বাবার প্রেমিকার কাছে এক সন্তানের চিঠি

আলফা আরজু:

“প্রিয় বাবা’র প্রেমিকা,

আমার নাম বার্বি। আমি যখন খুব ছোট ছিলাম তখন আমার একটা বার্বির মতো fairy জীবনের স্বপ্ন ছিলো। সেইজন্য নিজেকে বার্বি বলে পরিচয় দিতে ভালোবাসি।

আমার বাবা আপনার সাথে ভালো আছেন ও ভবিষ্যতে ভালো থাকবেন – এই ভেবে আমার খুব ভালো লাগে। কারণ আমি বাবাকে খুব ভালোবাসি।

আমি যখন খুব ছোট ছিলাম – ঘটনার শুরু তখন থেকেই। আপনার সাথে সম্পর্কের সূত্রপাত ধরে আমার বাবা আমার ও মায়ের সাথে যেইসব দুর্ব্যবহার করেছেন আমি সব ভুলে গেছি, কারণ আমি বাবাকে ভালোবাসি।

আমার বাবা কোনোদিন আমাদেরকে নিয়ে হইহুল্লোড় করেননি, কোনদিন নিজে থেকে বলেননি চলো কোথাও ঘুরতে যাই, খাওয়াতে নিয়ে যাই।

কারণ বাবা খুব ব্যস্ত মানুষ। অনেক বড় কাজ করেন। ছুটির দিনে উনি – আরও বেশি ব্যস্ত থাকতেন। নিজের মানসিক refreshment এর জন্য। তাই আমাকে দেয়ার মতো সময় বাবার ছিল না। তবুও বাবাকে “বাবা বলে ভালোবাসি।”

প্রায় মনে মনে ভাবি – “আমার বাবা যদি এমন হতেন, তেমন হতেন – কেমন হতো আমার জীবন।” কান্না পেয়ে যায় ঐসব ভাবলে।

আলফা আরজু

কিন্তু আমি আমার ছয় বছরের সময় প্রতিজ্ঞা করেছিলাম – আমি আর কাঁদবো না। তাই আর কাঁদি না।

আমার বাবা আপনার সাথে ভালো আছে – প্রথমে এইটা জেনে ও ভাবতে কষ্ট হয়েছিলো, খুব insecure মনে হয়েছিলো, নিজেকে খুব অবাঞ্ছিত মনে হয়েছিলো। কিন্তু এখন আমার খুব ভালো লাগে- “বাবা ভালো আছেন ও থাকবেন ভেবে।”

প্রিয় বাবার প্রেমিকা,
আপনি দেখতে খুব সুন্দর। একদম মুভিতে দেখা নায়িকাদের মতো। আমার মা তেমন না। খুব সাদাসিধে। উনি সাজতে জানেন না, আপনার মতো সুন্দর করে কথা বলতে পারেন না, গান কিংবা কবিতাও পারেন না।

আমি বড় হয়ে আপনার মতো হতে চাই। বাবার বয়সী কারোর প্রেমে পড়তে চাই। কারণ আমার মা খুব বোকা ছিলেন। আমি ঐরকম বোকা হতে চাই না। মা একজন বেকার-কাপুরুষ ছেলের সাথে প্রেম করে জীবনে কোনোদিন সুখ পাননি। কিন্তু আপনার জীবন কত মজার! বাবা আপনাকে কত টাকা দেয়, কত দামী দামী উপহার কিনে দেয়! কত সুন্দর সুন্দর জায়গায় বেড়াতে নিয়ে যায়!

আমিও এমন প্রেমিক চাই।

আচ্ছা আমার বাবা দেখতে কী কুৎসিত, এমন ভুঁড়ি ও টাকওয়ালা মানুষকে ভালোবাসতে কেমন লাগে আপনার? আমি আসলে এইরকম কারোর সাথে প্রেম করবো বলেই – জানতে চাই?

আমার স্বপ্নে দেখা অথবা মুভিতে দেখা প্রেমিকগুলোর সাথে বাবার কোন মিল নেই। কিন্তু, বাবার অনেক টাকা আছে। আমিও একজন টাকাওয়ালা প্রেমিক চাই……!!”

“আপনার প্রেমিককে কুৎসিত বলায় – রাগ হচ্ছে আমার উপর? কেনো বলেছি – জানেন?

মা যখন আমাদের কোনো জিনিস কিনে দিতে পারে না – তখন সেই জিনিসটাকে বলে “এটা ভালো না”- আমরা তখন চুপচাপ মেনে নেই। যা ভালো না – সেটা আমার চাই না।

কিন্তু জানেন – আমরা যখন ছোট ছিলাম – “আমার বাবা একদম নীলের মতো ছিলো! নীল’কে চেনেন? আমার একটা প্রিয় অনুষ্ঠানের উপস্থাপক ছিলেন। আঁকাআঁকি শিখাতেন। আমার তখন “বাবা ও নীল” কে একদম এক মনে হতো। পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর মানুষ।”

ছোটবেলায় সকালে উঠে বাবা যখন কাজে যাওয়ার জন্য রেডি হতেন, আমি তাকিয়ে থাকতাম – “আমার বাবা এতো সুন্দর”। কতোদিন এমন হয়েছে – “বাবাকে জড়িয়ে চিৎকার করে কাঁদতাম। বাবা যেনো অফিসে না যায়।”

আমার ভাই’টা আরও বেশি ‘বাবা বাবা’ করতো।

এমনও বলতো – “আমার মা চাই না, বাবা চাই। শুধু বাবা। বাবাকে চোখের আড়াল হতে দিতো না।”

জানেন বাবা’র বুকে শুয়ে বাবার বুকের হার্টবিট শুনতে কী যে ভালো লাগতো! বাবার চওড়া বুকটা – আমার সবচেয়ে নিরাপদ মনে হতো। আমি মাঝে মাঝে বাবা’র বুকে মাথা রেখে বিট’ গুনতাম। আর সেই বিট গুনতে গুনতে ঘুমিয়ে যেতাম- বাবা তখন আমাকে রেখে কাজে যেতেন।

আমি আর ভাইয়া মিলে বাবা’কে আসলে অনেক বিরক্ত করতাম। সেজন্য বাবা আস্তে আস্তে আমাদের দূরে ঠেলে দিয়েছে। বাবা’কে এতো ভালোবাসতাম – বাবার দম বন্ধ মনে হতো। আমার মা’ও সেরকম করে ভালোবাসতেন।

সেইজন্য বাবা একটু দম নেওয়ার জায়গা বের করে নিয়েছেন – আপনার কাছে।

জানেন শুধুমাত্র বাবা’কে মুগ্ধ করার জন্য – খুব ছোট বয়সেই আমি কয়েকটা বড় বড় কবিতা আবৃত্তি শিখেছিলাম। মা এখনও বলে, “আমি ঘাড় হাত পা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে এতো সুন্দর করে – আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে…থাক্ এখন আর মনে নেই!”

বাবা’কে হাসতে দেখবো বলে “মোল্লা নাসিরুদ্দিনের প্রায় সবগুলো” জোকস আমি একদম নিপূণভাবে অভিনয় করতাম।

আচ্ছা, বাবা কি আপনাকে এসব কোনোদিন বলেছে?

জানেন, আমি বাবা’র ভরাট গলা নিচতলা থেকে শুনে চারতলার দরজা খুলে দাঁড়িয়ে থাকতাম। বাবা’র জন্য অপেক্ষা!

বাবা তখনও আমার বাবা ছিলো। কী সুন্দর ছিলেন। মা খুব পছন্দ করে করে বাবার জন্য শার্টপ্যান্ট, পাঞ্জাবী কিনতেন। আর সেইসব পোশাকে বাবা একদম “নীল” হয়ে উঠতেন।

আপনার মা আছে? বাবা?- আপনি কি কোনোদিন আপনার মা’র চোখে জল দেখেছেন?

আমার কি মনে হয় জানেন – মা’র চোখের জলের সাক্ষী হওয়া সবচেয়ে কষ্টের!”

:: শিশুদের ভালোবাসুন। ওঁরা আপনার প্রেমে/পরকীয়ার’র বাধা নয়। ওঁরা শুধু নিশ্চিত হতে চায় ওঁদেরকে আপনি কতোটুকু ভালোবাসেন ও নিরাপত্তা দিলেন।

শেয়ার করুন:
  • 16.2K
  •  
  •  
  •  
  •  
    16.2K
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.