লেডিস লেডিস খেলা

0

আহমেদ মুশফিকা নাজনীন:

বগুড়ার এক স্বনামধন্য স্কুল। দুপুর ১২টা। বাজে ছুটির ঘণ্টা। ক্লাস সেভেনের ছেলেমেয়েরা সব হৈ হুল্লোড় করে বেরোয় ক্লাস রুম থেকে। একসাথে বেরিয়ে যেতে গিয়ে হঠাৎ এক ছাত্রীর সাথে একটু ধাক্কা লাগে এক ছাত্রের। ব্যস সেই ছাত্রের বন্ধুরা চিৎকার করে ওঠে। তুই লেডিস, তুই লেডিস। রেগে যেয়ে সেই ছেলে, তখন দৌড় দেয় বন্ধুদের ধরতে। বন্ধুরা ততক্ষণে ভোঁ দৌড়। ওকে কেউ ছুঁতে দিবে না। কারণ ওই বন্ধু এখন যাকে ছুঁয়ে দিবে সে তখন লেডিস হয়ে যাবে। সে আবার যাকে ছুঁয়ে দেবে সেও তখন হবে লেডিস। তবে ইউনিফর্মের টাই ধরে থাকলে সে লেডিস হবে না।

সুপ্রিয় পাঠক, এটা একটা খেলা। এ খেলার নাম লেডিস লেডিস খেলা। কবে কোথা থেকে এ খেলা এ স্কুলে শুরু হয়েছে শিশু কিশোররা জানে না। তারা বলে ছোটবেলা থেকেই এ খেলা দেখে ও খেলে আসছে।
তবে এ খেলা খেলে শুধু ছেলেরা। তারা বলে এ খেলা খেলে ওরা খুব মজা পায়। কারণ ওই বন্ধুকে যত লেডিস বলে রাগানো যায়, খেলার আনন্দ তত বেড়ে যায়।
কেন ও রেগে যায়? জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ছাত্র জানায়, লেডিস হওয়া লজ্জার। তাই খেলায় কেউ লেডিস হতে চায় না। রেগে যায়। অপমান বোধ করে।

ওর কথা শুনে আর ওদের এই লেডিস লেডিস খেলার গল্প শুনে হতবাক হয়ে গেলাম। কষ্টও পেলাম ভীষণ। কী খেলা খেলছে, কী খেলা শিখছে এই শিশু কিশোররা!

ভাবতে লাগলাম ছোটবেলা থেকেই নারীদের প্রতি কী পরিমাণ অশ্রদ্ধা নিয়ে বড় হচ্ছে ওরা! মেয়ে হওয়া লজ্জার। মেয়ে হওয়া ভালো না। মেয়েদেরকে হেয় করতে হবে। তাদের ছোট করে দেখতে হবে এ বোধগুলো ওদের শিশু কিশোর মনের ভেতর কেন জাগলো? কে জাগালো?
ওদের তো এখন কতো কিছু শেখার বয়স। জানার বয়স। নতুন চোখে নতুন পৃথিবীতে দেখার বয়স। আবিষ্কারের বয়স। মানুষকে শ্রদ্ধা ও সম্মান করা বয়স। অথচ সেই নতুন সময়ে সেই চোখে কী দেখছে ওরা! এ ভয়ংকর ভাবনাগুলো ওদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছে! এর জন্য দায়ী কে? পরিবার? স্কুল? সমাজ নাকি রাষ্ট্র?

পরিবার থেকেই শিশুদের প্রথম আচরণ শেখা শুরু হয়। পরিবারেই শিশুরা দেখে মায়ের প্রতি বাবার আচরণ। অথবা বাবার প্রতি মায়ের আচরণ। দু:খজনক হলেও সত্যি আমাদের দেশের বেশিরভাগ পরিবারেই মাকে অবজ্ঞার চোখে দেখা হয়। তার মতামতের কোনো মূল্য দেয়া হয় না। দেয়া হয় না সম্মান। ফলে ছোট বয়সেই শিশুরা বুঝে যায় সংসারে মার মূল্য কম। মা অসহ্য়, মা দুর্বল। তারা বুঝে নেয় সংসারে বাবাদের মূল্য বেশি। তাই বাবাদের দাপটও বেশি। তার শিশুমনে অবচেতনেই তখন যেন গেঁথে যায় নারীদের অবজ্ঞা করার ধারণাটি।

অনেক পরিবারেই মা বা স্ত্রীকে মারধোর করা হয়। এসব দেখে শিশুটি ভাবে মেয়েদের সাথে এমন ব্যবহারই করতে হয়। তাই যখন সে স্কুল কলেজ, কর্মক্ষেত্র বা পরে তার বিবাহিত জীবনে যায় সেখানে সে তার স্ত্রী বা মেয়ের সাথেও্ এমন ব্যবহারই করে।
কারণ সে এটাই শিখেছে। সে কখনো দেখেনি, কেউ তার বাবাকে শাসন করে নিষেধ করে বলছে স্ত্রীর সাথে বা মার সাথে এ ধরনের ব্যবহার করা উচিত না। শোভন না।

আমার এক এক আত্মীয়কে দেখেছি সারা জীবন তাকে স্বামীর পা টিপে দিতে। পা টিপে দেয়ার পর স্বামী যখন মধ্যরাতে ঘুমিয়ে পড়তেন, তখন সেই আত্মীয় ঘুমাতে যেতেন। গ্রীষ্ম বর্ষা শরত হেমন্ত শীত কোনেদিন বাদ যায়নি সেই পা টেপা। সময় যায়। একসময় সেই আত্মীয়ের ছেলে বিয়ে করে। সেও তার বউকে বলে পা টিপে দিতে। মেয়েটি অস্বীকৃতি জানালে সংসারে শুরু হয় অশান্তি।

ছেলের অভিযোগ, তার বউ কেন পা টিপে দিবে না! তার মা’তো সারাজীবন এ কাজ করেছে। আর মেয়েটির কথা, স্বামী অসুস্থ হলে প্রয়োজনে করা যায়, কিন্তু অনর্থক এ কাজ প্রতিদিন করা সম্ভব না। তাদের দুজনের কথা শুনে সেই ছেলেকে প্রশ্ন করেছিলাম, বছরের পর বছর তোমার মা যে বাবার পা টিপে দিতো, তা কি তোমার কাছে শোভন মনে হতো? কখনো কি তোমরা সন্তানরা জানতে চেয়েছো প্রতিদিন এ কাজটা করতে মার ভালো লাগতো কিনা? বা ভালবেসে মা কাজটা করছে কিনা? সে কোনো উত্তর দিতে পারেনি।

ঘরে ঘরে এমনি বহু নারীকে প্রতিনিয়ত ইচ্ছের বিরুদ্ধে অনেক কাজ করতে হয়। অনেক পরিবার আছে যেখানে এখনো ছেলেমেয়ে বিভেদ করা হয়। সংসারের নানা কাজ মেয়েকে করতে বলা হলেও ছেলেকে মুখে তুলে খাওয়ানো হয়। লেখাপড়ায় ছেলের জন্য বেশি শিক্ষক রাখা হয়। মেয়ের জন্য কম। অভিভাবকদের ভাবনায় থাকে মেয়েরা চলে যাবে পরের বাড়ি। তাই তার জন্য টাকা পয়সা খরচ করা লস প্রজেক্ট। আর ছেলেরা বাবা মাকে দেখবে। তাই তার জন্য ইনভেস্ট করতে হবে বেশি। এ বৈষম্যমূলক আচরণে ছেলেরা হয় অহংকারী। আর মেয়েরা মনে মনে মরে যায়। এ ধরনের আচরণে সেই ছোট্ট মেয়েটা যে কত কষ্ট পায় সে খোঁজ কি অভিভাবকরা কখনো রাখেন? মনে হয় না।

প্রায় সব পরিবারেই মায়েরা সারাজীবন স্যাক্রিফাইস করে জীবন পার করেন। সারা জীবন ভর মাছ-মাংস সবার জন্য রেঁধে নিজে না খেয়ে থাকেন দিনের পর দিন। মা অথবা স্ত্রীরা তো এমনই হয় এমন তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে সে সব খাবার খান স্বামী সন্তানরা। একজন স্বামী বা সন্তান কখনো জানতে চান না তার স্ত্রী বা মা তারও কখনো মাছের মাথা বা গরম ভাত খাওয়ার ইচ্ছে কোনদিন হয়েছিলো কিনা?

কর্মক্ষেত্রে অনেক পুরুষদের দেখা যায় তারা কেউ কেউ নারী সহকর্মীদের হেয় করে কথা বলেন। তাদের সম্মান করে কথা বলেন না।

মনোবিজ্ঞানী তাহমিনা তাবাসসুম বলেন, এসব পুরুষদের আসলে পরিবার থেকেই গ্রুমিংটা ভালোভাবে তৈরি হয়নি। যার ফলে তাদের এমন আচরণ হয়। তারা তাদের পরিবারে কখনো দেখেনি নারীদের সম্মান করা। এসব পুরুষরা কোন না কোন ভাবে ছোটবেলা থেকে পরিবারে বা প্রতিবেশী পরিবারে নারীদের হেয় করাই দেখে এসেছেন। অনেকে আবার হেয় করা শিখেছেন স্কুল থেকে, কখনো বা বন্ধুদের কাছ থেকেও। তারই প্রতিফলন হয় তার পরবর্তী আচরণে। আমরা বাইরে যে যা আচরণ করি তা দিয়ে আসলে আমরা সবাই যার যার পরিবারকেই প্রতিনিধিত্ব করি। একথা আমরা অনেকেই বুঝি না।

তাই পরিবারের সব অভিভাবকদের আচরন হওয়া দরকার শোভন মার্জিত ভদ্র। ছেলে মেয়ে আলাদা করে নয়। সব সন্তানকে সমানভাবে দেখানোর দৃষ্টিভঙ্গি থাকতে হবে পরিবারের সবার। মেয়েকে পুতুল আর ছেলের হাতে বন্দুক না দিয়ে দুজনের হাতেই সমানভাবে বুদ্ধিবৃত্তিক খেলনা দেয়া দরকার।

এ প্রসঙ্গে স্কুল শিক্ষক নাজনীন হক বলেন, যে স্কুলের ছেলেরা এই লেডিস নামের খেলা খেলছে তা অবশ্যই স্কুল কর্তৃপক্ষের বন্ধ করা উচিত। স্কুল কর্তৃপক্ষের প্রত্যেকটা ছেলেমেয়েকে মনিটর করা দরকার, তারা কী করছে, কী খেলছে। তাহলে এ ধরনের নেতিবাচক খেলাগুলো শিশুরা আর স্কুলে খেলতে পারবে না। যদিও শিশুদের মূল শিক্ষাটা হয় পরিবারে। তবুও স্কুল কর্তৃপক্ষেরও সচেতন থাকা দরকার শিক্ষার্থীদের বিষয়ে। কোনভাবেই স্কুল তার দায় অস্বীকার করতে পারে না এমন খেলা খেলতে দেয়ার জন্য।

তবে শুধু শিক্ষার্থী নয়, অনেক স্কুলে শিক্ষকরাও একটা মাইন্ড সেটাপ নিয়ে আসেন কর্মক্ষেত্রে। কোনো মেয়ে যদি দুষ্টু হয় বা সাহসী হয় তাকে বলা হয় তুমি কি ছেলে নাকি? ছেলেরা এমন করবেই। সবাই যেন ধরেই নেয় মেয়েরা হবে চুপচাপ শান্তশিষ্ট। আর ছেলেরা হবে চঞ্চল। স্কুলে ও পরিবারে এধরনের আচরণের ফলে শিশুমনে অবচেতন ভাবেই বিভাজন তৈরি হয়ে যায়। এজন্য শিক্ষকদেরও মুল্যবোধের শিক্ষা দেয়া দরকার। প্রতিটি স্কুলে দরকার এখন মনোবিজ্ঞানের শিক্ষক। যারা শিশুমন বুঝে তাদের অনেক কিছু বুঝাতে পারবে। যখনই শিশুদের সাথে খোলামেলা কথা বলা যাবে। তাদের ভালো মন্দর পথটা বুঝিয়ে দেয়া যাবে তখন আশাকরি বন্ধ হবে এ খেলাগুলো।

মানবাাধিকার কর্মী নাজনীন পাপ্পু বলেন, সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির পরির্বতন আজ বড় দরকার। এরজন্য এগিয়ে আসতে হবে নারী পুরুষ দুজনকেই। নইলে লেডিস খেলার মতো এ ধরনের নেতিবাচক খেলাগুলো শিশুরা না বুঝেই খেলে যাবে, যার সুদূরপ্রসারী ফল হবে ভয়ংকর। পরিবার, সমাজ বা রাষ্ট্র যদি এখনো সচেতন না হয় তবে এই বৈষ্যম গুলো থেকেই যাবে। যার ফল শুভ বয়ে আনবে না কারও জন্য।

শেয়ার করুন:
  • 531
  •  
  •  
  •  
  •  
    531
    Shares

লেখাটি ২,০২৯ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.