অশ্রু ও ঘামে ভেজা রোমের গল্প (পর্ব- ছয়)

লুতফুন নাহার লতা:

রাতের রোম দেখে এসে ঘুমাতে ঘুমাতে বেশ একটু দেরিই হলো। সকালে আলতো করে চোখ খুলতেই দেখি চারিদিক আলোয় ভরা। আমার বিছানার উপর সকালের নরম রোদ্দুর আঁচল বিছিয়ে দিয়েছে। সারা আকাশ কী যে সুন্দর এক নরম উজ্জ্বল আলোর ঝর্ণা হয়ে গলে পড়ছে! মনে হচ্ছে ওরা আলোর দেশের পরির গায়ে আজ লুটিয়ে পড়েই থাকবে। মুগ্ধ হয়ে দেখছি সে আলোর খেলা। এ অদ্ভুত এক থরো থরো মুহূর্ত। ঠিক যেমন দিনের শেষে রাত্রির নিবিড় গাঢ় প্রেমে ঢেকে যায় সব, যেমনি রাত্রির হৃদয় থেকে জন্ম নেয় এমন সকাল। শুনশান নিরব চারদিক। সবাই ঘুম। ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে দেখি লাল রক্তকরবী ভোরের বাতাসে দুলছে।

আজ ওরা সবাই বেরিয়ে যাবে যে যার কাজে। কালকেই কথা হয়ে আছে আমি এই তরবেল্লা মনাক্কা থেকে বেরিয়ে হেঁটে হেঁটে যাবো সাবওয়ে রেল স্টেশনে। সেই স্টেশনের নাম গ্রোত্তে চিলুনী। সেখান থেকে দশটা স্টেশন পরে লোদী নামে স্টেশনে গিয়ে একটা বাস নেবো, তারপরে সেই বাসে তেরমিনি। সেখান থেকে গ্রিনলাইন টুরিস্ট বাসে করে যেতে পারবো আমি যেখানে যেতে চাই।

মনে মনে ভেবেছি এই বাসে করেই ঘুরে ঘুরে দেখবো যতটা দেখা যায়। কত কী যে রয়েছে আমার দেখার লিস্টে। ভ্যাটিক্যান সিটি, ফোরাম, কলাসিয়াম। স্প্যানিশ স্টেপ্স, ক্যাসেল সান্তাঞ্জেলো, প্যানথিয়ন। আজ দেখতে যাবো ক্যাসেল সান্তাঞ্জেলো, স্থানীয় ভাষায় কাস্তেল সান্তাঞ্জেলো।

সকালে বাসা থেকে বেরিয়ে ঠিকঠাক ধরেছি ট্রেন, লোদীতে নেমে বাসটাও নিতে পেরেছি। সারাদিন বাস চলছে শহরের প্রধান সড়কের গা ঘেঁষে ঘেঁষে। জানালার পাশে বসে দেখছি মুগ্ধ দু’চোখ মেলে। এ এক অসাধারণ শহর। এর যেন আদি অন্ত নেই। চারিদিকে বিশাল সব অট্টালিকা, বিশাল ইমারত। পাথর আর পাথরের কারুকাজে ভরা এই শহর।

কতো না শিল্পী, কতো না গণিতজ্ঞ, কতো না বিশেষজ্ঞ ইঞ্জিনিয়ার কতো যে যুগ যুগান্ত ধরে এর কন্সট্রাকশানের কাজ করেছে ভেবে অবাক বিস্ময়ে বিভোর থাকি। বাস চলছে, মানুষ উঠছে, মানুষ নামছে। ঘুরে ঘুরে দেখে আবার উঠে পড়ছে। আমিও ওদের সাথে নেমে পড়ছি এক একটি জায়গায়। নাম না জানা এই শহর। আমার সাথে কেউ নেই। আমি একা। আমি স্বাধীন। আমার ভীষণ ভালো লাগছে। আমি পারি, এই আত্মবিশ্বাস মানব জীবনকে একরকম পূর্ণতা এনে দেয়।

বড় বড় স্থাপনার সামনে ট্যুরিস্ট ভরা, দলে দলে লোকজন হাঁটছে, ঘুরছে সেখানে। রাস্তার ধারে ধারে দাঁড়িয়ে পানি, ফুল, স্যুভেনির, পেপার বিক্রি করছে ও কারা! ওদের অনেকেই তো আমার মতো দেখতে! নিজেদের মধ্যে ওদের কথা শুনছি। আর না শুনলেই বা কী! ওদের মুখের দিকে চেয়ে আমার নিজের ভাইদের মুখ দেখতে পাচ্ছি, আমি জানি ওরা আমার বাংলাদেশের। শ্যামলা অমন মায়াভরা মানুষের মুখ তো আর কোথাও দেখি না! একজন এগিয়ে এসে কাঁধের ঝোলা থেকে এক বোতল পানি বিক্রির জন্যে হাত বাড়িয়ে ধরেছে আমার দিকে, আমি ব্যাগ থেকে টাকাটা বের করে হাতে ধরে ওর সাথে কথা বলতে যাবো এর মধ্যেই পুলিশ ওদের পুরো দলটাকে তাড়া করলো। নিমেষে উধাও হয়ে গেল ওরা। চারিদিকে চেয়ে কাছে পিঠে আর কাউকে দেখলাম না।

বাইরে গরম। আকাশ ফেটে সূর্য ঢলে পড়ছে। মানুষের মগজ গলে বেরিয়ে যাবার মতো অবস্থা। এর ভেতরে রাস্তায় দৌড়ে দৌড়ে ওরা বিক্রি করছে হরেক রকম জিনিস। ছাতা, হ্যাট, জল, ফুল, টিকেট, খেলনা, চাদর, সানগ্লাস আরও নানা রকম প্রয়োজনীয় জিনিস।

একা একা হাঁটছি, বুকটা কষ্টে ভরে উঠেছে। গলার ভেতর কান্না দলা পাকিয়ে পাকিয়ে উঠছে। ভাবছি পৃথিবীর আদি থেকে এই যে চলেছে মানুষের অভিবাসন, এই যে ভাগ্যের অন্বেষণে দেশ ছাড়ার গল্প, এর শেষ কোথায়! কেবল মাত্র পেটের দায়ে দেশ থেকে দেশান্তরে যাওয়ার এই জীবন কেন হয় মানুষের! বহু বহু পথ পাড়ি দিয়ে ভাসতে ভাসতে কোথাও গিয়ে ঠেকে যাওয়া আর সেদেশে থেকে যাওয়া, কিম্বা আবারও স্রোতের ফুলের মতো ভেসে যাওয়া অন্য কোথাও অন্য কোন দেশে। হয়তো ওরা অনেকেই জানে না আসলে কোথায় গিয়ে থিতু হবে। জানে না কেমন সে দেশ, কিইবা তার নিয়ম নীতি, কিইবা তার ভাষা, সংস্কৃতি আর সমাজ। ওরা কেবল জানে কোথাও যেতে হবে, কোথাও গিয়ে বাঁচতে হবে।

মানুষ যখন অজানা কোনো দেশে যায় তখন একরকম জীবন হাতের মুঠোয় নিয়েই যায়। তাদের উপরে ঘটে যাওয়া অন্যায়ের বিচারও হয় না বেশিরভাগ সময়ে। বড় অভাগা দেশান্তরি মানুষ! আজ যাদের ঘামে ভেজা মুখগুলো আমাকে চোখের নোনা জলে ভাসিয়ে দিয়েছে, রোমের এই গ্রীষ্মের দুপুরের সূর্যলাভায় ওরা পুড়ে যাচ্ছে। ওরা ক্ষুধা তৃষ্ণায় কাতর। রোদে পুড়ে ওদের শ্যামলা চামড়া তামা বর্ণ হয়েছে। সারাদিন এইভাবে ওরা হাড়ভাঙা খাটুনির পরে হয়তো ফিরবে ঘরহীন ঘরে। একসাথে গাদাগাদি করে পাঁচ সাতজনের মাথাগোঁজার মতো কোথাও। কত জীবন এভাবেই ঝরে গেছে পথে প্রবাসে।

ওদের কেউ কেউ হয়তো আমারই মতো ভাগ্যের অন্বেষণে ছেড়েছে স্বদেশ। বেরিয়ে পড়েছে পৃথিবীর পথে। প্লেনে করে, জাহাজ বা নৌকায় করে কিম্বা পায়ে হেঁটে পাড়ি দিয়েছে দীর্ঘ পথ। এসেছে ইতালির মিলান, ভেনিস, বা রোমের মতো বড় বড় শহরগুলোতে। নানান দেশের উপর দিয়ে নানান পথে ঝুঁকিপূর্ণ সেইসব যাত্রা পার হয়ে এসেছে ওরা! ওই যে রবীন্দ্রনাথের গান আছে না! “পার হয়ে এসেছ মরু, নাইকো সেথায় ছায়া তরু—পথের দু:খ তোমায় দিলেম গো এমন ভাগ্যহত!

— আচ্ছা কেন এমন হয়! পথের দুঃখ কে দেয়! যে দেয় সে কেন দেয়! দুঃখ যে দেয় সেতো ক্ষমতাবান, তবে সে দুঃখ না দিয়ে সুখ কেন দেয় না!

আমার কান্না পেলো খুব। বাসের ভেতর ফিরতি পথে আমি কাঁদছি। বিকেল শেষ, প্রায় সন্ধ্যার মুখে আবার সেই রেল স্টেশনে এসেছি। টিকেট কাউন্টারে টিকেট কিনতে গিয়ে কোথায় যাবো, আর তো সেই স্টেশনের নাম মনে করতে পারছি না! তো ‘কী যেনো’ ‘কী যেনো’ মনে করতে করতে বলে ফেললাম গর্তে চালুনি। তরবেল্লামনাক্কা। কাউন্টারের এই লোক তো বুঝতেই পারে না, কোথায় যাবো। যতো বলি ‘গর্তে চালুনি’ ও অবাক হয়ে থাকে। এই এক জ্বালা এদের নিয়ে, আমেরিকাতেও দেখেছি ইংরেজি উচ্চারণে এই একটু টানটুন ঠিক না হলে এরা বুঝেই না। আমার তো ওই কার্ডিওলজিস্ট শব্দটাই ঠিক হলো না আজও। যা হোক এই রোমান ভদ্রলোক বুঝলো না কিছুই, এবার সে উঠে গিয়ে ভিতর থেকে একজনকে ডেকে আনলো। সে দু’বার শুনে চিৎকার দিয়ে বললো ‘ওওও গ্রোত্তে চিলুউউনি।’

টিকেট নিয়ে নিচে নেমে আবার ফাঁপরে পড়লাম। ডান দিকের ট্রেন উঠবো নাকি বামদিকের! একজনকে ওই গর্তে চালুনি’র কথা বললাম। সে কিছুই বুঝলো না। যা হয় হবে ভেবে উঠে তো পড়লাম সামনে যে ট্রেন এলো। দেখি ঠিকঠাক এসে গেছি। ট্রেন থেকে নেমে বাসা পর্যন্ত হাঁটতে হাঁটতে মনে মনে বললাম- ভাইরে ভাই! এই যাত্রা বাঁচলাম! আর আমি একা যাচ্ছি না! হয় অনিন্দ্য না হয় সুকন্যা, জাকারিয়ার এই দুই ছেলে মেয়েই আমার গাইড। ব্যস্ততার কারণে অনিন্দ্যকে আর তেমন পাওয়া যায়নি, তবে সুকন্যা হয়ে উঠেছিল আমার সাকাগাওয়া। (বিখ্যাত নেটিভ আমেরিকান গাইড)

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.