নারী তোমার পায়ে ধর্মের শিকল পরিয়েছি, কই যাবা?

সাইফুল বাতেন টিটো:

আমার বাড়ি বাংলাদেশের একটি প্রত্যন্ত গ্রামে। গ্রাম বলতে এমন গ্রাম যে এখনও ইউনিয়ন সদর থেকে আমার বাড়ি যেতে বর্ষাকালে হাঁটু অবধি কাদা মাড়িয়ে যেতে হয়।

আমি কৃষক মজুর পরিবারের সন্তান। আমার চাচা চাচতো ভাইয়েরা বেশিরভাগই কৃষক। মাঝখান থেকে আমার বাবা লেখাপড়া করে শিক্ষকতা পেশা বেছে নিয়েছিলেন। আর সেই কারণেই হয়তো আজ আমি নিজেকে লেখক বলে পরিচয় দিতে পারি।

ছোটবেলা থেকেই আমি নারী নির্যাতন দেখে দেখে বড় হয়েছি। আমার বাবা শিক্ষক হলেও বউ পেটানোর বর্বরতা তার রক্তে রয়ে গিয়েছিলো। আমার অন্যান্য চাচা ও চাচাতো ভাইয়েরা নিয়ম করে বৌ পেটাতো। আমার বাবাও। আমার মনে আছে ডালে হলুদ বেশি হওয়ায় আমার মাকে আমার বাবা সারা বাগানময় তাড়িয়ে তাড়িয়ে পিটিয়েছে। পান খাওয়ার সাদা পাতায় বালি থেকে যাওয়ায় মাকে অনেকদিন মার খেতে হয়েছে।

অন্যান্য পরিবারগুলোও ঠিক এমনই ছিলো। মার খাওয়ার পরে এসব বৌয়েরা কোনো কথা বললে বরং মারের পরিমাণ বেড়ে যেতো। খুব অদ্ভুৎ লাগতো আমার কাছে। যখন আমার গায়ে শক্তি হয়েছে, বড় হয়েছি, তখন থেকে অন্তত আমাদের পরিবারে এই কালচার বন্ধ হয়ে গিয়েছে।

কিন্তু এর মানে এই নয় যে পুরো গ্রাম থেকে এই নারী নির্যাতন বন্ধ হয়ে গিয়েছে।

ওসব এখনও চলছে। আর চলবেও। কারণ মসজিদে শুক্রবার ইমাম নিয়মিত বয়ান করে কীভাবে বৌকে টাইট দিয়ে রাখতে হয়। মানে এখানে বৌ মানে আসলে সময়মতো ’স্বামী’র সামনে ভাত দেয়া, ধান-চাল সংরক্ষণ করা, সন্তান উৎপাদন ও রক্ষণাবেক্ষণ করা আর রাতের বেলা ‘স্বামী’র কাছে ধর্ষিত হওয়া। ধর্ষিত হওয়া একারণে বলছি যে দিনে যাকে পশুর মতো পিটিয়েছে, সেই নারীই রাতে প্রেম নিয়ে ওই পুরুষের সাথে মিলিত হয়েছে এটা আমার মন মানতে চায় না।

আমি গ্রাম ছেড়েছি সেই ১৯৯৬ সালে। এরপর গ্রামে এসেছি বড় জোর দুয়েক দিনের জন্য। ২০১৭ সালে বাবা মারা যাওয়ার পর আমরা আবার গ্রামে ফিরে এসেছি। বেশ কিছুদিন হলো গ্রামে আছি। দেখলাম সবকিছু সেই আগের মতোই আছে। আমার যে ভাবী তার স্বামীর হাতে রেগুলার মার খেতো সে এখন তার পুত্রবধুদের কীভাবে নির্যাতন করে তা দেখছি। আমি ঐ ভাবীকে তার শাশুড়ির হাতে মার খেতে দেখেছি। এখন একই কাজ সে তার ছেলের বৌদের সাথে করে। যেন নির্যাতনের দণ্ডটা তার শাশুড়ি মরার সময় তার হাতে দিয়ে গেছে।

আমার এক চাচার ঘরের সামনে একটি পেয়ারা গাছ ছিলো। গতবছরও সে গাছটিকে আমি তরতাজা দেখেছি। চমৎকার পেয়ারা হতো। এবছর এসে দেখি হঠাৎ গাছটা মরে যাচ্ছে। সবাই বলাবলি করছে গাছটি আর বাঁচবে না।
আমি আমার ঘরের সামনে বসার যায়গায় বসে আমার চাচীকে জিজ্ঞেস করলাম, গাছটি মরে যাওয়ার কারণ কী?
এ প্রশ্নে জবাব দিলেন আমার চাচাতো বোন। সে তার স্বামীকে নিয়ে বেড়াতে এসেছে। সে উঠে বললো, ‘মাগীরা গাছটা মাইরা হালাইছে।’ আমার চেয়ে বয়সে বড় হলেও আমি তাকে তুই তুই বলি ছোট থেকে। এটা আমাদের গ্রামের সংস্কৃতি।
আমি বললাম, ‘এটা কী বললি আপা? কেমনে বুঝিয়ে বল তো’। তারপর সে যে কথা বললো তার মানে অনেকটা এই রকম যে এই বাড়ির অনেক পুত্রবধু মাসিক চলাকালিন এই গাছের নিচ দিয়ে হেঁটেছে, গাছের পেয়ারা খেয়েছে বলে গাছটা মরে গিয়েছে। আমি তব্দা খেয়ে গেলাম। এটা কেমনতরো কথা। আমি মায়ের মুখের দিকে তাকালাম। মা এমন একটা মুখভঙ্গি করলো যার মানে অশিক্ষিত মানুষ বলে সে এমন কথা বলেছে। তুই এতে কান দিস না।

এ জাতীয় কথা আমি আগেও শুনেছি। তবে সেটা পুরুষদের মুখে। একটা মেয়ে কীভাবে এমন কথা বলে? ওর নিজেরও তো মাসিক হয়। আমি বললাম, ‘আপা তোকে একথা কে বলেছে?’

‘ক্যা, হুজুররা কয় হোনো না? তুই তো না ফরমান (নাস্তিকের নামান্তর), তুইতো মসজিদের ধারে কাছও যাস না। তুই এসব জানবি কী করে?’
আমি আর থাকতে পারলাম না। আমি বললাম, তুই নিজেও কী নিজেকে নাপাক মনে করিস যখন তোর মাসিক হয়?’
আপা কোনো কথা বললো না।
আমি আবার বললাম, একজন নারীর মাসিক হয় বলেই তুই আমি পৃথিবীতে আসার সুযোগ পেয়েছি, আর তুই নিজে নারী হয়ে একথা বলিস কী করে?’
পুরো বাড়ি স্তব্ধ হয়ে গেলো। শুধু মা বললো ‘টিটো থাম! এসব নিয়ে তোকে ঝগড়া করতে হবে না।’
আমার মা এই বাড়ির সবচেয়ে শিক্ষিত নারী। আমি মাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘মা আপনিও কী এটা মনে করেন?’ মা বললো, ‘আমি কী মনে করি বা না করি সেটা বড় কথা নয়, বড় কথা হলো মসজিদের হুজুর কী বলে!’

বছর দশেক হলো আমাদের বাড়ির সামনে মসজিদ হয়েছে। সেখানে সবাই মিলে একজন কওমি পাস মাওলানাও রাখা হয়েছে। যাকে হয়তো একদিন আমারই মা, আমার বোন কিংবা আমার ভাবি রান্না করে খাওয়ায়। অথচ সেই ২২/২৩ বছরের মূর্খ ছেলেটা সবাইকে যা বলে সবাই তাই মানে।
আমার ইচ্ছে হলো ওকে মসজিদ থেকে বের করে পায়ের জুতাটা খুলে পিটাতে পিটাতে বের করে দেই। ঐ সমজিদে আমার জমি আছে। সেখানে সে আমারটাই খায়। অথচ সেখানে বসে সে সাড়ে চৌদ্দশো বছর আগের বর্বর নিয়ম দিয়ে সবাইকে বেঁধে ফেলেছে। কেউ কিছুই বলছে না! ধর্ম নামক অসভ্য বর্বর পদ্ধতি আমাদের কোথায় নিয়ে ঠেকিয়েছে!

বিষয়টা এমন যে আমার বিলাই আমার খাইয়া আমারে কয় ম্যাঁও। ঐ ছোকরা ইমাম আমার চেয়ে অন্তত পনেরো বছরের ছোট। আমি তাকে ধরে বললাম, ‘এই ছেলে তুমি মসজিদে বসে নারীদের নিয়ে আজে বাজে কথা বলো কেন?’ জবাবে সে বললো, ‘আমি কোরান হাদিসের বাইরে কোন কথাটা বলেছি ভাইয়া?’
আমি আর কোনো কথা বলতে পারলাম না। আসলেই তো কোরান হাদিসের বাইরে কোনো কথা বলেনি। এই বর্বরতা তো সে নিজে থেকে এনে মানুষের মাথায় চাপিয়ে দিচ্ছে না।

আমি কোনো নামাজ পড়তেই যাই না। কিন্তু মাইকে বয়ান শুনতে বাধ্য। কোনো শুক্রবারেই শুনলাম না সে এমন কোনো ওয়াজ করছে যা পুরুষের বিরুদ্ধে যায়। এই ধুর্ত ধর্ম ব্যবসায়ী বুঝে গেছে তার বেতন ভাতা থাকা খাওয়া কয়েকজন পুরুষের হাতে ন্যস্ত। তারা ওকে না করে দিলে পরদিন আর ওর ভাত জুটবে না। তাই সে কষ্মিনকালেও পুরুষের বিরুদ্ধে কোনো ওয়াজ করে না।

কিন্তু নারীর বিরুদ্ধে ওয়াজ করলে পুরুষ খুশি। নারীর সাজপোশাক নিয়ে এই ইমামের খুব জ্বালা। এজন নারী সাজুগুজু করলে সেই নারী তো দোজখবাসি হবেই তার সাথে সাথে তার স্বামী, ভাই সবাই দোজখবাসি হবে।

এই ওয়াজ করার পর পরনির্ভর নারীর আর কোনো অস্তিত্ব থাকে? মনে মনে ভাবি তুই তো সারা জীবন মাদ্রাসায় হুজুরের দ্বারা বলাৎকারের শিকার হইছিস, এখন নিজে বলাৎকার করিস, তোর কাছে নারী ভালো লাগবে কেন? অথচ ওর মোবাইলটা খুঁজলে দেখা যাবে সেখানে বিশ্বের নামী দামী পর্ন তারকার ভিডিও দিয়ে ভরা।

আসলে যুগের পর যুগ আমরা নারীকে এমন করে রেখেছি যে নারী নিজেও এখন এই সিস্টেম থেকে আর বের হতে চায় না। তার বিরুদ্ধে ঐ কওমি পাস মুর্খটা যা বলে সে নিজেও সেটাই বিশ্বাস করে। স্বামীর অধিকার আছে তাকে যেকোনো সময় তাড়িয়ে দেয়ার। আর তা যে কারণেই হোক দোষ ঐ নারীরই। আর তেঁতুল হুজুর তো বলেছেই যে নারী আয় করে সে বেশ্যা।

সিস্টেমটা কী অদ্ভুৎ! নারী তোমাকে বাঁচতে হলে এভাবেই বাঁচতে হবে। ধর্ম এটা ঠিক করে দিয়েছে। তুমি যদি এই সিস্টেমের বাইরে যেতে যাও তবে তুমি বেশ্যা। কারণ এই সমাজ হলো ধর্ম নিয়ন্ত্রিত পুরুষশাসিত সমাজ। আর এদেশে সেই সমাজ দিন দিন আরো বেশি শক্তিশালী হচ্ছে।

আপনারা হয়তো অনেকেই বলবেন – না আজকাল অনেক পরিবর্তন হয়েছে, নারীরা এসব আর মানছে না, তারা কাজ করে নিজের পায়ে দাঁড়াচ্ছে। তাদের কাছে আমার প্রশ্ন তা কতো পার্সেন্ট? এটা একটা চেইন। একটা নাগাপাশ। যা ক্রমশই অধিক শক্তিশালি হচ্ছে। যতদিন ধর্ম আছে ততদিনে এই জাল ছিঁড়ে নারী বের হতে পারবে না।

সাইফুল বাতেন টিটো, লেখক ও গণমাধ্যম কর্মী।

শেয়ার করুন:
  • 105
  •  
  •  
  •  
  •  
    105
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.