ধর্ষণ যখন বাংলা সংস্কৃতির বিনোদনের দর্শন

0

মুশফিকা লাইজু:

বলার অপেক্ষা রাখে না যে, কোনো সভ্য জাতির প্রধানতম বিনোদন হলো তার সিনেমা শিল্প। এখানেই জাতির বিবেক, মূল্যবোধ, ঐতিহ্য ও তার সাংস্কৃতিক ভাবনা প্রস্ফুটিত হয়। সিনেমা শিল্প একটি জাতির ইতিহাসের সাক্ষ্যও বহন করে থাকে।

আর আজ এই ২০১৯ সালে আমরা যে ধর্ষণ-সহিসংতা দেখে আতংকিত, হতবিহ্বল- এর প্রতিরোধ প্রায় অপ্রতিরোধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে তার শিকার বাঙালীর জীবনে অনেক গভীরে বিস্তার হয়ে আছে। যার প্রধানতম ভূমিকা পালন করেছে বাংলা সিনেমা। যার বেশিরভাগই ১৯৭১ সালের পরে নির্মিত। একদল নির্মাতা, দর্শকদের সস্তা উষ্ণতা দেয়ার জন্য বিনোদনের দর্শন হিসেবে ধর্ষণকে উপস্থাপনা করেছে। তার ধারাবাহিকতা আজও চলমান।

মুশফিকা লাইজু

বহু বছর ধরে সচেতনভাবে বাংলা সংস্কৃতিকে ব্যবহার করে বিনোদনের মাধ্যম চলচ্চিত্র শিল্পের মাধ্যমে ধর্ষণের-কর্ষন করেছে। চলমান বাস্তবতায় এই সমাজে সেটা বহন করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। এই সমাজ তা থেকে কোনো শিক্ষা না নিয়ে বরং খারাপ কাজটিকেই চর্চা করছে। বিষয়টি এমন এক পর্যায়ে গিয়ে এখন পৌঁছেছে যে তা থেকে মুক্তি পাওয়া মোটেই সহজতর নয়। তাই আজ যতই সোচ্চার হই না কেন ধর্ষণের বিভৎসতা থেকে উদ্ধার পাওয়া কঠিন।

’৭৫ পরবর্তী সিনেমা, যাত্রাপালা এবং সাকার্সের কথা মনে পরে, যখন বাবা-চাচা এবং খালাদের কোলে-কাঁখে চড়ে বাঙালী বিনোদনের এই তিন মাধ্যমে আমার বিচরণ ছিল অবারিত। সেই বিনোদন থেকে যে শিক্ষা আমার মানসপটে স্থায়ী হয়ে আছে তা হলো- নায়িকা মানেই একজন অসহায় নারী, তার সতীত্বই তার ক্ষতির কারণ। এবং নারী মাত্রই ধর্ষণের শিকার হতেই পারে। কারণ পুরুষের লালনা চরিতার্থ করার একমাত্র বস্তুই যে নারী।

সেই সময় থেকে এই সময় পর্যন্ত সিনেমার গল্পের একটি কমন অবকাঠামো এমন যে- একটি ছেলে, একটি মেয়ে, একজন খলনায়ক, প্রেমে বাঁধা এবং ছেলে-মেয়ের প্রেমের বাঁধার অনুষঙ্গ হিসেবে ভিলেনের আগমন ও নিশ্চিত একটি ধর্ষণ দৃশ্য। শেষে প্রেমিক-প্রেমিকার মিলন। বাংলাদেশের শতকরা ৮০ ভাগ সিনেমা ধর্ষণ দৃশ্য ছাড়া কল্পনাও করা যায় না। আর এই ধর্ষণ দৃশ্যের পেছনে নির্মাতা ও পরিচালকের যে দর্শন কাজ করে তা হলো প্রথমত: পুরুষের অবদমিত ধর্ষকামিতাতে উস্কে দেয়া।

নারীরা অবলা-অসহায়, সতীত্বই তার প্রথম ও প্রধান সম্পদ। সেই ট্যাবুকে প্রতিষ্ঠিত করা এবং জীবনের বিনিময়ে যা রক্ষা করতে হবে। ভিলেন মনে করে, যেকোনো মূল্যের বিনিময়ে নায়িকাকে ধর্ষণ করতে পারলেই নায়িকা অপাংক্তেয় হয়ে যাবে। নায়ক আর তাকে গ্রহণ করবে না। সুতরাং নায়িকা চিরদিনের জন্য তার হয়ে যাবে। অত:পর সেই পুরুষ নায়কই তার (নায়িকার) শেষ ভরসা। নায়ক বিপুল বিক্রমে ভিলেনকে পরাজিত করে নায়িকার সতীত্ব রক্ষা করে জয়ের হাসি হাসেন। চার দশক ধরে মোটামুটি বাংলা সিনেমার গল্পের উপরি কাঠামো এমনই। যাত্রাপালার গল্পও এই অবকাঠামো থেকে বের হতে পারেনি। মানে সিনেমায় দেখানো ধর্ষণ-পথে হেঁটেছে এদেশের যাত্রাপালাও।

বাংলাদেশে স্বাধীনতার আগে এবং পরবর্তীতে ৬/৭ দশক ধরে সাধারণ গণমানুষের বিনোদনের একমাত্র মাধ্যম ছিল এই সিনেমা। পাশাপাশি যাত্রাপালাও খানিকটা তাদের বিনোদনের জায়গা পূরণ করতো। সুতরাং এতো দীর্ঘ সময় ধরে নানা শ্রেণীর দর্শকদের চিন্তা-চেতনায়, অস্থি-মজ্জায়, মেধা-মননে বিনোদনের নামে ধর্ষণের চাষাবাদ করা হয়েছে।

বিষয়টি এমন নয় যে সকলে ধর্ষণ করে কিংবা সকলেই ধর্ষণের শিকার হয়। তবে বিষয়টি এমনভাবে উপস্থাপনা করা হয়েছে যে চলতি জীবনে ধর্ষণ কোনো গর্হিত কাজ নয়, জীবনে চলার পথে এটা স্বাভাবিক একটি প্রক্রিয়া। বিষয়টি ভীষণ যেন আটপৌড়ে।

আর এই ধর্ষণ দৃশ্যের প্রাক-মুহূর্তে ভিলেনের যে পৌরুষ্যে পরিতৃপ্তি, যে বিক্রম তা পুরুষমাত্রই মস্তিষ্ক দিয়ে উপভোগ করেছে। অন্যপ্রান্তে নারী অসহায়, তার পেশীশক্তি নেই। কুমারিত্বই তার একমাত্র সম্পদ। এবং সে সর্বদাই ঝুঁকিপূর্ণ, পাপের আধার, সর্বনাশী ইত্যাদি ইত্যাদি।

বাংলা সিনেমার বহু ব্যবহৃত কিছু সংলাপ, ‘বাণী চিরন্তনী’র মত মানুষের মুখে মুখে চলমান ১) হা হা হা… সুন্দরী, এবার তুমি কোথায় যাবে; ২) সুন্দরী এবার তোমায় কে বাঁচাবে; ৩) আমার হাত থেকে তোমার নিস্তার নেই; ৪) ছেড়ে দে শয়তান; ৫) তুই আমার দেহ পাবি, মন পাবি না; ৬) আমি আমার জীবন দেবো, তবু ইজ্জত দেবো না ইত্যাদি ইত্যাদি।

বাংলা সিনেমায় (সাহিত্যের কথা অন্যত্র বলবো) ধর্ষণকে যেভাবে বিনোদনের উপাদান হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে এবং সেই বিশ্বাসের শিকড় মর্মে মর্মে প্রোথিত হয়ে গেছে, সেখান থেকে আজকের বাঙালী পুরুষকে বের করে আনা সময়সাপেক্ষ। পরিতাপের বিষয় এই যে বৃহৎ একটি সময়কাল ধরে এই ঘটনাটি ঘটেছে।

আর মজার ব্যাপার হলো ঠিক, তখন কিন্তু নতুন বাংলাদেশের বিনির্মাণ চলছিল। তখন আমাদের ছিলেন অনেক উৎকর্ষিত নামী-দামী লেখক, সমাজ প্রবর্তক, রাজনীতিবিদ, শিল্পী এবং অনেক প্রজ্ঞাবান মানুষ। প্রশ্ন হলো, কেন কেউ একজন বা একটি বুদ্ধিবৃত্তিক দল, সিনেমা শিল্পে এইসব অনাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ালেন না? কেন তারা বুঝতে পারলেন না আগামী প্রজন্মের উপর এই চিত্রায়িত ধর্ষণদৃশ্য কত মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে! কোনো মানবতা বিরোধী অপরাধ যখন সহজভাবে চোখের সামনে দৃশ্যমান হয় এবং এর প্রতিরোধে কোন কঠোরতা দেখা যায় না তখন আম-জনতা তাকে জলবৎ তরলং হিসেবেই ধরে নেয়।

’৮০ দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত বাংলাদেশের উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত এবং নিম্মবিত্ত সবশ্রেণীর মানুষই বাংলা সিনেমার দর্শক ছিল। সিনেমার মাধ্যমে তারা জীবনের অনেক অমীমাংসিত প্রশ্নের সমাধান পেয়ে যেতেন। পর্দার অভিনেতা-অভিনেত্রীর সুখে, দুঃখে, হাসি, কান্নায় তারাও হাসতো-কাঁদতো। সিনেমা দেখে মানুষ নির্দোষ আনন্দও পেতো। এর পরবর্তীতেই শুরু হয়েছে নারীর স্বাভাবিক আচরণের ইতিবাচক দিকগুলির মোড় ঘুরিয়ে দিয়ে যৌনতার বাণিজ্য। উপকরণ হিসেবে চিত্রায়িত হয়েছে শরীর প্রধান নৃত্য, নারীর প্রতি সহিংসতা, হিংস্রতা এবং ধর্ষণ দৃশ্য। সাধারণত বলা হয়, কোন দেশের সিনেমা সেই দেশের সমাজের দর্পণ। আমি হলফ করে বলতে পারি তখনও পর্যন্ত কিন্তু বাঙালী সমাজে বাস্তবিক পক্ষে কোন ধর্ষক ভিলেনের গল্প শোনা যেতো না। হিংস্রতা, সহিংসতা যা ঘটতো পুরুষে পুরুষেই। ধর্ষণের মাধ্যমে নারীকে হীন করা প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার মানসিক বিকার বাঙালীর অন্তত: ছিল না।

’৭১ পরবর্তী বাঙালীর একাংশ পাকিস্তানের হিংস্রতাকে অনুসরণ করে বাণিজ্যিক মোড়কে বাংলা সিনেমাকে চটকদার যৌন উত্তেজক করে পুরুষের জিঘাংসাকে, যৌনতাকে, পুঁজি করেছে বাজার ধরার জন্য। এমনিতেই যুদ্ধবিধ্বস্ত কোনো দেশে জীবনের অনেক জটিলতার মধ্যে পড়ে মানুষেরা মূল্যবোধ সংকটে ভোগে, পুঁজিবাদীরা সাধারণ মানুষের সেই মনোজাগতিক শূন্যতাকে রঙিন সুতোয় বুনে দিতে সচেতনভাবেই সিনেমা শিল্পকে কাজে লাগিয়েছে। আর এটা কে না জানে যে, একমাত্র সিনেমা দিয়েই অতি দ্রুত সাধারণের কাছে পৌঁছানো যায়!

বাংলাদেশের মতো স্বল্প শিক্ষিত দেশের পুরুষদের বড় একটা অংশ নারীকে দমন, নারীকে পীড়ন, এবং নারীকে ধর্ষণ করা, একটি সহজ সাধারণ নিত্যকার ব্যাপার মনে করে মস্তিষ্কে ধারণ করে ফেলেছে। তার সবচেয়ে বড় প্রভাবক ছিলো বাংলা সিনেমা।

আজ যখন বাংলাদেশে ধর্ষণ-সহিংসতা রোধ শাসকদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে, আইন, বিচার, এবং সামাজিক সচেতনতা দিয়েও আমরা এই ব্যাধি থেকে নিস্তার পাচ্ছি না। এমনি অবস্থায় আমাদের প্রয়োজন হয়ে পড়েছে সময় বিশ্লেষণের।
সে বিষ বৃক্ষ আমরা অবচেতন মনে বেশিরভাগ পুরুষ প্রজাতির মাথায় বপন করেছি তা সমূলে উৎপাটন করা সহজ তো নয়ই, দু:সাধ্যও বটে। কারণ ধর্ষণকে তো আমরা বাঙালী জাতির ঊষালগ্নে বিনোদনে দর্শন হিসেবেই ব্যবহার করেছি।

শেয়ার করুন:
  • 342
  •  
  •  
  •  
  •  
    342
    Shares

লেখাটি ৬১৮ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.