লোপা, বিদায় বলবো না তোমায়!

সুপ্রীতি ধর:

তানিয়া মোর্শেদ, যাকে আমরা লোপা নামে ডাকি, সে চলে গেছে। আর আসবে না কখনও। মুহূর্তের জন্য এসে বলবে না, ভালো নেই আমি বা My condition is not good! আমরাও আর কখনও উন্মুখ হয়ে থাকবো না ও কেমন আছে জানার জন্য।

তুমি ছিলে আমার বন্ধুর বন্ধু হিসেবে অন্যতম এক বন্ধু। এই বন্ধুত্বে কালিমা নেই, বরং দৃঢ়তা আছে। ভালবাসা আছে, সমালোচনাও আছে। সর্বোপরি হাত দুটি ধরে পাশে থাকার মতোন মানসিকতা আছে। এখন থেকে এই সবগুলো ‘আছে’ বলতে হবে ‘ছিল’। তাই কি লোপা? তুমি কি অতীতযোগ্যা? না তো!

এইতো সেদিনই তোমার কথা জানতে চেয়েছিলাম তোমার ছোটবেলার বন্ধুদের কাছে। সুস্মি জানালো ভালো নেই তুমি। অক্টোবরে ও যাবে তোমাকে দেখতে। সেই সুস্মি এখন যাচ্ছে তোমাকে ‘দেখতে’, বললো ‘দেরী হয়ে গেলো’।

কল্যাণী রমা  কিছুদিন আগেই দেখে এসেছে জেনে ফোন দিয়েছিলাম ওকে। তোমাকে ফোন করার সাহস কই আমার! রমা বললো, তুমি ভালো নেই। সারাবাড়িতে তোমার উপস্থিতি সুন্দর করে সাজিয়ে রেখেছে তোমার সঙ্গী মিজান, এতোটুকু ম্লান হতে দেয়নি। এই মিজানের কথা তুমি নিজেও বলেছো আমাকে অনেকবার। তবে সেগুলো ছিল তোমার আক্ষেপের কথা। রমা এও বললো যে, সারা বাড়ি জুড়ে অসংখ্য অর্কিড ফুটেছে এবার। তোমার পছন্দ বলে মিজান সব করেছে। বলো তো, এমন ভালবাসাও তুমি পেয়েছো জীবনে!
বলতে তোমার অসুস্থতার জন্য মিজানকে কতোটা ত্যাগ করতে হয়েছে, এসব! শুনতে গিয়ে মনে হতো, সত্যিই তো, মিজানের অনেককিছু করার ছিল, কিন্তু পরক্ষণেই তোমার প্রতি কিছুটা হিংসাও হতো।
রমা বলছিল, তুমি বাঁচতে চাও। তোমার গলায় তেমনই আকুতি সে শুনেছে। তোমার সব লেখাই তো আমি পড়েছি। এই আকুতির কথা তোমার লেখাতেও ছিল। রমার মা আমাদের ঝর্ণা মাসীও তো বললেন, তোমাকে দেখে বা তোমার সাথে কথা বলে তো কখনও মনেই হয়নি যে তুমি ‘চলে যাচ্ছো’!

চলে যাওয়ার খবরটা শোনার পর তোমার লেখাগুলো বের করলাম। উইমেন চ্যাপ্টারে সর্বমোট ৮০টা লেখা ছাপা হয়েছে, আর হবে না কোনদিন। আর কোনদিন অসুস্থতা থেকে কিছুটা সুস্থ হয়ে ফিরে এসেই আমাকে লেখা পাঠাবে না তুমি! একদম শুরু থেকেই তুমি ছিলে আমার সাথে, আমাদের সব কাজের সাথে, সব লড়াইয়ের সাথে।
মনে আছে একদিন তুমি তোমার পুরো ডায়েরিটা (এক যোদ্ধার ডায়েরি) আমাকে মেইল করে বলেছিলে যে, নিজের মতো করে গুছিয়ে নাও। তারপর তো আরও লিখেছো, আরও অনেক। একসময় বইটা বের হলো, সেখানে আমার নামও স্থান পেলো। হতভাগ্য বন্ধু আমি।

ছোটবেলার এই ছবিতে লাল জামা পরা তানিয়া মোর্শেদ লোপার সাথে তার বন্ধুরা

তোমার মতোন এমন লড়াকু মানুষ আমি আর দেখিনি। জানতাম তুমি আজ বা কাল চলে যাচ্ছো। কিন্তু তুমি যে বলতে, ছেলেটা আরেকটু বড় হোক, তারপর যাই, আরেকটু বড়, যখন ও নিজে বাঁচতে পারবে।
লোপা, কতোটা বড় হয়েছে তোমার দীপ্ত? দেখবে না তুমি?

কতো কতো মানুষ তোমার কাছ থেকে ভালবাসা পেয়েছে, তুমি দেখবে না ওদের?
রানা প্লাজার সেই মেয়েগুলো, যাদের তুমি রিকশা কিনে দিয়েছো, পরিবারের খরচ দিয়েছো, বাচ্চাদের দুধের খরচও জুগিয়েছো। আর্য, শ্রেষ্ঠা, আনিস ভাই, কতো মানুষের পাশে ছিলে তুমি! আনিস ভাইয়ের জন্য তুমি কতো ব্যাকুলই না ছিলে! তাকে জানতে না বলে আফসোস করেছিলে, তার মৃত্যুতে কষ্ট পেয়েছিলে। এখন কি দেখা হবে তোমাদের?

গোবিন্দগঞ্জে যখন আদিবাসীদের ওপর হামলা হলো, আমরা সাহায্য তুললাম ওদের জন্য, তুমি একাই এগিয়ে দিলে আমাদের দানের সীমানা। ছোট্ট পূজার হাতে তুলে দিলে কিছু টাকা। আমি পূজার ছবি দেখালাম তোমায়, বললে, তোমার চোখটা টনটন করছে ব্যথায়। আর রমা মাসীমার কথা? ঊনার বই প্রকাশের জন্য এগিয়ে এলে। সেইসাথে অনেকসংখ্যক বইও কিনে নিলে। মুক্তিযুদ্ধ, একাত্তর, রাজাকার, নারী-শিশুর ওপর অত্যাচার, আদিবাসীদের ওপর নির্যাতন, সবকিছুতেই তোমার স্পর্শ ছিল। বিদেশে থেকেও কীভাবে দেশের সাথে ওতপ্রোতভাবে থাকা যায়, তুমি ছিলে তার জ্বলজ্বলে উদাহরণ লোপা। এখনও তাই থাকবে। তোমার কাজেই তুমি থাকবে, তোমার লেখায় তুমি থাকবে।  

এক জীবনে নিজের শরীরের সমস্ত যন্ত্রণা পাশে রেখে তুমি অন্যদের কষ্ট লাঘবের চেষ্টা করেছো। এটা কেবল তোমার পক্ষেই সম্ভব।
আমার মাথা খারাপ করা দিনগুলোতে তুমি ফোনের পর ফোন করে কথা বলেছো আমার সাথে। বলেছো, একদিন তো সবাই যাবো, এতো তাড়া কীসের! আমার তো তাড়া নেই। তোমার তাড়া ছিল কেন?

লোপা দেখো তোমার চলে যাওয়ার খবরে তোমার বন্ধুরা, কাছের মানুষেরা সবাই কেমন কষ্ট পাচ্ছে। তোমার ছোটবেলার বন্ধু কল্যাণী রমার মা ঝর্ণা নাথ লিখেছেন,

লোপা তো যাবার জন্যে পা বাড়িয়েই ছিল। তবুও মানা যাচ্ছে না। দুই সপ্তাহ আগে ফেইসবুকে দেখলাম লোপার শরীর অনেক খারাপ, শ্যামাসহ সন্ধ্যাতে দেখতে গেলাম। সবিতা, দীপ্ত, মিজান ছিল। যত খারাপ ভেবে দেখতে যাই, আমার সে রকম মনে হলো না। আমাদের সবার সাথে ভালো ভাবেই কথা বললো। গলার স্বরও স্বাভাবিক লাগলো। মনে অনেকটা শান্তি নিয়ে ফিরলাম। সুস্মি অক্টোবরের ৪ তারিখ লোপাকে দেখতে আসবে বলে টিকিট কেটেছে, অফিসে ছুটি নিয়েছে, কিন্তু লোপা তার মা, ভাই আত্মীয় বন্ধু সবাইকে আসতে বারণ করছিল। মনে হয় তার কষ্টটা কেউ দেখে কষ্ট পাক সেটা সে চায়নি। এখন অমৃতলোকে লোপা শান্তিতে থাকুক। মিজান, দীপ্তসহ আত্মীয় বন্ধু সবাই যেন এই শোক সইতে পারে সেজন্যে প্রার্থনা করি।

শিক্ষক কাবেরী গায়েন লিখেছেন,

লোপা আপা চলে গেছেন, জানলাম কল্যাণী রমা’দির পোস্টে। জানতাম লোপা আপার অসুস্থতার কথা। কতো কতো দিন যে কথা হয়েছে আমার ২০১৬/১৭/১৮ সালে আমেরিকায় বসবাসের দিনগুলোতে! অত্যন্ত মেধাবী, স্পষ্টভাষী, স্বচ্ছ চিন্তার এই মানুষটি আবার ভীষণ আবেগপ্রবণ ছিলেন মুক্তিযুদ্ধ, অসাম্প্রদায়িকতা আর মানবিকতার প্রশ্নে। কঠিনে-কোমলে এমন সৎ, সাহসী, স্নেহপ্রবণ মানুষ ক’জন আছেন আমার চেনাজানার মধ্যে? খুব বেশি না। ডার্ট্মাউথ ক্যাম্পাসের বড় পুকুরের পাড় ধরে হাঁটতে হাঁটতে কথা বলতাম অনেক বিকেলে-সন্ধ্যায়, ঘন্টার পরে ঘন্টা। মাঝেমধ্যে একটু খুক খুক করে কাশতেন। শ্বেতার জন্য যখন ক্যাম্পেইন করছি, নিজেই এগিয়ে এলেন। পেনপল অ্যাকাউন্ট খুললেন, সবার টাকা-পয়সার হিসেব রাখলেন, দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করলেন।

মেডিক্যাল ট্রায়ালের ভেতর দিয়ে যাবার কথা নিজেই জানিয়েছিলেন। সেদিন লিখলেন স্ট্যাটাসে, খুব ছোট করে, ভালো নেই তিনি। আমি ইনবক্সে লিখলাম। এই প্রথম কোন উত্তর এলো না। বুঝলাম, লোপা আপা কতোটা খারাপ আছেন!

লোপা আপার মত মানুষ চলে গেলে যে বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখে একদিন দেশটা স্বাধীন হয়েছিলো, সেই বাংলাদেশের একজন মানুষ কমে যায়। আমার ব্যক্তিগত ভালোলাগা, ভালোবাসা ছাড়িয়ে এই কথাটাই মনে হচ্ছে শুধু। লোপা আপার সাথে সামনা-সামনি কোনদিন দেখা হয়নি আমার। অথচ প্রাণের মানুষ চলে যাবার ক্ষত বোধ করছি। ভালোবাসা লোপা আপা! সমুখে শান্তি পারাবার।

শেখ তাসলিমা মুন  তার টাইমলাইনে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে লিখেছেন,

২০১৩ সালে এভাবেই সে প্লেকার্ড হাতে দাঁড়িয়েছিল যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে, এটাই আমাদের লোপা, এই তার চিরন্তন রূপ

তানিয়া ২০ বছর ধরে ক্যান্সারের সাথে যুদ্ধ করছিল। ও আমাদের বড় spoiled করে ফেলেছিল। ও যুদ্ধ করছে, ফিরে আসবে – এমন একটা ধারনাই বদ্ধমূল হয়ে গিয়েছে মনের ভেতর। ও হারবে এটা মনের কোন জায়গায় জায়গা পায়নি। ও কোনদিন লেখেনি, ‘আমি ভাল নেই’। সেটা সে লিখেছিল শেষ পর্যন্ত। কি আশ্চর্য! তবু আমি কেমোর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছাড়া কিছু ভাবিনি। তানিয়াকে আমি হার মানতে দেখিনি। তানিয়া হার মানেনি, তানিয়ার ২০ বছরের যুদ্ধের শেষ হয়েছে।
তানিয়া, তোমার মতো যোদ্ধা আমি আর দেখিনি।

তানিয়ার মত সাহসী এবং ইন্টিগ্রিটি সম্পন্ন মানুষ আমি কম দেখেছি। সে কোনো অকারণ সহানুভূতি চাইতে কোন পোষ্ট দিতো না। এ বিষয়ে সে সবাইকে সতর্ক করে দিতো। তার অসুখ বিষয়ে ডিটেইলস লিখত। বড় বড় লেখা। মানুষের সাথে শেয়ার করতো। অনেক ডিটেলস মানুষের উপকারে আসতো। সে অসুখটা খুব নির্লিপ্ত আবার সিরিয়াস বিষয় হিসেবে তুলে ধরতো। তার অসুখটাকে সে ট্যাবু করে তোলেনি কখনও। অনেক মানুষের বেঁচে থাকার যুদ্ধ এবং বেঁচে থাকার কারণ সে স্বচ্ছ করে গেছে।

ফারজানা কবির স্নিগ্ধা লিখেছেন,

প্রিয় লোপা আপু,

আপনি বলেছিলেন সুস্থ হয়ে আমাকে ফোন করবেন, এমন তো কথা ছিলো না আপা! আপনি বলেছিলেন, আপনি ইউরোপের কিছু দেশ ঘুরে দেখবেন। বিজ্ঞানের এত বিকাশ হলো অথচ কর্কট নামের রোগটাকে এখনো দূর করা যাচ্ছে না। লোপা আপার মত মানুষের সঙ্গে কোনদিন দেখা হয়নি, তারপরও এতো কষ্ট লাগে কেন? পোড়া মাস এই সেপ্টেম্বর মাস। আর কত প্রিয়জনকে বিদায় জানাতে হবে এই মাসে? বিদায় আপনাকে লোপা আপু। একজন সুন্দর মনের মানুষ চলে গেলেন। জানতে পারলাম কাবেরী গায়েনদি’র পোষ্ট থেকে।
মানুষের জীবনের পরম সত্য হলো- মানুষকে চলে যেতে হয় এই পৃথিবীর মায়া ছেড়ে। আর কথা হলো না আপা। আর আশায় থাকবো না যে আপনি ফোন করবেন‌!

আপনার শেষ লেখা কথাগুলো তুলে দিয়ে আজ বিদায় জানাতে চাই, –
“বেশ কিছুদিন পর এই মুহূর্তে ফেইসবুকে ঢুকে তোমার মেসেজ, আমাকে নিয়ে দেওয়া স্ট্যাটাস পড়ে এতটাই অভিভূত হলাম স্নিগ্ধা! পৃথিবীতে যখন মানুষের আকাল চলছে তখন তুমি আমায় এতটা ভালবাসা দেখালে?! তোমার সাথে তো আমার কখনো দেখাই হয়নি! আমি আসলেই অনেক অসুস্থ। গতকাল লাংসের রেডিয়েশন থেরাপী শেষ হলো। প্রচন্ড ব্যথাময় জীবন এখন আমার। আগামীকাল জানতে পারবো কবে থেকে কিমোথেরাপী শুরু হবে। যুদ্ধটা করে যেতে চাই আরও কিছু সময়। আশা করি একদিন তোমার সাথে ফোনে কথা বলতে পারবো। তোমরা অনেক অনেক ভালো থেকো সব সময়। আমার বসবাসের স্থানের বাংলাদেশীরা যখন আমাকে আগেই বিদায় দিয়ে দিয়েছে প্রায় সে সময় তোমার এই ভালবাসার প্রকাশ আমাকে আবারও ভাবালো, এখনও কিছু মানুষ আছে পৃথিবীতে। সারা জীবন আমি মানুষেরই কথা ভেবেছি, ভাবতে চাই। অনেক অনেক ভালবাসা।”

তোমার ফেসবুক বন্ধু সালেহা ইয়াসমিন লাইলী লিখেছেন,

লোপা আপা (তানিয়া মোর্শেদ লোপা), গত ৯ তারিখ আপনি লিখেছিলেন আপনি ভালো নেই। তখন অনেক রাত। সাথে সাথে আমি কমেন্ট করলাম। ততক্ষনে আপনি বেড়িয়ে গেছেন অফলাইনে। পরে সুপ্রীতির সাথে আপনাকে নিয়ে দীর্ঘক্ষণ আলাপ হলো। সে বললো, আপনি নাকি খুব বাঁচতে চাচ্ছেন। আমার বুকটা হু হু করে উঠেছিল ওর কথায়। আপনি একযুগেরও বেশি সময় ধরে সফট টিস্যু সারকোমা নামের এক ক্যান্সারের সাথে লড়াই করছিলেন। আপনাকে আমি কখনও সামনাসামনি দেখিনি। কিন্তু এই ফেসবুক আমার থেকে অনেক কিছু কেড়ে নিলেও আপনার মতো এমন আপন একজন মানুষের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল বলে আমার পাওয়াটাই বেশি ভারী ছিল। খুব খুব আপন করে আপনাকে পেয়েছি। আজ যখন শুনলাম আপনি নেই, চলে গেছেন ওপারে, আমি কিছুটা সময় বিমূঢ় হয়ে ছিলাম। তারপর ইনবক্সে গিয়ে আপনার সাথে কথোপকথন দেখছিলাম। ইনবক্সে আপনি একেবারেই জীবন্ত।

আমি এভাবে কাঁদছি কেন আপা? আপনার সাথে এতো এতো কথা হয়েছে, এতো ছবি শেয়ার হয়েছে যা দেখতে একটা পুরো দিন লাগবে। আমি পোস্টে যাই লিখেছি আপনি সাথে সাথে ইনবক্সে ব্যাখ্যা চেয়েছেন। মন খারাপ দেখলেও কতো ভাবে বোঝাতেন। শরীর খারাপ শুনলে ডাক্তার দেখানোর জন্য পীড়াপীড়ি করতেন। কতোজনের সমস্যা শুনে পাশে দাঁড়িয়েছেন। অর্থ সহায়তা করেছেন কতোজনকে। সর্বশেষ আমি যখন দুর্ঘটনায় পঙ্গু হয়ে হাসপাতালে, তখনও আপনি আপনার ছোট ভাই তন্ময়কে আমার সাথে দেখা করতে ঢাকার নিউরো সায়েন্স হাসপাতালে পাঠিয়েছেন। তখনও আপনি নাকি অনেক অসুস্থ। অথচ আপনি আমাকে সুস্থ হতে বলেছেন অনেক কাজ করতে বাকি আছে বলে। তারপর আর আপনার সাথে কোন কথা হয়নি। ইনবক্সে কুশল জানতে চাইলে জবাব দেননি।

আপা, এতো এতো মানুষের প্রার্থনা, শুভকামনা আপনাকে ক্যান্সার থেকে ফেরাতে পারলো না! মানতে পারছি না। কিছুতেই মানতে পারছি না। ওপারের বিশ্বাস আমার নেই। থাকলেও হয়তো বলতাম যিনি আপনাকে এপারে ভালো থাকতে দিলেন না, তিনি ওপারে কি ভালো করবেন! আপনাকে সারাজীবন অনেক মিস করবো, আপা।

হিল্লোল দত্ত  লিখেছেন,

তানিয়া মোর্শেদ বা তানিয়া আপার সাথেও ফেসবুকেই আলাপ। পূর্ণার অসুস্থতার কথা জেনেই নিজে থেকেই বন্ধু করেছিলেন। পরে তাঁর দৈহিক বেদনা ও নিজেরও ক্যান্সারের আক্রমণের কথা জেনে বিমূঢ় হয়ে গেছি। তাঁর কষ্টকাহন পড়তে গিয়ে নিজেরই শারীরিক কষ্টবোধ হত। এর ভেতরেও তাঁর লেখনি থামেনি। যা অপছন্দ, অন্যায়, অসুন্দর তার বিপক্ষে তিনি ছিলেন সোচ্চার। বাঙালি ও বাংলাদেশের নিয়ত পতনের বিরুদ্ধে তিনি নৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে দাঁড়িয়েছেন অক্ষুণ্ন চেতনায়, নারীদের বিপক্ষে অত্যাচারের বিপরীতেও৷

তাঁর মেধাবী, নীরব, সৌম্য, শক্তিময় স্বামীর কথা জেনে শ্রদ্ধায় অবনতশির হয়েছি, তাঁর মেধাবী সন্তান, যে এতো সমস্যার ভেতরেও তার মেধার সাক্ষর রেখে বড় হয়েছে, ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হয়ে সেখানেও নিজেকে প্রমাণ করছে প্রতিনিয়ত, তার খবরেও আনন্দিত হয়েছি। রোগকষ্টের ভেতরেও সন্তানের খবর জানাতে ভুলতেন না তিনি। এমনই ছিল মাতৃহৃদয়ের ঢেউ। তাঁকে দেখলেও মনে হতো তিনি স্নেহবৎসল, করুণাময়ী মাতৃকা। স্নিগ্ধশান্ত বাঙালি নারীর অবিকল চিত্ররূপ যেন তিনি। রুচিশীল। জ্ঞানপ্রেমী। সকল সহা সকল বহা।

আজ তিনিও সাঙ্গ করলেন যন্ত্রণাসহ্যের পালা। বিদায় নিলেন ধরাধাম থেকে। তাঁর নীতি, লড়াই, ভালোবাসার শক্তি ছড়িয়ে পড়ুক, শক্তি দিক অন্যদের যারা লড়ছে নানাভাবে। তাঁর স্বামী ও প্রিয়তম সন্তান এই মহাশোক কাটিয়ে ওঠার শক্তি পাক দ্রুত।

আমি এই ক্যান্সার রোগটা এতো ঘৃণা করি, ঘৃণা করি, ঘৃণা করি…।

আরও অনেকে অনেক কিছু লিখেছে কাল থেকে, এখনও লিখছে। কানিজ আকলিমা সুলতানা আপা তোমাকে অনেক ভালবাসতো। আজ ফোন করে কেঁদেছে অনেকক্ষণ, যদি একটু হালকা হতে পারে এই আশায়।

তোমাকে যারা কাছ থেকে দেখেছে, তোমার সাহচর্য পেয়েছে, বন্ধুত্ব পেয়েছে, দৃঢ়তার স্পর্শ পেয়েছে তোমার, কেউ কোনদিন তোমাকে ভুলতে পারবে না। জেনে রেখো। কতগুলো কাজ পড়ে আছে লোপা, তুমি ছাড়া এগুলো হয়তো বসে থাকবে না, কিন্তু যতোটা যত্নে কাজগুলো হওয়ার কথা ছিল, তা কি আর হবে!

শেয়ার করুন:
  • 267
  •  
  •  
  •  
  •  
    267
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.