পতাকার ওই মেয়েটিকে আমি চিনি

0

সুপ্রীতি ধর:

সোনিয়ার সাথে আমার দেখা হয়েছিল দোকানে ঘুরতে ঘুরতে। হঠাৎই বাংলায় কথা শুনে আমিই আগ বাড়িয়ে কথা বলেছিলাম সেদিন। তারপর একসাথে কফি পান। ওইটুকুই। নিজ শহরে ফিরে গিয়ে সোনিয়া আমাকে ফেসবুক বন্ধু করে নেয়। টুকটাক কথা হতো বিভিন্ন পোস্টে। তেমন গুরুত্বপূর্ণ কিছু না। কিন্তু একরাতে সে আমাকে ফোন করে পরিচয় করিয়ে দেয় বাংলাদেশি এক মেয়ের সাথে, নাম নাজমুন নাহার। মেয়েটি নাকি ‘দেশ ঘুরে বেড়ায়’। অমন করে কতজনই তো বিভিন্ন দেশ ঘুরে বেড়ায়, এটা আর এমনকি!

অনেক কথা হয়, এমনভাবে হয় যেন আমরা অনেক চেনা দুজনের। ‘দেখা হবে’ বলে একসময় ফোন রাখতে হয়। অনেকবার প্ল্যান করেও দেখা হয়নি, একদিন হঠাতই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি ওর শহরে যাবার। ব্যস, মাত্র এক ঘন্টার পথ ট্রেনে।

নাজমুন নাহার

নাজমুনের নাম আগে থেকেই শোনা, সেও আমাকে চেনে ওভাবেই। অত:পর নাজমুনের মেসেজ,

স্টেশনে কী করে চিনবেন আমাকে?
-তোমাকে না চেনার তো কিছু নেই! অনেকের মাঝে দেখলেও তোমাকে চেনা যাবে, এমনটাই তুমি। বলি আমি।

এবছরই শীতের এক শুভ্রস্নাত সকালে যখন আমি ওর শহরে যাই, স্টেশনে ও এসেছিল আমাকে নিতে। ছোট্ট ছিমছাম শহর এসকিলসতুনা। সুইডেনের সব শহরই এমন সুন্দর, সাজানো। শীতে এক রূপ, গ্রীষ্মে আরেক, শরতেও আরেক। আমরা কথার পিঠে কথা বলি আর হাঁটি। পরদিন সে দেশে যাবে, তারই প্রস্তুতিমূলক কিছু কাজ আমাকে সাথে নিয়েই সেরে ফেলে। আমার মাথায় ঘুরতে থাকে একটা লেখা। কোথা থেকে শুরু করবো ওকে নিয়ে!

ওকে খেয়াল করি আমি গোপনে। যে মেয়েটি বিশ্বের এতোগুলো দেশ ঘুরে বেড়িয়েছে এরই মাঝে, আরও ঘুরবে বলে পণ করেছে, সে আসলে কেমন! আমাদেরই মতোন! নাকি অন্য কোনকিছু! খুব টাকাওয়ালা সে? আধুনিক, ধার্মিক, মানবিক, নারীবাদী? কোনটা সে? আমি আসবো বলে আগে থেকেই সে রান্না করে রেখেছে, নিমন্ত্রণ করে রেখেছে ওই শহরের জনাকয়েককে। তারাও খাবার নিয়ে আসবে। জম্পেশ একটা আড্ডার গন্ধ পাই। খাওয়া শেষে অনেক রাত জেগে আমাদের কথা হয়। পৃথিবীর তাবত বিষয় নিয়ে কথা বলি।

সে এবছর ‘অনন্যা শীর্ষ দশ’ পুরস্কার পেয়েছে মার্চে। এই খবরটি নিশ্চিত হওয়ার পর আমাকেই নাকি প্রথম জানিয়েছিল। প্রতিটি প্রাপ্তিই মানুষকে সীমাহীন আনন্দ দেয়। সেখানে এরকম পুরস্কার সত্যিই অনন্য। অনেকদিন ধরে সে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত ঘুরে বেড়াচ্ছে। ক্লান্তিহীন এই ঘুরে বেড়ানোতে শুধুমাত্র দেশ দেখা বা নতুন নতুন দেশের মাটি স্পর্শই নয়, প্রতিটি দেশে গিয়ে নিজের পতাকাকে পরিচিত করানো, বিশ্ববাসীর কাছে বাংলাদেশের অস্তিত্ব তুলে ধরাই তার লক্ষ্য।

৪৮ বছর বয়সী একটা দেশ যখন জরা-ব্যাধি-সন্ত্রাস-মৌলবাদ আর দুর্নীতিতে প্রাণপন চেষ্টা করে যাচ্ছে ‘খ্যাত’ হবার, তখন সেই মুহূর্তে সেই দেশের একটি মেয়ে, একজন নারী তার চারপাশে ঘিরে থাকা আজন্ম সব আগল ভেঙে স্বপ্নপূরণের পথে ছুটে চলেছে এক দেশ থেকে আরেক দেশ, সাগর-মহাসাগর পেরিয়ে, মহাদেশের সীমানা ছাড়িয়ে। আমাকে অভিভূত করে রাখে নাজমুন। সাধারণের মাঝেও সে অসাধারণ। তার বিনয়, কথা, চলা, রান্না, বন্ধুত্ববোধ, প্রশংসার শক্তি সবই আমাকে মুগ্ধ করে।

একদিনের জায়গায় দুদিন থেকে আসি ওর ওখানে। দুজন দুজনকে ছুঁয়ে থাকি। ও কথা বলে যায় অনর্গল। আমি শুনি। প্রশ্ন যেহেতু সে করে না তাই উত্তর দেবারও বাধ্যবাধকতা নেই আমার। আমি হাসি। আর ওর প্রতিটি কথাই আমার না করা প্রশ্নগুলোর উত্তর হয়ে উঠে। বাবার প্রতি তার শ্রদ্ধা, ভালবাসা, বাবার কাছ থেকে পাওয়া শিক্ষা যে তাকে আজ পৃথিবীর পথে বের করে এনেছে, এটা জানা হয় আমার। আরও জানা হয় পরিবারের সবার কাছে সে কতোটা আদরের। একটা পরিবার যে একজন মানুষকে গড়ে তোলে, এগিয়ে নিয়ে যায় সাফল্যের পথে, এই কথাগুলো ওর কাছ থেকে শুনতে শুনতে নিজেকেও আমি সেই উচ্চতায় ভাবতে শুরু করি, কেবল বাকি থেকে যায় পাশে থাকার মতোন পরিবারের মানসিকতাটুকু। নিজের ব্যর্থতার জায়গাগুলো তখন চিহ্নিত করতে পারি।

ও বলে যায় একের পর এক দেশ ভ্রমণের গল্প। আফ্রিকার গল্প, পদে পদে আপদ-বিপদের গল্প। পাহাড়ের উচ্চতা থেকে সমুদ্রের তলদেশ, মরুভূমি-মালভূমি-সমতল, গহীন জঙ্গল পেরিয়ে যাওয়ার গল্প। কল্পনায় আমি নিজেও ভাসতে থাকি সেইসব দেশে। যদিও জানি এসব কেবলই স্বপ্ন। ওর সাথে আমার চুক্তি হয় কোনো একটা দেশে আমরা একসাথে যাবো। জানি না ও নেবে কীনা!

হালকা, ছিমছাম গড়নের মেয়ে নাজমুন। প্রচণ্ড আত্মপ্রত্যয়ী, সিদ্ধান্তে অটল এবং সময়ানুবর্তী। দেশে যাওয়া উপলক্ষে তার গোছগাছ দেখেই বুঝি যে, এরকমটি না হলে এতো এতো দেশ কারও পক্ষে ভ্রমণ করা সহজ নয়।

নিজেকে সে পর্যটক বলবে, নাকি অভিযাত্রী বলবে! শেষপর্যন্ত অভিযাত্রীতে এসেই থামে সে। কারণ তার দেশ ভ্রমণ কেবলমাত্রই মাটি স্পর্শ নয় তার কাছে। সেইসব দেশের আলোচিত স্থানগুলো সে ঘুরে আসে।

দুদিন থেকে আমি চলে এলাম আমার শহরে, ও গেল দুবাই হয়ে নিজ দেশ বাংলাদেশে। তারপরেরটা মোটামুটি ইতিহাস বলা চলে। একের পর এক সংবর্ধনা, পুরস্কার প্রাপ্তি, অডিও-ভিডিও-সাক্ষাতকারে ও ভরে উঠে। তারপরও সময় করে দু’একটা মেসেজ আদান-প্রদান হয় আমাদের, কথাও হয়। ও জানায় সবসময় তার কী কী কাজ সামনে। নাজমুনের ফেসবুক প্রোফাইল আমি খেয়াল করি। যত মানুষই তার পোস্টে মন্তব্য করুক না কেন, সবাইকে সে সময় নিয়ে উত্তর দেয়, উপেক্ষা তার চরিত্রে নেই। এড়িয়ে যাওয়াও নেই।

এরই মাঝে সে কানাডার সীমান্ত ছোঁয়ার মধ্য দিয়ে ১৩০টি দেশ অতিক্রম করেছে। নিজ দেশের পতাকাকে সে উড়িয়ে এসেছে প্রতিটি দেশে। সবাই তাকে চেনে ‘পতাকা কন্যা’ বা ‘ফ্ল্যাগ গার্ল’ বা ‘তারুণ্যের আইকন’ হিসেবে একনামে। আমিও পতাকার ওই মেয়েটিকে চিনি, সে নাজমুন, অনেকের মাঝে অন্যতম, যার স্বপ্ন আরও অনেক কিছু ছাড়িয়ে যাবার।

এই মুহূর্তে সে আমেরিকাতে আছে। সুইডেন থেকে আমেরিকায় যাবার পথেই বড় ভাইকে অকালে হারিয়েছে। তার লেখায় সেই কষ্টটা আমাদেরও ছুঁয়ে গেছে। যেহেতু সব আগে থেকেই প্ল্যান করা ছিল, তাই তার আর ফেরানো হয় না।

আমেরিকাতে সে ‘মিস আর্থ কুইন অ্যাওয়ার্ড’ পেয়েছে। আমাকে এক ফাঁকে ইনবক্সে জানিয়ে রেখেছে সেই খবর। ভালো লাগে ওর অসামান্য সব সাফল্যের কথা শোনে। আমি মানুষটা অদৃষ্টবাদী, ভাগ্যে বিশ্বাসী ছোটবেলা থেকেই। পৃথিবীর আরেক প্রান্তে এসে জীবন সায়াহ্নে পৌঁছে যখন নাজমুনের মতোন মানুষদের দেখা পাই, কৃতজ্ঞ থাকি জীবনেরই কাছে।

ওর ওখান থেকে আসার পর থেকেই অনেক চেষ্টা করেও লিখতে পারছিলাম না ওকে নিয়ে। কারণ নতুন করে কী লিখবো এই ভাবনাটাই আমাকে ভাবাচ্ছিল। যাই লিখি বা লিখতে চাই, সবই তো কেউ না কেউ লিখে ফেলেছে। ভাবতে ভাবতেই সময় চলে যায়। নাজমুন তাড়া দেয় লেখার জন্য। আমাকে ডাকে ‘দিদি পাখী’ বলে। কিছুতেই লেখা হয়ে উঠে না, আজও হলো না মনমতো। আসলে ও তো আমার সাংবাদিকতার বিষয় নয়, এমনকি দূর থেকে ঝটপট দেখে এসে লিখে দেয়ার মতোন বিষয়ও নয়।

খবরে পড়লাম, নিউইয়র্কের লং আইল্যান্ড শহরের নাসাউ কলসিয়ামে অনুষ্ঠিত ৩৩তম ফোবানা সম্মেলনের শেষ দিন অর্থাৎ ১ সেপ্টেম্বর নাজমুনকে এই বিশেষ সম্মাননা দেওয়া হয়েছে। এর কারণ হিসেবে লেখা হয়েছে –

বাংলাদেশের লাল-সবুজের পতাকাকে পৃথিবীর পথে পথে পৌঁছে দেওয়ার এক ভিন্ন ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন নাজমুন নাহার। তারুণ্যের আইকন অদম্য সাহসী বীর এই নারীকে দেশের জন্য তার এমন বিরল অবদানের কৃতিত্ব স্বরূপ তাকে দেওয়া হয় এই সম্মাননা। একই যাত্রায় সে নিউইয়র্কে তরুণদের সম্মেলনে অংশ নেয়। ইয়ুথ কনফারেন্সেও ‘গ্লোব অ্যাওয়ার্ড’ এর মাধ্যমে সম্মাননা জানানো হয় তাকে।

পুরস্কারের ঝুলি বেশ বড় নাজমুনের। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো অনন্যা সম্মাননা। জাম্বিয়া সরকারের গভর্নর হ্যারিয়েট কায়োনার কাছ থেকে ‘ফ্ল্যাগ গার্ল’ উপাধি, এ ছাড়া অতীশ দীপঙ্কর গোল্ড মেডেল, জনটা ইন্টারন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড, তিন বাংলা সম্মাননা ও রেড ক্রিসেন্ট মোটিভেশনাল অ্যাওয়ার্ড।

গত ১৯ বছর ধরে চলা এই নিরলস প্রচেষ্টা সম্ভবত সাফল্য পেতে শুরু করেছে এতোদিন পর এসে। অবশ্য অ্যাওয়ার্ড প্রাপ্তিই মুখ্য না নাজমুনের কাছে, একথা বার বার বলেছে সে। তবুও যখন মানুষ তার প্রতি সম্মান দেখায়, ভালবাসা প্রকাশ করে, কার না ভালো লাগে।

নাজমুনের সাথে এক শীতের সকালে, ২০১৯

সেই জানালো, ২০২১ সালের মধ্যে জাতিসংঘের অন্তর্ভুক্ত প্রতিটি দেশ ভ্রমণের মাধ্যমে পৃথিবীর বুকে বাংলাদেশকে পরিচিত করিয়ে দেওয়ার মাইলফলক সৃষ্টি করার স্বপ্ন সে দেখছে তার বিশ্ব ভ্রমণের মাধ্যমে।

আমাদের মেয়েদের শত প্রতিবন্ধকতা, বিপত্তি সত্ত্বেও এই যে একেকটা মেয়ে আগল খুলে বেরিয়ে আসে পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে, তখন মনে হয় যে না, নারীজীবন আমাদের ব্যর্থ নয়। এইটুকু সুযোগই আমরা চাই। নাজমুন আমাদের সেই চাওয়াতে আলো জ্বেলে পথ দেখায়।

স্যালুট নাজমুন, তোমাকে অনেক ভালবাসি। স্বপ্ন যেন ছুঁতে পারো অথবা এমন করেও বলা যায় যে, তোমার স্বপ্নের সমান হয়ে উঠো তুমি।

শেয়ার করুন:
  • 1.3K
  •  
  •  
  •  
  •  
    1.3K
    Shares

লেখাটি ১,২৮৮ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.