দেশে ‘নারী গবেষণা’র চেয়ে রসালো কিছু নেই!

0

মিলি স্বপ্নময়ী:

আমাদের দেশের পুরুষরা যেভাবে যেখানে সেখানে চাইলেই গায়ের স্যান্ডো গেঞ্জিটাও খুলে ফেলতে পারে সর্বত্র, সেখানে মেয়েদের ভাবতে হয় বুকের ওড়নার একটু কোণাও কি জায়গা থেকে সরে গেলো কিনা! আবার ভাঙা রাস্তাতে লক্করঝক্কর টেম্পু বা বাসে নিজের ব্যালান্স ঠিক রাখতেই যেখানে হিমশিম খেতে হয়, তখনও খেয়াল করলে দেখবেন, মেয়েরা সবার আগে বুকের ওড়নাটাই চেপে ধরে, ওড়নার ঠিক জায়গা ধরে রাখার জন্যে নয়তো ঝাঁকুনির চোটে বুকের উঠানামা রোধ করার বৃথা চেষ্টার জন্যে।

অথচ কিছু বিষয় খুবই স্বাভাবিক, যেমন হাঁটলে যেমন আমাদের দুই পাশের হাত দুলতে থাকে, স্থির রাখা যায় না, কোমর নড়ে, মোটা-চিকন মানুষ ভেদে কারো কোমরের দুলুনি কম-বেশি হয়ে থাকে, (অবশ্য হাঁটার সময় মেয়েদের কোমরের স্বাভাবিক দোলনকেও অনেকেই অস্বাভাবিক মনে করে ভেবেই বসে থাকেন ইচ্ছা করে এমন ঢেউ তুলে হাঁটা, ক্ষেত্রবিশেষে তখন কেউ কেউ সেই মেয়েকে বাঁকা চোখে দেখে বাঁকা মন্তব্য করতেও পিছপা হয় না)। কিন্তু এসব করতে গিয়ে বডি মুভমেন্ট বা চলন্ত যেকোনো অবস্থায় আমরা দেহের স্বাভাবিক উঠানামাটাই ভুলে অস্বাভাবিক রিয়্যাক্ট করতে থাকি)।

আর এই দেশে সম্ভবত নারী গবেষণার চেয়ে আরামদায়ক আর রসালো কোনো গবেষণা নেই! নারীর চুল থেকে শুরু করে পায়ের নখ সবই আলোচনার বিষয় হয়ে যায়, সেখানে নারীর পোশাক অবশ্যই খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা ইস্যু। একেবারে সমাজের লোয়ার ক্লাসের দিনমজুর থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষিত সুবেশী পুরুষ কেউই নারীর পোশাক দিয়ে নারীকে জাজ করতে পিছিয়ে থাকে না এবং মন্তব্য ছুঁড়ে দিতেও দ্বিধা করে না।

অনেক আধুনিক, এলিট শ্রেণীর অনেক নারীই আছেন বটে যারা পোশাকের স্বাধীনতা নিয়ে নানারকম কথা বলেন, নিজেরা নিজেদের মতো পছন্দের পোশাক পরেন। কিন্তু এই দেশে তারাই কি সব জায়গায় সব রকম পোশাক পরতে পারেন? চাইলেও তারা পারেন না, কারণ সেটা সম্ভব হয় না আসলে কোনোভাবে। চাইলেই বাইরের দেশে বা নিজ দেশের কিছু সিলেক্টিভ প্লেসে, এলিট জায়গায় স্বল্প পোষাক পরিধান করা যায়। কিন্তু সেই একই পোষাক নিউমার্কেট বা কারওয়ান বাজার, চকবাজারে পরা যায় না!

নরমালি প্যান্ট-টপস পরে যেকোনো গ্যাদারিং প্লেসে গেলেই নানারকম তীর্যক মন্তব্য, অশ্লীল চাহনি হজম করতে হয়, সেখানে নিউমার্কেট বা চকবাজারের মতো জায়গায় ফেসবুকে হাফপ্যান্ট পরা বা স্লিভলেস শর্ট গেঞ্জি পরে ছবি দেওয়া নারীটিও এরকম ড্রেস চাইলেও পরে যেতে পারবে না।

এগুলো হচ্ছে এইদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটের দৃষ্টিভঙ্গি। আর এই দৃষ্টিভঙ্গি সমাজের সব অবস্থানের নারীকে কোনো না কোনোভাবে বাধ্য করে নিজের পছন্দ, রুচি, আচরণ সবকিছুর একটা সীমাবদ্ধতার মাঝে আটকে রাখতে।

ব্যক্তিগতভাবে আমার কোনো পোষাকেই এলার্জি নেই। আমি নিজে পোষাকের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করলেও বেশিরভাগ সময় আমাকে ভাবতে হয় কোন জায়গায় কেমন পোশাক পরলে একটু বাঁকা চাহনি কম দেখতে হবে। আমার মতো নিম্ন মধ্যবিত্ত বা যারা মধ্যবিত্ত শ্রেণীতে অবস্থান করছেন, তাদের জন্যে এগুলো একটা কমন বিষয় বা সমস্যা। যা বেশিরভাগ মেয়ে অবচেতন ভাবেই এসব নিয়ে সচেতন থাকে বেশি।

নারীর পোশাক নিয়ে পুরুষের পাশাপাশি নারীও কিন্তু কম গসিপ করে না। যদিও পুরুষতান্ত্রিক চিন্তা দ্বারা প্রায় সবাই প্রভাবিত, তাই এইক্ষেত্রে নারীও বাদ নেই। আমার যে বন্ধুটি একেবারে বোরকা-নেকাব, হাতমোজা, পা মোজা পরে চলাফেরা করে, তার কাছে কিন্তু আমি জাহান্নামের একটি টুকরো। কারণ মুখে যতই হাই-হ্যালো বা ভালো সম্পর্ক থাকুক না কেন, ভিতরে ভিতরে তার বদ্ধমূল ধারণাটাই হচ্ছে, আমার স্থান নিশ্চিত জাহান্নাম এবং পরপুরুষকে আকৃষ্ট করে নিজের সৌন্দর্য বিলানোই আমার উদ্দেশ্য! তাদের মতো নারী-পুরুষের চিন্তার দৈন্যতা নিয়ে আমি কখনোই খুব বেশি মাথা ঘামাইনি, এবং সব জেনে বুঝেও হাই-হ্যালো করতেও আমার খুব একটা সমস্যা হয় না, কারণ যে চিন্তা বা দর্শন দ্বারা তারা বেহেশতের হুরপরীর মতো নিজেকে মূল্যবান মাল ভেবে শুধুমাত্র পোশাক দিয়ে জাজ করে ভালো-মন্দ যাচাই করে ফেলতে পারে, সেখানে আসলে তর্ক করা বৃথা এনার্জি লস ছাড়া আর কিছু মনে হয় না।

ব্যক্তিগতভাবে এরকম বোরকা পরিধানকারী নারীর প্রতিও আমার কোনো এলার্জি কাজ করে না, কাউকে যদি আমার সাথে আন্তরিক বলে মনে হয়, তাহলে আমি সব চিন্তার মানুষের সাথেই আন্তরিক হতে পারি!

আমি নিজে পোশাক পরি মূলত প্রথমে শারীরিক কমফোর্ট এর কথা চিন্তা করে, তারপর পরিবেশ এবং কাজ বুঝে। আমি যেই পোশাক পরিধান করলাম, সেটা পরে যদি আমার আরামই না হলো, আমার কাজের এবং পরিবেশের উপযোগী না হলো, তাহলে পোশাকের ভ্যালু থাকে কোথায়!

পোশাকটা পরুন নিজের আরাম আর ফিজিক্যাল কমফোর্ট এর কথা চিন্তা করে, পরিবেশ-কাজ বুঝে। কারণ সব পোষাক সব জায়গার জন্যে পারফেক্ট না, এটা স্বাভাবিক সেন্স। আর যেই নারী তার আরামের কথা চিন্তা করে পোশাক পরে, চুজ করে, তাকে নিয়ে অযথা রসালো গল্প বন্ধ করুন। নিজের চিন্তার দৈন্যতা অন্যের উপর চাপিয়ে দিবেন না প্লিজ!

শেয়ার করুন:
  • 655
  •  
  •  
  •  
  •  
    655
    Shares

লেখাটি ১,৪৫৯ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.