“ধর্ম ও নারীর অধিকার অর্জনের রাজনীতি”

মুহাম্মদ গোলাম সারওয়ার:

ইসলামের নবীর ব্যক্তিগত যৌন জীবনের চাইতেও কয়েকহাজার গুন জরুরি প্রশ্ন হচ্ছে ইসলামী সংস্কৃতিতে, ইসলামী সমাজগুলোতে নারীদের অধিকার এর প্রশ্নটি।

ইসলামী সমাজগুলোতে নারীর অধিকার কেমন? এই প্রশ্নটায় যদি আমি বলি ইউরোপের মুসলিম প্রধান দেশ বসনিয়া, এশিয়ার মুসলিম প্রধান দেশ বাংলাদেশ ও ইসলামের পিতৃভূমি সৌদী আরবের তুলনা করতে, আপনারা করতে পারবেন? একদম অধিকারের ক্যাটাগরি ধরে ধরে? মানে –

– ভোটাধিকার
– পারিবারিক সম্পত্তিতে উত্তরাধিকার
– চাকুরীর অধিকার
– বিবাহ ও ডিভোর্স এর অধিকার
– সন্তান নেয়া বা না নেয়ার অধিকার
– পড়াশুনা করার অধিকার
– বিজ্ঞান পড়ার অধিকার
– পুরুষের সাথে সামাজিক মেলামেশার অধিকার

তুরস্কে কামাল আতাতুর্কের সময়ের স্কুল ছাত্রীরা

এই সমস্ত বিষয়ে ধরে ধরে দেখাতে পারবেন যে বাংলাদেশ, বসনিয়া বা সৌদী আরব একই রকমের? কেননা এঁরা সবাইই তো মুসলিম প্রধান দেশ।

কোনো সন্দেহ নেই যে এই তিন দেশে নারীর অধিকার নানান ভাবেই সীমিত, পুরুষের সমান নয়। কিন্তু এই তিনটি দেশে মুসলিম নারীদের সামাজিক জীবন কি একই রকমের? উপরের এই অধিকার গুলোর প্রশ্নে? অর্থাৎ কেবল মুসলিম প্রধান বলেই কি এই তিনটি সমাজের বাস্তব প্রেক্ষিত কে “একই” বলা যাবে? নিশ্চিত ভাবেই সেটা বলা যাবেনা। নানান সীমাবদ্ধতা নিয়েও বাংলাদেশ বা বসনিয়ার নারীর জীবন সৌদী নারীর জীবনের মতো নয়।

কেনো এক নয়?

কেনো কামাল আতাতুর্কের তুরস্ক মুসলিম প্রধান হয়েও সেক্যুলার দেশ হয়, কেনো কমিউনিস্ট পোল্যান্ড কমিউনিজমের পতনের পরপরই একটা গোঁড়া ক্যাথলিক দেশে পরিণত হয়?

কেনো?
আসেন নাস্তিকতার চর্চা যারা করেন, আসেন উত্তর খুঁজি।

একটি সমাজে ধর্ম কীভাবে আবির্ভূত হবে, কতটা শক্তি নিয়ে আবির্ভূত হবে এটা নির্ধারণ করে রাজনীতি। বা আরও নির্দিষ্ট করে বললে বলা চলে সংখ্যাগরিষ্ঠের রাজনীতি, যা ক্ষমতা কাঠামোর ভাগীদার হয়। সেজন্যেই সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুর দেশ নেপাল সেকুলার হয়ে ওঠে আর সেকুলার ভারত সেকুলার থেকে “হিন্দু ভারত” হয়ে ওঠে। কেননা নেপালে যারা রাষ্ট্র ক্ষমতায়, তাঁরা রাষ্ট্রকে ধর্ম থেকে বিযুক্ত করার বিষয়ে একমত হয়েছেন আবার ভারতে যারা রাষ্ট্র ক্ষমতায় তাঁরা ক্রমশই বিশ্বাসী হয়ে উঠছেন যে ভারত মানেই “হিন্দুত্ব”।

এজন্যেই মোসাদ্দেগ এর ইরানের সংখ্যা গরিষ্ঠ নাগরিক মুসলিম হয়েও উদার জীবন যাপন করে আর খোমেনির আমলে সেই একই জনগোষ্ঠী বোরকার নীচে চলে যায়? কেনো? এখানে তফাৎটা কি মোসাদ্দেগ আর খোমেনীতে? কেননা জনগণ তো মোসাদ্দেগের আমলেও মুসলিম ছিলেন, খোমেনীর আমলেও মুসলিম ছিলেন। তাহলে তফাৎটা হচ্ছে রাজনৈতিক ক্ষমতায় কে থাকছেন তার উপরে। সোস্যালিস্ট মোসাদ্দেগ আর ইসলামিস্ট খোমেনী একই জনগণ নিয়ে রাষ্ট্র গঠন করেন, কিন্তু তাঁর ফলাফল ভিন্ন হয়, কেনো?
এই কেনোর উত্তর হচ্ছে রাজনীতি। যদি একটি সেকুলার আধুনিক সমাজ চান, তাহলে কি রাজনৈতিক পরিবর্তন দরকার? নাকি ফেইসবুকে মুহাম্মদের দাসী সহবতের সংখ্যা গণনা বেশি জরুরি?

রাজনীতিই নির্ধারণ করে দেয় ধর্ম কখন ফণা তুলবে, আর কখন বশংবদ হয়ে চাঁদা তুলে দিন কাটিয়ে দেবে।

পৃথিবীর সকল দেশে নারীর অধিকারের সংগ্রাম নানান ভাবে চলছে। ইসলামী সমাজে নারীর অধিকারের সংগ্রাম সবচাইতে প্রকট ও কঠিন। এই সংগ্রাম কোনো “প্যাকেজ” নয় যে একদিন সকালে পুরো “প্যাকেজ”টা ডিএইচএল বা ফেড এক্স এর পোস্টে এসে হাজির হবে। এই সংগ্রামটা গড়ে তুলতে হবে, প্রথমত নারীদেরকেই, আর তার সাথে যুক্ত হতে হবে সকল মানবিক মানুষকে।

আজকের মানুষের সংগ্রামটা মুহাম্মদের “দাসী সহবতের” চাইতে লক্ষ গুণ বড় ও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। সেইখানে ইসলাম যদি প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকে, আসেন ব্যাখ্যা করি সেটা।

শেয়ার করুন:
  • 60
  •  
  •  
  •  
  •  
    60
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.