শাড়ি (গল্প)

0

সালমা লুনা:

ফয়জুন্নেসা বেগম এস্কেলেটর এ উঠতে পারেন না। তার মাথা ঘুরায়, শরীর কাঁপে এই জিনিস দেখলে। বড় বড় চলন্ত সিঁড়ি। একটা সিঁড়ির ভেতর থেকে আরেকটা সিঁড়ি বের হচ্ছে, একটা সিঁড়ি আবার আরেকটার ভেতর ঢুকে পড়ছে।
মানুষগুলো গিয়ে দাঁড়ায় আর চলন্ত সিঁড়ি গিয়ে তাকে আস্তে করে নামিয়ে দেয় উপরে। আবার নিচে নিয়ে আসে।

ঠিক যেন মানুষের জীবনের মতো। জীবনের এক ধাপ আরেকটা ধাপে ঢুকে যায়। নতুন আরেকটা ধাপ আসে। মানুষ কিন্তু তার জায়গাতেই দাঁড়ায়ে থাকে। শুধু জীবনটাকে কখনো উঁচুতে কখনো নিচুতে নিয়ে যায় সিঁড়ি ।
তারা যাবেন সাত তলায়, তাই তিনজন বসুন্ধরা সিটির লিফটের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। তারা মানে তার ছোট ছেলের বউ, মেজোমেয়ে আর তিনি।

চারিদিকে তাকিয়ে দেখছেন ফয়জুন্নেসা বেগম। কী বিশাল শপিং মল! এমন মার্কেট তো বাপের জন্মেও দেখেননি তিনি। এস্কেলেটর সিঁড়ি দেখেছেন, নিউমার্কেট, গাউছিয়া, ইস্টার্ন প্লাজা মার্কেট আর আড়ংও দেখেছেন, কিন্তু এতোবড় মার্কেট দেখেননি। এইজন্য এইটার নাম মল? কে জানে!

সালমা লুনা

আজকে তারা তিনজন মিলে শপিং এ এসেছেন। ফয়জুন্নেসা বেগমের ভাশুরের ছেলের ঘরের নাতির বিয়ে। নাতির বিয়ের গিফট কিনবেন আর নিজের জন্যও একটা শাড়িও কিনবেন। শাড়িটা অবশ্য ছোট ছেলে কিনে দেবে বলেছে।
সেই তো দেবে। এখন ফয়জুন্নেসা তার বাসাতেই আছেন। যখন যার বাসায় থাকেন তিনি, তখন তার সকল খরচ সেই সন্তানের।

ফয়জুন্নেসার তিন ছেলে। মেয়েও তিনজন। মেজো মেয়েটা শুধু দেশে থাকে। বড় আর ছোট দুই মেয়ে, আর বড় ছেলে বহুবছর ধরে প্রবাসী। আমেরিকা কানাডা আর অস্ট্রেলিয়ার বাসিন্দা তারা। বছর দুবছরে দেশে আসে। দেশে থাকা দুভাই, একবোনের বাসা আর তাদের শ্বশুরকুলের বাসায় ঘুরে বেড়ায়, এক দেড়মাস থাকে আবার চলে যায়।

তিনি সারা বছর ঘুরেফিরে মেজো ছেলে আর ছোট ছেলের বাসায় থাকেন। স্বামী গত হওয়ার পর তার আর নিজের কোন বাড়ি নেই। তার নিজের বাড়ি অবশ্য আছে, পরীবাগে দোতলা বাড়ি কিন্তু তিনি সেটাতে থাকেন না। বিশাল বাড়ি একটা অফিস ভাড়া দিয়ে রেখেছেন। সেটাও ছেলেমেয়েদের ইচ্ছেতেই। তিনি একা হলেও আলাদা থাকার একটা খরচ আছে, তাছাড়া আলাদা থাকলে কে তার দেখভাল করবে তা নিয়েও টানাহেঁচড়া চলে। তাই সবকিছু বাদ দিয়ে নির্ঝঞ্ঝাট হয়ে তিনি ছেলেদের বাসায়ই থাকেন, একেবারে ঝাড়া হাতপা। খরচ নেই, উল্টো ভাড়ার টাকা পান। ছেলের বউদের উপর তার সকল দায়িত্ব ন্যস্ত করে ছেলেরাও আরামে আছে। তাদের ব্যবসা চাকরি সামলে মাকে দেবার মত প্রচুর সময় নেই। বউরা একজন স্কুলের চাকরি, আরেকজন স্বামীর ব্যবসার অফিসেই দায়িত্ব পালন শেষে শাশুড়িকে দেবার মতো সময় বের করে নেয় অথবা নিতে বাধ্য হয়।

তিনি অবশ্য মেজো মেয়ের বাসায়ও থাকতে যান মাঝে মাঝে। যদি মেজো জামাই ব্য বসার কাজে বিদেশে যায়। মেয়েটা তার খালি বাসায় ভয় পায়, তাই স্কুল কলেজ পড়ুয়া দুটি ছেলে থাকতেও মাকে ডাকে তার সাথে ঘুমাবার জন্য।
বিশাল বাড়ি তার। চাকরবাকরও আছে গোটা চারেক, তবুও মাকে তার লাগে। এছাড়া অবশ্য কখনোই তিনি মেয়ের বাড়ি গিয়ে থাকেন না।

তার মেয়ে বলে, আম্মা বুঝেনই তো! এটা আপনার জামাই বাড়ি না? এতো ঘনঘন আসা ঠিক না। তাছাড়া বুঝেনই তো, আমার শ্বাশুড়িকে তো আমার বাসায় এনে কখনো রাখি না। আমার হাই প্রেশার, ডায়াবেটিসের সমস্যা এইসব বলে বলে আমি তো আপনার জামাইকে আটকে রাখি যেন তার মাকে এনে আমার ঘাড়ে না ফেলে।
হ্যা তিনি বুঝেন সবই। না বোঝার কিছু নেই তো। আজকে যদি মেয়ের মা হয়ে ওই বাড়িতে তিনি থাকেন তবে তার নির্বিবাদী ভালো মানুষ জামাইটিও একদিন হয়ত বলে বসতে পারে মেয়েকে, মা যখন থাকছে আম্মাও আসুক না।

ফয়জুন্নেসা চারিদিকে তাকিয়ে দেখেন। তিনি মনে মনে গালে হাত দিয়ে ভাবেন, আল্লার দুনিয়ায় মানুষ কী না কী বানাইতেছে! এইরম চ্যালচ্যালায়া কেমনে উঠে সিঁড়ি? মানুষের পা ক্যান ঢুকে পড়ে না!

কিন্তু এদের সামনে এসব চিন্তা প্রকাশ করা যাবে না। ছোট বউ হাসবে।
এই বউটা একটা ফাজিল, সবকিছুতেই খালি হাসে। হাসতে হাসতে গা জ্বালানো কথা বলে। ফয়জুন্নেসার মনে হয় বউটা তাকে নিয়েও হাসাহাসি করে আড়ালে।
তিনি তাকিয়ে দেখলেন লিফট চলে এসেছে। ভুরভুর করে লোক বের হচ্ছে। যেন বদহজম হওয়া মানুষের মতো পেটের ভেতরের যা কিছু সব উগড়ে দিচ্ছে।
মেয়েটা বেকুবের মতো মাকে না নিয়েই আগে গিয়ে লিফটে উঠলো। ছোটবউটা এগিয়ে এসে তার হাত ধরে নিয়ে লিফটে তুলল।
চলন্ত লিফটে মেয়ে হেসে জিজ্ঞেস করে, আম্মা কী শাড়ি কিনবেন? ঠিক করছেন কিছু?
ফয়জুন্নেসা উত্তর দেন না।
উত্তর দেয় ছোট বউ, ছোটপা একটা কাতান কিনে দিব নে আজকে মাকে।
মেয়ে ফয়জুন্নেসার দিকে তাকিয়ে কুলকুল করে হাসে, আম্মা কাতান পরবেন?
ফয়জুন্নেসার রাগ লাগে। তিনি কি বলেছেন নাকি যে তিনি কাতান কিনবেন? ছোটবউটার ভাবসাবই বেশি বেশি।
আর হবেই বা না কেন?
তার নিজের পেটের ছেলেই তো আস্কারা দিয়ে দিয়ে বউকে এমন মাথায় তুলেছে। প্রেম করে বিয়ে যেন আর কেউ করে না। তাই বলে বউই সব হবে কেন? সংসারে, বিজনেসে তাকে মাথায় তুলে নাচতে হবে কেন! বউ ছাড়া যেন জগত অন্ধকার। সে এখন ধরাকে সরা জ্ঞান করে। দুই বাচ্চার মা অথচ ভাব দেখায় যেন খুকি।
যখন যেখানে যেতে ইচ্ছে করে যাচ্ছে। যখন যা মন চায় কিনে আনছে।
নিজের রোজগার তো আছেই, তার ছোট ছেলেটার রোজগারেও ভাগ বসায়। কসমেটিকস থাকতেও কসমেটিকস, শাড়ি সালোয়ার কুর্তি যখন যা পছন্দ হচ্ছে কিনছে। গয়না কিনে কিন্তু সেগুলো কোন ঢকের গয়না না। মাটি, পুঁতি, নারকেলের মালা, পিতল এইসবের গয়না কিনে আজাইরা টাকা নষ্ট করে। রুচি নাই। কিনবি তো হিরে বা সোনা কেননা বাপু ! নিদেনপক্ষে রূপা। তা না, দুদিন পরপর এইসব কী কিনে আনা?

আজকাল তো নাকি মার্কেটেও আসতে হয় না কেনাকাটার জন্য। অনলাইন না কী জানি বের হয়েছে, সেখান থেকেই দেদার কিনছে।
এই তো সেদিন, কুড়ি হাজার টাকায় এক শাড়ি কিনলো। সাথে একটা গয়নার সেট, পুঁতির! সেই অনলাইনে। বাসায় এসে দিয়ে গেছে। বিল নাকি সাতাশ হাজার টাকা। ছেলে সেদিন বাসায়ই ছিলো। সেই টাকা দিয়ে দিলো।
বউ অবশ্য এসে লোকদেখানো সাধাসাধি করেছে টাকা ফেরত দিতে।
বলেছে, তুমি এটা দিবা না। এটা আমি আমার টাকা জমিয়ে কিনেছি। তুমি পরে অন্য শাড়ি দিও। আমি একটা কাঞ্জিপুরম দেখে রেখেছি। ওটা যখন অর্ডার করবো সেটার টাকা তুমি দিও।
ছেলের সে কী আহ্লাদ !
বলে, দিব, ওইটাও দিব। এটাও দিব।
কী ঢং! কেন রে! যে মা জন্ম দিল, তাকে কখনো দিছিস এতদামী শাড়ি কিনে?
সবই বোঝেন ফয়জুন্নেসা। সেই দিন আর নাই। ছেলেমেয়েরা এখন সব স্বার্থপর হয়ে গেছে।
দিন বদলে গেছে।

অথচ তার স্বামী যখন শাড়ি কিনতেন, সবসময় একজোড়া শাড়ি কিনতেন। বউ আর মা দুজনের জন্য। একইদামের এবং একরকম শাড়ি হতো সেগুলো। ঢাকাইয়া বিটি, টাঙ্গাইল, ধনেখালি এসব রোজকার পরার শাড়ি ছাড়াও দামী শাড়ি যেমন জামদানী, ব্রোকেড বা মাইশোর সিল্ক আনলেও শ্বাশুড়ির জন্য আনতেই হতো। নইলে উনি গাল ফুলিয়ে থাকতেন।

একবার তো একটা জর্জেট শাড়ি আনলেন শুধুমাত্র ফয়জুন্নেসার জন্য। কী সুন্দর শাড়ি! ওমা, সেই শাড়ি দেখে কী রাগ শ্বাশুড়ির! অথচ ওই পাতলা ধরনের শাড়ি উনি কখনোই পরেন না। তবুও উনি রেগেছিলেন। পরে একসাথে দুটো রাজশাহী সিল্ক কিনে দিয়ে মায়ের মান ভাঙ্গাতে হয়েছিল তার ছেলেকে।আর তিনি? শ্বাশুড়ির সেই রাগের জন্য অনেকবছর সেই জর্জেট শাড়িটা পরতেই পারেননি ভয়ে।
কী ছিলো সেইসব দিন!

ছেলেরা তখন মায়ের কদর করতো। বউরা শ্বাশুড়িকে বাঘের মতো ভয় পেত। আর এখন?
এখন বউ-ই সব। কী ছেলের কাছে কী সংসারে!
ভাবতে ভাবতে এগোন ফয়জুন্নেসা। সাত তলায় লিফট থেকে নেমে
তারা তিনজনে মিলে একটা বড় দোকানে ঢুকে পড়লেন।
চারদিকে কত শাড়ি!

ফয়জুন্নেসা মনে করতে চেষ্টা করলেন শেষ কবে তিনি শাড়ির দোকানে এসে শাড়ি কিনেছেন। প্রায় উনিশ কুড়ি বছর তো হবেই।
আজও হতো না হয়তো। তিনি নিজে দেখেশুনে কিনবেন বলে জেদ না করলে। গতকালই তো ছোটছেলে বউকে বলেছিল, বিয়েতে পরার জন্য আম্মার জন্য একটা ভালো শাড়ি কিনে এনো।
বউও খুব উৎসাহে জিজ্ঞেস করেছিল, মা কী শাড়ি কিনবো? একটা কাতান কিনে ফেলি, না?
ফয়জুন্নেসা কতক্ষন চুপ করে ছিলেন। পরে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার ওই শাড়িটার নাম কী ছিলো?
ছোটবউ ভ্রু তুলে একটু অবাক হয়ে বলেছিলো, কোনটা মা?
ওই যে সেদিন বাসায় এসে দিয়ে গেল, নীল রঙ-এর শাড়িটা, বিশ হাজার টাকা দিয়ে যে কিনলা?
বউ হাসতে হাসতে বললো, অহ, ওইটা?! ওইটা তো বেনারসি মা!
একটু লজ্জা পেয়েছিলেন সেদিন বউয়ের হাসিতে, ও কি কিছু বুঝে হাসলো?
ফয়জুন্নেসা সেসব তোয়াক্কা না করে ছেলেকে বলেছিলেন আমি নিজে গিয়ে কিনব।
শাড়ির দোকানের সেলসম্যানরা সব ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠেছে। মেয়ে আর বউ দুজনেই এখানকার ক্রেতা বোঝা যাচ্ছে।
মেহেদি দাঁড়িওয়ালা এক সেলসম্যান বারবার বলছে, আপা এইবার অনেকদিন পরে আসলেন।
মেয়ে হেসে হেসে বলল, আরে আমি তো সেদিনও কিনলাম।
ছোট ভাইয়ের বউকে দেখিয়ে বলল, ও তো অনলাইনেই কিনে বেশি এখন।
মেহেদি দাঁড়ি মুখ গোমড়া করে, এই জন্যই আপুরে দেখি না আজকাল। আমাদের এত তাড়াতাড়ি ভুইলা গেলেন আপা?
পরমুহূর্তেই বিনয়ে গলে পড়ে বউয়ের দিকে ফিরে বলল, আজকে বলেন কী নিবেন। আজকে আপনারে একটা কাঞ্জিপুরম দিয়া দেই আপা?
বউ হেসে বলল, আরে না সালাম ভাই, আজকে মা কে নিয়ে আসছি। উনার জন্য দেখান শাড়ি।
আরে খালাম্মার জন্য? তা আগে বলবেন না!
ফয়জুন্নেসার দিকে এগিয়ে এসে বলে, বলেন খালাম্মা, আপনেরে কী শাড়ি দিব? ভালো কিছু তসর আসছে। বয়ষ্ক মানুষদের জন্য কিছু তন্তুজের শাড়ি আনাইছেন মালিক নিজে। সেইগুলা দেখাই?

ফয়জুন্নেসা হাঁসফাঁস করেন। তিনি তো এসব শাড়ি কিছুই জানেন না। তাকে ছেলেবউরা ঈদে পার্বনে গিফট দেয়। মেয়েরা দেশে আসলে কিনে দিয়ে যায়। তার আলমারি শাড়িতে উপচে উঠলেও তিনি কোনটারই নাম জানেন না। অনেক সময় মেয়ে বা বউরা শাড়ির নাম বললেও মনে রাখতে পারেন না।

ছোট বউ উৎসুক চোখে শাড়ি দেখে। মেয়েও তাক থেকে ইতিমধ্যেই অনেকগুলো শাড়ি নামিয়ে ফেলেছে। ছোকরা মতো কানের পাশ থেকে চুল উপরে টেনে নিয়ে চূড়ো করে রাবার ব্যান্ডে আটকে রাখা এক সেলসম্যান সেসব বাহারি শাড়ি নানা কায়দায় গায়ে জড়িয়ে দেখাচ্ছে। মেয়েও মত্ত হয়ে দেখছে।

ফয়জুন্নেসার রাগ লাগে মেয়ের উপর, খালি নিজের স্বার্থ দেখে। ওকে ফোন করে বলে কয়ে আনিয়ে মার্কেটে নিয়ে এসেছেন তিনি। যেন একটা ভালো আর বেশ দামী শাড়ি বাছাই করে দেয় মাকে। ছোট বউটা কী না কী শেষে গছিয়ে দেবে। হাজার হোক ছেলের বউ সে।
হা হতোস্মি, কোথায় কী! সে নিজের শাড়ি দেখতে ব্যস্ত হয়ে গেলো। আর বসেছেও আলাদা, দূরে। একটু ইশারা ইঙ্গিত বা ফিসফাস যে করবেন, তারও জো নেই। ছোট বউ বসেছে দুজনের মাঝখানে। আরে তার সাথেই যদি সব করবো, তবে তোকে আনলাম কেন!
নিজের পেটের মেয়েই মায়ের স্বার্থ দেখে না, সেখানে ছেলের বউ! সে তো পরের মেয়ে।
ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলেন তিনি।
মেহেদি দাঁড়ি ফিরে এসেছে।
হাতে একগাদা শাড়ি।
ধপাস করে সাদা গদির বিছানায় শাড়িগুলি ফেলে দিয়ে বললো, আইজকা খালাম্মারে মনের মতো শাড়ি দিমু দুইটা।
একটা ভারী শাড়ি মেলে গায়ে অদ্ভুত করে পেচিয়ে কাঁধে আঁচল ফেলে দিয়ে বলল, দেখেন খালাম্মা। সেইরকম শাড়ি!
ফয়জুন্নেসা বিরস মুখে দেখেন।
কেমন জ্বলা জ্বলা রঙ। তেমন ভালো লাগে না, তবু জিজ্ঞেস করেন, দাম কত?
সাড়ে চার হাজার। এইটা এক নাম্বার কলমকারি। আপনার জন্য চার রাখবোনে খালাম্মা। আপনি প্রথম আসছেন আজকে।
ফয়জুন্নেসা আঁতকে উঠেন। মাত্র সাড়ে চার! মাত্র চার হাজার টাকার শাড়ি কিনতে আসছেন উনি!
না না, অন্যকিছু দেখাও।
অসুবিধা নাই, দেখাই বলে একটা তসর মেলে ধরে, দেখেন এই যে ডিজাইনার শাড়ি, তসরের উপরে। এইরকম আরেকটা শাড়ি এই ঢাকা শহরে আপনি কারো কাছে পাইবেন না।

ফয়জুন্নেসা এক পলক তাকান। মনে মনে চমৎকৃত হোন, শাড়িটা আসলেই ভালো তো!
কিন্তু মুখে বলেন, এটার দাম কত?
সালাম হাসে, বেশি না। যেমন শাড়ি এইটা তাতে এর দাম হওয়া উচিত পাঁচ হাজারের উপরে। কিন্তু আপনি পাঁচই দিয়েন।
ফয়জুন্নেসা ছোট বউয়ের পাশ কাটিয়ে মেয়ের দিকে তাকান।
মেয়ে কমলা রঙের একখানা সিল্ক গাদোয়াল হাতে নিয়ে মুগ্ধ দৃষ্টিতে খুঁটিয়ে দেখায় ব্যস্ত।

ছোট বউ কানে কানে ফয়জুন্নেসাকে বলে, মা পছন্দ হলে বলেন। আপনার ছেলে বলেছে দাম কোনো ব্যাপার না। ও আমাকে বলে দিয়েছে, আপনি আপনার পছন্দের সবচেয়ে সুন্দর শাড়িটা যেন কিনেন।
ফয়জুন্নেসা মুখ বিকৃত করেন, নাহ, এটা তেমন ভালো লাগতেছে না।

আধাঘন্টা পর দেখা গেল মেহেদি দাঁড়িওয়ালা একস্তুপ শাড়ির মাঝখানে হতাশ বসে আছে। আর ফয়জুন্নেসা বেগম ততোধিক বিরক্তমুখে মেয়ের দিকে তাকিয়ে বসে আছেন। তার মেজো মেয়ে গোটা বিশেক গাদোয়াল আর কাঞ্জিপুরম ঘেঁটে একটা পাটোলা কিনে বুকে শাড়ির ব্যাগ চেপে হাসিহাসি মুখ করে গা এলিয়ে বসে আছে। শাড়ি কেনার পর তার জন্য, সবার জন্যই ক্যানে কোল্ড ড্রিঙ্কস এসেছে।

ছোট বউয়ের একটা ফোন এসেছে। সে দোকানের বাইরে গিয়ে কথা বলছে।
ফয়জুন্নেসা মেয়ের দিকে তাকিয়ে তেতো গলায় বললেন, আর দোকান নাই?
আম্মা এইটাই সবচেয়ে ভালো আর বড় দোকান। আমরা সবাই এখান থেকেই সবসময় শাড়ি কিনি। এতো শাড়ি দেখালো তবু আপনার একটাও পছন্দ হয় না। আর কোন দোকানে হবে?

ফয়জুন্নেসা এবার বিরক্ত হয়েই মেয়েকে বললেন, তোর আজকে শাড়ি কিনার কথা ছিলো? কত শাড়ি কিনছ তুই? সেদিনই না কলকাতা থাইকা এতোগুলা শাড়ি আনলি!
ছোটবউ গ্লাস ঠেলে দোকানে ঢুকে পরিস্থিতি আন্দাজ করে ফয়জুন্নেসার দিকে এগিয়ে আসে, কই মা, আপনার কোনো শাড়ি পছন্দ হলো?

ফয়জুন্নেসা এবার বলেই ফেলেন, তুমি আবার কই চইলা গেছো? তোমাদের এতো ফোনও আসে! একটু দামী শাড়ি দেখাইতে বলো বৌমা। ওরা যে কী ছাতামাথা দেখাইতেছে। সব সস্তা সস্তার শাড়ি।

মা, আপনার ছেলে ফোন করেছিলো তার ড্রয়ারের চাবি খুঁজে পাচ্ছে না। আপনি কোন ধরনের শাড়ি পছন্দ করেন আমাকে বলেন। দেখি এদের বুঝাতে পারি কীনা।

এতোক্ষণ ধরে তামাশা দেখতে থাকা চুল চূড়ো করা ছোকরা সেলসম্যান এগিয়ে আসলো, আপু আমি আন্টিরে দুইটা শাড়ি দেখাই? পছন্দ না হইলে অন্য দোকানে যাইয়েন।
তারপর ফয়জুন্নেসার দিকে তাকিয়ে দাঁত বের করে বলল, আন্টি, শাড়িটা নতুন আসছে। এখনো ট্যাগ লাগানো হয় নাই। মাত্র দুই পিস শাড়ি আসছে। এইসব শাড়ি সারা পৃথিবীতে একজন মাত্র মানুষ পরে। আর পরবেন আপনে। আপনেরে মানাইবোও সেইরাম। নেন না নেন একবার দেখেন শাড়িটা। দাম ইট্টু বেশি, কিন্তু এই শাড়ি যেনতেন কাস্টমাররে দেখাইও না।

এইবার ফয়জুন্নেসা একটু নড়েচড়ে বসলেন৷ মনে মনে একটু খুশিও হলেন, যাক এতক্ষণে তাহলে আসছে আসল শাড়ি!
মেজমেয়ে ক্যানড পেপসি ডায়েটে চুমুক দিতে দিতে বলে, এ্যাই, পৃথিবীতে একজন পরে যে বললা, কে সে? কে পরে সেই শাড়ি?

চূড়া চুল দাঁত কেলিয়ে দেয় আরও, আপা, এই পৃথিবীর একজন মহিলাই আছে যে সবচেয়ে এক্সকুসিভ শাড়ি পরে, সে হইল জয়া বচ্চন। এইগুলা মুম্বইয়ের ডিজাইনার শাড়ি। উনার জন্যই স্পেশাল বানানো হয়। উনি কোনো কারণে শাড়িটা রিজেক্ট করলে সেই শাড়ি লুকায়ে কেউ বেচে দেয়। সেইরকমই একটা দুইটা শাড়ি হটাতে আমাগো মালিকে আনে নিজের পরিবারের লোকজনের জন্য। তারা না রাখলে আমরা সেল কইরা দেই আপা। কিন্তুক আগেই কইলাম দামটা ইট্টু বেশি।

অস্থির হয়ে উঠেন ফয়জুন্নেসা, আরে ছেলে তুমি আনো তো! দাম নিয়ে এতো কথা বলো কেন?
ভেতরে ভেতরে তখন তার উত্তেজনা, এইবার পেয়েছি দামী শাড়ি। ছোট বউটাকে একহাত দেখিয়ে নেয়া যাবে।
ধৈর্যের তেরোটা বাজিয়ে বেশ কিছুক্ষণ পর খুব দামি কাগজে মোড়ানো দুইটা প্যাকেট এনে খুব ধীরে সুস্থে খুব যত্নে খুলতে লাগলো ছোকরা, যেন খুব ভঙ্গুর কিছু।
অবশেষে মোড়ক খুলে বের হলো একটা শাড়ি। ঘরে বানানো ঘি এর মত রঙ। তার উপর মিহি সোনালি সুতোর কাজ। পেটানো জরির পাড়। আঁচলেও তেমন কাজ।
ফয়জুন্নেসা ফস করে জিজ্ঞেস করলেন, দাম কত?
চূড়ো চুল মাথা নাড়ে, আন্টি আরেকটা দেখেন। দাম নিয়ে ভাইবেন না। শাড়ি দেখেন। পছন্দ করেন।
আরেকটা প্যাকেট সেই একইরকম সময় নিয়ে খোলে সে। এবার বের হলো ফলসা রঙা এক শাড়ি। পাড়ে নীলচে সুতোর সাথে জরির পেটানো কাজ। সারা শাড়িতে সোনালি কারুকাজ।
দুটো শাড়িই সুন্দর।
ফয়জুন্নেসা বেগম মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখলেন। একবার মেয়ে আর বউয়ের দিকে তাকালেন। তারা মুগ্ধ কীনা বোঝা গেল না।

ফয়জুন্নেসা বললেন, এবার তো বাপু দামটা বল!
ছেলেটা একটা শাড়ি নিয়ে আরেকটা ছেলেকে ডেকে বললো, এটা তুই ডিসপ্লে কর। আর নিজে আরেকটা শাড়ি সুন্দর করে গায়ে পেঁচিয়ে মেহেদি দাঁড়িওয়ালাকে বললো, কাক্কু লাইটগুলা জ্বালায়া দেন।
মেহেদি দাঁড়িওয়ালা চুপ করে বসেই রইলো। নিরাসক্ত চোখে একটু পরপর ফয়জুন্নেসাকে দেখছে।

কোনার দিকে বসে থাকা পিচ্চি ছেলেটা লাইট জ্বেলে দিলো। দোকানটা এখন ঝলমল করছে আলোতে, ঔজ্জ্বল্যে। সেই সাথে শাড়িগুলোও।
সবাইকে বিস্ময়াভিভূত করে যেন ছেলেটা জিতে গেছে এমন ভঙ্গিতে শাড়িগুলো ভাঁজ দিতে দিতে বললো, দামাদামি করতারবেন্না কইলাম। একদাম বইলা দিব। নিলে নিবেন না নিলে নাই। পঁয়ত্রিশ হাজার দিবেন।

ফয়জুন্নেসা একটু চমকে উঠে নিজেকে সামলে নিলেন।
মেজমেয়ে আঁতকে উঠলো, কী বলো?
এটা তো লিনেনের উপর শাড়ি।
ছোকরা কায়দা করে হাসে, আপু মেটেরিয়াল যাই হোক, এইটা যে কী শাড়ি সেইটা আমি আপনাদের বলসি। এখন আপনাদের ইচ্ছা।

ফয়জুন্নেসা ছেলেবউয়ের দিকে চাইলেন, সে চুপ করে আছে। মনে হচ্ছে দ্বিধাগ্রস্ত।
ফয়জুন্নেসার মনে তখন ভীষণ স্ফুর্তি, এই শাড়িই তার চাই। তার বউ জব্দ হচ্ছে।
কিন্তু মুখে বললেন, বাবা, আমি বুড়ো মানুষ। এতো দামি শাড়ি কখনো বুড়ো মানুষে পরে?
পাশের ছেলেটা বলে উঠে, আপনাদের মতো মানুষই পরে। সবাই তো আর পরতে পারে না এমন শাড়ি!

ফয়জুন্নেসা বেগম ছেলের বউয়ের মুখের দিকে তাকান, তার মুখে আঁতিপাঁতি করে অনিচ্ছুক আঁকিবুকি খোঁজেন। কিছু না পেয়ে মেয়ের চোখে চোখ রাখেন। সেখানে স্পষ্ট ভেসে আছে, না।
ফয়জুন্নেসার রোখ চেপে যায়। তিনি ছেলের বউকে জিজ্ঞেস করেন, তুমি কত টাকা আনছো?
মা, আপনার কি শাড়ি পছন্দ হয়েছে?
জিজ্ঞেস করেই কানের কাছে মুখ এনে বলে, এই শাড়ি কিন্তু এতো দাম হওয়ার কথা না।

এতোক্ষণে ফয়জুন্নেসা বুঝলেন, বউ আসলে চায়ই না তিনি দামী শাড়ি কিনেন। দামী শাড়ি সে একাই পরবে।
মনের মধ্যে বিষ এই মেয়ের। সে মুখে মধু অন্তরে বিষ কিসিমের মানুষ। কিন্তু এটা সে কাউকে দেখায় না। সবাই তাকে ভালো জানে। তার এতো মা ভক্ত ছেলেটা এখন এই বউয়ের ভক্ত। তার জীবনের যা কিছু সবই এই বউয়ের জন্য। অথচ এক সময় সে মা ছাড়া কিছুই বুঝতো না। শুধু তাই না, দুই ননাস এক ননদ এমনকি ভাশুর জা পর্যন্ত তার ভক্ত। স্বামী যতদিন জীবিত ছিলেন ছোটবউ বলতে অন্ধ ছিলেন।

মনের ভেতর তীব্র হলাহল নিয়ে তিনি ছোট বউকে মনে মনেই তীব্র বাক্যবাণে জর্জরিত করেন, আমার পুরো সংসার, বুকের ধন মানিক নিয়েও তোমার শান্তি হয় নাই? গাড়ি-বাড়ি টাকা পয়সা সবই তোমার, তাও তুমি আমাকে হিংসা করো? আমি তোমার চেয়ে বেশি দামী শাড়ি কিনলে তোমার গা জ্বলে?

কিন্তু এসব তো মুখে বলা যায় না। তাই মুখে স্মিত হাসি নিয়ে বলেন, না হোক। আমার এইটাই পছন্দ হইছে।

অবশেষে আটাশ হাজার টাকায় ফলসা রঙা শাড়িটা কেনা হলো।
তারা বেরিয়ে যেতে যেতে শুনতে পেলো না মেহেদি দাঁড়ি চূড়া চুলোকে বলছে, তুই আইজকা থাইকা আমার উস্তাদ। আট হাজার টেকার শাড়ি তুই আটাইশে কেমনে বেচলি?
চূড়ো চুলো হেসে ফেলে বললো, আরে খালাম্মায় দামী শাড়ি কিনতে আইছে। তারে দামী শাড়ি দিলাম।

ফয়জুন্নেসা বেগম তৃপ্তির হাসি নিয়ে দোকান থেকে বের হলেন। দুদিন পর বিয়েতে এই শাড়িটা পরে বড় জাকে আর ছোট জাকে দেখিয়ে কীভাবে বলবেন যে এই শাড়িটা তার ছোট ছেলে কিনে দিয়েছে সেই চিন্তায় বিভোর হলেন।

ফয়জুন্নেসা বেগমের মুখের হাসি শাড়ি কেনার আনন্দে নাকি পুত্র-গর্বে ঝলমল করে। অথবা শাড়ির দাম বউয়ের শাড়ির চেয়ে আট হাজার টাকা বেশি হওয়ার আনন্দে আরেকটু বেশি আলো ছড়ায়, ঠিক বোঝা যায় না।

শেয়ার করুন:
  • 582
  •  
  •  
  •  
  •  
    582
    Shares

লেখাটি ৩,২৪৬ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.