কর্তৃত্ববাদী সমাজে নারী যখন পুরুষের দাসী

0

ইমতিয়াজ মাহমুদ:

মওলানা গিয়াসউদ্দিন তাহেরি নামের এক ওয়াজকারি মৌলভীর বিরুদ্ধে মামলা করেছেন এক এডভোকেট সাহেব। কেন? ঐ মৌলভীর ওয়াজ উনার পছন্দ নয়। এই তাহেরি নাকি নেচে গেয়ে জিকির করে, নানারকম ঢং ঢাং করে ইঙ্গিতময় কথা বলেন ইত্যাদি।
এডভোকেট সাহেব বলছেন, কিছু কথা যেমন ‘বসেন’ বা ‘ঢেলে দিই’ এই ধরনের কথা নাকি ওয়াজে ব্যবহার করা ঠিক না। এইসবে নাকি উকিল সাহেবের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লেগেছে। তাহেরির কথা ও কাজ নাকি বিদআত। দিয়েছেন মামলা ঠুকে। মামলাটি ফাইল হয়েছে, আদালত আমলে নিয়েছেন কিনা বা কী আদেশ দিয়েছেন সেই খবর নিতেও ইচ্ছে করছে না।

আরও দুইটা খবর রয়েছে। বরগুনার আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নি আর ডাঃ তানজিলা হক চৌধুরী মিতু এই দুইটা মেয়ে হাই কোর্ট থেকে জামিন পেয়েছে আর সরকার পক্ষের উঁকি সাহেবেরা বীরদর্পে ঘোষণা করেছেন যে তাঁরা এই জামিনের আদেশের বিরুদ্ধে আপীল করবেন। এই দুইজনই নারী। একজনের স্বামী নিহত হয়েছে প্রকাশ্য দিবালোকে ঘাতকদের হাতে, আরেকজনের স্বামী আত্মহত্যা করেছে। দুইজনের বিরুদ্ধেই লোকজনের অভিযোগ এরা স্বামীর প্রতি বিশ্বস্ত ছিলেন না এবং অন্য পুরুষের সাথে নাকি ওদের প্রেম ছিল ইত্যাদি। ঘটনাগুলি আপনারা জানেন।

এইসব খবরের একটা সংযোগ আছে, এইসব ঘটনার প্রত্যেকটারই একটা সাধারণ বৈশিষ্ট্য আছে।

আমাদের রাষ্ট্রকে আমরা কর্তৃত্ববাদী একটা রাষ্ট্রে পরিণত করেছি। কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্র কী করে? কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্র পুরো সমাজকে চূড়ান্ত প্রতিক্রিয়াশীল বানায়। সমাজের সর্বত্র এরা কর্তাদের অপছন্দের কোন মতামত চিন্তা কাজ বা কিছুই সহ্য করে না। একটা স্ট্যান্ডার্ড থাকবে। ধর্ম শিল্প সাহিত্য ক্রীড়া সবকিছুতেই পুলিশি নিয়ন্ত্রণ থাকবে। কর্তাদের যেটা পছন্দ, সেটাই সবচেয়ে ভালো, সেটাই চূড়ান্ত- মানব সভ্যতার জন্যে এর পর বা এর ভিন্ন কিছু দরকার নাই। পূর্ণ যতি ফুলস্টপ পিরিয়ড। তো, আপনি যদি কর্তাদের পছন্দের যে ফর্ম বা কন্টেন্ট আছে এর বাইরে কিছু বলেন বা করেন- আপনি অপরাধী- ঢিসুম।

আপনাকে মেরে ফেলা হবে।

ইমতিয়াজ মাহমুদ, আইনজীবী

আর কর্তৃত্ববাদী সমাজে নারীদের অবস্থান কী? নারী নরকের কীট, নারী নোংরা, নারী নরকের দ্বার, সকল সর্বনাশের কারণ ও উৎস নারী- এইটাই হচ্ছে কর্তৃত্ববাদী সমাজে নারীর অবস্থান। কর্তৃত্ববাদী সমাজে নারী হচ্ছে দাসী- পুরুষের দাসী। একদম ক্রীতদাসী যেরকম ছিল আগে- সেরকম দাসী। দাসীর কোনো আনন্দ নেই, ইচ্ছে নেই, আকাঙ্ক্ষা নেই। সেইখানে যদি কোন দাসী শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে তাইলে পুরো সমাজ লাঠি নিয়ে আসবে ওকে মারতে। এতো বড় সাহস ছেমড়ি তোর! আমাদের এতো পুরনো প্রথা ভঙ্গ করিস!

এইজন্য কী হয়। নারীকে শায়েস্তা করতে চান? তাইলে নারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করে দিবেন যে এই নারী অসতী। বলে দিবেন যে এই নারী নিজের জন্যে সুখ আনন্দ বা তৃপ্তি চেয়েছে। ব্যস। যখনই কোন নারীর বিরুদ্ধে এরকম অভিযোগ ওঠে গোটা কর্তৃত্ববাদী সমাজ ওকে মারবে। ব্যস।

এইগুলি ঐ একজন মৌলভী বা একজন মিন্নি বা একজন মিতুর ব্যাপার নয়। এইগুলি হচ্ছে কর্তৃত্ববাদী অসভ্য প্রতিক্রিয়াশীল সমাজের উপসর্গ।

শেয়ার করুন:
  • 142
  •  
  •  
  •  
  •  
    142
    Shares

লেখাটি ৪৩৫ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.