‘অধ্যাপক সাহেবের চোখে নয়, নারীর চোখে পাশ্চাত্যের পোশাক দেখুন’

0

কাজী তামান্না কেয়া:

অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ বলেছেন, বাঙ্গালী নারী খাটো ৷ তাই বর্তমানে যারা পাশ্চাত্যের পোশাক মানে শার্ট, প্যান্ট, স্কার্ট, টপ্স পরছেন, তারা নাকি হাস্যকর আত্মতৃপ্তি নিয়ে বাস করছেন৷

আমি পাশ্চাত্যে সমাজে বসবাস করা এক বাঙ্গালী নারী৷ আমি এই লেখায় একজন বাঙ্গালী নারীর চোখে পাশ্চাত্যের পোশাকে প্রাত্যহিক জীবন যাপন কেমন তা তুলে ধরবো৷ সেই সাথে পাশ্চাত্যের পোশাকের শালীনতা নিয়ে কথা বলবো৷

উনি বলেছেন, ইউরোপিয়ান পোশাক পরা হলো অর্ধ উলঙ্গ ব্যাপার৷ আসুন দেখে নেই আসলেই আমেরিকায় পোশাক বা শালীনতার বিষয়টা কেমন৷

মোটা দাগে বলতে গেলে আমেরিকায় নারীর শালীন পোশাক বলতে বোঝায় হাঁটুর উপর অব্দি ঢাকা, ড্রেসের গলার কাট বেশি বড় না হওয়া, স্লিভলেস ড্রেস হলে উপরে পাতলা সোয়েটার বা আরেক পার্ট জড়ানো৷ অনেকেই হাঁটুতে স্কিন মোজা পরেন যেন সরাসরি স্কিন দেখা না যায় এবং কদাচিত কেউ কেউ গলায় স্কার্ফ পরেন৷ তবে স্কিন মোজা এবং স্কার্ফ একেবারেই গৌণ৷ এই ড্রেস কোড মূলত সরকারি অফিস আদালত, ইউনিভার্সিটি কিংবা এ ধরনের প্রতিষ্ঠানগুলো যারা ড্রেস কোড মেনে চলে বেশি তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য৷

এ দেশে পুরুষের জন্যেও শালীন পোশাক বেঁধে দেওয়া আছে৷ তবে পুরুষেরা কিন্তু সারা পৃথিবীতেই শার্ট, প্যন্ট, কোট আর ছোট চুলের ট্রেন্ড ফলো করে থাকেন, তাই আমেরিকান পুরুষের পোশাক এর বিষয়ে কথা কম বলবো এই লেখায়৷

জাতীয়তা, শালীনতা, শরীরের দোহাই দিয়ে যেদিন পৃথিবী জুড়ে সব নারী একই রকম পোশাক বেছে নেবে, সেদিন হয়তো নারীর পোশাক নিয়ে এত কথা লেখার প্রয়োজনীয়তা থাকবে না৷ দুর্ভাগ্যক্রমে দেশে দেশে নারীরা এখনো নানান রকম পোশাকের জালে আটকে আছে৷

বাংলাদেশ বা মুসলিম দেশগুলিতে নারীর পোশাক নির্ধারকরার স্বাধীনতা কম৷ আর অধ্যাপক আবু সায়ীদের মতো আলোকিত মানুষেরা যখন বাঙ্গালী নারীর স্বাধীন পোশাক পরার অধিকারে শামিল না হয়ে নারীর শরীরের ত্রুটি খুঁজতে বসে যায়, তখন বাঙ্গালী নারী হিসেবে কলম না ধরে আর কী করার থাকে?

আমি একাডেমিয়াতে মানে ইউনিভার্সিটির একটি রিসার্চ সেলে কাজ করি এবং একই বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চতর শিক্ষা নিচ্ছি৷ চার বছর আগে ঢাকা ছেড়ে আমেরিকার বস্টন শহরে রওনা হয়েছিলাম এমএস করার জন্যে৷ সেই থেকে এদেশেই আছি৷ এই স্টেট সেই স্টেট করে এখন সাউথ ক্যরোলিনায় থিতু হয়েছি৷ ওইদিকটা মানে বোস্টনে যখন ছিলাম প্রচণ্ড ঠাণ্ডার হাত থেকে বাঁচতে শার্ট, প্যান্ট, টি শার্ট এর উপর ভারী জ্যাকেট পরতাম ৷

সদ্য বংলাদেশ থেকে এসেছি, তার উপর বরফ শীতল আবহাওয়া৷ ফ্যাশন নয়, ঠাণ্ডা থেকে বাঁচতেই এমন পোশাক বেছে পরতাম৷ সেখানে শালীনতা- অশালীনতার চেয়ে আবহাওয়া ছিল পোশাকের নির্ধারক৷ নারী প্রফেসররা স্কার্ট/ প্যান্ট এর উপর শার্ট পরে৷ আর স্লিভলেস ড্রেস পরলে উপরে কিছু একটা পরে নেয় যেন খোলা বাহু দেখা না যায়৷ অর্থাৎ ‘শালীনতা’ মানে খোলা বাহু না দেখানো, ক্লিভেজ না দেখানো, আর অতি আঁটসাট পোশাক না পরা৷ অধ্যাপক সাহেব যেমন বলেছেন অর্ধ উলঙ্গ, ব্যাপারটা তা নয়৷ বরং নারীর ‘শালীন’ পোশাক এ দেশেও আছে এবং কর্মক্ষেত্রে তা মেনে চলা হয়৷

গ্রাজুয়েশন করে চলে এলাম ওয়াশিংটন ডিসিতে৷ এখানে এসেই মূলত পোশাক নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন এলো৷ আমি এখন আর ক্লাসরুমে বসা গ্রাজুয়েট স্টুডেন্ট নই, বরং কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানে কর্মরত নারী, যেখানে ড্রেসকোড এবং ডেকোরাম মেনে চলার ব্যাপার আছে৷ আমি আমার নারী কলিগদের পোশাক যেমন খেয়াল করি, পুরুষ সহকর্মির পোষাকের দিকেও চোখ বুলাতে থাকলাম৷ এই বেলা বলে নেই, নর্থ ইস্ট ওয়াশিংটন ডিসির যে এলাকায় আমার অফিস, সেটা বেসিক্যালি অফিস এরিয়া৷ এখানে ওয়ার্ল্ড ব্যাঙ্ক, প্রেসিডেন্টের ওভ্যাল অফিস, ওয়াশিংটন পোস্ট নিউজপেপার থেকে শুরু করে মাথাওয়ালা সব প্রতিষ্ঠানের অফিস আছে৷ আমার চলাফেরা এখন শুধু একটি অফিসেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং প্রায়শই বিভিন্ন মিটিং এটেন্ড করতে অন্যান্য অফিসে যেতে হয়৷ এছাড়া চলতে ফিরতেও চোখে পরে অফিস পাড়ার নারী পুরুষের পোশাক৷ আমেরিকান প্রফেশনাল সমাজে নারী পুরুষের পোশাক এ আমি এখন অভ্যস্ত হয়ে পরেছি৷

আমি আস্তে আস্তে মেসিস, জে সি পেনি, টি জে ম্যাক্স এ ঘুরে বেড়ানো শুরু করলাম৷ টিশার্ট আর প্যান্টের বাইরে গিয়ে স্কার্ট, টপ্স এবং ড্রেস কেনা শুরু করলাম৷ বাংলাদেশে থাকতে আমি আমেরিকা বেইজড একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলাম৷ ওয়াশিংটন ডিসিতে একই প্রতিষ্ঠানের ডিসি অফিসে কাজ করছিলাম৷ ডিসি অফিসের কিছু নারী কলিগ যারা বাংলাদেশ অফিস ভিজিট করেছে, তাদের কয়েকজন আমার পূর্ব পরিচিত৷

তাদের একজন একদিন জিজ্ঞেস করলো, তামান্না, তোমাকে আমি বাংলাদেশ অফিসে দেখেছি লম্বা কাপড় চোপড় পরতে৷ আমেরিকায় এসে তুমি শার্ট প্যান্ট পরছো, এতো তাড়াতাড়ি পোশাকে পরিবর্তন আনলে কী করে? তোমার কদিন লেগেছে এইদেশের পোশাকে অভ্যস্ত হতে?

আমি বললাম — শার্ট, প্যান্ট পরেই আমেরিকায় এসেছি৷ একদিনও লাগেনি আমার এদেশের উপযোগী পোশাক পরতে! তোমরা যে পোশাক এদেশে পরো, তার একটা বড় অংশ বাংলাদেশ তৈরি করে৷ তুমি যে শার্ট তিরিশ ডলারে কেনো, আমি তা তিন ডলারে বাংলাদেশে বসে কিনতে পারতাম৷ কিন্তু বাংলাদেশে আমি এসব পরতে পারতাম না লোকের তির্যক চাহনি আর মন্তব্যের কারণে৷ এখানে আসার পর বাঙ্গালী নারীর আর এমেরিকান নারীর পোশাকে ব্যবধান করা ঘুচিয়ে ফেলেছি আমি বহু আগেই৷

এ্যানি (আসল নাম নয়) জানালো, বাংলাদেশে গেলে এয়ারপোর্ট এ নেমে পোশাক বদল করে নিত, গোড়ালি পর্যন্ত প্যান্ট আর গলায় স্কার্ফ জড়াতো সে৷ নারীর শরীরে তির্যক দৃষ্টি দেবার যে বদভ্যাস বাঙ্গালী আয়ত্ব করেছে, আমার এমেরিকান সহকর্মী মাত্র দু একবার বংলাদেশ ভ্রমণ করেই তা জেনে গিয়েছিল৷

এবার আসি তরুণীদের পোশাকের ব্যাপারে৷ দুভাগে ভাগ করা যায় মূলত৷ একদল ভার্সিটিতে পড়ুয়া আর আরেক দল হাই স্কুল পাশ করে উপার্জন এ লেগে যাওয়া তরুণী৷ যারা লেখাপড়ায় আছে, বিশেষ করে আন্ডার গ্রেড, ছেলেমেয়ে উভয়ের পোশাক সামার টাইমে ক্লাসরুমের ভেতরেও টপ্স আর শর্টস৷ ভার্সিটির বাইরের মেয়েরা এই বয়সে বিশেষ করে সামারে খোলামেলা বা আধুনিক পোশাক পরে৷ পার্টিতে বা বন্ধুদের আড্ডায় পোষাকের ধরনে ভিন্নতা আসে৷ কিন্তু উভয় গ্রুপই আবার চার্চে বা ফরম্যাল ইভেন্টে ফরম্যাল হতে জানে ৷

অধ্যাপক সাহেবরা খালি চোখে এই সব ভেরিয়েশনগুলি দেখতে পায় না কেবল৷ পাশ্চাত্য পোশাক মানেই অর্ধ উলংগ পোষাক নয় অধ্যাপক সাহেব!

শেয়ার করুন:
  • 81
  •  
  •  
  •  
  •  
    81
    Shares

লেখাটি ৯২৫ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.