জীবন সুন্দর, সুন্দর এই বেঁচে থাকা

শাহরিয়া দিনা:

জীবনে কখনও না কখনও এমন একটা সময় আসে যখন মনে হয় মরে গেলেই বরং বেঁচে যাই। আত্মহত্যা যদি সহজ কোনো জিনিস হতো, যদি ধর্মীয় বিধিনিষেধ না থাকতো, যদি মরে আবার জীবিত হবার চান্স থাকতো অর্থাৎ এতোগুলো ‘যদি’র সমন্বয় হতো, তবে এই জীবনেই সবাই দুই/একবার আত্মহত্যা করে ফেলতো।

মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি হচ্ছে বেঁচে থাকার প্রবণতা। অসহনীয় যন্ত্রণা বা জটিল পরিস্থিতির মধ্যেও আমরা বেঁচে থাকতে চাই। আত্মহত্যা সাহসিকতা নাকি ভীরুতা সেই তর্কে যাবো না, শুধু একটা কথাই এক্ষেত্রে প্রযোজ্য – শখ করে কেউ নিজেকে শেষ করে দেবার সিদ্ধান্ত নেয় না।

অনেকেই হয়তো ভাবেন জীবনে খুব সাধারণ অথবা ব্যর্থরাই আত্মহত্যা করে। তাহলে বিশ্ববিখ্যাত সফলদের দিকে একটু দৃষ্টি দেয়া যাক।

লাখো কোটি ভক্তকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে জনপ্রিয় ব্যান্ড দল লিনকিন পার্কের প্রধান গায়ক চেস্টার বেনিংটন আত্মহত্যা করেছিলেন।

হলিউডের বিখ্যাত অভিনেতা রবিন উইলিয়ামস। ১৯৯৮ সালে অস্কার জিতেছিলেন ‘গুড উইল হান্টিং’ সিনেমার জন্যে। অসম্ভব স্বতঃস্ফূর্ত একজন অভিনেতা ছিলেন। দুর্দান্ত মেধাবী এবং হাসোজ্জল মুখ দেখে আপাতদৃষ্টিতে তাকে সুখী মানুষই মনে হতো। নোবেলজয়ী লেখক আর্নেস্ট হেমিংওয়ে, কাওয়াতাবারাও আত্মহত্যা করেন, ভ্যানগগ অসামান্য সব ছবি এঁকেও বুকের রক্তের লাল রংয়ে ভাসিয়ে দিয়েছেন মাটির ক্যানভাস।

এতো সফল মানুষের কীসের অভাব ছিলো? আত্মহত্যার বেশকিছু আগে রবিন উইলিয়ামস বলেছিলেন, “আমি একাকিত্বকে ভয় পাই, তারচেয়ে বেশি ভয় পাই সেইসব মানুষকে যারা আমাকে একাকিত্ব অনুভব করায়”। এই একাকিত্ব এমন এক দুরারোগ্য অসুখ যা শেষ করে দেয় জীবনকে।

সফল, ঝলমলে স্পট লাইটের আলোতে থাকা মানুষটাও দিনশেষে প্রদীপের নিচের অন্ধকারের মতো একা। হাজার জনতার মাঝে থেকেও নির্জন অনুভব করার অসুখে যাকে পেয়েছে তার আর অন্য কোনো মরণব্যাধির প্রয়োজন নেই। তবে ইন্টারেস্টিং ব্যাপার এটাই, এই একাকিত্বকে যে জয় করে ফেলে, একাকিত্বকেই একান্ত সঙ্গী বানিয়ে নিতে পারে, তাকে মৃত্যুও ভয় দেখাতে পারে না।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, সারা বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় আট লাখ মানুষ, অর্থাৎ প্রতি সেকেন্ডে ৪০ জন আত্মহত্যা করে। এই তো গত ১০ সেপ্টেম্বর পালিত হলো বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস।
দেখা গেছে, আত্মহত্যার সময় অধিকাংশ মানুষই কোন না কোন মানসিক সমস্যার ভেতর দিয়ে যায়। এর মধ্যে ত্রুটিপূর্ণ ব্যক্তিত্ব, বিষণ্নতা, মাদকাসক্তি ও অন্যান্য জটিল মানসিক রোগ।
সম্পর্কে জটিলতা, ব্যর্থতা (প্রেমে প্রত্যাখ্যাত, বিচ্ছেদ, পরীক্ষায় ফল বিপর্যয়, আকস্মিকভাবে সামাজিক/অর্থনৈতিক অবস্থার পরিবর্তন), কষ্টকর শারীরিক রোগ ইত্যাদি কারণে আত্মহত্যা করেন। কারণ যতো গুরতর হোক এ ধরনের আত্মধ্বংসী প্রতিক্রিয়া কখনোই সমর্থনযোগ্য স্বাভাবিক প্রক্রিয়া নয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ‘প্রিভেনটিং সুইসাইড: আ গ্লোবাল ইমপেরাটিভ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পৃথিবীর বেশির ভাগ দেশেই নারীদের তুলনায় পুরুষেরা বেশি আত্মহত্যা করে থাকে। অথচ বাংলাদেশে পুরুষের তুলনায় নারীরা বেশি আত্মহত্যা করে থাকে। আমাদের পাশের দেশ ভারতেও নারীর তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ পুরুষ আত্মহত্যা করে। আমাদের দেশে নারীদের আত্মহত্যার বেশীরভাগ কারণই পারিবারিক অশান্তি, সহিংসতা, অবহেলা, বিষন্নতা।

এদেশের সামাজিক অবস্থায় নারী সবসময় দোষারোপের শিকার। মানসিক চাপ সামলানোর মতো মানসিক পরিপক্কতা যেমন নেই, তেমনি নেই নিজের একান্ত কথাগুলো শেয়ার করার বা মানসিক সাপোর্ট পাবার একটা জায়গা। বাবা-মা অত বন্ধুবৎসল নয়, বিয়ের পরে একটা বয়সে এসে ভাই-বোনের সাথেও দূরত্ব তৈরি হয়। ব্যস্ততার কারণে বন্ধু-বান্ধবদের সাথে মেশার অতটা সময়ও থাকে না।

এছাড়া প্রতিবেশী বা বাচ্চাদের স্কুলে ভাবী সার্কেল কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ায় সবার সাথে সুখী চেহারার হাসিমুখ দেখানোটাই হয় শুধু। কে কার বেদনা শুনে! যার সামাজিক অবস্থান ভালো তার সাথে মেশার জন্য সবাই উদগ্রীব। সে-ও ইনজয় করে ব্যাপারটা। কিন্তু দিনশেষে দেখা যায় তার-ও ব্যক্তিজীবনে চরম দুঃখের অপমানের এমন অনেক ঘটনা থাকে যা মনে পড়লে চোখে জল আসে অথচ তার বিপরীতে এমন একটা স্মৃতি খুঁজে পাওয়া যায় না যা তার একজীবনে হাসি মুখের কারণ হয়, আত্মতৃপ্তি দেয়।

জীবনের কঠিন সময়কে দৃঢ়তার সাথে মোকাবেলা করাই মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ। অথচ আমাদের সিলেবাসে থাকে না দৃঢ় ব্যক্তিত্ব গঠনের পূর্ণ প্রক্রিয়া। আমরা দেখে শিখি, ঠেকে শিখি। আত্মীয়, পরিবার, ববন্ধু-স্বজন সবাইকে একে অন্যের পাশে থাকতে হয়। অথচ আমরা প্রয়োজনেই প্রিয়জন ভাবি, প্রয়োজন শেষ তো তোমাকে মনে নেই!

থাকতে হয় একটা মনের আশ্রয়। যেখানে সব থেকে গোপনতম কথাটিও বলা যাবে নির্দ্বিধায়, নিজের অস্তিত্বের মতোই আস্থা রাখা যাবে – দুনিয়ায় যত কিছু হোক সে আমাকে ছেড়ে যাবেনা কখনো। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে তেমন কাউকে পাওয়া এতো সহজ নয়। নিজ ভুবনে একাকি এই মানুষগুলো এক সময় নিজেকে শেষ করার বিধ্বংসী পথে পা বাড়ায়।

আত্মহত্যা নিয়ে কিছু ভুল ধারণা প্রচলিত আছে। যেমন অনেকেই মনে করেন যে মুখে আত্মহত্যার কথা বলে সে করে না, যে করে সে কাউকে বুঝতেও দেয় না। অথচ গবেষণায় দেখা গেছে, যারা আত্মহত্যা করে তারা প্রত্যেকেই সরাসরি বা ঘুরিয়ে -ফিরিয়ে ইচ্ছেটা জানান দিয়েছিলেন কাছের মানুষদের কাছে। হয়তো অবচেতন মনেই তিনি মানসিক সাপোর্ট চান, শুনতে চান বেঁচে থাকার মতো অনুপ্রেরণার কথা।

অনেকেই ফেইসবুকে পোস্ট দিয়ে আত্মহত্যা করেন বা চেষ্টা চালান। কেউ কেউ তাদের নিয়ে হাসিঠাট্টা করেন, যদি মরেই যাবে তবে কেন মানুষকে জানান দেয়া? কিন্তু কী জানেন, এই জানান দেয়াই তার জীবনের প্রতি ভালোবাসা। এই জানান দেয়াই পৃথিবীর প্রতি তার অভিমানের প্রকাশ, সব অবহেলার প্রতিবাদ!

তবে এটা সম্পূর্ণ ভুল প্রতিবাদের ভাষা। আপনি বেঁচে থাকতেই যাদের কিছু আসে-যায়নি, মৃত্যুর পর তারা আপনার গুরুত্ব বুঝবে সেটা কোনদিনও হয় না। এই পৃথিবী যেমন এক মুহূর্ত থেমে থাকে না কারো অনুপস্থিতিতে, ঠিক তেমনি অন্যদের জীবনও আপনিবিহীন কেটে যায় জীবনের নিয়মে।

তবু কেন নিজেকে শেষ করে দেয়া! বরং বেঁচে থাকার প্রতিটা মুহূর্ত সপ্রতিভ উপস্থিতিতে জানিয়ে দেবার ‘আমি আছি’। এমনিতেই তো জীবনের সময় অল্প! একটা মানুষের তখনই মৃত্যু হয় যখন মানুষ স্বপ্ন দেখতে ভুলে যায় বা স্বপ্ন দেখাটা থামিয়ে দেয়।

একাকিত্বকে উপভোগ্য সঙ্গী বানিয়ে নেয়াটা বিষে বিষক্ষয়ের মতো ব্যাপার। একাকিত্বকে পাশে বসিয়ে মনছবি আঁকা, তাকে চোখ রাঙিয়ে সৃজনশীল হওয়া, সর্বোপরি তার চোখে চোখ রেখে জানিয়ে দেয়া আত্মহত্যা সমস্যার সমাধান নয়, বরং আত্মহত্যা সমস্যার।

হুমায়ূন আহমেদ লিখেছিলেন- “যাদের জন্য আমরা অপেক্ষা করি তারা কেউ আসে না, আর যাদের জন্য অপেক্ষা করি না তারাই ফিরে ফিরে আসে”! একাকিত্ব সেই অপেক্ষার মতো একা! একাকিত্ব সেই অপেক্ষার স্বপ্নের মতো সুন্দর। সাতশো কোটি মানুষের এই গ্রহে কেউ একজন কোথাও না কোথাও আছে আমার জন্য। একদিন আসবে সেই হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা। যার সুর ভাসিয়ে নিবে আমার কষ্টগুলো।
যে স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখতে পারে জীবন, সেই স্বপ্ন যদি অপূর্ণও থাকে আজীবন, তো ক্ষতি কী! এক জীবনের অনেক অপূর্ণতা নিয়েই তো এই বেঁচে থাকা। সময়ের স্বল্পতার এই জীবনে কোন মানুষ নিজেই তো সম্পূর্ণ না। যত বিপদের ঝড়-ঝঞ্ঝা আসুক কখনোই স্বপ্ন দেখা বন্ধ করতে নেই।

রুদ্রের ভাষায়- “জানি চরম সত্যের কাছে নত হতে হয় সবাইকে-
জীবন সুন্দর
আকাশ-বাতাস পাহাড়-সমুদ্র
সবুজ বনানী ঘেরা প্রকৃতি সুন্দর
আর সবচেয়ে সুন্দর এই বেঁচে থাকা
তবুও কি আজীবন বেঁচে থাকা যায়!

শেয়ার করুন:
  • 1K
  •  
  •  
  •  
  •  
    1K
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.