বেলাশেষের সমীকরণ

0

শাহরিয়া দিনা:

দুই-একটা ব্যতিক্রম বাদে প্রাণের শুরুটা উচ্ছ্বসিত। পৃথিবীতে আমরা অস্তিত্ব জানান দেই সশব্দে। চিৎকার আর কান্নায়। শব্দ শুধু ভাব আদানপ্রদানের মাধ্যমই নয়, বেঁচে যে আছি সেটাও প্রমাণ দেয়।

শব্দ থেকে আমরা বাক্যে আসি। ধীরে ধীরে নিজের চাহিদা অন্যকে বলতে শিখি। পছন্দ-অপছন্দ, ভালো লাগা-মন্দ লাগা জানাতে পারি। আমাদের পূর্বসুরীদের শেখানো পথেই হাঁটতে শুরু করি। একটা নির্দ্দিষ্ট গণ্ডি ঠিক করে দেয়া হয়। এই তোমার ধর্ম, এই তোমার সমাজ, এদের সাথে মিশবে না, ওটা করা যাবে না ইত্যাদি। শৈশব ভাবনাহীন অবুজের পেন্সিল, যেমন ইচ্ছে তেমন আঁকা কিছু পড়াশোনার বাধ্যবাধকতা। তবুও আমরা ভাবি, কবে বড় হবো? মায়ের জুতাটা পায়ে দিয়ে দেখি, বাবার শার্টটা গায়ে দিয়ে মাপি বড় হতে এখনও কতটা বাকি!

মার্ক টোয়েনের একটা লেখা আছে অনেকটা এমন, যখন আমি ছোট ছিলাম তখন আমি স্কুলে যাবার জন্য মরে যাচ্ছিলাম। যখন স্কুলে গেলাম, আমি কলেজে যাওয়ার জন্য মারা যাচ্ছিলাম, পড়াশোনা শেষ হলো, আমি চাকরির জন্য মারা যাচ্ছিলাম, চাকরি হলো, এবার আমি বিয়ের জন্য মারা যাচ্ছিলাম, এরপরে বাচ্চা-কাচ্চার জন্য মারা যাচ্ছিলাম, বাচ্চারা বড় হলো, এবার আমি অবসরের জন্য মারা যাচ্ছিলাম, যখন সত্যি সত্যি আমি মারা যাচ্ছি তখন মনে হলো, “আসলে আমি বেঁচে ছিলাম কখন?”

অর্থনীতির ভাষায়, সম্পদ সীমিত আর মানুষের চাহিদা অসীম। ব্যক্তিজীবনে চাহিদা সীমিত হলেও সময়ের সাথে চাহিদার ধরন বদলায়। এমন একসময় থাকে, তোমাকে পেলে পৃথিবীর কিছুই চাইনা। সেই তোমাকেই পাওয়া হয়ে গেলে, পুরনো হয়ে গেলে শুনতে হয় কি দিয়েছো তুমি আমাকে? কি পেয়েছি তোমার কাছে?

যে বাবা-মা বলতেন, কিছুই চাইনা শুধু পড়ালেখা করে মানুষ হও। তারাও সুযোগ পেলে শুনিয়ে দেয়, অমুক সাহেবের ছেলে-মেয়ে পৃথিবীর কোন কোন দেশে নিয়ে চিকিৎসা করায়, ঘুরতে নেয়, টাকাপয়সা কত কি খরচ করে অথচ তাদের চাইতে আরামদায়ক ভাবে রেখেছিলাম তোমাদের। শুধু তাই না, সন্তানদের মধ্যে যার অর্থ-প্রতিপত্তি বেশী তার গ্রহনযোগ্যতা এবং আদরও বেশী।

পৃথিবীটা এখন কেমন জানি! টাকায় বেচাকেনা হয় সবকিছু। সবই লেনদেনযোগ্য। সম্পর্ক, সম্মান, ভালোবাসার মত বায়বীয় ব্যাপারগুলো টাকায় মেলেনা এখনো এটা বিশ্বাস করাটা বোকামি। তবু কিছু বোকা আছে যারা ভাবে ভালোবাসা সবচেয়ে দামী। জীবনের এই অমুল্য সম্পদ সে বিনিময় আশা না করেই দিয়ে দেয়। সাধ্যের বাইরে গিয়ে প্রিয়জনদের জন্য কিছু করলেও মনেহয় কিছুই দিতে পারিনি। হিসেবে কাঁচা বলে কি চেয়েছিলাম কি পেয়েছিলাম নিয়ে ভাবতে বসেনা। তারচেয়ে কতটুকু করতে পারি ভাবনায় থাকে। তবে দিনশেষে হিসেব মেলানোর স্বার্থপর পৃথিবী জানিয়ে দেয় যা তুমি অমুল্য মনে করেছে তা আসলে মূল্যহীন। তুমি বিনিময় চাওনি অথচ বিনিময়ে পেয়ে যাবে অপমান। সাথে বোনাস হিসেবে অবহেলা তো আছেই।

বিজ্ঞাপনও বলে আজকাল একটু চালাক নাহলে টেকা যায়না। আসলেই তাই। একটু চালাকি একটু অভিনয় দিয়ে দেয় অনেকখানি সুখ আর স্বাচ্ছন্দ। ছলে-বলে নিজের জন্য সেরাটা আদায় করে নেয়ারাই জিতে যায় দিনশেষে। আবেগের ফলেই উদ্ভাবন হয়েছে সভ্যতাকে এগিয়ে নেবার সব বড় বড় আবিস্কার তবুও মানুষ বলে, আবেগে জীবন চলেনা। তাইতো আবেগ হেরে যায় যুক্তির কাছে চিরকাল।

মেয়েরা তুলনামূলক আবেগপ্রবণ। এরা একরাশ মুগ্ধতা চোখে নিয়ে একবেলা না খেয়ে কাটিয়ে দিতে পারে। তাকে বিস্মিত করার চেষ্টা দেখে ছেঁড়া কাপড়টাও রিপু করে পরতে জানে। মনের মানুষ পাশে থাকলে তাজমহল দেখিনি বলে আফসোস হয় না। তারা জানে তাজমহল মৃতের কবর মাত্র। যেখানে মমতাজ ছাড়াও রয়েছে আরো অনেকের কবর। যে মমতাজ মারা গেলেন চৌদ্দতম সন্তানের জন্ম দিতে গিয়ে, আবার মমতাজের বোনকেই বিয়ে করলেন সম্রাট। সুতরাং প্রেমকে প্রাসাদবন্দী না করে সাদামাটা ঘরটাতেই প্রসাদ বানানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে।

তুলনামূলক যুক্তিবাদী পুরুষ হিসেবনিকেশে দক্ষ হয়। কয়েকটা বাড়ির মালিকের মেয়ে হলে সেটাই তাদের বিয়ের যোগ্যতা বলে বিবেচিত। মুখে বলেন বিয়েতে যৌতুক নিইনি, কিন্তু শ্বশুরের সম্পদের হিসেবটা গর্বভরে শুনিয়ে আত্মতৃপ্তি পান।

তো এই লেনদেনের পৃথিবীতে বেলাশেষের গোধুলিতে অনেকেই নিজেকে আবিষ্কার করেন সহায়সম্বলহীন একাকি। আসলে খুব অল্প সময়ের জীবনে মানুষ আসেও একা, চলেও যায় একা। মাঝখানে মায়াই বাঁধন, কর্তব্য সেই বন্ধনের ফলাফল। দায়িত্ব আর কর্তব্যে ফুসরত মেলে না নিজেকে সময় দেবার। জীবনকে উপভোগ করার। যখন সময় মেলে থাকে না সেই শারীরিক সামর্থ্য, থাকে না মনের ইচ্ছের জোর, থাকে বুকের কাছে একদলা আফসোস।

সরব দুনিয়ায় শব্দ-বাক্যরা শক্তিশালী। কথায় আঘাত লাগে, কথায় প্রশান্তি আনে। বেঁচে থাকা একটা সময় মন খুলেই বলি ভালোবাসি, শুধু কর্তব্যের খাতিরে নয়, মমতায় পাশে থাকি।

দিনশেষে আমরা প্রত্যেকে একাই। পৃথিবীর সবচাইতে খারাপ অনুভূতি হলো নিজেকেও ভালো না লাগা। নিজেকে যখন অসহ্য লাগে মানুষ তখন বেঁচে থাকার ইচ্ছে হারায়। মৃতের জন্য কান্নাকাটির অনেককেই পাওয়া যায়, শুধু বেঁচে থাকা অবস্থায় একটা মমতামাখা হাতের স্পর্শ, কান্নার জন্য এগিয়ে দেয়া একটা কাঁধ, নির্ভরতার মাথা রাখার মতো একটা বুক পাওয়া যায় না। তাই ক্ষণিকের এই সময়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিজেকে ভালোবাসি। নিজেকে ভালোবাসতে না পারলে অন্যকে ভালবাসবো কী করে!

শেয়ার করুন:
  • 1.9K
  •  
  •  
  •  
  •  
    1.9K
    Shares

লেখাটি ৪,১৫৩ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.