একজন সায়ীদ স্যার এবং স্তাবকদলের হিপোক্র‍্যাসি

0

নাসরিন শাপলা:

আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারের ‘শাড়ি’ বিষয়ক লেখাটির প্রতিবাদে অনেক লেখা হয়েছে, অনেক কথা হয়েছে। আমারও যা লেখার ছিলো তা দুই বাক্যে লিখে ফেলেছি। লেবু আর কচলাতে ভালো লাগছে না।

আমার এই লেখাটি মূলত স্যারের ডিফেন্স টিমের সদস্যদের উদ্দেশ্যে। আমার হালকাভাবে একটা বিশ্বাস ছিলো যে, অন্তত স্যারের এই লেখাটিকে কেউ ডিফেন্ড করতে আসবে না। আমার সেই হালকা বিশ্বাস যে কতোখানি পলকা, সেটা বুঝতে লেগেছে মাত্র কয়েক ঘন্টা। ডিফেন্স টিম মাঠে নেমে পড়েছেন তাদের সর্বশক্তি নিয়ে।

তাদের ডিফেন্স হলো-আমরা দলবেঁধে সবাই নাকি বয়স্ক একজন মানীর মান নিয়ে টানাটানি করছি। এখন প্রশ্ন হলো, মান কী জিনিস? ইনাদের ‘মান’ শব্দের প্রয়োগ থেকে আমার কাছে মনে হয়েছে ‘মান’ হচ্ছে এক ধরনের কচু জাতীয় গাছ। এই গাছের সর্বোচ্চ শিখরে যিনি একবার আরোহন করবেন, উনি সারাজীবনের জন্য এক্কেবারে নিশ্চিত। তার আর বিশেষ কোন দায় দায়িত্ব নাই। মান গাছের সর্বোচ্চ শিখরে চড়ে উনি যত বর্জ্যই ত্যাগ করুন না কেন, তা আমাদেরকে হাসিমুখে গ্রহণ করতে হবে। আর একদল স্তাবক দায়িত্ব নিয়েছেন সেই মান গাছের যেন কোন নড়নচড়ন না ঘটে সেটা প্রতিরোধ করার, পাছে মাননীয় এই ধরায় নেমে আসেন। ধন্য এই স্তাবকগোষ্ঠির মাননীয় প্রীতি!

স্তাবকগোষ্ঠীর এই জাতীয় চিন্তাভাবনা আমাকে ভাবায় বটে। সাথে আমি খানিকটা শংকিতও বটে যখন দেখি এই দলে আছেন ছোটবড় ‘সো কল্ড’ বুদ্ধিজীবীর দল।

আসলে অন্যায়ের প্রতিবাদের বিষয়ে আমাদের অনেকের মাঝেই ব্যক্তিগত একটা হিসেব নিকেশ থাকে। যতক্ষণ না কোন অরুচিকর কথা বা অন্যায় আচরণ নিজের দরজায় এসে কড়া না নাড়ে, ততক্ষণ সেটা নিয়ে সবার মাথা না ঘামালেও চলে- এই নীতিতেই যেন অধিকাংশ মানুষ চলছে আজ। যারা মানীগুণী লোকের ছায়াতলেই নিজেদের ইমেজ গড়েন, সেখানে মাননীয়ের ইমেজে দাগ লাগলে তাদের খানিকটা অসুবিধা হয় বইকি।

এর আগেও সায়ীদ স্যারের কথার প্রতিবাদ করে এই দলের নানা বাধার মুখে পড়েছি। প্রবাসী মেধাবী, প্রবাসী শ্রমজীবী, নারী, শাড়ি কিছুই আর উনার জিভের আগলে থাকছে না। আবার সেই প্রবাসীদের আমন্ত্রণেই চলছে প্রবাস ভ্রমণ। ভাবছি স্যারের কথা আর কাজের মাঝের এই স্ববিরোধিতার শেষ কোথায়?

স্খলনবিহীন মানুষ এই পৃথিবীতে হাতে গোনা। মানুষের ভুল থাকবে, ত্রুটি থাকবে এটাই স্বাভাবিক। স্খলনকে কার্পেটের নিচে চাপা দেয়াটাও খুব কাজের কথা নয়। দিলেও তার দুর্গন্ধ ছড়ানো বন্ধ থাকে না। তবে স্খলন স্বীকার করার এবং তার দায়িত্ব নেবার মতো মানসিক দৃঢ়তা দেখানোটা অন্তত আশা জাগায়। তাতে হারানো সম্মান খানিকটা ফিরেও আসে। স্তাবকেরা বরঞ্চ এই লাইনে চিন্তা করে দেখতে পারেন। না হলে ভবিষ্যতে আপনার মেয়ে বা বোনের শাড়ির ভাঁজে কেউ সাহিত্য আর সংস্কৃতির নামে বাঁক খুঁজলে মুখটা কোথায় লুকাবেন, সেই জায়গাটা মনে মনে ঠিক করে রাখলে ভালো হয়।

তবে এর মাঝেও ভালো লেগেছে দেখে যে এবার প্রতিবাদটা শুধু নারীদের কাছ থেকে নয়, এসেছে পুরুষদের কাছ থেকেও। সুতরাং আশা ছাড়ার এখনও কিছু হয় নাই। এই সমাজে এখনও এমন পুরুষ আছেন যারা সায়ীদ স্যারের এই লেখার মাঝে তাদের মায়ের অবমাননা দেখেন, বোনের অবমাননা দেখেন, মেয়ের অবমাননা দেখেন, আর সর্বোপরি মানুষের অবমাননা দেখেন। তাদের জন্য ভালোবাসা।

আর হ্যাঁ, একটা কথা- এই লেখা পড়ে দয়া করে আবার কেউ আমাকে নারীবাদী ট্যাগ লাগাবার চেষ্টা করেন না। কথা দিচ্ছি স্যারের মেধা, প্রজ্ঞা আর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের মতো মহাযজ্ঞ বাদ দিয়ে কেউ যদি উনার পাঞ্জাবি, সিক্স প্যাক বা উচ্চতা নিয়ে কোন বিদ্রুপ করার চেষ্টা করে, সেক্ষেত্রেও আমার কলম একইভাবে তার প্রতিবাদ করবে।

শেয়ার করুন:
  • 502
  •  
  •  
  •  
  •  
    502
    Shares

লেখাটি ২,৮৭৬ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.