নারীর মাঝে পুরুষতান্ত্রিকতা

সাবিহা সুলতানা:

শিক্ষকতা এবং লেখালেখি ছাড়াও আর একটি দিকে আমার কিঞ্চিৎ ঝোঁক আছে আর তা হলো চারটি হাতকে সামাজিকভাবে এক করে দেবার একটি উদ্যোগ নেয়া, খাঁটি বাংলায় যাকে আমরা বলি ঘটকালী। যদিও খুব বেশি নয় এ পর্যন্ত মাত্র চারটি বিয়ে দিতে পেরেছি তবে এই চারটি বিয়ে দিয়েই আমি বেশ আত্মতৃপ্তি লাভ করেছি। কিন্তু আজ আমি এখানে আমার ঘটকালির সাত কাহন বলতে আসিনি, বরং আজ আমি যেটা বলতে চাইছি সেই প্রসঙ্গটি হলো পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা। আর আশ্চর্য্যজনকভাবেই এই মানসিকতাটি পুরুষ নয় বরং আমরা নারীরাই সযতনে ধারন করে আছি যুগ যুগ ধরে। কীভাবে? বলছি তবে।

একটি এ্যারেঞ্জ ম্যারেজের ক্ষেত্রে প্রথম পদক্ষেপ হিসেবেই আমরা কী দেখি? পাত্র এবং পাত্রী নির্বাচন। এবং সবার প্রথমেই যেটা প্রধান বিষয় হয়ে দাঁড়ায় তাহলো কন্যাটিকে তার হবু বরের চেয়ে অবশ্যই বয়সে ছোট হতে হবে। ইয়ারমেট হলেও হবে না, কমপক্ষে তিন থেকে চার বছরের জুনিয়র হতে হবে। দ্বিতীয়ত, পাত্রটিকে অবশ্যই কন্যার চেয়ে যোগ্যতায় বড় হতে হবে।

যেমন মাস্টারস কমপ্লিট পাত্রীর অবশ্যই ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার অথবা ভালো চাকুরিজীবী পাত্র হতে হবে। ডক্টর ইঞ্জিনিয়ার পাত্রীর জন্য তার চেয়ে কোয়ালিফাইড বা সমান কোয়ালিফিকেশনের পাত্র হতে হবে, কোনভাবেই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করা পাত্র চলবে না। তবে তারা যদি বিসিএস কোয়ালিফাইড হয় (তাও যেন তেন নয় এডমিন অথবা ফরেন অ্যাফেয়ার্স) তাহলেই একমাত্র চলতে পারে।
তৃতীয়ত পাত্রকে অবশ্যই পাত্রীর চেয়ে লম্বা হতে হবে। পাত্রটি উচ্চতায় সমান কিংবা সামান্য দীর্ঘ হলেও বিপদ। তাহলে পতিদেবটির চেয়ে দীর্ঘাঙ্গী লাগবে বলে মেয়েটিকে সারাজীবন ফ্ল্যাট স্যান্ডেল পরে উঁচু হিল না পরতে পারার দুঃখ করে যেতে হবে!
আর সবশেষে যেটি গোলমেলে ব্যাপার তাহলো দেনমোহর নির্ধারণ। পাত্রীটির ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি মোটা অংকের দেনমোহর অবশ্যই পাত্রটির উপর চাপিয়ে দিতেই হবে, তা সে পাত্রটির সেটি পরিশোধ করার ক্ষমতা থাকুক আর না থাকুক। প্রতিটি বিয়ের ক্ষেত্রেই এই দেনমোহর নিয়ে দুই পরিবারের মনোমালিন্য একটি স্বাভাবিক ঘটনা।

এখন বলি পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার কথা কেনো বললাম। একটু গভীরভাবে চিন্তা করলেই দেখা যাবে পাত্রের ক্ষেত্রে কাঙ্খিত উপরোক্ত প্রতিটি যোগ্যতাই কোনো না কোনো ভাবে পাত্রটিকে পাত্রীর চেয়ে মর্যাদায় উপরে রাখার চেষ্টা যা পুরুষতান্ত্রিক সমাজের সৃষ্টি। অর্ধাংগকে অবশ্যই তার স্ত্রীর চেয়ে যোগ্যতায় বেশি হতে হবে, বয়সে বড় হতে হবে, লম্বায় উঁচু হতে হবে যেনো তার স্ত্রীর চেয়ে সর্বক্ষেত্রেই তার শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ হয়।

উচ্চ দেনমোহর দিয়ে পুরুষকে আটকে ফেলার মধ্যেও যে কী পরিমাণ অসম্মান লুকিয়ে আছে তা যদি নারীজাতি বুঝতো তাহলে হয়তো বিয়েতে দেনমোহর নিয়ে এই দর কষাকষির চল অনেক আগেই উঠে যেতো। যার সাথে সংসারই সম্ভব নয় তার কাছ থেকে হাত পেতে টাকা নেয়ার মধ্যে আর যাই হোক গর্ব বোধ হয় কিছু নেই, যা আছে তা হলো টাকার বিনিময়ে নিজের আত্মমর্যাদা আর সম্মান বিকিয়ে দেয়ার চেষ্টা।

আপনার সাথে যে পুরুষটি ঘর করতে চাইছে না কিংবা আপনি যার সাথে সংসার করতে পারছেন না শুধুমাত্র দেনমোহরের টাকা পরিশোধ করতে পারবে না বলে সে আপনাকে নিয়ে সংসার করছে এতে আর যাই হোক আপনার সম্মান নেই কিছু।

এই প্রতিটি নিয়মই পুরুষতান্ত্রিক সমাজের সৃষ্টি, অথচ দুঃজনক হলেও সত্যি পুরুষদের চেয়ে নারীরাই এখন তা লালন করে চলেছেন বেশি। কীভাবে? এক্ষুণি একজন শিক্ষিতা নারীর কাছে তার চেয়ে কম যোগ্যতার কোনো পাত্রের প্রস্তাব নিয়ে যান, ফলাফল হাতেনাতিই পাবেন। আমরা নারীরাই আমাদের পাশে আমাদের চেয়ে কম যোগ্যতার কাউকে আশা করি না, কারণ আমরা জন্মগতভাবেই পুরুষ দ্বারা শাসিত হবার মানসিকতা নিয়েই বড় হয়ে উঠেছি।

পাত্র যখন কন্যা নির্বাচন করতে আসেন তারা যেমন রূপ দেখেন সবার আগে, ঠিক সেইভাবে আমরা নারীরাও কিন্তু পাত্রের যোগ্যতাটা দেখি আগে। আর তাই রূপ আর যোগ্যতার আড়ালে প্রকৃত মানুষটি কোথায় যে হারিয়ে যায় তার সন্ধান আর পাওয়া হয় না কারও।

তাহলে এর সমাধান কী? সমাধান হলো দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন আর অবশ্য অবশ্যই শিক্ষা। নারীরা প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিতা হয়ে নিজের পায়ে দাঁড়ান প্লিজ। সংসারে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক ঊর্ধ্বতন আর অধস্তন কর্মকর্তার নয়, বরং একে অপরের সহযোগীর। এর মাঝে যে কেউ এ্কটু কম যোগ্যতা সম্পন্ন হতেই পারে। সেটি যে শুধু নারীকেই হতে হবে এমন নয়। শুধুমাত্র একজন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বা বিসিএস কোয়ালিফাইড নয় বলে তাকে প্রত্যাখ্যান করার আগে আরো কয়েকবার ভাবুন। তিনি তো মানুষ হিসেবে অসাধারণ হতে পারেন। তার সাথে কথা বলে দেখুন।

সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলো মানসিকতার মিল। একজন বয়সে ছোট হলেও মননে অনেক পরিণত হতে পারেন। আবার অনেক বয়স্ক ব্যক্তিরও ম্যাচিউরিটি আসতে অনেক সময় লাগতে পারে। জীবনসঙ্গী যাকে করবেন সে যেনো বন্ধুভাবাপন্ন হয় সেদিকে দেখুন।

শুধু লম্বায় খাটো বলে একজনকে যখন প্রত্যাখান করছেন তখন আপনার সাথে ঐ পুরুষটির কোনো পার্থক্য নেই যে পাত্রী দেখতে এসে গায়ের রঙ কালো বলে তাকে রিজেক্ট করে। আপনার বর আপনার চেয়ে খাট বলে লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই। সমাজের এসব কাল্পনিক সীমারেখা থেকে বেড়িয়ে আসুন।

আপনি নিজে শিক্ষিতা একজন নারী। তবু আপনি ভবিষ্যতে একজন যোগ্যতা সম্পন্ন নিজের বাড়ি, গাড়ি আছে এমন পয়সাওয়ালা পাত্রকে বিয়ে করে নিজের ভবিষ্যত নিশ্চিত করার স্বপ্ন দেখেন। আপনার সাথে গ্রামের একজন অশিক্ষিত বা পিছিয়ে থাকা নারীর কোনো পার্থক্য নেই। পাত্রের মধ্যে টাকা পয়সা ও যোগ্যতা খোঁজার চাইতে নিজেই সেই যোগ্যতাগুলি অর্জন করুন না।

আপনি উচ্চ মোহরানা নির্ধারণ করে স্বামীকে বেঁধে ফেলার চেষ্টা করেন যেনো কোনোভাবেই তিনি আপনাকে ডিভোর্স দিতে না পারেন। আর দিলেও তার টাকায় যেনো সন্তানদের নিয়ে বাকি জীবন চালিয়ে যেনো দিতে পারেন। এটা করে নিজেই নিজেকে ছোট করলেন। সম্পর্কের তিক্ততা যদি ডিভোর্স পর্যন্ত গড়ায় তবে তার দায় দুজনেরই। দুজনেই সন্তানের দায়িত্ব সমানভাবে পালন করুন। আর যদি হাজবেন্ড অন্যায় করে তবে তাকে জেলের ভাত খাওয়ান তার মধ্যেও অনেক সম্মান আছে। হাত পেতে দেনমোহরের টাকা নিয়ে কম্প্রোমাইজ করার মধ্যে যার তিল পরিমাণ নেই।

আমার এই কথাগুলি প্রধানত শিক্ষিত মেয়েদের প্রতি। গ্রামের অসহায়, শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত, বাল্যবিবাহের শিকার হওয়া মেয়েদের প্রতি নয়, কারণ তাদের ভাগ্যে এতো বাছবিছার করার কোনো সুযোগ হয় না কখনোই। তবে তাদেরও এই পরিস্থতির উত্তরণের একমাত্র উপায় হলো শিক্ষা।

কালের স্রোতে একবংশ শতাব্দীতে এসে পৌঁছেছি আমরা। ঘরে বাইরে সর্বক্ষেত্রেই পুরুষের পাশাপাশি নারী সমান পদক্ষেপে এগিয়ে চলেছে। সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তন এসেছে অনেক কিছুরই। কিন্তু দুঃখের বিষয় বড় বড় অনেক ক্ষেত্রে পরিবর্তন এলেও বিবাহের ক্ষেত্রে সেঁকেলে এই মানসিকতার কোনো পরিবর্তন আসেনি এখনও। আজও আমরা তাই পাত্র-পাত্রী নির্বাচনে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের নির্ধারণ করে দেয়া গঁৎবাঁধা নিয়মগুলির বাইরে যেতে পারিনি আজও।

পুরুষ এবং নারী কেউই একে অপরের প্রতিপক্ষ নয়, নয় প্রভু কিংবা দাস (যদিও বাংলায় স্বামী শব্দটির অর্থ “প্রভু” যা পুরুষতান্ত্রিক সমাজেরই সৃষ্টি) বরং উভয় মিলেই একটি সমাজের মুল চালিকা শক্তি। আর একটি সংসার থেকেই তাদের সেই ভূমিকার সূচনা। এখানে উভয়পক্ষকেই হতে হবে একে অপরের পরিপূরক। পরস্পরের আস্থা আর ভালবাসায় সেটি গড়ে উঠবে, প্রভু দাসের সম্পর্কে নয়। তাই সবার আগে নারীদের সম অবস্থান নিশ্চিত করতে হবে, শুধু নারী মুক্তি নারী মুক্তি করে গলা ফাটালেই চলবে না।

দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা মানসিক দাসত্ব থেকে যেদিন নারী মুক্ত হতে পারবে সেদিনই হবে তার প্রকৃত মুক্তি, তার আগে নয়।

শেয়ার করুন:
  • 569
  •  
  •  
  •  
  •  
    569
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.