‘আমার হৃদয়ে অশ্রুপাতের বয়স এক বছর’

0

ফাতিমা জাহান:

কেয়ারটেকার কাকা আমাকে এসে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আম্মু, ভাইকে গোসল করানোর পানি কোন বালতিতে নিয়ে যাবো?’
আমি স্থির আছি, আশ্চর্যজনকভাবে মাথাও কাজ করছে। ভালো একটা বালতি দিলাম। গোসলের পানি কতখানি গরম তাও হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখলাম। নতুন একটা সাবান মোড়ক খুলে দিলাম। বাবা এখন তার প্রিয় জামরুল গাছের নিচে শুয়ে আছে।

বর্ষাকালে জামরুল গাছে থোকায় থোকায় জামরুল ধরে, বিশাল একেকটার সাইজ। পাড়ায় বিলিয়ে শেষ করা যায় না। কীসব ভাবছি আমি! কাকাকে বললাম,
‘চলেন কাকা, বাবাকে গোসল করিয়ে আসি।’
‘আপনাকে তো যেতে দিবে না মা।’
‘কেন দেবে না? গত একবছর ধরে তো আমিই গোসল করাচ্ছি। আমার চেয়ে ভালো কে জানবে কীভাবে গোসল করাতে হয়!’
‘নিয়ম নাই মা। আমি যাই ভাইকে নিয়ে।’
তাকিয়ে তাকিয়ে আমি দেখি।
‘কী অদ্ভুত সব নিয়মকানুন। বাবার গায়ে বেশি জোরে ঘষা দিতে মানা করবেন। ব্যথা পাবে। আস্তে আস্তে পানি ঢালতে বলবেন। খুব কিন্তু রাগ। রাগ করলে পড়ে গিয়ে ব্যথা পাবে। খেয়াল রাখবেন কাকা।’
কাকার চোখ দিয়ে জল ঝরছে।
আমার হৃদয়ে অশ্রুপাতের বয়স এক বছর।

ফাতিমা জাহান

বাবা চলে গেল গোসল করতে অন্য মানুষের হাতে। যে আমাকে ছাড়া কাউকে কাছে আসতে দিতো না অসুস্থতার সময়, কারো কথা বুঝতো না, কারো হাতে খেতো না, একা ঘুমাতো না, তার সব কাজ এখন অন্য মানুষ করে দেবে।
গোসল করিয়ে আনার পর বাবাকে শুইয়ে দেয়া হলো বাবার অতি প্রিয় আম গাছের ছায়ায়।

কী যে সুন্দর লাগছিল আমার বাবাকে! একটু হাসছিলোও যেন! শুধু মাথা অবধি সাদা কাপড় ঢাকা দেয়াটা আমার পছন্দ হয়নি। আম গাছটায় বাবা চলে যাবার পর মুকুল ধরেনি। আমও হয়নি, আশ্চর্যের ব্যাপার। বাবার সাথে সাথে তারাও অভিমান করেছে, চলে গেছে।

গত এক বছর যারা কেউ আসেনি আজকে তারা বাবাকে নিয়ে খুব ব্যস্ত। আমি তাকিয়ে তাকিয়ে দেখি। বাড়িতে আজ তেমন কান্নাকাটির রোল ওঠেনি। একদিক দিয়ে ভালোই হয়েছে। যারা এতোকাল আসেনি এখন হৈচৈ করলে আমার ভালো লাগতো না।
কাঁদলে কি কেউ ফিরে আসে!
আমাকে কে যেন বললো, যাও দেখা করে এসো।

বাবার কাছে গেলাম। ঘুমন্ত বাবার গায়ে কখনো স্পর্শ করিনি। সবসময় যেমন মাথায় গালে হাত বুলিয়ে আদর করে দিতাম তেমনি দিলাম, বুঝতে পেলেন কিনা জানি না। বাবার ঘুম খুব পাতলা। ভেঙে যেতে পারে। একদম স্বাভাবিকভাবে ঘুমাচ্ছেন। আমি খুব নিচু স্বরে বললাম, ‘ক্ষমা করে দিয়েন বাবা, ক্ষমা করে দিয়েন।’

উঠোন ভরে গিয়েছে মানুষে। এতো মানুষ কখনোই আমার পছন্দ নয়। বাবার সাথে অনেক কথা ছিল। বেশির ভাগই হিসাবনিকাশের। অসুস্থ হবার পর এক পৃথিবী দায়িত্ব আমার কাঁধে করে এসে পড়লো, ঠিকমতো করতে পেরেছি কিনা না জেনে গেলে কেমন করে হয়! সবসময়ই তো বলতেন,’তুই ছোটো মানুষ, তুই কী বুঝবি।’ আমি হুট করে বড় হয়ে গিয়েছি বাবা।

বাবাকে আর একটু দেখতাম! তার আগেই তারা আমার বাবাকে নিয়ে গেল। গত এক বছর বাবা ছিল আমার কাছে, আমার মতোন করে। এখন বাবা সবার। ডিমেনশিয়ার পর শিশুর মতো হয়ে গিয়েছিল। কিছুক্ষণ না দেখলে মা, মা, বলে ডাকতেন।
এখন আমার কাছ থেকে নিয়ে কোন অচেনা জায়গায় রেখে আসবে তারা! গত একবছর কাছ ছাড়া করিনি, বাবা একা কীভাবে থাকবে!
আমার ঘর খালি হয়ে গেল সন্ধ্যের মধ্যে। খালি ঘরে নিঃশ্বাস নেয়া যায় না।

বাবার কি এখন ঠাণ্ডা লাগছে? লাগারই কথা, মাটির নিচে ঘর, আমার সেখানে যাবার উপায় নেই।

বাড়িতে এখনো এক বছর ধরে বাবার খাবার প্লেট গ্লাস আগের মতো রাখা আছে। ওষুধের বাক্স, বাবার গায়ে মাখার লোশন, সাবান, শ্যাম্পু সব। আলমারি ভর্তি তাঁর জামাকাপড়, লাইব্রেরি ঘরে আড়াই হাজারের বেশি বই। মাঝে মাঝে খুলে স্পর্শ করে দেখি। বিছানায় চাদর, বালিশ আগের মতোই সাজানো আছে। আমি তাঁর বিছানায় এরপর কখনোই বসিনি। ঘরটা পরিস্কার করিয়ে রাখি। ফিরে এসে অপরিচ্ছন্ন ঘর দেখলে খুব রাগ করবেন।
একটা ছায়া ছিল তা মিলিয়ে গেছে মাথার ওপর থেকে। এখন রোদ, জল, বিদ্যুৎ সব সরাসরি মাথায় এসে আঘাত হানে।

বাবা সুস্থ থাকতে খুব বেশি হলে বছরে কয়েক ঘন্টার জন্য দেখা হতো। মতের মিল কোন দিনও ছিলো না। কথা হতো কালে ভদ্রে, যার শুরু এবং শেষ হতো ঝগড়া দিয়ে। রাগ বা ঝগড়া করার জন্য যে কারো থাকা প্রয়োজন তাও বুঝিনি।
দোর্দণ্ড প্রতাপশালী, রাগী, জেদী মানুষ ছিলেন। সন্তানের জন্য ভালোবাসা প্রকাশ করতেন না। আমিও ভাবতাম তিনি ভালো বাসেনই না। এইসব অভিমানে অপচয় হয়েছে আমাদের সময়। কারও থাকা, আর না থাকার মধ্যে যে এতো বিশাল খাদ তৈরি হতে পারে তা ভাবিনি।
ফিরে যদি আসেন তবে অবশ্যই জানাবো যে আমি তাঁকে সবচেয়ে বেশি সময় দিয়েছি, তাঁকে অনেক ভালোবাসি আর গত এক বছরে আমার ক্ষত গভীর থেকে গভীরতর হয়েছে।

সেপ্টেম্বর ১০, বুকের ভেতর কয়েক হাজার তীর বেঁধে।

শেয়ার করুন:
  • 54
  •  
  •  
  •  
  •  
    54
    Shares

লেখাটি ২৭৬ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.