‘শারীরিক ত্রুটি ঢাকতে আমরা শাড়ি পরি না স্যার’

0

কাজী তামান্না কেয়া:

প্রথম আলোয় শাড়ি নামে একটা লেখা ছাপা হয়েছে৷ নানানভাবে পেঁচিয়ে বলা হয়েছে মূলত দুইটি কথা– বাঙ্গালী নারী উচ্চতায় কম বলে শাড়ির মতো যৌন আকর্ষণীয় কিন্তু শালীন পোষাক পরে তার উচ্চতার ঘাটতি ঢাকতে হবে, বাঙ্গালী নারীর উচ্চতা ঘাটতির কারণে তাকে ইউরোপিয়ান বা অন্য পোষাকে ভালো দেখায় না৷

আমি গড়পড়তা বাঙ্গালী নারীর চেয়েও খাটো৷ তবে সেই ত্রুটি ঢাকতে শাড়ি বেছে না নিয়ে স্বাছন্দ্যে যেখানে যে পোষাক পরতে হয়, আমি তাই পরি৷ আমার পোষাকের তালিকায় স্কার্ট, শার্ট, প্যান্ট, টি শার্ট, শর্ট সবই আছে৷

শাড়ির লেখক অধ্যাপক আবু সায়্যিদ বলেছেন, বাংলাদেশের মেয়েরা আজকাল এসব মডার্ন পোষাক পরে হাস্যকর আত্মতৃপ্তি নেয়৷
সিরিয়াসলি অধ্যাপক সাহেব? মেয়েরা তাদের স্বাচ্ছন্দ্যের জন্যে বা কর্মোপযোগী পোষাক পরলে আপনার কাছে তা হাস্যকর আত্মতৃপ্তি? আপনি শাড়ি বন্দনা করতে চাইছেন, করুন, কিন্তু তার জন্যে নারী কী পরবে কী পরবে না সে নিয়ে কদর্য মন্তব্য করছেন কেন?

দেশে থাকতে মূলত সালোয়ার কামিজ পরতাম৷ আর ফরমাল, আনফরম্যাল বা বিশেষ দিবসে শাড়ি পরতাম৷ দেশে এবং দেশের বাইরে যা কিছু পরেছি বা পরি তার কোনটাই আমার শারীরিক ত্রুটি বিচ্যুতি ঢাকার জন্যে নয়, বরং সময় এবং উপলক্ষ্য দেখে পরেছি এবং পরি৷

অন্য নারীরাও এসব ভাবনা থেকেই পোষাক বাছাই করেন৷ অধ্যাপক সাহেব তার লেখায় বলেছেন, বাঙ্গালীর উচ্চতাজনিত ত্রুটি মানে সোজা বাংলায় খাটো হওয়া পুরুষের জন্য তেমন সমস্যার না৷ তবে নারীর খাটো হওয়া চলবে না৷ নারীকে এই ত্রুটির জন্যে ‘মেইক আপ দা লস’ করতে হবে৷ তো, কীভাবে সেই মেইক আপ করবে? শাড়ির ন্যায় দীর্ঘ পোষাক পরে। কারণ তাতে নাকি ৫ ফুট ৩ ইঞ্চি লম্বা নারীকে দেখতে ৫ ফুট ৪ ইঞ্চি দেখাবে৷

নারীকে এতোটা সেক্সিস্ট দৃষ্টিকোণ থেকে কেন দেখতে হবে স্যার? সমস্যাটা কোথায় আপনার?

আমি অবশ্য প্রথম আলোর এমন লেখা ছাপানোতে খুব একটা অবাক হইনি৷ এর আগেও তারা সাঈদ জামিল নামে এক কবিকে ‘জীবনানন্দ দাশ সাহিত্য পুরষ্কার’ দিয়েছিল৷ সাঈদ জামিলকে কবি না বলে চটি লেখক বলাই শ্রেয়৷ ‘কায়কাউসের ছেলে’ নামের বইটি প্রথমা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়েছিল৷ প্রিয় পাঠক এবং পাঠিকা, প্রথম আলোর বিতর্কিত রুচি বোঝার সুবিধার্থে সেই বই থেকে দু চরণ তুলে ধরছি এখানে৷

‘আমি কায়কাউসের ছেলে, আমি বেড়াই
হেসে খেলে৷ ইচ্ছে হলে হাগি মুতি, ইচ্ছে
হলে চুদি; ইচ্ছে হলে উরুর ভাঁজেই দুই চক্ষু মুদি’।

এমন কবিতা লেখনেওয়ালাকে যারা বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবির নামে প্রদত্ত পুরষ্কারে ভূষিত করতে পারে, তারা অধ্যাপক সাহেবের লেখা ছাই পাশ ছাপবে, তাতে অবাক হবার তেমন কোন কারণ দেখছি না৷

অধ্যাপক সাহেবের কাছে আমার প্রশ্ন, বাঙ্গালী নারী আসলে কী? ফুল না প্রজাপতি? তাদের কেন শুধু সুন্দর আর লম্বা চওড়া হয়েই অধ্যাপক সাহেবের চোখে আকর্ষণীয় হতে হবে?
পৃথিবীর আর কোনো জাতির মেয়েরা খাটো হয় না? চীনের, জাপানের, তাইওয়ান, মেক্সিকোসহ আরো অনেক দেশের নারীই উচ্চতায় কম৷ কিন্তু এতো দেশের নারী রেখে শাড়ি বন্দনার নামে উনি বাঙ্গালী নারীর শারীরিক খুঁত এবং ত্রুটি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন কেন? এ কেমন স্থুল রুচি আর মানসিকতা?

অধ্যাপক সাহেবকে বাংলাদেশের একজন গড়পড়তা উচ্চতার নারী হিসেবে বলতে চাই, আমি পার্ফেক্ট উচ্চতার অধিকারী নই৷ বরং আপনার বেঁধে দেওয়া পারফেক্ট উচ্চতার বেশ নিচেই আমার অবস্থান৷ মজার বিষয় হচ্ছে, এতে আমার কোন ভ্রুক্ষেপ নেই৷ আমার মতো লক্ষ নারী আপনার এই লেখাটির সাথে একমত হবেন না, কারণ উচ্চতা ব্যক্তির এচিভড কোয়ালিটি নয়৷ আর নিজের অর্জিত গুণের বাইরে গিয়ে শারীরিক সৌন্দর্য্য নিয়ে মেতে থাকার মতো সময় আমার বা বাংলাদেশের অধিকাংশ নারীরই নেই৷

অধ্যাপক সাহেব, নারী পূর্ণাঙ্গ মানুষ৷ সে কী পরবে, কী করবে, সে সিদ্ধান্ত তার নিজের৷ আড়ে ঠারে, বারে বারে নারীকে নিয়ন্ত্রণ করার ইচ্ছেটা আপনার মতো আলোকিত মানুষের কাছ থেকে আমরা শুনতে চাই না৷

শেয়ার করুন:
  • 6.3K
  •  
  •  
  •  
  •  
    6.3K
    Shares

লেখাটি ১৭,১৮১ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.