রাগ মোটেও পুরুষের বৈশিষ্ট্য নয়, বরং পুরুষতান্ত্রিক ছল

শান্তা মারিয়া:

পারিবারিক নির্যাতন নিয়ে কাজ করতে গিয়ে দেখেছি অনেক নির্যাতন ঘটে শুধুমাত্র পুরুষের রাগের কারণে। রাগের মাথায় স্ত্রীকে আঘাত, সন্তানদের আঘাত নাকি ‘পুরুষ মানুষের জন্য’ খুবই স্বাভাবিক! যে পুরুষের রাগ নেই সে নাকি পুরুষের কাতারেই পড়ে না!
এ কথাটি যে কতখানি ভুল সেটা আমি আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি।
প্রথমে আমার বাবার কথা বলি।

আমার বাবা ছিলেন শারীরিক ও মানসিকভাবে অত্যন্ত শক্তিমান একজন মানুষ।অসাধারণ স্বাস্থ্য। কোন রোগবালাই হতো না। হাই ব্লাডপ্রেশার, ডায়বেটিস কিছুই ছিল না। শরীর ছিল মেদহীন। খুব পরিমিত খেতেন। ধূমপান ও মদ্যপানের প্রশ্নই ওঠে না। চা খেতেন না। সকালে ও বিকালে এক কাপ ওভালটিন মেশানো দুধ ছিল নিয়মিত খাদ্যতালিকায়। কখনও পান খেতে দেখিনি। বাইরের খাবার খুব কম খেতেন। তার দেহে কতটা শক্তি ছিল সেটা দেখেছি ছোটবেলায়। বাড়িতে দুটি লোহার স্প্রিংযুক্ত ডাম্বেল ছিল। সেগুলো তিনি অনায়াসে হাতের মুঠোর চাপে খুলতেন ও বন্ধ করতেন। বিশ-ত্রিশ কেজি ওজন এমনভাবে তুলতেন যে মনে হতো সেগুলো একশ’ দুশ গ্রামের প্যাকেট।

প্রচণ্ড শক্তি থাকা সত্ত্বেও কাউকে কখনও আঘাত করতেন না। মারামারি বা ঝগড়া বিবাদে জড়াতেন না একদম। আমার মায়ের সঙ্গে তো জীবনেও উঁচু গলায় কথা বলতে শুনিনি, আমাদেরও কোনদিন একটা ধমকও দেননি। গৃহকর্মী, অফিসের পিয়ন, দারোয়ান এদের সকলের সঙ্গেই ব্যবহার ছিল অত্যন্ত ভদ্র। কাউকে একটা জোরে কথাও বলতেন না। মনে হতো তিনি বোধহয় রাগ করতেই জানেন না।

ছোটবেলায় আমি বাবাকে মাত্র দুবার রাগ করতে দেখেছি। আমাদের আলুবাজারের বাড়িটি ছিল খুব পুরনো। বাড়ির উঠোন ও পাশের বাড়ির সঙ্গে সীমানা হিসেবে পুরনো দিনের দেয়াল। সেই পাঁচিলের ওপাশে প্রতিবেশিদের জলের কল। সেখানে প্রতিবেশি মেয়েরা স্নান করতো।

আমাদের বাড়িতে তখন চব্বিশ পঁচিশ বছর বয়সী এক ‘কাজের ছেলে’ ছিল। সেটা সত্তরের দশকের ঘটনা। তখন অনেক জোয়ান পুরুষ শহরের মধ্যবিত্তের বাড়িতে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতো। সেই যুবকটি আমাদের পুরনো পাঁচিলের একটি ইট কোনভাবে খসিয়ে দেয়ালে গর্ত করে পাশের বাড়ির মেয়েদের স্নানের দৃশ্য দেখার ব্যবস্থা করে নিয়েছিল। মেয়েরা টের পেয়ে আমাদের বাড়িতে নালিশ জানায়। বাবা রাজমিস্ত্রী আনিয়ে সিমেন্ট করে গর্তটি বন্ধ করেন। এবং ছেলেটিকে ডেকে নিষেধ করেন। কিন্তু পিপিং টমকে এতো সহজে নিবৃত্ত করা সম্ভব নয়।

একবার সে দুপুরবেলা মেয়েদের স্নানের আওয়াজ পেয়ে দেয়াল বেয়ে উঠে উঁকি মারে। দেয়ালের ওপর তাকে দেখে মেয়েরা ভয় পেয়ে চিৎকার করে। যুবকটি দেয়াল থেকে লাফিয়ে নামে। একটু হইচই হয়। দুর্ভাগ্যবশত সেদিন বাবার অফিস বন্ধ ছিল এবং তিনি বাড়িতে ছিলেন, বই পড়ছিলেন। হইচই শুনে তিনি ঘরের ভিতর থেকে বই রেখে বেরিয়ে আসেন এবং উঠোনে দাঁড়িয়ে এক পলকে অবস্থাটা বুঝে নেন। তারপর ভীষণ রেগে ছেলেটিকে এক চড় মারেন। সেই প্রচণ্ড শক্তিশালী হাতের এক চড়েই ছেলেটির চোয়ালের একটি দাঁত খসে পড়ে যায় এবং মাথা ঘুরে বেচারা অজ্ঞান হয়ে পড়ে। পাশের বাড়ির লোকজন ততক্ষণে আমাদের বাড়িতে এসে হাজির হয়েছে। তারাও এই কাণ্ড দেখে একটু সহানুভূতি প্রকাশ করছিল। ছেলেটির একটুপরেই জ্ঞান ফিরেছিল এবং বাবাই তাকে হাসপাতালে নিয়ে যান।
পরে মা বলেন, ‘তুমি কেন ওকে মারতে গেলে? থাপ্পর খেয়ে যদি মরে যেত, তখন কী হতো? তুমি জানো না তোমার মিলিটারি মার্কা হাতের একটা টোকা খেলেও মানুষ ছিটকে পড়ে যায়?’

আরেক বার বাবাকে রাগ করতে দেখেছিলাম রাস্তায়।
আমরা সেদিন সকালে মুন্সীগঞ্জ যাচ্ছিলাম বেড়াতে। তখন মুন্সীগঞ্জ যেতে হতো লঞ্চে চড়ে। সদরঘাটে যাবার জন্য দুটি রিকশায় করে আমরা রওনা হই। আমি ও মা এক রিকশায়। বাবা ও ভাইয়া আরেক রিকশায়। সদরঘাটের কাছাকাছি চলে এসেছি। আমাদের রিকশাটা একটু ধীরে যাচ্ছিল, বাবা ও ভাইয়ার রিকশা এগিয়ে গিয়েছিল খানিকটা সামনে। হঠাৎ এক পাগল এসে আমাদের রিকশা ধরে আটকালো। শা জোয়ান এক লোক। খালি গা। কোমরে একফালি ন্যাকড়া। সারা গায়ে ময়লা মাখা। পরে জেনেছি লোকটি প্রকৃত পাগল নয়। পাগল সেজে মেয়েদের রিকশা আটকায় এবং নানাভাবে হয়রানি করে টাকা আদায় করাই তার ধান্ধা। আমি ও মা লাফিয়ে রিকশা থেকে নেমেছি। পাগল আমাদের ধরতে আসছে দেখে আমি তারস্বরে চিৎকার করছি। মা লোকটিকে ধমকাচ্ছে যাতে না ধরে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে এসব ঘটছে। এরই মধ্যে বাবা চিৎকার শুনে পিছন ফিরে দেখেন এই ঘটনা। পাগলটি তখন মায়ের ব্যাগ ধরে বোধহয় টান দিতে যাচ্ছিল। রিকশা থেকে ছুটে নেমে এসে বাবা পাগলকে মারলেন এক ঘুষি। সেই ঘুষি খেয়ে তিন হাত দূরে ছিটকে পড়ে লোকটি। রাস্তায় ভিড় জমে যায়।
কয়েকজন বাবাকে বলে, ‘ঠিক কাম করছেন। আপনের ঘুষি খাইয়া হালার পো হালার পাগলামি ছুইট্যা গেসে’। সত্যিই সেই এক ঘুষিতেই নকল পাগলের পাগলামি ভালো হয়ে যায়। লোকটি এক দৌড়ে পালিয়ে যায় সেখান থেকে। এরপর আর সদরঘাটে কোনদিন সেই পাগলকে দেখিনি।

এই দুটি ঘটনা ছাড়া আমি বাবাকে কখনও রাগ করতে দেখিনি।

আরেকটি ঘটনা ঘটে আমার জন্মের অনেক আগে। সুতরাং আমার চোখে দেখা নয়, তবে মায়ের মুখে শোনা। এবং মা যেহেতু অতি কঠোর সত্যবাদী তাই ঘটনাটা যে ১০১ শতাংশ খাঁটি তাতে সন্দেহ নেই। সেটা চকবাজারের বাড়িতে। রাত্রে বাড়িতে চোর আসে। তবে বাড়ির লোকজন টের পেয়ে যাওয়ায় চোর বাড়ির পাশের গলি ধরে ছুটে পালাতে থাকে। দোতলার বারান্দা থেকে বাবা লাফিয়ে পড়েন চোরের উপর এবং দুজনেই অবধারিতভাবে মাটিতে গড়িয়ে পড়েন।

বাবা অবশ্য খুব সামান্য ব্যথা পেয়েছিলেন। চোর সেজন্য খুব দুঃখ প্রকাশ করে বলে, ‘আহহারে, আমারে ধরতে গিয়া আপনে চোট পাইলেন স্যার। চোট পাইছেন মাগার নামছেন বহুত জলদি’। এই কথার পর বাবা রাগ করতে পারেননি, বরং হেসে ফেলেন। সেই চোরকে ছেড়ে দেওয়া হয় কোনরকম মারধোর না করেই।

আমার ভাইও রাগী মানুষ নয়। তার রাগ মোটামুটি বিরল ঘটনা। বেশ উঁচু পদে চাকরি করলেও অফিসে বা বাড়িতে কোন অধীনস্তের উপর কখনও রাগ করেন না।

আমাদের পাড়ায় দু’তিনজন ‘মিস্টার ঢাকা’ থাকতেন। তারা বডি বিল্ডিং প্রতিযোগিতায় মিস্টার ঢাকা খেতাব জিতেছিলেন। একজন হলেন নজরুলভাই। ছয় ফুট লম্বা। বডি বিল্ডারদের শরীর কেমন হয় সেটা সকলেই জানে তাই আর বর্ণনা করলাম না।
সেই বলশালী নজরুলভাই ছিলেন মাটির মানুষ। ফুলস্লিভ শার্ট গলার বোতাম অবধি বন্ধ, যাতে মাসল দেখা না যায়। কমিউনিটি সেন্টারে কোন অনুষ্ঠানে যদি দেখা হতো, তিনি আমার মাকে সালাম জানিয়ে একপাশে চুপ করে সরে দাঁড়াতেন। পাড়ার মুরুব্বিদের সঙ্গে যখন দেখা হতো চোখ থাকতো মাটিতে। কোন মারামারি, রাগ, ঝগড়া কিছুর মধ্যেই নজরুল ভাইকে দেখিনি কোনদিন। শুনেছিলাম তার প্রেমিকা নাকি তার চেয়ে অধিকতর পয়সাওয়ালা একজনকে বিয়ে করেছে। কিন্তু নজরুলভাই প্রতিশোধ নিতে ছুটে যাননি মোটেই। অনেক পরে অন্য একজনকে বিয়ে করেন এবং স্ত্রীর সঙ্গে অতীব ভদ্র আচরণ করতেন।

আরেকজন মিস্টার ঢাকা ছিলেন মুন্নাভাই। তিনি খুব বনেদী বাড়ির সন্তান। কুস্তিগীর। পরে জাতীয় পর্যায়ে কিশোরদের কুস্তি শিক্ষক ছিলেন। তিনিও অতি ঠাণ্ডা মাথার মানুষ। ভারি মোলায়েমভাবে কথা বলতেন সকলের সঙ্গে। পাড়ায় কখনও কোন কারণে মুন্নাভাইকে রাগ করতে দেখিনি। দেহে শক্তি থাকলেই যে অপরের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে পিটাপিটি করতে হবে এটা খুব ভুল ধারণা।

আমার নিজের কাছে মনে হয় ‘রাগ’ বিষয়টি পুরুষের উপর চাপিয়ে দেওয়া পুরুষতন্ত্রের এক কৌশল। বাস্তব ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ উভয়ই রাগী হতে পারে।(যেমন আমার মা ছিলেন রাগী মানুষ।) এটা মানুষের চরিত্রের একটা বৈশিষ্ট্য হলেও পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ছেলে শিশুকে উত্সাহিত করে রাগী হতে। এবং মেয়েশিশুকে রাগ দমন করতে শিক্ষা দেয়।

অনিয়ন্ত্রিত রাগ একটা ভয়াবহ বিষয়। অথচ রাগকে ‘পুরুষের শক্তির প্রতীক’ বলে মনে করে সেটাকে উৎসাহ দেওয়া হয় বা বাহবা দেওয়া হয়। আমি কোনদিন রাগকে ‘পুরুষের বৈশিষ্ট্য’ বলে মনে করি না। বরং আমার কাছে মনে হয় যিনি রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন, তিনিই অধিকতর শক্তিমান।

আমার ব্যক্তিগত মত হচ্ছে পারিবারিক নির্যাতন সমূলে দূর করতে হলে, নারী-শিশুর উপর পুরুষের অনিয়ন্ত্রিত রাগের প্রবণতাকেও দূর করতে হবে। আর এটা করতে হবে একেবারে শিশু বয়স থেকে। ছেলে-মেয়ে উভয় শিশুকেই রাগকে নিয়ন্ত্রণ করা শেখাতে হবে।

শেয়ার করুন:
  • 1.1K
  •  
  •  
  •  
  •  
    1.1K
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.