‘আলুকিত’ নয়, সাধারণ বাঙালি পুরুষের চরিত্র বিশ্লেষণ

0

শান্তা মারিয়া:

এই লেখা একাধারে স্ট্যাটাস ও সাইকোলজি টেস্ট। কেমনে? সে কথা পুরো লেখা না পড়লে বুঝতে পারবেন না।

বাঙালি পুরুষের চরিত্র বিশ্লেষণ। প্রথমেই বলে রাখি যারা নিছক পুরুষ থেকে মানুষে রূপান্তরিত হয়েছেন তাদের এটা নিয়ে অযথা ক্ষুব্ধ, উত্তেজিত ও রাগান্বিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। এই চরিত্র বিশ্লেষণ আপনাদের উদ্দেশ্যে প্রযোজ্য নয়। তারপরও যদি অহেতুক উত্তেজনা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন তাহলে বুঝবো এভোলিউশন এখনও পুরোপুরি হয়নি। আপনাদের উত্তেজনায় আমার কোন ক্ষতি হবে না, কিন্তু আপনাদের অ্যাসিডিটি বাড়বে এবং ওষুধের দোকানদারের লাভ হবে।

এইটুকু নান্দীপাঠ দিয়ে শুরু করছি। এখন হইতে সাধুভাষা। এই লেখা অতিশয় আলুকিত ‘সাধু পুরুষ’দের বিশ্লেষণ। ‘দুর্বৃত্ত পুরুষ’দের জন্য এই বিশ্লেষণ নয়। কারণ দুর্বৃত্ত পুরুষদের প্রতি আমাদের সংবাদপত্রসমূহ অনেক রোমাঞ্চকর ভাষা ব্যবহার করে। যেমন ‘নরপিশাচ’, ‘নরাধম’,‘বর্বর’, ‘নরপশু’ ইত্যাদি। যদিও এত রোমাঞ্চকর সব শব্দের পরিবর্তে ‘নরপুরুষ’ শব্দটি ব্যবহার করিলেই সব ফকফকা হইয়া যাইতো।

প্রথমেই বলি দাম্পত্য জীবনে বাঙালি পুরুষ রূপবান ও রহিম বাদশাহর রূপকথা দ্বারা দারুণভাবে প্রভাবিত। তাহারা স্ত্রীর নিকট মায়ের সেবা, যত্ন, প্রত্যাশা করেন। আর গৃহকর্মে অংশগ্রহণের সময় তাহারা ১২ দিনের শিশুতে পরিণত হন। (আমি জানি এইখানে অনেকে এখন হারে রে রে করে বলে উঠবেন ‘আমরা তো ঘরের অনেক কাজ করি’। কাজ করেন, ভালো কথা, আমি আপনাদের কথা বলছি না। লেখার প্রথম অংশ দ্রষ্টব্য)।
তাহারা কচি খোকার মতো স্ত্রীর উপরে সব বিষয়ে নির্ভরশীল। বিশেষ করে যখন কর্মক্ষেত্রে যাওয়ার উত্তেজনাময় লগ্নে এক পাটি জুতা অথবা মোজা খুঁজিয়া পাওয়া যায় না। সেই সময় মাতৃরূপা স্ত্রী যদি সামনে থাকে তবেই উদ্ধার। আর স্ত্রী যদি তখন আপন কর্মক্ষেত্রে প্রস্থান করিয়া থাকেন তাহলে কলিকালের বিড়ম্বনায় দীর্ঘশ্বাস ফেলিতে ফেলিতে (আমাকে দেখার কেউ নেই ধরনের এতিম অনুভূতি) দুই পায়ে দুই রকম জুতা অথবা অতি কষ্টে নিচু হইয়া খাটের নিচে উঁকি দিয়া নিখোঁজ বস্তুর সন্ধানে রত হন। খাটের নিচে উঁকি দেওয়ার কারণ হইলো বাঙালি পুরুষ শু র‌্যাকে জুতা রাখার কথা অফিস থেকে ফিরিয়া পাদুকা খোলার সময় স্মরণ করিতে পারেন না। একই রকম এতিম অনুভূতি হয় যখন অফিসে গিয়ে লাঞ্চের সময় টিফিন বাটি খোলেন। ভিতরে রুটি আর সবজি ভাজি দেখিয়া অন্তঃস্থল হইতে দীর্ঘশ্বাস পড়ে। আবার যদি পাশের টেবিলের সুন্দরী কলিগকে লাঞ্চে নেওয়ার প্রস্তাব দেন তখন সেই টিফিন বাটি অতি সত্বর ড্রয়ারে চালান করিতে ভুল করেন না।
মনে রাখিতে হইবে, সেই সুন্দরী কলিগও কিন্তু তাহারই মতো আরেক অবুঝ বালকের মাতৃসমা স্ত্রী। এইখানে জনান্তিকে বলে রাখি, বাঙালি পুরুষ নিজের স্ত্রী, মা, ভগিনীর কাছ হইতে সীতা, সতী, সাবিত্রীর আচরণ প্রত্যাশা করিলেও (কখনও কখনও স্ত্রীকে দেবী দুর্গাও মনে করেন যেন সে দশ হাতে সকল কাজ করে ফেলতে পারে) অপরের স্ত্রী, ভগিনী ও কন্যার কাছ হইতে ঊর্বশী, মেনকা, রম্ভার লীলাময়তা প্রত্যাশা করেন। আর সেই সুন্দরী সহকর্মী যদি ফোন করে নিজের তত্বাবধানাধীন রহিম বাদশাহর খোঁজ খবর নেন, আর তা যদি এই পুরুষের কানে যায় তিনি স্বগত সংলাপ দেন ‘ইশ, সব আহ্লাদ একজনের জন্য গলে গলে পড়ে। জানি না ওই ব্যাটা কিরকম?’
আর যদি সেই নারী তাহার সঙ্গে লাঞ্চে যাইতে ইনকার করেন (কারণ ‘লোকটার গায়ে ভীষণ বদ গন্ধ’) তাহা হইলে বাঙালি পুরুষের মেজাজ সপ্তমে চড়িয়া যায়। কারণ তিনি নিজে প্রত্যাখ্যানের সকল ক্ষমতার নিরঙ্কুশ অধিকারী বলিয়া তাহার মনে শৈশব হইতেই এক প্রকার ভ্রান্ত বদ্ধমূল ধারণা রহিয়াছে।(এইখানে সাইকোলজি কপচাইলাম)।

এবার বাঙালি পুরুষের দৃষ্টি শক্তির জন্মগত ত্রুটির উল্লেখ করি। এটি সম্ভবত তাদের ক্রোমোজমগত সমস্যা।(একটু বিজ্ঞান না কপচালে আজকাল লেখাকে জাতে তোলা যায় না)।

বাঙালি পুরুষের চোখে স্ত্রী, মা, বোন ও কন্যা ব্যতীত সকল নারীই ঐশ্বরিয়া। কিন্তু নিজে যে জনি লিভার সেকথা তারা স্মরণ রাখিতে পারেন না। আরেকটি জিনগত ত্রুটি হইলো, তাহারা কখনও কখনও আমাদের জাতীয় পশু (রয়েল বেঙ্গল টাইগার যে কয়টা অবশিষ্ট আছে কে জানে) আবার কখনও কখনও গৃহপালিত মার্জারের ন্যায় আচরণ করেন। কখনও ঘরে বাঘ, বসের সামনে বিলাই, আবার কখনও ঘরে বিলাই (সমুন্নত ঝাঁটার সামনে) আর অফিসে নারীকে হয়রানি করার বেলায় বাঘ বা শিয়াল।
একই জিনগত ত্রুটি দেখা যায় (এক্ষেত্রে ডুয়েল পারসোনালিটি জনিত) ফেসবুকের ইনবক্স গোপন আলাপ আর প্রকাশ্য স্ট্যাটাসের সময়। বিস্তারিত দাখিলায় গেলাম না। এই অভিজ্ঞতা কমবেশি সকলেরই আছে।

আরেকটি জিনগত ত্রুটি হইলো নারীর স্পর্শ পাইবার জন্য আকুলিত বাসনা। (এই ধরনের আকুলিত, হিল্লোলিত, আবেদনময়ী, রহস্যময়ী, লীলাময়ী, রমণীয় ইত্যাদি শব্দের ব্যবহার দ্বারা আমার এই তুচ্ছ লেখাটিকে একটু আলুকিত করিতেছি)। বাসে, ভিড়ের মধ্যে এই বাসনা মাঝে মধ্যে লাগাম ছাড়া হইয়া ওঠে। তখন কড়া ডোজের ক্যালিফস (পড়িতে হইবে গালিফস) প্রয়োগ করিয়া এই বাসনা দমন করাইতে হয়।

আর আশি বছরের উপরে যেসব লুচ্চা পুরুষ এখনও নারীর শরীর নিয়া বিশ্লেষণে মাতেন তাহারা অনেক সময় বাঙালি পুরুষের ‘গুরু’ শ্রেণীতে পরিণত হন। সেইসব লুচ্চাদের উদ্দেশ্যে ডেঙ্গু মশা তাড়াইবার ঝাড়ু ব্যবহার করার ইচ্ছা পোষণ করিতেছি।
বাঙালি তেতুঁল পুরুষদের বিশ্লেষণ অন্যত্র দিব। তাহাদের জন্য তেঁতুল বিছা চিকিৎসা পদ্ধতির কথাও পরে জানাইব।

আমার লেখা আর দীর্ঘায়িত করিব না। (বাঙালি পুরুষ নিয়ে এতোক্ষণ পড়ে থাকার সময় আছে নাকি?) এই লেখাটি শেষ করার দায় অন্য বন্ধুদের। আপন আপন জীবনের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে এর সঙ্গে যোগ বা বিয়োগ করুন। আর যেসকল পুরুষ বিদ্যালয়ে সরল অংক শেখেন নাই তারা মনে মনে গজরান আর আমাকে গালি দেন। (চুপ করেন, আপনাকে কিন্তু বলি নাই)।

এখন সাইকোলজি টেস্ট। যাহারা ইহা পড়িয়া বাল্মিকী প্রতিভা নাটকের ডাকাত দলের মতো ‘হা রে রে রে’ করিবেন তারা নির্ভেজাল বাঙালি পুরুষ। যারা অন্তরে জ্বলিবেন কিন্তু মুখে কিছু বলিবেন না বরং হাসির ইমো দিবেন তাহারা বিবর্তনের মধ্য স্তরে আছেন। যারা কোনো অন্তর জ্বালা উপভোগ না করিয়াই লেখাটি উপভোগ করিতে পারিবেন তাহারা পুরুষ হইতে মানুষ শ্রেণীতে উন্নীত হইয়াছেন।
পুরুষোত্তীর্ণ মানুষদের জন্য অভিবাদন।

শেয়ার করুন:
  • 558
  •  
  •  
  •  
  •  
    558
    Shares

লেখাটি ২,০৭৬ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.