সাহিত্য বোধহীন বেরসিক বাঙালী নারী

0

সামিনা আখতার:

আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদের ‘শাড়ি’ নিয়ে প্রচুর লেখালেখি হয়েছে, পুরোটাই ছিল প্রতিবাদ। তাই লেবু কচলানো হবে মনে করে ক্ষান্ত দিয়েছিলাম। তবে আবার কলম ধরলাম এই জন্য যে, যে প্রতিবাদ করা হয়েছিল সেটা ঠিক নয় বলে কেউ কেউ নতুন করে মাঠে নামলেন। তাদের বক্তব্যের সারমর্ম হলো, এই লেখাটিতে তারা কোনো সমস্যা দেখতে পাচ্ছেন না। বরং এটি একটি সাহিত্য। আর একজন সাহিত্যিক সৌন্দর্য্যের বর্ণনা দেবেনই।

তবে এ নিয়ে যত লেখা এসেছে তার ৯৮-৯৯ ভাগ এর বিরুদ্ধে বলেছে আর ১-২ ভাগ এর পক্ষে। তো এই অবস্থাটিকে কী বলবো? সাহিত্যটির দুর্বলতা নাকি আমরা বেশিরভাগ মানুষ বিশেষ করে নারীরা সাহিত্য বুঝি না?

সামিনা আখতার

যে নারীর সৌন্দর্য্যের বর্ণনা করা হয়েছে বলে বলা হচ্ছে সেই নারীই যদি সেটা প্রত্যাখ্যান করে এবং সেটাকে গুরুত্ব না দিয়ে যদি জোর করে বলা হয় এটি সাহিত্য, তবে তো জিজ্ঞেস করতেই হয়, নারীর সৌন্দর্য্য বর্ণনা বা নারীর অন্য বিষয় নিয়ে যে সাহিত্য তা আসলে কী? সেটা কি এমন, যে একজন সাহিত্যিক পুরুষের দ্বারা বর্ণিত নারীর সৌন্দর্য্য যা অন্যকিছু পুরুষ বা পুরুষ সাহিত্যিকরাই পুলকিত হোন, পছন্দ করেন, কিন্তু সমসাময়িক নারী-পুরুষ এমনকি শিক্ষিত নারীরাও তা গ্রহণ বা পছন্দ করলো কী করলো না, তাতে কিছু এসে যায় না!তাহলে তো বলতেই হয় সাহিত্যের নামে এ এক সামন্তবাদী চিন্তা।

বিবিসি বাংলায় প্রকাশিত এই পক্ষের লেখাগুলো থেকে যদি উদ্ধৃতি দেই;
শংকর মৈত্র তার ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, ‘লেখাটি পড়ে আমি মুগ্ধ হয়েছি। আমিও মনে করি শাড়িতে বাংগালী নারীর যে রুপ ফুটে ওঠে, অন্য কোনো পোশাকে তেমনটি হয় না।’

আমি বলতে চাই, আসলে কি লেখাটির সারমর্ম এমন সহজ চিরায়ত কথন ছিল? নাকি প্রকারান্তরে বলা হয়েছে যে ৯০ ভাগ বাংগালী নারীর (যদি তার উচ্চতা বিষয়ক তথ্যকে ধরি) শারিরিক গঠনের দৈন্যতা বা খুঁতগুলোকে ঢাকবার এক মোক্ষম অস্ত্র হচ্ছে এই শাড়ি!
আসলেই কি তাই? আবহমান কাল ধরে বাংগালী নারী তাহলে এই ফাঁকিই দিয়ে এসেছে বাংগালী পুরুষদেরকে? চরম রেসিস্ট মন্তব্য কি নয় এটা?

একই লেখায়(বিবিসি) এসেছে ব্রাত্য রাইসু লিখেছেন,’যেই লোক সৌন্দর্য্যে বিশ্বাস করে না তারে কেউ জোর করতে যাবে না নিশ্চয়ই। কিন্তু সৌন্দর্য্যে অবিশ্বাসের কারণে যিনি সুন্দরে বিশ্বাস করেন তিনি এর দ্বারা কোন রেসিজম করেন না। … ফলে বেঁটে মেয়েদের চাইতে লম্বা মেয়েরা অধিক সুন্দর, এই দেশে বেশি লম্বা হইলে আবার সুন্দর না। আপনার সোসাইটি এরকমই মনে করে।

তো উপরের মন্ত্যব্যে তিনি প্রতিবাদকারী সবাইকে এই সোসাইটির বাইরে ফেলে দিলেন, কারণ সোসাইটির ভাবনার সাথে তাদের মিল নেই। আসলে কি তাই? নাকি বলা যায় যে সোসাইটির মানুষ এবং তাদের চিন্তার বদলকে এই প্রবন্ধ ধরতে পারে নাই!

প্রসংগত বলি পৃথিবীতে গতানুগতিক সৌন্দর্য্যের ধারণাগুলো ক্রমেই পাল্টাচ্ছে।সাম্প্রতিক কোনো একটি দেশে (ঠিক মনে নেই কোথায়) একজন পঙ্গু গর্ভবতী নারীর ভাস্কর্য করা হয়েছে। অনলাইনেও হরহামেশাই এখন চোখে পড়ে এমন ছবি।

অথচ বাংলাদেশে সাহিত্যের রসিক মানুষটিও যখন বেশিরভাগ বাংগালী নারীর শারীরিক সৌন্দর্য বর্ণনার নামে রগরগে লেখা লিখলেন, এবং দৈন্যতাকেই তুলে ধরলেন তখন বাকি কাঠখোট্টা মানুষেরা বাংগালী নারীদেরকে কী বলবে?

আমি তো এতোদিন জানতাম সাহিত্য হচ্ছে “কালো তা সে যতই কালো হোক দেখেছি তার কাল হরিণ চোখ!’’ আর বোবা মেয়েও সুভাষিনী!

নাকি সাহিত্য হচ্ছে আপামর জনতা যেভাবে গুঙ্গি, খাট্টুস, ল্যাংড়া, মোটকা, পেটকা, দ্যাড় বেটারি ইত্যাদি বলে এবং একটা বিরাট অংশকে প্রান্তিক করে ফেলে, ঠিক সেইভাবে বর্ণনা করা?

যারা এই লেখাটির পক্ষে বলছেন, তারা পুরো লেখাটির অন্য সবকিছু বাদ দিয়ে শুধু বাঙালী নারী শাড়িতে সুন্দর এই কথাটিকে ফোকাস করছেন। এমন হলে তো ভালোই হোতো। তাহলে এই আমরাও যারা সবদিন না হোক শুধু উৎসবেও শাড়ি পরে না হয় আত্মতৃপ্তি পেতাম এই বলে যে ‘জল-জঙ্গলের দেশের শ্যামা মেয়ে আমি আজ রূপসী রুপালী চাঁদ!’ যেমনটা আমরা দারুণ উৎসাহে পরি পহেলা বৈশাখে!
কিন্তু এখন তো মনে হচ্ছে যে যে পোশাক ফাঁকিবাজি করে আমার শারীরিক দৈন্যতাকে ঢেকে একরকম ফলস সৌন্দর্য্য ফুটিয়ে তুলে সে পোশাক আমার উৎসবেও পরার দরকার কী!

প্রবন্ধটিতে তিনি আরও বলছেন যে বাঙালী নারীরা এই শাড়ি ছেড়ে দিয়েছে। তাহলে তো প্রমাণ হয়েই গেল যে বাঙালী নারী তার শারীরিক দৈন্যতা নিয়ে চিন্তিত নয়, এবং তা ঢেকে কারও মনোরঞ্জনের চেষ্টাও করছে না। বাঙালী নারী ব্যস্ত তার বাস্তব জীবন নিয়ে।

ছবিটি ইন্টারনেট থেকে পাওয়া। কার ছবি জানা নেই, তারপরও যার ছবি তার প্রতি কৃতজ্ঞতা রইলো।

তবে এই লেখার পক্ষের লেখাগুলো দেখে আমার বাঙালী নারীদের আর একটি দৈন্যতার কথা মনে হচ্ছে। সেটি হচ্ছে সাহিত্য আর সৌন্দর্য্য বোধহীন বেরসিক বাঙালী নারী!
তাদের আসলে শাড়ি ছেড়ে দেওয়ার আগে একবার ভাবা উচিত ছিল, সাহিত্যিকরা কী নিয়ে লিখবেন? এইটা তো একটা বি-রা-ট সমস্যা, তাই না?

শেষ করবো উপনিবেশিক আমলে ১৯৩৬ সালে ভারতীয় লেখকদের সংগঠন, প্রগ্রেসিভ রাইটারস এসোসিয়েশন বা প্রগিতিশীল লেখক সঙ্ঘের উদবোধনী অনুষ্ঠানে এর নেতা প্রেম চাঁদের বক্তব্য দিয়ে –

“যে সাহিত্য আমাদের মনে অনুসন্ধিৎসা জাগায় না কিংবা আমাদের আত্মিক প্রয়োজন মেটায় না, যা শক্তিসঞ্চারী এবং গতিশীল নয়, যা আমাদের হৃদয়ে সৌন্দর্যের ফুল ফোটায় না, অন্তরে অঙ্গীকারের শক্তি জাগিয়ে যা আমাদের করালদর্শন বাস্তবতাকে মোকাবিলা করতে শেখায় না– আজকের দিনে সে সাহিত্যের প্রয়োজন ফুরিয়েছে। এমনকি এগুলো সাহিত্য পদবাচ্যও নয়”।।
এই অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রনাথও উপস্থিত ছিলেন!

(বিঃদ্রঃ প্রবন্ধটিতে যৌনতা বিষয়ে যা আছে তার উপর আলোকপাত করি নাই, তা নিয়ে আরও অনেক কথা বলার রইলো)।

শেয়ার করুন:
  • 290
  •  
  •  
  •  
  •  
    290
    Shares

লেখাটি ১,০৬১ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.