার লড়াইটা নজর কেড়েছিল। সে একাই স্টকহোমে প্রতি শুক্রবার ‘স্কুল স্ট্রাইক ফর ক্লাইমেট’ নামে প্রতিবাদ কর্মসূচি চালিয়ে যেতে থাকে। ধীরে ধীরে তার প্রতি নজর পড়ে গণমাধ্যমের, এভাবেই আলোচনায় উঠে আসে সে। একজন একজন করে তার পাশে জড়ো হতে থাকে পরিবেশ সচেতন মানুষজন।

গ্রেটার পরিবেশবাদী বক্তব্য চাবুকের মতো আছড়ে পড়ে সারাবিশ্বে। তারই প্রতিফলন দেখা গেল গত সপ্তাহে। অস্ট্রেলিয়া, জার্মানিতে লাখো তরুণের সমাবেশ ঘটে এই কর্মসূচিতে। জার্মানিতে প্রতিবাদের মুখে সরকার বিশেষ বরাদ্দের ঘোষণা দিতে বাধ্য হয়। প্রতিবাদ হয় ভারতসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশেও।

জাতিসংঘে সোমবারে গ্রেটার ভাষণের পর বিশ্বনেতাদের অনেকে তাকে অভিনন্দন জানান। এঙ্গেলা মেরকেলসহ অনেকেই তার সঙ্গে আলাদা করে বৈঠকে বসেন।
কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাকে এড়িয়ে যান, গ্রেটাও তার বক্তব্যের কোথাও ট্রাম্পের নাম উচ্চারণ করেনি। তবে তার আক্রমণের লক্ষ্য ছিলেন ট্রাম্প।

যে বয়সে আমাদের দেশের একটা প্রজন্ম নেশায় আসক্ত, যখন তারা কোনো দিকনির্দেশনা না পেয়ে মানসিক বৈকল্যে ভুগছে,  ঠিক সেই বয়সেরই একটি মেয়ে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। কেবল নিজের কথাই নয়, তাকে ভাবাচ্ছে কোটি মানুষের ভবিষ্যত, তাকে স্যালুট।

যখন চারদিক আসলেই অন্ধকার তখন এই মেয়েটি কোথা থেকে যেন আবির্ভুত হলো, ওই এখন আমাদের একমাত্র অবলম্বন।

অনেকেই ওর সমালোচনা করছে, ও কাদের পারপাস সার্ভ করছে তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে, সেগুলোও খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়েছি। গ্রেটা নিজেও এর ব্যাখ্যা দিয়েছে। আরও পড়েছি গ্রেটার ফেসবুক পেইজে অধিকাংশের কমেন্ট, বেশিরভাগই ভালবাসাময়, উৎসাহদায়ক। বিশেষ করে ওর স্কুলের শিক্ষকদের কমেন্টগুলো বেশি ভালো লেগেছে। তাই আমি মোটেও নেতিবাচক হিসেবে দেখতে চাইছি না। আমার মন চাইছে ওকে, এবং পুরো বিষয়টাকেই পজিটিভলি দেখতে, আমি তাই দেখছি। কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোকে যেমন দেখি।

ছোট্ট একটি বাচ্চা মেয়ে আজ বিশ্ব কাঁপিয়ে দিয়েছে, কোটি কোটি মানুষের ভিতরে আশার সঞ্চার করেছে, এইটুকুই আমার কাছে যথেষ্ট।
ও আমাদের সন্তান হয়েই নাহয় থাকুক, ওকে নাহয় একটু ভালোই বাসি আমরা…ক্ষতি তো নেই!

শেয়ার করুন:
  • 391
  •  
  •  
  •  
  •  
    391
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.