আমরা কি অদৃশ্য?

আনন্দময়ী মজুমদার:

১) মা হবার আগে হাসপাতালে নার্সদের কাছে কোর্স নিচ্ছি, তারা জানিয়েছিল, শিশু কাঁদলেই আদর দেবে, কোলে নেবে, স্পর্শ দেবে। শিশুর নতুন নিউরন জেনে নিচ্ছে পৃথিবীতে আমার জন্য কেউ আছে। এই খবরটা তার মাথায় স্থায়ী হলে সে শান্তি পাবে, শান্ত থাকবে।

এটা বলাই বাহুল্য ছিল। শিশুকে আমরা স্পর্শ দিয়েছি যতভাবে সম্ভব। পরে অনেকে বলেছে, ‘ছেলেটা খুব আদর বোঝে আর আদর ফিরিয়ে দিতে জানে।’

শিশুরা স্পর্শকেন্দ্রিক। চোখ, স্বর, ত্বক, মন দিয়ে তাদের স্পর্শ করা খুব সহজ। শিশুর চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলে দেখেছি, তারা সহসা চুপ করে যায়। প্রায় সব শিশুর জন্য এ কথা সত্যি। সংযোগ সাধন হলে তারা খুব খুশি হয়। সঙ্গে সঙ্গে সাড়া দেয়।

শিশুদের কাছে কান্না হলো দাবির ভাষা। নির্বাক শিশুর একমাত্র শক্তি। সে বলছে, আমাকে দেখো। আমার নিজেকে অদৃশ্য মনে হচ্ছে।

২) ঘুমানোর সময় ছেলেকে একলা ঘরে রেখে যেতে পারতাম না। তার একা একা লাগতো। ভয় করতো। যদিও সে জানে আমি কাছেই আছি। এখন একটা টেকনিক শিখেছি। অনেক আদর-টাদর করে, আর নিয়ে, বলি পাঁচটা এমন জিনিস ভাবতে যা আজকে ঘটেছে, আর খুব খুব ভালো জিনিস। সেটা করতে গিয়ে সে ঘুমিয়ে পড়ে।

শুনেছি দুই বছর বয়সে শিশুরা জেনে যায় — যা দেখা যায় না, শোনা যায় না, তাও আছে।

যে মা-কে দেখা যাচ্ছে না সে তো রয়েছে কোথাও না কোথাও।

কাছের মানুষ হারিয়ে হারিয়ে এক সময় বুঝতে পারি, শারীরিকভাবে যে হাজির নেই, সেই মানুষ, প্রাণী, গাছ বা স্মৃতি কোথাও না কোথাও আছে। ছেড়ে যায়নি। ডেকে নেওয়া যায়। আমি তাই গানের সময় আমার পিসিদের ডাকি। আমার বন্ধুকে ডাকি যে এখন নেদারল্যান্ডস থাকে। মঞ্চে ওঠার সময় আমার বাবাকে মনে মনে ডাকি। মাকে ডাকি।

এ কথা আমার মাত্র না।

দার্শনিক কবিরা নানাভাবে এই কথা উপলব্ধি করেন। সাম্প্রতিক কালের কবি মায়া এঞ্জেলু যখন লেখেন ‘Still I rise’ – তখন তাঁর মাথায় থাকে তিনি একা নন। তাঁর সঙ্গে তাঁর পূর্বপুরুষ আর পূর্বনারীরা আছেন – আছে এক বিশাল উত্তরাধিকার। এ কেমন থাকা? কোনো পরজাগতিক থাকা নয়। হৃদয়ে জেগে থাকা।

‘ছোট্ট রাজপুত্র’-এ তারায় চলে যাওয়া রাজপুত্র যেমন লেখককে বলে, যা কিছু জরুরি, তা চোখ দিয়ে দেখা যায় না। হৃদয় দিয়ে দেখতে হয়।

ফাল্গুনী নাটকে রবীন্দ্রনাথ যেমন বলেন, অন্ধ বাউলের মুখ দিয়ে, ‘অন্তরে আজ দেখব/ যখন আলোক নাহি রে।’

এই দেখা না থাকলে মানুষের এমন ক্ষুদ্র জীবনের বিচ্ছিন্নতাই সার মনে হয়।

আমরা ‘তারায় চলে গেলে’, হয়ত একদিন শিশু আমাদের এভাবেই ডেকে নেবে।

৩) যে শিশুকে কেউ লক্ষ্য করেনি, ফেলে রেখেছে, কান্নায় কোলে তুলে নেয়নি, অসুখে আরাম দিতে পারেনি, বুক ভেঙে গেলে বুঝতে পারেনি, শিশুরা যখন তাদের খেয়াল খুশি ‘আবোলতাবোল’ কথা বলতে এসেছে, মনোযোগী শ্রোতা পায়নি। ভালো খাবার, ভালো ইস্কুল, ভালো জামাকাপড় সবই আছে। সে অন্তরে তবুও অদৃশ্য।

নিরুত্তাপ ঠাণ্ডা শৈশব তাদের মস্তিষ্কের নিউরনগুলোকে শিখিয়েছে পৃথিবীর কাছে সে অদৃশ্য। তাই তাকে প্রমাণ করতে হবে, সে বেঁচে আছে।

এমন শিশু গুন্ডামি, দুষ্টুমি করে মনোযোগ আকর্ষণ করছে। অথবা গোল্ড মেডেল, স্কলারশিপ পেয়ে প্রশংসা কুড়িয়ে নিতে চাইছে। এভাবে যদি সে অদৃশ্য অবস্থা থেকে দৃশ্যমান হয়!

কিন্তু যে মনোযোগটা সে পাচ্ছে, তা কন্ডিশনাল। তা মধু না, স্যাকারিন। তাই মন ভরছে না। বাহবা বা তিরস্কার নয়, শিশুর দরকার তার ভয়ভীতি, ভালোবাসা সব কিছুকে রায়হীনভাবে দেখার এক জোড়া চোখ।

আমি শুনেছি এক প্রকার মানুষ আছে, যাদের সেপারেশন এঙ্কজাইটি ছয় মাসের শিশুর মতোন। যাদের দেখতে পায় না, তারা তাদের কাছে নেই হয়ে যায়। এই জন্য যাদের ওপর তারা নির্ভর করে, তাদের দুই দণ্ড ছেড়ে থাকতে পারে না। কেউ কেউ এই চোখে চোখে হারানোকে হয়ত ভালোবাসা মনে করবে। কিন্তু এ হল মনের মধ্যে এক শূন্যতার কান্না। ভালোবাসা কদাপি নয়।

এই প্রসঙ্গে একটা গল্প মনে পড়লো।

আমার ছেলে এক মাঝবয়স্ক মানুষ সম্পর্কে আমাকে জিজ্ঞেস করে বলেছিল, ‘মা, ‘ঝ’ কি তোমার চেয়ে ছোটো না বড়ো?’

‘তোমার কী মনে হয়?’

‘আমার মনে হয় ছোটো। অনেক সময় ওকে দেখলে ছয় মাসের বাচ্চা মনে হয়।’

৪) সেদিন শুনলাম একটা মেয়েকে বাঁচাতে গিয়ে এক ছেলে জলে ডুবে মারা গেছে। মেয়েটা বেঁচে গেছে। ছেলেটা বাঁচতে পারেনি। ভেবে দেখলাম এমন কাণ্ড হলে এক ভয়ানক ট্রমায় আমাদের ভুগতে হতো। সে মেয়েটি কিন্তু দিব্যি এক মাসের মাথায় ব্যাপারটা ভুলে গেছে। অর্থাৎ এই ঘটনার কোনো অভিঘাত তার মধ্যে তেমন একটা পড়েনি হয়তো।

ছোটোবেলায় বা বড়ো হতে হতে যাদের নিজেদের অদৃশ্য মনে হয়, অনেক সময় তাদের অন্যের প্রতি কোনো সত্যিকারের এম্প্যাথি কাজ করে না। অন্যদের জুতোয় দাঁড়িয়ে তাদের সুখ-দুঃখ নিজেদের বলে অনুভব করার ক্ষমতা থাকে না।

এরা নিজেদের ফলাও করে আর মনোযোগ চায়, কিন্তু অন্য কাউকে সত্যিকার অর্থে ‘দেখতে’ পায় না। তাই হয়ত, সম্পর্ক লালন করতে পারে না। আপন মা-বাবা, ভাই-বোন পার্টনার বা সন্তান হলেও পারে না।

এমন একটা এম্প্যাথি-হীন অবস্থা নাকি সমাজে ছড়িয়ে পড়েছে। অর্থাৎ এটা যদি ডেঙ্গু হতো তবে এটাকে এপিডেমিক হিসেবে ঘোষণা করা যেত। এই এপিডেমিকের নাম নারসিসিজম।

আমাদের সন্তান আর আমরা সকলে এই এপিডেমিকের যুগে ঝুঁকি নিয়ে বাস করি।

এর বিরুদ্ধে আমাদের অস্ত্র, একটু সচেতনতা, আর মানুষের হাত ধরতে শেখা। চোখে চোখে তাকাতে শেখা। শিশুদেরও তাই শেখানো। সব ভয়ভীতিভালোবাসা সহ নিজেদের আনকন্ডিশনালি মেনে নেওয়া।

৬) ১৯৯৫ এর তুলনায় সোশাল মিডিয়ার যুগে ২০০৫ সালে এই এপিডেমিক পাঁচ গুণ বেড়ে গেছিল। উত্তরোত্তর বাড়ছে — যেমন বাড়ছে নিঃসঙ্গতা।

দুনিয়ার সাড়ে সাত বিলিয়ন মানুষের মধ্যে আছে এই কান্না — ‘আমি অদৃশ্য।’ আমরা এতগুলো অদৃশ্য জীব এক গ্রহে থাকি, যাদের ‘ভালো মন্দ মিলায়ে সকলই’ দেখার বেশির ভাগ ক্ষেত্রে, কেউ নেই।

৭) নারসিসিস্টদের মূল লক্ষণ তাদের মধ্যে এম্প্যাথির অভাব। কেউ কেউ এই টেকনিকাল সংজ্ঞা না জেনেই নারসিসিজম==আত্মপ্রেম বলে থাকেন।

কিন্তু এর চেয়ে ভুল কথা আর হয় না। আত্মপ্রেম হল সেলফ-লাভের একটা পরিভাষা।

মনোবিজ্ঞানে সেলফ-লাভ কোনো অসুখ না। অসুখের নিরাময়।

নিজেকে জানো — এই কথা আছে হিন্দু, বৌদ্ধ ও সুফি দর্শনে। নিজেকে জানা, নিজেকে সব আলো-আঁধার সহ মেনে নেওয়া, নিজের প্রতি ভালোবাসা আর করুণা বোধ করা, এসব আজকের যুগের বিজ্ঞান-ভিত্তিক সোপান, বৃহত্তর জগতের সঙ্গে নিজের সংযোগ ঘটানোর।

৮) নারসিসিজম এক নিদারুণ আতংক আর ভয় থেকে জন্ম নেওয়া অসুখ (পোস্ট ট্রমাটিক ডিসঅর্ডার)।

নারসিসিস্টদের অন্যতম সমস্যা, তারা অন্যের দুঃখকষ্ট নিজের মধ্যে অনুভব করেন না। তারা নিজেদের প্রয়োজনে অন্যদের ঠিক যেন ঘাড় কামড়ে ধরে ব্যবহার করতে থাকেন এবং ছাড়বেন না তাই সব রকম বিবেকহীন ও আগ্রাসী কাজ করতে রাজী। তাদের কোনো নিরাময় নেই।

৯) যারা যুদ্ধে গেছে, যুদ্ধে শিশু হত্যা করেছে, রেপ করেছে, এমন লোকেরও ‘সংশোধন’ হয়েছে বলে রেকর্ড আছে। ট্রমাঘটিত অসুখ থেকে ফিরে আসার জন্য পথ আছে, ৮০% মানুষকে তা বাঁচাতে পারে।

অথচ নারসিসিসজম নামের প্রায় অচিন এই সামাজিক এপিডেমিকটির এখনো কোনো নিরাময় বিজ্ঞানীরা বের করতে পারেননি।

১০) সমাজের হালের চরিত্র নারসিসি্সট লালন করতে চায়। তাদের পুরস্কৃত করে। তাদের গুণগান গায়। “এম্প্যাথি দুর্বল মানুষের লক্ষণ। নির্লিপ্ত হও। কঠিন হও। জগতে কে বা কার,” সেটাই এই কঠিন পৃথিবী দাবী করে, নয় কি?

ব্রেনে ব্রাউনের ভাষায় আমরা পড়েছি – মজবুত পিঠ, কোমল মুখ। শক্ত হতে গেলে নরম হওয়া যায় না কে বলেছে? ইস্পাতের মত শক্ত নার্ভ আর ফুলের মত কোমল হৃদয় এক সঙ্গে পাওয়া যায় না কে বলেছে?

১১) নারসিসিস্টদের একটাই ভোট, সেটা নিজের জন্য। এই খেলায় প্রিয়জন কেউ নেই। সকলেই প্রজা। তিনি একাই রাজা। অথচ মাঝেমাঝে এরা এদের নারসিসিজমকে চাইলে অন-অফ করতে পারেন। দরকার মতো।

যখন অন রাখেন তখন পরিবারস্বজন তার অমতে চললে তিনি তাদের ধ্বস্ত করবেন। অন্যের মতামতকে তিনি শব্দযুদ্ধে গুঁড়য়ে দেবেন। তার সুবিধের জন্য তিনি নিষ্ঠুরতা আর মিথ্যের আশ্রয় নেবেন।

১২) সমস্যার কথা হলো যারা নারসিসিস্টদের সঙ্গে বেশি সময় কাটান তাদের মধ্যে অনুরূপ প্রবণতা দেখা যেতে থাকে। এটা ছোঁয়াচে অসুখ। এইজন্য এপিডেমিক বলে মনে করছেন আজকের বিজ্ঞানীরা। এইসব থেকে রেহাই পাবার পথ কী? আমার কাছে ব্রেনে ব্রাউন একটা মূল্যবান রিসোর্স। পাশাপাশি আরও পড়াশুনো আর জীবন-উপলব্ধি থাকার দরকার।

*****

ডিসক্লেইমার -একাডেমিক আর সেরেব্রাল আগ্রহ থেকে প্রথম সারির লেখক গবেষকদের কিছু আলোচনা আর সেমিনার শুনে রাখলাম। হালের সামাজিক গবেষণা থেকে প্রাপ্ত সারাংশের এক টুকরো। আমাদের মতামত নয়।

শেয়ার করুন:
  • 34
  •  
  •  
  •  
  •  
    34
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.