রামেরা সবসময়ই ভালো, সীতারাই আসলে দোষী!

ফারজানা আকসা জহুরা:

জ্বি, সবার দেবতা রাম খুব ভালো ছেলে, চরিত্রবান। তার মতো ভালো পুরুষ কি আর এই জগতে আছে? অথচ দেখুন দেবতা রামের স্ত্রী সীতাকে কিন্তু আত্মহত্যা করতে হয়েছিল! না মানে আত্মাহুতি দিতে হয়েছিল আর কী!
বাধ্য হয়েই সীতাকে বলতে হয়েছিল, “হে ধরণী! তুমি দ্বিধা হও!” আর তার এই ডাকে সাড়া দিয়ে মা জগদ্ধাত্রী উপস্থিত হোন এবং সীতাকে নিয়ে পাতালে প্রবেশ করেন।

তা আপনারা জানেন, সীতাকে কেন এই আত্মাহুতি দিতে হয়েছিল?

জ্বি, ঠিক ধরেছেন সীতার মাথায় সমস্যা ছিল। ঘোরতর সেই সমস্যা। তা না হলে কি কেউ সামান্য পরীক্ষার ভয়ে আত্মাহুতি দেয়? কতোটা অভিমান ছিল সেই আত্মাহুতিতে, আমরা কি তা পড়ি কোথাও? বিশ্লেষণ করি? না করি না। নারীর আবার অভিমান কী!

সবার দেবতা, সাধু চরিত্রবান রাম, তিনি তো কখনোই সীতাকে বিশ্বাস করতে পারেন নাই। বার বার সীতার সতীত্বের পরীক্ষা নিয়েছিলেন। তবুও কি সন্তুষ্ট হতে পেরেছিলেন?

ওদিকে রামের জন্য পাগল সীতা, স্বামীর অসম্মান হোক তা চান নাই। আবার অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদও করতে পারেন নাই। কেউ তো তার কথা বিশ্বাস করবে না। যেখানে স্বয়ং দেবতা সমতুল্য স্বামী রামই তাকে বিশ্বাস করেন নাই, সেখানে অন্যের কাছে কি তিনি সাহয্যের আশা করতে পারেন?

জ্বি, আপনাদের দেবতা রাম, জনগণের সন্তুষ্টি সাধনের জন্য তার গর্ভবতী স্ত্রী সীতাকে তপোবনে রেখে এসেছিলেন। অথচ সিংহাসন না পেয়ে বরং বনবাসের আজ্ঞা পাওয়া সেই রামের সাথে কিন্তু তার স্ত্রী সীতাও বনবাসী হয়েছিলেন। সেই ১৪ বছর রামের সাথে বনবাস কাটিয়েও সীতা রামের বিশ্বাস অর্জন করতে পারেন নাই। তিনিই একমাত্র জানতেন যে অপহরণের পর রাবণ তাকে কোনদিন কোন অসম্মান করেনি, স্পর্শ তো দূরে থাক। আর সেই কারণেই তিনি প্রথমে রাজী হয়েছিলেন অগ্নিপরীক্ষা দিতে! কিন্তু কতবার?

পরবর্তিতে আবারও তাকে তাই দুই পুত্র নিয়ে বনবাসী হয়ে থাকতে হয়েছিল। পরে যখন রাম জানতে পারেন সীতার গর্ভে লব-কুশ নামের দুই পুত্র সন্তান আছে, তখনও বিশ্বাস করেন নাই যে এই পুত্রগুলি তার নিজের!

জ্বি, আপনাদের দেবতা রাম, পুনরায় সীতাকে অগ্নিপরীক্ষা দিতে বলেন। একজন নারীর কাছে এটা যে কতোটা অসম্মানের, কেউ জানেন আপনারা?

কী আর করবে বেচারি সীতা?
স্বামীর প্রেমে অন্ধ, অভিমানী সীতা, বড্ড আবেগপ্রবণ ছিলেন।  রাগে, দুঃখে, অপমানিতা হয়ে তিনি তার মা জগদ্ধাত্রী ধরিত্রীকে আবাহন করেন এবং জগদ্ধাত্রীর সাথে পাতালপ্রবেশ করেন।

জ্বি, ঠিক ধরেছেন, এখানে তো রামের কোনো দোষ নেই। সব দোষ সীতার। তার মাথায় হাল্কা বা মোটা সমস্যা ছিল। রাম তো ভালো মানুষ। তিনি কি কোনো দোষ করেছিলেন? অথচ সীতা চাইলেই রামের বিরুদ্ধে তখন প্রতিবাদ করতে পারতেন বা তারও পরীক্ষা নিতে চাইতে পারতেন। তা তিনি করেন নাই বা করার কথা চিন্তাও করতে পারেন নাই, সতীসাধ্বী স্ত্রী বলে কথা!

জ্বি, রামের মতো পুরুষরা সবসময় ভালো মানুষ হয়েই থাকে। তাদের চরিত্রে কখনো কোনো দাগ থাকে না। তাদের কখনো অগ্নিপরীক্ষা দিতেও হয় না। এই জগৎ সংসারে যত পরীক্ষা সবই নারীদের জন্য। প্রতিটা পদে পদে তাদের অগ্নিপরীক্ষা দিতে হয়। আর তাই তো সামান্য অগ্নিপরীক্ষার ভয়ে কখনো কেউ আত্মহত্যা করে না?

জ্বি, ঠিক ধরেছেন, তাদের মাথায় সমস্যা থাকে। কখনো কখনো তাদের চরিত্রেও দোষ থাকে। তারা সব ডিপ্রেশনের রোগী। মানসিক ভারসাম্যহীন। আচ্ছা তারা কি জন্মের সময় ডিপ্রেশনে নিয়েই পয়দা হয়েছিল?
নাকি বড় হতে হতে, সমাজের খানাখন্দগুলো পেরোতে গিয়ে বা বিয়ের পরে সামাজিক চাপে, স্বামীর অবিশ্বাসের দোটানায়, ছেলেমেয়েদের নিয়ে নিত্য লড়াইয়ের চাপে তাদের মানসিক সমস্যা দেখা দেয়?

দয়া করে কেউ দেবতা সমতুল্য রামদের খারাপ কথা বলবেন না। আমিও কিন্তু বলছি না। সব দোষ আসলে সীতার। সীতার মাথার দোষ ছিল। বাচ্চা হওয়ায় পরে তো মেয়েদের ডিপ্রেশন বেড়ে যায়। তাই একটু বেশি আবেগপ্রবণ হয়ে তিনি আত্মহত্যা করেছিলেন। রামরা সবসময় ভালো মানুষ। দেবতা সমতুল্য। তাদের কোনো দোষ নেই। তাদের দোষ বলতে নেই। ওতে কিন্তু পাপ হয়।

প্রসঙ্গত চারদেয়ালের ভিতরে কে রাম আর কে রাবণ তা সীতা ছাড়া কে ভালো বলতে পারবে, বলুন তো?

শেয়ার করুন:
  • 687
  •  
  •  
  •  
  •  
    687
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.