চোখের দেখাই শেষ দেখা নয়

তামান্না ইসলাম:

আমরা যদিও প্রায়ই বলি অন্যকে জাজ না করতে, কিন্তু আমরা নিজেরাই কিন্তু এই জাজমেন্টের ঊর্ধ্বে উঠতে পারি না। কোন না কোন বায়াসিং, আমাদের শিক্ষা, বেড়ে ওঠার পরিবেশ, অভিজ্ঞতা আমাদের নিজেদের অজ্ঞাতেই আমাদেরকে দিয়ে জাজ করায়।
এরকম একটা অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার করবো আজ।

আমাকে বাসায় ফেসিয়াল করতে একটা মেয়ে আসে। মেয়েটা ইন্টেলে কাজ করে, পুরো দস্তুর এঞ্জিনিয়ার। এটুকু পড়েই হয়তো কারও কারও একটু অবাক লাগছে। আমারও লেগেছিল যেদিন অচেনা এই মেয়েটি আমাকে মলে দেখে বলেছিল ‘তুমি কি বাংলাদেশি? ফলসমে থাকো? আমি ফলসমে তোমাদের বাংলাদেশি একজনকে বাসায় গিয়ে ফেসিয়াল করে দেই। তুমি চাইলে তোমাকেও করে দিতে পারি।’

তামান্না ইসলাম

সেটা অনেক বছর আগের ঘটনা।
প্রথমেই আমাদের বন্ধুদের মাঝে বেশ কৌতূহল ছিল। এতো ভালো চাকরি করে যে, অফিস শেষে ক্লান্ত শরীরে অল্প কয়টা টাকার জন্য কেন সে অন্যর বাসায় এসে এই কাজ করে!
উত্তরটা ওই দিয়েছিল, এটা ওর প্যাশন, স্ট্রেস রিলিভার। এবং ও একদমই কেয়ার করে না কে কী ভাবলো! ও খুব ভাগ্যবান কারণ ওর স্বামী ওকে ওর ইচ্ছামতো কাজ করতে উৎসাহিত করে এবং সে রান্না করতে ভালবাসে। ওর সাথে কথা বলে আমার মনের অনেকগুলো বন্ধ দরজা খুলে গিয়েছিল।
তাই বছর কয়েক পরে ও যখন ম্যানেজার হলো, আমাকে একদিন কাফেতে দেখে বললো ‘কী করি বলতো? একটু বুদ্ধি দাও, ম্যানেজার হয়ে সব টেকনিক্যাল জিনিস ভুলে যাচ্ছি।’
তখন আমার একবারও মনে হয় নাই যে ও আর এখন আমাদের বাড়ি বাড়ি এসে ফেসিয়াল করবে না। এই মেয়ে জীবন কী, জীবনের পারপাস কী সেটা নিয়ে ভাবে, আমাদের প্রতিদিনের এই ইঁদুর দৌড় জীবনের বাইরেও জীবনটাকে আরও বড় করে ভাবে।

এক কথায় আমি মুগ্ধ।

এর মধ্যে ওর একটা মেয়ে হলো। বিয়ের বেশ অনেক বছর পরে। মেয়েটার বয়স যখন দুই বা তিন মাস, ও তখন মেয়েটাকে ওর মায়ের সাথে ইন্ডিয়া পাঠিয়ে দিল। এবং নিজের স্বাভাবিক জীবনে পুরোপুরি ফেরত এলো। এই প্রথম আমি একটু ধাক্কা খেলাম।
এ কেমন মা? এতো ছোট বাচ্চাকে নিজের কাছে রাখলো না, কোনো কারণ ছাড়াই? শুধু কষ্ট হবে সেজন্য! আমি চেষ্টা করি মানুষের ব্যাপারে নাক কম গলাতে, সে কারণে সরাসরি প্রশ্নটাও করা হয় নাই কখনও। বাচ্চাটা প্রায় এক বছর ছিল ওখানে। তারপর ওর একটা ছেলে হলো, তাকে সে কোথাও পাঠালো না। আমি আরও বিরক্ত এবং অবাক। ছেলে বলে স্পেশাল আদর?

কিছুদিন আগে ও আমাকে জিজ্ঞাসা করছিল, ওর মা এসেছে, আমি যেসব জায়গায় ভলান্টিয়ার করেছি, সেখানে এমন কোনো কাজ আছে কিনা যেটা ওর মা ইংরেজি ভালো না জেনেও করতে পারবে! কারণ ওর মা এখন সেবামূলক কাজ নিয়েই থাকে। শুধু বাচ্চা দেখতে বললে ওর খারাপ লাগবে।
ওকে আমি একটা আলজাইমার সেন্টারের কথা বললাম, যেখানে আমার ছেলে ভলান্টিয়ার করতো। মেয়েটি আমাকে তারপরে যা বললো, সেটা শোনার জন্য আমি একদম প্রস্তুত ছিলাম না। ওর তিন বছরের মেয়েকেও ও সেই আলজাইমারের রোগী বুড়োদের সেবায় পাঠাতে চায় ওর মায়ের সাথে।

মেয়েটির নাম ধরি দীপা। দীপার জা, ভাসুর ওর শ্বশুর-শাশুড়ির সাথে ইন্ডিয়া থাকে। জা একবার কনসিভ করলেও বাচ্চাটা শেষ পর্যন্ত আসেনি পৃথিবীতে। অন্যান্য শারীরিক জটিলতার কারণে সে আর কখনো মা হতে পারবে না। এই ঘটনায় ওর জা, ভাসুর এবং শ্বশুর-শাশুড়ি একদম ভেঙ্গে পড়ে।

দীপা তখন মনে মনে ঠিক করে ওর যদি কখনো বাচ্চা হয়, ও বাচ্চাটাকে ওদের কাছে পাঠিয়ে দেবে। সত্যি সত্যি ও তাই ওর দুই মাসের মেয়েটাকে পাঠিয়ে দিয়েছিল। নিজের বুকে পাথর বেঁধে। এই শিশুটি ওই চারজনের জীবন বদলে দিয়েছিল। বৃদ্ধরা নতুন জীবন ফিরে পেয়ে তাদের রোগ শোক অনেক কমে গিয়েছিল।

সেই থেকে ওর মনে হয়েছে বয়স্কদের সঙ্গ দেওয়ার যদি কোনো উপায় থাকে, তাহলে ও ওর বাচ্চাদেরকে নিয়ে যাবে। এই তিন বছরের মেয়েকে নিয়ে ও প্রতি শনিবারে আশপাশ পরিষ্কার করতে বের হয়। পলিথিন ব্যাগ হাতে মা, মেয়ে ময়লা কুড়ায় রাস্তাঘাট থেকে।
এছাড়া মন্দিরে গেলে পূজা শেষে ওর মেয়ে পলিথিন হাতে সবার ঝুটা খাওয়া, পানির বোতল, কাগজ এগুলাও কুড়ায়।

প্রকৃতির কাছে, মানুষের কাছে আমাদের ঋণ আছে না?

কানে ধরেছি, ভীষণ অবাক লাগলেও আর কখনো ভাববো না ‘এমন করতে পারলো?’

শেয়ার করুন:
  • 260
  •  
  •  
  •  
  •  
    260
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.