একটি বোকা পরিবারের গল্প

0

শান্তা মারিয়া:

পর্দা, বই, বালিশ নিয়ে দুর্নীতির খবর দেখে অবাক হই। শুধু এগুলোই নয়। এদেশে এখন প্রতি স্তরে দুর্নীতি। বিদ্যুতের মিটার রিডাররা কোটিপতি। সুইস ব্যাংকে বাঙালিদের কালো টাকার পাহাড়। দেশটা এমন দুর্নীতিবাজ, ঘুষখোরে ভরে গেল কেন বুঝতে পারি না। গলদটা কোথায়? এখন তো ঘুষখোর লোক সমাজের ঘৃণাও পায় না। বরং বাহবা কুড়ায়। টাকা সব পাপ ঢেকে দেয়। এমনকি এটা যে পাপ সেটা বলতে গেলেও লোকের হাসির পাত্র হতে হয়।

আমার মনে পড়ে শৈশবের কথা।
আমার বাবা, যিনি কমরেড তকীয়ূল্লাহ নামেই পরিচিত ছিলেন সবার কাছে সেই তিনি সত্তর দশকে (ষাট দশকের মাঝামাঝি থেকে চাকরি শুরু করেন) বিজেএমসি বা বাংলাদেশ জুটমিল করপোরেশনে চাকরি করতেন। তার পোস্টিং ছিল ঢাকা জুটমিলে। তিনি ছিলেন পারচেজের দায়িত্বে। বোঝাই যাচ্ছে পারচেজ হলো ঘুষের জায়গা, দুর্নীতির জায়গা। হাজার টাকা নয়, লাখ, কোটি টাকা কামানোর জায়গা। বাবার চেয়ে অনেক ছোট পদে চাকরি করে সেসময় ঢাকায় দুতিনটি বাড়ির মালিক হয়েছে অনেকেই। কিন্তু বাবা এক পয়সাও ঘুষ খাননি। কারও ফাইল কোনদিন আটকে রাখেননি। ঘুষ খেয়ে বেশি দামে মিলের জিনিষপত্র কেনার তো প্রশ্নই ওঠে না। আমার বাবা যেমন এ বিষয়ে কঠোর ছিলেন তেমনি মা।

মা, ফয়জুন নেসা খাতুন সবসময় বলতেন, আমরা যেমন আছি, তেমনি ভালো। ঘুষের টাকায় (মায়ের ভাষায় হারাম টাকা) সংসার চালালে ছেলেমেয়েদের সর্বনাশ হবে।

মা, বাবা ও ভাইয়ের সাথে লেখক

আমার কাছে মনে হয়, মা এ বিষয়ে এতো নীতিনিষ্ঠ ছিলেন বলেই বাবার পক্ষে সততা ধরে রাখা সম্ভব হয়েছিল। হ্যাঁ, বাবা নিজের বাড়ি করতে পারেননি। কিন্তু তাতে কি খুব ক্ষতি হয়েছে তার জীবনে? আমি ছোটবেলার কথা যখন ভাবি তখন মনে হয়, কোন কষ্টকর জীবন তো ছিল না। আলুবাজারের যে বাড়িটিতে আমরা থাকতাম, সেটি আমার দাদার। পুরনো একটি ছোট বাড়ি। ইট-সুড়কির। বর্ষাকালে নোনাধরা দেয়াল দিয়ে মাঝে মধ্যে জল গড়াতো। ষাটের দশকে কেনা বাবার একটি ছোট অস্টিন গাড়ি ছিল। সেটি তিনি নিজেই চালাতেন।

আমাদের জীবন ছিল বেশ সাদাসিধে। সরকারি চাকরির টাকায় যেমন চলা উচিত। কিন্তু তাতে যে আমরা খুব অসুখী ছিলাম তাতো নয়। ব্যাংকক, সিংগাপুরে বেড়ানোর সামর্থ্য ছিল না, চাহিদাও ছিল না। আমরা রমনা পার্কে বেড়িয়েই তো বেশ খুশি ছিলাম। খুব দামি নয়, কিন্তু পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন কাপড় চোপড় পরতাম। এরই মধ্যে যতদূর সম্ভব ফ্যাশনও করতে পারতাম। একটা নেলপলিশ বা লিপস্টিক যদি বিদেশ থেকে আসা আত্মীয়রা উপহার দিত, তাতেই আনন্দ হতো।

ওই সাদা কালো টেলিভিশনের অনুষ্ঠান দেখেই যথেষ্ট বিনোদন পেতাম। একটা স্পুল রেকর্ডার ছিল। পরে ভাইয়া ইউসুফ আব্বাস উদয় এর স্কলারশিপের টাকা দিয়ে কেনা হলো টুইন ওয়ান। বড় বড় হোটেল রেস্টুরেন্টে খেতে যাবার বায়না আমার বা ভাইয়ের কোনদিনই ছিল না।

আমার ভাই যখন কলেজে বা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েন, তখনও কোনদিন দেখিনি মা-বাবার কাছে কোন জিনিস চেয়ে খুব আবদার করছেন বা খুব ফ্যাশন করতে চাইছেন। বখাটেপনা তার মধ্যে একেবারেই ছিল না। তার বন্ধুবান্ধবরাও ছিল তার মতোই সাদাসিধে। ধনীর দুলালও কয়েকজন ছিল। কিন্তু তাদের সঙ্গে ভাইয়া কোনদিনই পাল্লা দিতে চাননি।

আমার মা বড় হয়েছিলেন বেশ বিলাসিতার মধ্যে। কারণ তিনি ছিলেন খান বাহাদুরের কন্যা। কিন্তু কমরেডের স্ত্রী হওয়ার পর তার কোনো বাড়তি চাহিদা কোনদিন দেখিনি। হাতেগোণা কয়েকটি শাড়ি ছিল। কয়েকটি সিল্ক, কয়েকটি জর্জেট। একটি বা দুটি কাতান শাড়ি। আর বিয়ের সময় পাওয়া গয়না। এতেই তো তার বেশ চলে যেত। দেখতেও তাকে সুন্দর লাগতো। ঈদের সময় একটি সাধারণ শাড়ি নিতেন। আমরা পুরো পরিবারই খুব অল্পে সন্তুষ্ট ছিলাম, সুখী ছিলাম। কতই বা বেতন পেতেন আমার বাবা! পৈতৃক বাড়ি থাকায় ভাড়াটা দিতে হতো না।

বেতনের টাকা থেকে আবার কিছু খরচ করতেন পাড়ার গরীবদের বিনা পয়সায় পড়ানোর জন্য। বাকি টাকা তুলে দিতেন মায়ের হাতে। সেই সামান্য টাকা দিয়েও তো সংসারটা ভালোভাবেই চলে যেত। আমরা তখন একালের মতো কথায় কথায় চাইনিজ বা ফাস্টফুড খাওয়ার কথা কল্পনাও করতাম না। মেহমান এলেই কেবল কাঁচের বোতলে রাখা কোক বা ফানটা কেনা হতো। আমি এবং আমার ভাই কেউই কখনও বাবার মানিব্যাগ বা মায়ের হাতব্যাগ থেকে না বলে টাকা নেইনি। কারণ যদি প্রয়োজন থাকে তাহলে বললেই তারা নিজে থেকেই দিবেন। আর যদি প্রয়োজন না থাকে তাহলে সংসারের সীমিত টাকা থেকে নিতে যাবোই বা কেন? এই শিক্ষাটা বাবা-মায়ের কাছ থেকেই পাওয়া। একই স্বভাব এখন আমার ছেলের মধ্যে দেখি। কখনই না বলে একটি টাকাও সে ধরে না।

বাইরে বিনোদন মানে মাঝে মধ্যে সিনেমা দেখা আর রমনা পার্কে ঘোরা, নিমতলীর জাদুঘরে বা বলধা গার্ডেনে যাওয়া, ঈদের ও মহরমের মেলায় যাওয়া, লক্ষ্মীবাজারে ও বনগ্রাম লেনে পূজো দেখা। অত দামি দামি খেলনার বায়নাও নেই। মাটির পুতুল, কাঠের পুতুল, হাঁড়ি পাতিলের সেট, দুয়েকটি প্লাস্টিকের পুতুল, টিনের তলোয়ার, প্লাস্টিকের পিস্তল, একটি তিনচাকার সাইকেল, বিদেশ থেকে এক আত্মীয়ের এনে দেওয়া একটি বড় ডল। বার্বিডলের নামও শুনিনি তখন।

সংসারে কিছুটা অভাব বা টানাটানি নিশ্চয়ই ছিল, কিন্তু তা নিয়ে অভিযোগ ছিল না মায়ের এবং আমাদের। কোন ঝগড়াঝাঁটি, বকাবাজি কিছুই নেই। আমার শৈশব ছিল অতি শান্তির, আনন্দের, সুস্থ মানসিকতার, সুস্থ পরিবেশের।

আমার মনে হয় আজকাল মানুষের মধ্যে অন্যায় চাহিদা ভয়ংকরভাবে বেড়ে যাওয়াতেই দুর্নীতি এতো বেড়েছে। কেউ তার বৈধ অবস্থানে এবং উপার্জনে সন্তুষ্ট নয়। এখন সকলের বড় বড় অ্যাপার্টমেন্টে থাকার শখ। দেশে-বিদেশে বেড়ানোর মোহ। ছোট গাড়ি নয়, লেক্সাস না হলে চলে না। ছেলে মেয়েদের বিদেশে পড়াতেই হবে নাহলে স্ট্যাটাস থাকবে না। কিন্তু সকলেই তো আর বৈধ পথে এতো উপার্জন করতে পারে না। তখন শুরু হয় দুর্নীতি।

আর ভ্যালুজও বদলে গেছে। কেউ প্রশ্ন করে না (এমনকি পরিবারের সদস্যরাও নয়) যে এতো টাকা কোন পথে উপার্জিত হচ্ছে! যে পুরুষ বা নারী দুর্নীতি করছেন তার ছেলেমেয়ে বা স্পাউসও জিজ্ঞাসা করছে না, তুমি এগুলো কোথায় পেলে?

আগে দুর্নীতিবাজ বা ঘুষখোরের বাড়িতে কেউ ছেলে-মেয়ে বিয়ে দিতে চাইতো না। এখন উল্টো। মনে আছে আমাদের পাড়ায় রেশন শপের মালিককে একবার পাড়ার লোক ঘেরাও করেছিল। কারণ সে ব্ল্যাকে রেশনের চিনি বিক্রি করে দিয়েছিল। ধরা পড়ায় সেকি হই হল্লা। ওই লোকের টাকা ছিল ঠিকই, কিন্তু কোন সম্মান ছিল না।

আশির দশক থেকে অবশ্য ভ্যালুজগুলো চারপাশে কিছুটা বদলে যাচ্ছিল, টাকার পিছনে দৌড়ানো আর দুর্নীতিবাজের সম্মান বাড়ছিল, কিন্তু আমাদের বাড়িতে তার ছায়া পড়েনি। ১৯৮৮ সালে আমার ভাই ব্যাংকে চাকরি পেলেন। ব্যাংকের দুর্নীতির কথা তো সকলেরই জানা। অথচ এতো বছরেও ভাইয়া এক টাকাও ঘুষ খাননি। মনে আছে ভাই তখন শিল্পঋণ বিভাগে ছিলেন। সেখানে ঘুষ বৃষ্টির মতো ঝরে।

বাবা শিখিয়ে দিয়েছিলেন, ‘টাকা দিতে চাইলে বলবি, আমার মুরুব্বির নিষেধ আছে।’ ভাইয়া সেকথা তার চাকরি জীবনে অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলছেন। আমি সত্যিই খুব প্রাউড ফিল করি যে আমার ভাই এবং মা-বাবা সততার সঙ্গে চলতে পেরেছেন। ভাগ্যিস আমি কোন দুর্নীতিবাজ পরিবারের মেয়ে নই। মা-বাবা নির্লোভ ছিলেন বলেই আমরা ভাইবোন কেউ লোভী হইনি।

আমার মনে হয়, আজকাল মানুষের মধ্যে এই লোভটাই খুব বেড়ে গেছে। সমাজের একবারে প্রান্তিক স্তর থেকে উচ্চস্তর অবধি এই লোভ, অবৈধ অর্থের প্রতি তীব্র আকর্ষণ বেড়েই চলেছে। যে যেভাবে পারছে ধান্দাবাজির তালে আছে।

মনে পড়ে একবার এক ধনী আত্মীয়া (তার স্বামী ছিলেন ঘুষখোর) বাবা সম্পর্কে আমার মাকে বলেছিলেন, ‘উনি তো বোকা, তাই টাকা পয়সা করতে পারেননি’। আমার মা মুখের উপর জবাব দিয়েছিলেন, ‘দোয়া করো যেন উনি এরকম বোকাই থাকেন। আর আমার ছেলে মেয়েও যেন বড় হয়ে বাপের মতোই বোকা হয়। অতি চালাকের গলায় দড়ি আমার দরকার নাই’। সেই আত্মীয়া আর দ্বিতীয় মন্তব্য করার সাহস পাননি।

এখন আমার মনে হয়, মা বড় খাঁটি কথা বলেছিলেন। এই দেশে এখন বোকা মানুষের খুব দরকার। চালাক তো অনেক দেখলাম। সমাজের সর্বস্তরে এখন যদি বোকা মানুষদের দেখা পেতাম!

শেয়ার করুন:
  • 5.8K
  •  
  •  
  •  
  •  
    5.8K
    Shares

লেখাটি 0 বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.