বিধবার বিয়ে কেন স্বাভাবিক নয়

শামীমা জামান:

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অক্লান্ত পরিশ্রম ও আন্দোলনের মাধ্যমে ১৮৫৬ সালের জুলাই মাসে ‘’বিধবা বিবাহ পুনর্বিবাহ আইন’’ পাশ হয়। বলা হয়েছিল এই সমাজ সংস্কারের মাধ্যমে বিধবাদের বিয়ের সমস্ত বাধাবিপত্তি ঘুচে গেলো।

আসলে কি ঘুচেছে এই বাধা? প্রায় দুইশত বছর পরের আজকের আধুনিক পৃথিবীতে বিধবার বিয়ে কি স্বাভাবিক দৃষ্টিতে দেখা হয়? সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাসছে চাঞ্চল্যকর একটি ঘটনা। বিধবা এক নারীকে তার দুই সন্তান প্রহার করে মাথা ন্যাড়া করে দিয়ে মুত্রপান করায়। ওই নারীর অপরাধ তিনি তার মধ্যবয়সী জীবনে একাকিত্ব সইতে না পেরে এক আত্মীয়ের সাথে সম্পর্কে জড়ান ও পালিয়ে যান। কিছুদিন পর সন্তানদের মায়ায় ওই নারী তার কম বয়সী প্রেমিকসহ ফেরত আসে নিজের ঘরে এবং আসার পর প্রেমিকসহ এই নির্মম বর্বরতার শিকার হোন। সন্তানরা মায়ের এই প্রেম মেনে নিতে পারেনি।
ঘটনাটি ঘটেছে ভারতের রাজস্থানের নাগাউর অঞ্চলে। তবে এ ঘটনা বা বিধবার প্রেম বিয়ে নিয়ে এরকম মনোভাব আমাদের দেশে ঘরে ঘরে বিরাজমান।

ঊর্মির (ছদ্মনাম) শাশুড়ি মারা যাওয়ার তিনমাসের মধ্যেই তার পঁয়ষট্টির্ধ্বো শ্বশুর বিয়ের জন্য ব্যতিব্যস্ত হোন। পরিবারের বয়স্ক নারী সদস্যরা বিপত্নীকের একাকিত্ব উপলব্ধি করেন সহমর্মিতার সাথে। নারীবাদের মুখোশ পরে সমাজে চলা এই নারীরা গর্ব ও আনন্দের সাথে একপা কবরে দেয়া বুড়োর বিয়ের জন্য পঁচিশ- ছাব্বিশ বছরের কচি মেয়ের অন্বেষণে লেগে পড়েন। কচি মেয়ের ব্যাপারে ঊর্মি মৃদু আপত্তি জানালে তার পরিবারের এই নারী সদস্যরা গর্বের সাথে বলেন, ‘রাজা বাদশারা করেছেন, উনিও করবেন’।

বলা বাহুল্য নারীবাদের ঝাণ্ডা হাতে জাতিসংঘ অবধি পৌঁছানো শিক্ষিত নারীর উক্তি এটি। ঘটনা এখানে শেষ হলেও হতো। কিছুদিনের ব্যবধানে এক দুর্ঘটনায় ঊর্মি তার স্বামীকে হারায়। একমাত্র শিশুকন্যাকে বুকে আগলে একাকি পার করে পাঁচটি বছর। তরুণী মেয়েটি একাকিত্বের ভয়ংকর অনলে যৌবন পার করে মধ্য বয়সে এসে পৌঁছায়। ভালো জব করে।
সবাই ধরেই নিয়েছে মেয়েকে ঘিরেই কেটে যাবে তার দীর্ঘ জীবনযাত্রা। কিন্তু এরই মাঝে বাদ সাধে ঊর্মির নাছোড়বান্দা কলিগ ও বন্ধু রিপন। ঘটনাচক্রে সে ডিভোর্সি।
ঊর্মির দায়িত্ব সে নিতে চায়। নিজের ও ঊর্মির জীবনকে নতুনভাবে গড়তে চায়। এমন সোনায় সোহাগা প্রস্তাবে ঊর্মির বাবা-মার আপত্তি থাকার কথা না।

কিন্তু বাধ সাধলেন ঊর্মির শ্বশুর। বিধবা বউয়ের এমন সিদ্ধান্তে তিনি গর্জে উঠলেন। একি বেলেল্লাপনা! এটা কি একটা কাজ সে করে বসলো? পরিবারের সেইসব নারীরা তীব্র নাখোশ হলেন ঊর্মির উপর। কিন্তু ঊর্মি আর্থিকভাবে
স্বাবলম্বী ও স্বাধীনচেতা নারী। এই বিবেকহীন মানুষগুলো কী বললো, সমাজ তাকে কী ভাবলো এসবের থোড়াই কেয়ার সে করতে পেরেছে বলেই নতুন স্বামী -সন্তান নিয়ে সুখের একটি জীবন সে কাটাচ্ছে।
কিছুদিন গেলে এই মানুষগুলোও স্বার্থের প্রয়োজনে ঊর্মির বরকে আপন করে নিলো।

ঊর্মির মতো শ্বশুরবাড়ির মানুষকে থোড়াই কেয়ার করে অল্প বয়সে নিজের বৈধব্যের অভিশাপ থেকে গ্রীবা উঁচু করে উঠে দাঁড়াতে পারেনি আমার বন্ধু জেবা (ছদ্মনাম)। জেবা আর তার বরের রোমান্টিকতা ছিল রীতিমতো ঈর্ষণীয়। ওদের দুজনকে একসাথে শেষ দেখেছিলাম ধানমন্ডির আনাম র‌্যাংগস এ। জেবার বরের দুহাত ভর্তি শপিং ব্যাগ। বেচারা সেগুলো নিয়ে জেবার পিছু পিছু ছুটছে এ দোকান থেকে ও দোকান। কিন্তু বেশি সুখ ওর কপালে সইলো না। খুব অল্প বয়সে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে ওর স্বামী মারা গেলো। রেখে গেলো ফুটফুটে দুটি মেয়ে আর একটি পরনির্ভরশীল আর্থিক অসচ্ছল জীবন। একটু সচ্ছল জীবনের জন্য জেবাকে শ্বশুরবাড়ির মানুষদের আগলে চলতে হয়। প্রিয়তম স্বামীর মৃত্যুকে মেনে নিতে পারে না জেবা। স্কুলের জব ছেড়ে পড়ে যায় ভয়াবহ ডিপ্রেশনের কবলে। বছর দুয়েক আগে বন্ধুদের এক মিলনমেলায় ওকে জোর করে আমরা হাজির করি। কিন্তু ওর দিকে তাকাতে পারি না।

এক সময়ের ডাকসাইটে সুন্দরী স্মার্ট জেবার আজ একী অবস্থা! অযত্নে অবহেলায়, জীবন যুদ্ধে হেরে যাওয়া এক বিষণ্ণ নারী। যার একমাত্র স্বপ্ন দুটি মেয়ের পড়াশোনা। আর্থিকভাবে ভালো থাকার চেষ্টা। বাসায় ফিরে ফোন করি ওকে। সরাসরি বলে ফেলি, বিয়ে কর। ও যেন একটা অদ্ভুত কথা শুনলো।আমাকে বললো ‘তুই এসব কী বলিস, আমরা এখনো ওর ছবি মাঝখানে রেখে ঘুমাই’।

এভাবে কেটে গেছে আটটি বছর। আমার শুধু চোখে ভাসে সুন্দরী সেই কিশোরী জেবা। ঝাঁকে ঝাঁকে ছেলেরা পাগল ছিল ওর রূপে। আর আজ! একাকী, বিষণ্ণ পুরুষহীন একটা জীবন বয়ে নিয়ে যাচ্ছে শুধুমাত্র সমাজের মানুষের কথা চিন্তা করে। ওর বড় মেয়ে এখন টিন এজ সুন্দরী। কদিন বাদে মেয়ের বিয়ে দিতে হবে। এই বয়সে ওর এসব ভাবলে হবে? মানুষ কী ভাববে? ছি:।

আসলে কি মানুষ সারাক্ষণ আপনাকে নিয়ে ভাবে? প্রিয় অপর্না সেন এর ভাষায় বলি ‘নিজেকে ভালবাসো, নিজের যেটা করতে ইচ্ছে হয় সেটাই করো। একটাই কিন্তু জীবন, সেই জীবনটা আর কোনদিনও ফিরে পাবে না, সব সময় লোকে কী বলবে, কে আমাকে কীভাবে দেখবে সেটা ভেবো না। তারা তোমার জীবনটা তোমার হয়ে বাঁচবে না, তুমিই তোমার জীবনটা বাঁচবে, সুতরাং তুমি একজাক্টলি নিজের যা ইচ্ছা করে সেটাই করবে।’

শেয়ার করুন:
  • 578
  •  
  •  
  •  
  •  
    578
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.