উত্তরে মিতা হক যা বললেন –

Mita Haq 2সুমন্দভাষিণী:

একাত্তর টিভিতে আলোচনা অনুষ্ঠানটি সম্প্রচারের পরপরই সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতে শুরু হয় এ নিয়ে তোলপাড়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী মিতা হককে তুলোধুনো করা হচ্ছে, অশ্লীল-অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করতেও ছাড়ছে না। যারা তার পক্ষে কথা বলছেন, তারাও ছাড় পাচ্ছেন না এই ‘অসম’ আক্রমণ থেকে। এখানে ‘অসম’ কথাটা খুব চিন্তা করেই বলেছি, একারণে যে, যারা বাজে কথা বলছেন, তাদের সাথে সংস্কৃতিগত একটা বিরোধ বা পার্থক্য তো রয়েছেই।

অধিকাংশ গালিগালাজের ভাষাই আমাদের সাধারণের উচ্চারণের বাইরে। আমাদের জীবনাচরণের কোথাও এর জায়গাও নেই। মূলত এখানেই পার্থক্য মিতা হকের ঘোমটা তত্ত্বের সাথে আমজনতার। তিনি কি বোঝাতে চেয়েছেন, তা বোঝার ক্ষমতা সবার আছে বলে আমি মনে করি না। আর সেই ক্ষমতা নেই বলে বা চিন্তাশক্তির প্রতিবন্ধকতার কারণেই শুরু হয়েছে এই বাকোয়াজ।

গত দুদিন ধরে এ নিয়ে বেশকিছু লেখা পড়েছি, দেখেছি, এবং ভেবেছি। শেষতক এই সিদ্ধান্তে এলাম যে, এইদেশে অধিকাংশ বাঙালী বাঙ্গালীয়ানার সাথে নিজ নিজ ধর্মের একটা মিশ্রণ ঘটায়। তাদের অধিকাংশেরই মতে, তারা কেউ বাঙালী মুসলমান, কেউ বা বাঙালী হিন্দু, বা বৌদ্ধ-খ্রিস্টান। কিন্তু কেউই শুধুমাত্র বাঙালী সংস্কৃতিতে বিশ্বাসী বাঙালী নন। বাঙালীয়ানা যদি একটা সংস্কৃতি হয়, ধর্মও একটা সংস্কৃতি। এ দুয়ের সুক্ষ্ম সংঘাত অনিবার্য। খালি চোখে এ দুয়ের পার্থক্য বুঝতে পারাও সবার কর্ম নয়।

সোমবার গভীর রাত পর্যন্ত কথার আড্ডা চলে মিতা হকের সাথে। উনি বললেন, এ ঘটনার পর প্রচুর ফোন কল পাচ্ছেন, আত্মীয়স্বজনরা আসছেন বাড়িতে। তবে কোন ফোনই তিনি ধরছেন না। মেয়ে জয়ীতা সবগুলো অনলাইন দেখছে, কিন্তু মাকে দেখতে দিচ্ছে না। মেয়ে বলেছে, ‘খুব বাজে কথা মা, তুমি শুনতে পারবা না’। সবাই মিতা হককে বলছেন, এসব না দেখতে, না পড়তে। বলছে যে, এসব পড়লে-দেখলে কষ্ট হবে, কোন সুস্থতা নেই অনলাইনের এসব ভাষায়।

জয়ীতার কথাই যদি ধরি, তাহলেও কি আমরা বুঝবো যে, আমাদের যে প্রজন্ম আজ মুখে খিস্তিখেউড় করছে মিতা হককে নিয়ে, তার সাংস্কৃতিক উচ্চতার ধারে-কাছে তারা? যার মেয়ে এইটুকু বোঝে, সেই মেয়ের বয়সীরাই আজ মিতা হককে নানা ভাষায় অলংকৃত (?) করছে! একবারও তাদের পারিবারিক শিক্ষা বা সামাজিক মূলবোধ তাদেরকে বিরত করছে না? এখানেই কি তাহলে পার্থক্য গড়ে উঠছে না প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে? সংস্কৃতি থেকে সংস্কৃতিতে? এখানেই কি পার্থক্য হচ্ছে না শুধু বাঙালী সংস্কৃতি আর বাঙালী-ধর্মীয় সংস্কৃতির? কী শিক্ষা দিচ্ছি আমরা নতুন প্রজন্মকে? নিজেদের শুধুমাত্র যারা ‘বাংলাদেশি’ শব্দের মধ্যে আজ আবদ্ধ করে ফেলছেন বা আবদ্ধ করতে পছন্দ করছেন, তারা কি হাজার বছরের সংস্কৃতিকেই চ্যালেঞ্জ করছেন না? সংস্কৃতি আর ধর্ম দুটি ভিন্ন সত্তা! আমরা দুটোকে এক করে ফেলাতেই সমস্যা তৈরি হয়েছে।

চলুন যাওয়া যাক মিতা হকের কথায়, ‘যারা ঘোমটা পরে তারা বাঙালি না’ – এ কথা আমি বলিনি। এটা একটা মিথ্যাচার প্রচার করা হচ্ছে আমার নামে। যা একেবারেই উদ্দেশ্য প্রণোদিত। যারা ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করেন এটা তাদের কাজ। আর পুরো অনুষ্ঠান না দেখে যারা বাজে মন্তব্য করছেন, তাদের বলবো পুরো অনুষ্ঠানটি দেখার জন্য।

সেদিনের আলোচনায় নারীর পোশাক বা হিজাব বিষয়টা নানাভাবে আসার কারণ হিসেবে মিতা হক বললেন, মানসিক পরিবর্তন না এলে পোশাকেও পরিবর্তন আসবে না, এটাই আমি বলতে চেয়েছি। একটা কথা বলবো, বাঙালী জাতীয়তাবাদ কি লুকানোর বিষয়? আড়াল করার বিষয়? আমরা তো বহু কষ্টে এটা অর্জন করেছি। তাহলে এ নিয়ে তো আমাদের দ্বিধা থাকার কথা না। আমরা বাঙালী, এই পরিচয়টা ছাপিয়ে কেন আমাদের প্রধান হয়ে উঠে নিজেদের ধর্মীয় পরিচয়?

তাছাড়া, বোরকা বা হিজাব কোনটাই এদেশীয় পোশাক না। তাহলে কেন বিদেশি পোশাক আমাকে পরতে হবে যখন নিজেদের ঐতিহ্য এতো সমৃদ্ধশালী? আজ যদি বিশ্বের বিভিন্ন মুসলিম দেশের ১০ জন নারীকে এক কাতারে দাঁড় করানো হয়, তবে দেখবো, সবারই পোশাক ওই এক, হিজাব বা বোরকায় ঢাকা। সেখানে বাঙালী নারী বলে আলাদা করা যাবে না কাউকে। তাহলে আমাদের আলাদা সত্ত্বা কোথায় গেল?

আসলে গত কয়েক বছরে হিজাব বা বোরকা এদেশে মহামারীর মতো ছড়িয়ে গেছে। এবছর গ্রামে-গঞ্জে নাকি বোরকা পরানোয় উৎসাহ দেয়ার জন্য নামমাত্র মূল্যে এই পোশাক দেয়া হয়েছে। এর গূঢ় উদ্দেশ্য কিন্তু ভয়াবহ। আজ যারাই আমার কথায় আঘাত পেয়েছেন বলে ধরে নিচ্ছেন, আমি নিশ্চিত, অচিরেই তারা আমাকে বুঝতে পারবেন, তখন দেরি না হয়ে যায় আবার।

অনেক কথা হয় মিতা হকের সাথে। সমাজ-সংস্কৃতি-রাজনীতি সব নিয়ে। রাজনীতি সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক দলের হাতে কিন্তু সমাজ সংস্কারের ক্ষমতা নেই। জনগণের হাতেই সেই ক্ষমতা। জনগণ যদি হয় গণতন্ত্রের মূল শক্তি, তাহলে সেই ক্ষমতা প্রয়োগ তাকেই করতে হবে।

বাঙালী মুসলমান বলে যারা নিজেদের পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন, তাদের মধ্যে আইডেন্টিটি ক্রাইসিসটা প্রকট হয়ে উঠেছে।
কথা হচ্ছে যে, আমি কি মুসলমান? না বাঙালী? বা কোনটা আগে? যে কারণে আমরা এখনও আমাদের পোশাক নির্বাচন করতে পারছি না। আমাদের কি কোন নিজস্ব পরিচয় থাকবে না? মুসলমান প্রমাণ করতে আমি কেন হিজাব আর বোরখা পরবো? আর এটা প্রমাণই বা কেন করতে হবে আমাকে? দেশে কী এমন সমস্যা হয়েছে যে, আমার পরিচয় ধরে টানাটানি হচ্ছে? আমার পরিবারে যে নামাজ-রোজা হয় না, তাতো না। আমরা তো শালীন জামা-কাপড়ই পরি, কই আমার তো কোন সমস্যা হচ্ছে না। পোশাক কখনও ধর্মের আইডেন্টিটি হতে পারে না।

আরেকটা কথা, যে বোরকা বা হিজাব নিয়ে আজ এত কথা, সেই পোশাক কিন্তু আরব দেশের আবহাওয়ার সাথে সামঞ্জস্য রেখেই করা, সেদেশের পুরুষরাও কাছাকাছি পোশাক পরেন। তাহলে আমাদের দেশে কেন মেয়েদের ওপরেই চাপানো হবে এই পোশাক?

ধর্মের ব্যবহার নিয়ে বেশ কথা হয় মিতা হকের সাথে। দুজনেই একমত হই যে, দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাও আজ এই দূষণে দুষ্ট। বিশেষ করে ইংরেজি মাধ্যমে তো কী শিক্ষা দেয়া হচ্ছে, বা আদৌ কোন শিক্ষা দেয়া হচ্ছে কিনা, তা রীতিমতো আলোচনা-বিতর্কের বিষয়। ইংরেজি মাধ্যমেই বেশি করে ছড়িয়ে পড়েছে হিজাব পোশাকটা। পাশ্চাত্য আর মধ্যপ্রাচ্যের সংস্কৃতির এক জগাখিচুরি সংস্করণ হচ্ছে এদেশের ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলগুলো।

তাহলে এ থেকে উত্তরণের পথ কী? পথ একটাই, নিজেকে আগে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা।

শেয়ার করুন:
  • 68
  •  
  •  
  •  
  •  
    68
    Shares

বাঙালী মুসলমান বলে যারা নিজেদের পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন, তাদের মধ্যে আইডেন্টিটি ক্রাইসিসটা প্রকট হয়ে উঠেছে।

কথা হচ্ছে যে, আমি কী মুসলমান? না বাঙালী? বা কোনটা আগে? যে কারণে আমরা
এখনও আমাদের পোশাক নির্বাচন করতে পারছি না। আমাদের কী কোন নিজস্ব পরিচয়
থাকবে না? মুসলমান প্রমাণ করতে আমি কেন হিজাব আর বোরখা পরবো? আর এটা
প্রমাণই বা কেন করতে হবে আমাকে? দেশে কী এমন সমস্যা হয়েছে যে, আমার পরিচয়
ধরে টানাটানি হচ্ছে? আমার পরিবারে যে নামাজ-রোজা হয় না, তাতো না। আমরা তো
শালীন জামা-কাপড়ই পরি, কই আমার তো কোন সমস্যা হচ্ছে না। পোশাক কখনও ধর্মের
আইডেন্টিটি হতে পারে না।

thaole r ki kora apni jama kapor porar dorkar nei apni r o kati bangali hote parben

kono musim je allah k bissa kore tar moke ei kota manai na / abr bole namaj pore

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.