আমরা কি প্রস্তুত করছি কিশোর-কিশোরীদের?

কাজী তামান্না কেয়া:

আমার বন্ধু লিস্টে আমার বেশ কিছু ভাগ্নি, ভাতিজি, ছোট বোন, ভাই আছে। আমি তাদের ফেইস বুক পোস্ট আগ্রহ নিয়ে দেখি। তাদের চিন্তা-ভাবনা বোঝার চেষ্টা করি। কিন্তু বেশীর ভাগ সময় পোস্টগুলি হয় গৎবাঁধা টাইপ। তারা কই খেতে গেল, কি পোষাক কিনল, বন্ধু বান্ধব নিয়ে কই বেড়াতে গেল, সেই সব পোস্ট দেখি।
আমি কিছুটা আক্ষেপ অনুভব করি। তারা কেন তাদের ট্রু সেলফ বা ব্যক্তি স্বত্তাকে তুলে ধরতে পারেনা? ছোট ভাই বা ভাগ্নেদের দেখি, যে বয়সে বান্ধবীর হাত ধরে বা পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তুলে পোস্ট করার কথা, তারা সেই ছবি তোলে নিজের বোনের সাথে। নিজের বোনের সাথে ছবি অবশ্যই তুলবে এবং ফেইসবুকে পোস্ট দিবে। কিন্তু বান্ধবীদের সাথে নিয়েও কোনো পোস্ট নেই কেন? ওদের কি আসলে কোন বন্ধু নেই নাকি মেয়ে বন্ধুদের সাথে ওদের ছবি দেখতে আমরা বড়রা প্রস্তুত নই? ওদের অনেকের হয়তো আসলেই কোন বান্ধবী নেই। তবে যাদের আছে, সেসব বিষয় ফেইসবুকে তুলে ধরাটা সহজভাবে নেয় না আমাদের সমাজ। এখন তো অনেক পরিবার আরো এক ধাপ কঠিন। সরাসরি বলে দেয়, প্রেম করা যাবে না, গেলেও পারিবারিক মর্যাদা দেখে শুনে প্রেম করতে হবে।

কিন্তু ওই বয়সে আমাদের তো বিপরীত লিঙ্গের বন্ধু ছিল। আমাদের সবাই কি সেইসব বন্ধুদের সাথে ঘর সংসার পেতেছি? কেউ কেউ নিশ্চয়ই সফল হয়েছি, তবে সবাই না। বাস্তব জীবনে, হাইস্কুল সুইটহার্টদের বেশির ভাগ আমাদের জীবন থেকে হারিয়ে যায়। তাছাড়া সব বয়ফ্রেন্ড বা গার্লফ্রেন্ড এর কি আমাদের সাথে জীবন জড়ানোর মতো মানসিক বা সামাজিক দক্ষতা বা যোগ্যতা থাকে? না, থাকে না। তো তারা যদি জীবন থেকে ঝরে যায়, সেটা কি অস্বাভাবিক? একদম না। আমাদের সন্তানদের জানতে হবে, সঙ্গীর আগমন বা ছেড়ে যাওয়া, জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এগুলি নিয়েই আমরা জীবনের পরবর্তী ধাপে এগিয়ে যাই।

শুধু লেখাপড়ায় এগিয়ে যাওয়া নয়, আমাদের ছেলেমেয়েগুলি জীবন দক্ষতার অংশ হিসেবে সঙ্গীও নির্বাচন করতে শিখুক, সম্পর্ক নিয়েও স্বচ্ছ ধারণা রাখুক। তারা জানুক সঙ্গীকে ভালবাসার সাথে সম্মান করতেও জানতে হয়।

সুস্থ এবং স্বাভাবিক জীবন যাপনের স্বার্থে যে সম্পর্কটি চালিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব না, সেটাকে এক পাশে রেখে জীবনে এগিয়ে চলাটাও জরুরি, এই শিক্ষাটা নেবার বয়সও কিন্তু সেই ১৬ বছর থেকেই শুরু হয়। এমেরিকায় দেখি এইটথ গ্রেড পাশ করলে ছেলেগুলিকে মায়েরা বান্ধবী নিয়ে ঘুরতে যাওয়ার জন্যে প্রস্তুত করে। কিছু পয়সা দিয়ে দেয় পকেটে, ভালো একটি স্যুট কিনে দেয়। ছেলেটি সাধারণত ক্লাসের বা তার পরিচিতদের মধ্য থেকে একজন মেয়েকে নিয়ে সিনেমা দেখতে যায়, বেড়াতে যায় বা খেতে যায়। আবার মেয়ের বাবারা মেয়ের ১৬ বছর হলে পার্টি দেয়, পার্টিতে বাবা মেয়ের হাত ধরে নাচে, একজন পুরুষের কাছ থেকে কেমন ব্যবহার মেয়েটি আশা করবে, মেয়েটি তা তার বাবার কাছ থেকে শেখে। অর্থাৎ পরিবার এবং সমাজ থেকে সঙ্গীর সাথে মেশার বিষয়টিকে স্বাভাবিকভাবে দেখা হয় এবং পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়।

প্রশ্ন হলো আমাদের পরিবার, বা সমাজ কি আমাদের সন্তানদের লেখাপড়ার বাইরে জীবন দক্ষতা নিয়ে ভাবছি? আমরা কি সন্তানদের কথাগুলি শোনার মতো সময়, বা পরিবেশ তৈরি করে রেখেছি?

নাকি মনের কথা আর ভাবনাগুলি শেয়ার করতে তারা বেছে নিয়েছে তাদেরই বয়সী কোন বন্ধুকে? আজকাল ফেইসবুক গ্রুপ নামে যে ব্যাপারটা আছে, সেটাতে আমার চিন্তা হয়। দেশে দুই কোটি মানুষ মানসিক ব্যাধিতে আক্রান্ত। তো এই ব্যাধিগ্রস্ত লোকজনের ব্যাধির ব্যাপারটা চট করে আমরা ধরতে পারি না। তারা সমাজে স্বাভাবিক মানুষের মতোই মিশে থাকে এবং প্রশিক্ষিত মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সাহায্যে তাদের মানসিক ব্যাধি নির্ণয় করা সম্ভব না।

আমাদের দেশে সেই সুযোগ খুবই কম। তো সেইসব উগ্র এবং ক্ষতিগ্রস্থ মানসিক চিন্তার লোকজনেদের অনেকেই ফেইসবুককে নিজেদের বিদ্যা বুদ্ধি জাহির করতে নেমে পড়েন। তারা বিভিন্ন পেইজ চালায়, এডমিন হয়। সেই সব এডমিনদের আমরা চিনি না, জানি না, বাস্তব জীবনে কখনো দেখি না, কিন্তু তাদের চিন্তার সাথে যুক্ত হই ফেইসবুক গ্রুপের মাধ্যমে। যে সমস্যা সমাধান করতে হয় পরিবার থেকে, সমাজ থেকে, ডাক্তার এবং শিক্ষকের সাথে, সে সমস্যা নিয়ে আমাদের ছেলেমেয়েগুলি সমাধান খুঁজে এসব ফেইসবুক গ্রুপে। আমি তখন আসলেই আতংকিত বোধ করি।

আজ আমরা যারা বাবা মা কিংবা গুরুজনের আসনে রয়েছি, নিজেদের প্রাতিষ্ঠানিক বা লেখাপড়ার পরিচয় নিয়ে আত্মতৃপ্তি নেই, আমরা কি আজকের জায়গায় এসেছি ভুল না করে? মোটেও না। আমাদের পথ কি কাঁটা বিছানো ছিল না? অবশ্যই ছিল।

আমি শুধু চাই, সন্তানদের জীবনের সেইসব সমস্যা নিয়ে আমাদের শিশু, কিশোর, তরুণরা নির্ভয়ে আমাদের সাথে বলতে শিখুক। আমাদের প্রশ্ন করতে জানুক, দরকার হলে চ্যলেঞ্জ করুক– যুক্তি, বুদ্ধি আর উদাহরণ দিয়ে।

আমাদের শুধু তাদেরকে শেখাতে হবে তাই নয়, ওদের কাছ থেকে শিখতেও হবে। সমাজে ভালো মানুষের মুখোশ পরে বসে থাকাটা কোনো বুদ্ধিমানের কাজ নয়। সমাজের জঞ্জাল পরিষ্কার করার দায়িত্ব আমাদের নিজেদেরকেই নিতে হবে, আমাদের সন্তানদের, ছোট ভাই বোনেদের সাথে নিয়ে।

শেয়ার করুন:
  • 72
  •  
  •  
  •  
  •  
    72
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.