মেয়েকে প্রতিবাদ করতে শেখান

কৃষ্ণা দাশ:

বয়স তখন ৮/১০ বছর হবে, নাদুস নুদুস দেখতে মেয়েটি অনেকবার ভায়োলেন্সের শিকার হয় তার নিজের পরিবারের লোকদের কাছেই। দিনের আলো যেমন ঝলমলে সব, ঠিক তেমনি রাতের আঁধারটা ওই বয়সেই মেয়েটির কাছে ছিল বিভীষিকাময়।
দিনে সম্পর্কে একজনকে নিজের দাদা (পিসতুতো) বলেই মনে হতো, তো দাদাই যদি হয় তাহলে কেন রাতে তার শরীরের বিভিন্ন অংশে হাত দেয়?
সে জেগে থাকলে দেয় না, যখন সে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন তখন আলগোছে একটা হাত তার শরীরে কী যেন খোঁজে! ওই বয়সেই লজ্জায় সে বিছানায় সেঁটে থাকতো আর ভাবতো কেন এমন হয়!

বাড়িতে কেবলমাত্র দুটো খাট থাকায়, এক খাটে তার বাবা-মা আর ছোট ভাই ঘুমাতো। তাই বাড়িতে নিকট আত্মীয়দের কেউ এলে তার আর তার ঠাম্মার সাথে ঘুমাতে দিতো ওই দাদাকে৷ ঠাম্মা গভীর ঘুমে তাই কিছুই টের পেতো না, আর দাদাটি তার সমস্ত শরীরে হাত বুলায়। মেয়েটি জেগে যায়, চোখ খোলে না কারণ এই বিভৎস দৃশ্য সে দেখতে চায় না কিংবা দাদাটাকে লজ্জা দিতে চায় না!
হতে পারে সাহসটাও কম ছিল! কে জানে! পরিবার থেকে অনেক কিছুই তো তার করতে মানা, সে মেয়ে বলে।
হয়তো সে ভেবেছে এই লজ্জার কথা বলতে মানা। যাই হোক একদিন রাতে মেয়েটির বাবা ওয়াশরুমে যাওয়ার জন্য উঠলে কিছু দেখতে পান এবং হৈ চৈ শুরু করেন। মেয়েটির মা আর ঠাম্মা মিলে বাবাকে থামিয়ে দেন লোকে শুনবে বলে। এরপর ঠিক আর কী কী হয় ওই ছোট্ট মেয়েটি আর বুঝে উঠতে পারে না। কিন্তু ঘটনা হলো এরপরও ওই দাদাটি তাদের বাড়িতে আসতো তবে তাকে আর ওই খাটে শুতে দেয়া হতো না, এই আর কী!

পরিবারেই মেয়েরা এই ধরনের ঘটনার শিকার বেশি হয়। শিকার বেশি হয় কারণ আমাদের লজ্জা, লোকে কী বলবে তার ভয়। আমরা মেয়েদের শুধুমাত্র মেয়ে ভাবি! তারাও মানুষ এবং এই ধরনের ঘটনা ঘটলে তার মানসিক অবস্থা কী হয় তা না ভেবে, কীভাবে ঘটনাটিকে ধামাচাপা দেয়া যায় তাই ভাবতে থাকি। সবাই আমরা ভুলে থাকার অভিনয় করতে থাকি যেন কিছুই হয় নাই, মেয়েটি কি ভুলতে পারে, পেরেছে?
আজও যখন সে নিরিবিলি একা শুয়ে থাকে, মনে হয় কে যেন তার শরীর হাতড়ায়। মেয়েটি এখন আরেকটি ফুটফুটে মেয়ের মা। মেয়েকে যেদিন প্রথম বুকে আগলে নেয় তখনি সে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে “মা, আমার মতো শৈশব আমি তোকে দিবো না, আমার মতো হতাশা আর বিষাদ নিয়ে তোকে আমি বড় করবো না৷ সব সময় তোকে আগলে রাখবো, কোনো রাক্ষস তোকে ছোবল মারতে পারবে না, আমি আছি তোর বেড়ে উঠায়। আমার জন্য তুই সব। সমাজ আর সংসারের পরোয়া করি না।”

মেয়ে যখন ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে ওই মা তাকে শেখায় কীভাবে নিজেকে হায়েনার হাত থেকে রক্ষা করতে হয়। শেখায়- সমাজ হচ্ছি আমরা, এই সমাজেই এমন কিছু লোক আছে বা সময় সময়ই থাকবে তারা শুধু সারাক্ষণ অন্যের দিকে আঙ্গুল তুলে রাখবে, রাখুক এদের নিয়েই আমাদের চলতে হবে। শুধু মনে রাখতে হবে আমি মেয়ে, আমি মানুষ, আমিই দুর্গা। কখনও ভালোটাই ভালো বলতে যেমন কুন্ঠিত হবি না, ঠিক তেমন মন্দটাতেও মন্দ বলতে কখনও পিছপা হবি না৷।

আমরা প্রতিবাদ করতে পারি না, প্রতিবাদ করতেও শেখাতে পারি না। আমরা পারি কেবল মেয়েগুলোকে মুখ বুঁজে সব সহ্য করতে বলতে। আমরা পারি কেবল কেউ প্রতিবাদ করলে, তাকে তীর্যক আঙ্গুল তোলে শেখাতে যে, দেখো, তুমি খামাকা চেঁচাচ্ছো, তুমি তো জানো ওই রাস্তায় বখাটেরা আছে, তুমি কেন ওদিকে যাও? কেন রাতে একা বের হও? এমন পোশাক পরলে লোকে তো চোখ দিবেই! এরকমই হাজার নিয়মের ডানা মেলে তারা আগলে ধরবে। আবার দু’একজন বলেও বসবে, তোমার সাথেই এমন কেন হয় বাপু বুঝি না! আমরাও তো বের হই, কই আমাদের সাথে তো এমন হয় না!

আমি বলবো হয়, আপনার চেতনা লোপ পেয়েছে বলে আপনি ফিল করতে পারছেন না, আসলে অনেকদিন আগে থেকেই তো আপনার সাথে এরকম হয়ে আসছে, আপনার ধৈর্য শক্তি দেখে চেতনারা পালিয়েছে।
আপনি ভাবছেন ছেলেগুলো খারাপ? আরে না, ছেলেগুলো খারাপ না, ওদের খারাপ আপনারাই বানিয়েছেন। কারণ আপনি তো শেখান নাই ভালো বা মন্দ কোনটা। আপনি তো শুধু ওদের অপকর্মে পর্দা দিয়েছেন, ঢেকেছেন। এভাবে চলতে চলতে ওরা ভুলটাকেই ঠিক ভেবে নিয়েছে।

প্রতিবাদ করতে শিখুন আর শেখান, আর কিছু না পারলে অন্তত প্রতিবাদীর দিকে আঙ্গুল তুলে দাঁড়িয়ে যাবেন না প্লিজ। আজ হয়তো অন্যের মেয়ের সাথে হয়েছে, কাল যে আপনার মেয়ের সাথে হবে না, সে কথা তো হলপ করে বলা যায় না, তাই না?
আর ছেলেগুলোও আমাদের, ওদের সঠিক রাস্তাটা চেনানোর দায়িত্ব কিন্তু আমাদের।

লেখক: কল্যাণী, নদীয়া, পশ্চিমবঙ্গ থেকে।

শেয়ার করুন:
  • 1.9K
  •  
  •  
  •  
  •  
    1.9K
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.