একবার রাস্তায় হাঁটুন, স্যার

0

সাজু বিশ্বাস:

প্রিয় আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার,
একদিন ভোরে আজিমপুর কলোনির রাস্তা ধরে কল্যাণপুর হয়ে সাভার পর্যন্ত হাঁটতে বের হইয়েন। কিম্বা মিরপুর ঘুরে টঙ্গী, গাজীপুর পর্যন্ত। হাঁটার উপকারিতা আছে। আপনার ডায়াবেটিস কমে যাবে, সকালের সদ্য শিশির ছুঁয়ে যাওয়া বাতাসে আপনার ফুসফুস পরিস্কার হবে।
সেই সাথে সাথে আপনি আরেকটি জিনিসও দেখতে পাবেন। বাংলাদেশের মেয়েদের বেঁচে থাকার খণ্ডচিত্র।
আপনি দেখবেন রাস্তার দুই পাশ দিয়ে সারি বেঁধে পুরুষ-নারী ছুটে চলেছে। তাদের এক হাতে একটা টিফিনের কৌটো ঝুলানো। এই কাফেলার বেশিরভাগ সদস্যই মেয়ে। মেয়েগুলির পরনে তিনশো, সাড়ে তিনশো টাকার ছাপা সুতির জামা পায়জামা। মোটা কাপড়ের সস্তা সুতির ওড়নায় কারো কারো মুখ ঢাকা। কারো বা মুখ খোলা। তাদের সবার পরনে প্লাস্টিক বা সস্তা রেক্সিনের একশো সোয়া’শ টাকা দামের স্যান্ডেল। প্রতিদিন দুই আড়াই বা তিন মাইল হাঁটা এবং ফিরতি হাঁটার কারণে সেই স্যান্ডেলের তলা ক্ষয়ে গেছে। কারো কারো পায়ের গোড়ালির কিছু অংশ জুতোর পিছনে বাইরে রয়ে গেছে। ধুলোময় রাস্তায় ময়লা মাটি, ডাস্টবিন, গাড়ির হর্ন সব উপেক্ষা করে তারা গন্তব্যের দিকে ছুটে চলেছে।
এই মেয়েরা সবাই ঢাকার কোনও না কোনও গার্মেন্টস বা ছোট কারখানায় কাজ করে। তাদের বেশিরভাগেরই বেতন সর্বসাকুল্যে ওভার টাইম টুইম দিয়ে হয়তো দশ থেকে পনের হাজার টাকা।

আপনি অধ্যাপক মানুষ ছিলেন। টাকা পয়সার কড়ি কড়ি হিসেব হয়তো আপনার ভালো নাও লাগতে পারে।
তবু বলি। ঐ দশ-পনেরো হাজার টাকাই এদের সারা মাসের চাল-ডাল ঘর ভাড়া, কারেন্ট বিল, পানির বিল, সমস্ত বাজার সদাইয়ের খরচ মিটিয়ে দূরের গ্রামে পড়ে থাকা পরিবার পরিজনের সংসারের খরচেরও যোগান দেয়। এদের অধিকাংশই পরনের কাপড় কী হবে তা নিয়ে সৌখিন ভাবনার অবকাশ পায় না সারা জীবনেও।

আপনার হয়তো সহসাই মনে পড়বে বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পের শতকরা প্রায় সত্তর ভাগ শ্রমিক এখনও নারী। আগে এই সংখ্যা আরো বেশি ছিল, প্রায় পঁচাশি ভাগ নারী শ্রমিক দিয়ে গার্মেন্টস চলতো। কারখানায় দুর্ঘটনা, শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হওয়া, বেতন বাকি পড়া, বোনাস সময়মতো না পাওয়া, মেশিন নির্ভর উৎপাদন শিল্প গড়ে ওঠা,—- এইসব কারণে নারী শ্রমিকরা গত কয়েক বছরে নিরুৎসাহিত হতে হতে পঁয়ষট্টি থেকে সত্তর ভাগে নেমে এসেছে।

তবু এই সংখ্যাও বড় কম নয়! এবং এরা কেউই নান্দনিকভাবে শাড়ি পরে সক্কালবেলা হন হন করে মাইলকে মাইল হেঁটে কাজে যাবার কথা চিন্তা করতে পারে না। আপনি চট্টগ্রাম, খুলনা বা দেশের যেখানে যেখানে উৎপাদনশীল এলাকার আছে, সর্বত্র মেয়ে শ্রমিকদের পরনে ঐ সস্তা ছাপার সুতি কাপড়ের সালোয়ার কামিজ দেখতে পাবেন। তাদের কেবল শরীর ঢাকার দায়-ই বড় দায়। শরীরের ভাঁজ বোঝার বা বোঝাবার মতো সময় তাদের নেই।

আপনি কি জানেন স্যার, আমাদের দেশে পিওর কটন বলে এখন তেমন কোনও বস্তু নেই!
সুতির শাড়ি কমপক্ষে এক হাজার টাকা।
গ্রামের মহিলারা আগে হাট থেকে জোড়ায় জোড়ায় কিনে আনা যেই নরম তাঁতের মিহিন সুতোর কাপড় পরতো, তার বদলে এখন মোটা মিক্সড নাইলন সুতো বড় বড় ছাপার সুতি শাড়ি পরতে হয় তাদের।

আমাদের খুব শৌখিন বয়ন শিল্প ছিল রাজশাহীর গুটি রেশমের সিল্ক শাড়ি। কবে কবে কেমন করে কোথায় হারিয়ে গেল তা!

ঢাকাই জামদানীর নকশায় এখন কেবল চিকন নাইলন আর মোটা সুতোর উপর জামদানীর ডিজাইনের মোটিফই ভরসা।

সাজু বিশ্বাস

একমাত্র টাঙ্গাইল শাড়ি এখনও মরো মরো করে বেঁচে আছে। পুরো বাজার নাইলনের সিল্ক আর লিলেন জর্জেট দিয়ে সয়লাব, যার একটিও আমাদের দেশি কাপড় নয়।

বাঙালি মেয়েদের দেশি স্টাইল শাড়িই।
এটা আমাদের দেশের চিরায়ত পোশাক। কিন্তু এর সাথে চেহারার মানানসই, শরীরের ভাঁজ বা উচ্চতা বা গায়ের রঙের ব্যাপারটা কী?

আপনার মতে, এভারেজ উচ্চতা এবং শরীর একটু কম ফরসা, এই সব অযোগ্যতা কাভারেজ দেবার জন্য বাঙালি মেয়েদের শাড়ি পরেই থাকা উচিত!
তা, বাংলাদেশের মেয়েরা যে আজকাল ক্রিকেট খেলছে, শ্যুটার হচ্ছে, হিমালয়ে চড়তে যাচ্ছে, — ওরাও তাহলে কেডস ট্রাউজারের উপরে শাড়ি পইরা চলুক স্যার? সৌন্দর্য রক্ষা হবে!

গ্রাম বা শহরে অনেক মেয়েই যে শুধুমাত্র পোশাকের দৈন্য ঢাকতে এক বোরখা পরে বছর কাটিয়ে দেয় এমন কথা বোধ হয় আপনার জানা নেই!

সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক হলো আপনার মতো একজন মানুষ গড়ার কারিগর যাকে বলে, সেই মানুষ যখন এই সময়ে এসে, যখন মানুষ মেয়েদের পিরিয়ডের মতো প্রাকৃতিক বিপত্তির কারণে শিক্ষা এবং কর্মক্ষেত্রের ব্যাপারে ঘরে বসে থাকাকেও চ্যালেঞ্জ হিসেবে মোকাবেলা করছে, — আপনি সেই সময় শাড়ি পরিয়ে বাঙালি মেয়েদের বেঁটে খাটো কালো চেহারার শরীরগুলোকে কেমন করে আকর্ষণীয় করে তোলা যায়, সেই ব্যাপারে বিরাট এক মনোজ্ঞ আইডিয়া দিয়ে ফেললেন!

আপনাকে আবারো পুরস্কৃত করা উচিৎ স্যার।
আপনার আইডিয়ায় পাঁচ ফুট দুই-তিন উচ্চতা আর ময়লা -আধা ময়লা- আধা ফর্সা গায়ের রঙ নিয়ে আগে থেকে কমপ্লেক্সে ভুগতে ভুগতে মুখে রঙ ফর্সা করার ক্রিম ঘঁষতে থাকা বাঙালি মেয়েরা এইবার শাড়ির ভাঁজ-টাজ কায়দা করে দিয়ে আরও রূপবতী হয়ে বিশ্বের অন্যান্য নারী সমাজকে টেক্কা দিতে পারবে বলে আশা করা যায়!

শেয়ার করুন:
  • 2.4K
  •  
  •  
  •  
  •  
    2.4K
    Shares

লেখাটি ১১,৮৫৫ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.