সরল চোখে মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ

সাবিরা শাওন:

সব সময় তো খারাপ খবর দিয়ে শুরু করি তাই আজ ভেবেছি ভালো খবর দিবো সবাইকে। তবে শেষ পর্যন্ত এমন সুখবরের বহর থাকবে কিনা বলা যাচ্ছে না।

২০১৭ সালে বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পুরষ্কার পাওয়া সংগঠন সিআরডিএ এর প্রতিষ্ঠাতা কে জানেন?
– মর্জিনা বেগম।
হ্যাঁ, একজন নারী। যিনি কৃষক বাবার মৃত্যুর পর কৃষিকাজে নেমে পড়েন। এরপর তিনি নারী কৃষকদের সহায়তা করার জন্য গড়ে তুলেন এই সংগঠন। এই খবর দিয়েই রবিবারের প্রথম আলো’র নারীমঞ্চে নারীর অগ্রগতির কথা বলা হয়েছে। সেখানে একজন ভারতীয় অর্থনীতিবিদ জঁ দ্রেজ আমাদের দেশের বন্দনা করেছেন। তিনি বলেছেন, সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা ও লিঙ্গ বৈষম্য দূর করতে বাংলাদেশ ভারতের থেকে এগিয়ে আছে।
নিঃসন্দেহে ভালো খবর। ভারতের চন্দ্রাভিযানের ব্যর্থতা যেমন বাঙ্গালীকে ‘পৈশাচিক আনন্দ’ দিয়েছে, তেমনি এই খবরটাও নিশ্চয়ই হাসি ফুটাবে।

এখানে বলা আছে, ২০১৩ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে শ্রমবাজারে বাংলাদেশের নারীদের অংশগ্রহণ বেড়েছে ২৬ থেকে ৩৬ শতাংশে। নারী শিক্ষার হার ও সকলের সচেতনতা এখানে অনেক বড় ভূমিকা রেখেছে বলেই ২০১১ সালের নারী শিক্ষার হার ৪৬.৭ শতাংশ থেকে ২০১৭ সালে এসে দাঁড়িয়েছে ৭০.১ শতাংশ। নিঃসন্দেহে এটা সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার পথে একটা অগ্রগতি।

এবার চলুন দেখি মুদ্রার অপর পিঠ। বরাবরই বেরসিক আমি ভালো খবরের মাঝে খারাপ খবরগুলো না দিলে আমার ভালো লাগে না৷

সৃষ্টির শুরু থেকেই যেখানে সুন্দর আর কুৎসিতের সমান্তরাল অবস্থান সেখানে একই পত্রিকার অপর পৃষ্ঠায় সুখবরের বিপরীতে কিছু লেখা থাকবে না, তাই কি হয়?

ওইদিন পত্রিকার অপর আরেক পৃষ্ঠায় ছিলো কর্মজীবী নারীদের চলাচলের দুর্ভোগের কাহিনী। পাবলিক ট্রান্সপোর্টগুলোতে তাদের হয়রানির কথা।

আমাদের দেশে বর্তমানে প্রায় ১,৮৬,৪৬০০০ জন কর্মজীবী নারী। আর এদের জন্য সরকারি ব্যবস্থাপনায় বাস আছে ২১ টি এবং বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় আছে চারটি।

এই যে, হারে রে রে করে তেড়ে আসবেন না। বলছি নির্ধারিত আসনের কথা। নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধীদের জন্য সিট রাখার কথা নয়টি। কিন্তু রাখা হয় ছয়টি অথবা চারটি। অনেক সময় তাও বেদখল হয়ে যায় নারী-পুরুষ সমতার যুক্তিতে। যুক্তির মারপ্যাঁচ কিংবা পরিস্থিতির চাপে পড়ে অগত্যা উঠে পড়তে হয় ভিড় বাসে। নাহ, বাসে দাঁড়িয়ে যেতে কোন মেয়ের-ই আপত্তি নেই যদি আপনি সভ্যভাবে নিরাপদ দূরত্বটুকু বজায় রাখেন।

ব্র্যাকের জরিপ মতে, দেশের ৯৪ শতাংশ নারী কোন না কোন ভাবে যৌন হয়রানির শিকার হন। সংখ্যাটা কম হয়ে গেলো কি??? আর এই নিত্য ভোগান্তি থেকে মুক্তি পেতে অনেকেই চাকরি ছেড়ে দিচ্ছেন বাধ্য হয়ে।

এবার একটু আতস কাঁচে চোখ রাখি।
এক বাবা তার নয় মাস বয়সী মেয়েকে হত্যা করেছেন। কেন? তিনি তার প্রত্যাশা মতো পুত্রের পিতা হতে পারেননি। পুত্র সন্তান প্রত্যাশা করতেই পারেন আপনি কিন্তু তাই বলে মেয়ে হয়ে জন্মানোর অপরাধে একটা শিশু তার জীবন দিয়ে সেই ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করবে! বিষয়টি নির্মম হয়ে গেলো না?

এতোকিছুর সাথে রোজকার নারী ও শিশু ধর্ষণ ও নির্যাতন তো আছেই। সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী এই বছরে প্রায় ৪০০+ শিশু আর ২০১৯ এর এপ্রিল পর্যন্ত ৩৯৬ জন নারী ধর্ষণ ও নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এই খবরগুলো এখন আর কিছু লাগে না। নিত্যকার বাতাসে ভেসে আসা এই দুঃসংবাদগুলো ছুঁতে পারে না আমাদের বিবেক। যার ঘরে কন্যা নেই তিনি স্বস্তিবোধ করছেন? করবেন না। আপনার পুত্র সন্তান ও কিন্তু এই জানোয়ারগুলোর হাত থেকে নিরাপদ নয়। এই নরখাদকদের শুধু একটা শরীর দরকার।

২০১৮ তে এই নির্যাতনের হার বেড়েছে ৩৪ শতাংশ। আর ২০১৯ এ এসেও এই সংখ্যাটা বেশি বৈ কম নয়।

অর্থনীতিবিদ হোসেন জিল্লুর রহমান বলেছেন, নারীর প্রতি সহিংসতা আমাদের অনেক অর্জন কেই ম্লান করে দিচ্ছে।
সুশাসনের অভাব, আইনের সঠিক প্রয়োগ ও জবাবদিহিতার অভাব এর মূল কারণ। শুধু নারী নয় এখন এই সমাজে প্রায় সবাই কোন না কোন ভাবে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে ক্ষমতাশালীদের হাতে।

অথচ পরিবর্তন হওয়ার কথা ছিলো এই অবস্থার। এগিয়ে থাকার কথা ছিলো সুন্দর একটা দেশ গড়ার স্বপ্নপূরণের প্রতিযোগিতায়।

অস্বীকার করছি না নারীর অগ্রগতির জন্য সরকারের বিভিন্ন প্রয়াস ও কার্যক্রম পদক্ষেপগুলো। তবে মোট বাজেটের ৩১ শতাংশ বরাদ্দটা সংখ্যার মাঝে আবদ্ধ না রেখে যদি এটি সঠিক খাতে ব্যয় করা হয় তাহলে হয়তো একদিন আমরা পাবো ধর্ষণ ও নির্যাতন মুক্ত একটা দেশ।

প্রবৃদ্ধি নয়, শুধু সমৃদ্ধির পথে আমরা সত্যিকার অর্থেই এগিয়ে যাবো। প্রতিটি মানুষ হয়তো সেদিন ঘর ছাড়বে প্রিয়জনকে অক্ষত ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি দিয়ে।

শেয়ার করুন:
  • 64
  •  
  •  
  •  
  •  
    64
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.