প্রতিবাদ না করে পাপ করছো হে তরুণ সমাজ!

0

ফাহমিদা নীলা:

কথায় বলে, অল্প শোকে কাতর আর অধিক শোকে পাথর। আসলে পুরো ব্যাপারটায় এতোটা আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছি যে, কী লিখবো, কীভাবে লিখবো ঠিক গুছিয়ে উঠতে পারছি না। ঘটনার আকস্মিকতায় একেবারে স্তম্ভিত বলা চলে।
কিন্তু এই ঘটনা কি আসলেও আকস্মিক?

একবার পুরোটা শুনে দেখুন তো! মেয়েটা তার বিদ্যাপীঠ (দেশের সেরা বিদ্যাপীঠের একটি) থেকে বের হয়ে একটা অটো রিক্সায় উঠলো। সেখানে আরও তিনজন ছেলে ছিল। দুজন তার ক্যাম্পাসের সিনিয়র ভাই, অন্যজন অপরিচিত। কিছুদূর গিয়ে তাদের গন্তব্যে পৌঁছে ওর ক্যাম্পাসের ছেলে দুটো নেমে পড়ে। কিছুদূর এগিয়ে বাকি অন্য লোকটিকেও অটোওয়ালা নামিয়ে দেয় জোর করে তার নিজস্ব লোক আছে বলে। হুট করেই উঠে পড়ে চারজন ছেলে। অটো চলতে থাকে। আর এই নতুন চার ছেলে মেয়েটাকে নানানভাবে উত্যক্ত করতে থাকে। তার ব্যাগ, মোবাইল, মানিব্যাগ ধরে টানাটানি করে। শরীরের বিভিন্ন অংশে হাত দিয়ে সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্ট করতে থাকে। মেয়েটি তার কলেজ ব্যাগ বুকে চেপে ধরে চিৎকার করতে থাকে, ‘অটো থামান, অটো থামান’। অটো ড্রাইভার অটো না থামিয়ে পেছন ফিরে পৈশাচিক হাসি দেয়। কিছুক্ষণ পর টহল পুলিশ দেখতে পেয়ে মেয়েটাকে চলন্ত অটো থেকে ধাক্কা মেরে রাস্তায় ফেলে জোরে অটো টান দিয়ে চলে যায়। মেয়েটা উঠে দাঁড়ানোর আগেই অটো চলে যায় নাগালের বাইরে।

কী ঘটনা চেনা লাগছে না তো! অথচ এই ঘটনার সূত্রপাত কিন্তু বহু আগের। শুধু দৃশ্যপটের একটু রকমফের হয়েছে আপনার-আমার, আমাদের আচরণের বদৌলতে। কীভাবে? বলবো।
তার আগে কাহিনীটা আপাত: শেষ করে নিই।

মেয়েটি তার বন্ধু-বান্ধবকে ঘটনা জানালে তারা তাকে এটি পাবলিকলি জানানোর পরামর্শ দেয়, যেন সাধারণ মানুষ সতর্ক হতে পারে। মেয়েটি এটি ফেসবুকে পাবলিশ করার সাথে সাথেই পুরো বিষয়টা খুব দ্রুত ভাইরাল হয়ে যায়।
এইবার শুরু হয় খেল। আত্মীয়-স্বজন থেকে শুরু করে ওদের ছাত্র কল্যাণ সমিতি পর্যন্ত একই অভিযোগ ছুঁড়তে থাকে, সে এই ঘটনা ফেসবুকে শেয়ার করলো কেন? তাদের বক্তব্য, ‘আমাদের সাথেও তো এমনটা হয়, আমরা তো চেপে যাই। তুমি এতো বোকা কেন?’

ফোনের উপর ফোন আসতে থাকে। আত্মীয় ছাড়াও সাংবাদিক, প্রশাসন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা সবাই ফোন দিয়ে ঘটনার সত্যতা যাচাই করে। মেয়েটির বিধবা মা হতবিহ্বল হয়ে পড়ে। মেয়ের ভবিষ্যত চিন্তায় ওর বন্ধুদের প্ল্যান করা পরদিনের মানববন্ধনেও বাঁধা দেয়। নিয়মমাফিক পরদিন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে যোগাযোগ হয়। ডিবি পুলিশ ইনভেস্টিগেশন শুরু করে। নানান ঝামেলা শেষে ঐদিন সন্ধ্যেবেলা কেস ফাইল করা হয়।

ভাবছেন, সবই তো ঠিক আছে। তবে এ লেখার অবতারণা কেন? এই যে ভয়াবহ সময় পার করছে এই মা-মেয়ে, ওদের পাশে কিন্তু দাঁড়িয়েছে এ সমাজের হাতে গোণা কিছু মানুষ। একটা প্রথম সারির বিদ্যাপীঠে এই মেয়েটা নিয়ত সম্মুখীন হচ্ছে হাজারও সমালোচনার। কেন সে হিজাব পরে না, কেন সে ছেলেদের সাথে কথা বলে, এইজন্যেই তার সাথে এসব ঘটেছে ইত্যাদি ইত্যাদি।

এইবার আসি, যে কথাটা বলতে চেয়েছিলাম সে কথায়।
এক সময় ভীড়-ভাট্টায়, বাসে, সিনেমা হলে গোপনে কিছু পুরুষ সম্প্রদায় হাত চালান করে তাদের বিকৃত যৌন লালসা পূরণ করেছে। আপনি-আমি, আমাদের জেনারেশন মুখ বুঁজে থেকেছি। বাবা-মাকে জানালেও তারা ইশারায় চুপ করিয়ে দিয়েছেন। মানসিক পীড়নে বারবার চোখ ভিজে গেলেও কাউকে কিছু বলতে পারিনি। প্রতিবাদ করার, সাহস দেয়ার মোত পাশে কেউ ছিল না বলে অন্যায়গুলো মুখ বুঁজে সহ্য করেছি দিনের পর দিন।

লাভের লাভ কী হয়েছে বলেন তো? ঐ পুরুষগুলোর দৌরাত্ম্য বেড়েছে। আগে তারা গোপনে আশেপাশের সবার চোখ এড়িয়ে লালসা পূরণ করতো। আর এখন করে খোলামেলাভাবে, দিনের আলোয়। এমনকি মেয়ের অভিভাবকের সামনেও। এসবের জন্য দায়ী কে জানেন? পোষাক না, কো-এডুকেশন না, শিক্ষা না, আইন না। এর জন্য দায়ী আমাদের মানসিকতা। পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা। যা এ দেশের নারী-পুরুষ যুগ যুগ ধরে বহন করে আসছে নিজেদের চেতনায়। আর তাই যুগে যুগে পুরুষের অপরাধে মেয়েদের দাঁড়াতে হয়েছে বিচারের কাঠগড়ায়। পুরুষের কৃতকর্মের দায় ভিক্টিম মেয়েকে কাঁধে নিয়ে হাজারও প্রশ্নবাণে জর্জরিত হতে হয়েছে বারবার।

খুব সহজ করে একটা কথা বলি।
একদিন আমরা পুরুষের বিকৃত মানসিকতার গোপন প্রয়োগকে নিশ্চুপতার আড়ালে ঢাকার চেষ্টা করেছি বলেই আজ আমাদের সন্তানদের এই দিন দেখতে হচ্ছে। আর এই অবস্থা চলতে থাকলে পরবর্তি জেনারেশনকে ওপেন রাস্তায় সবার সামনে ধর্ষণ করবে ওরা। কারণ আপনি যতো চুপ থাকবেন, ওরা ততোই উৎসাহী হবে।

চুপ থাকলে তবুও তো কথা ছিল। উল্টা ভিক্টিমকে নানানভাবে মানসিক নির্যাতন করে আপনি সেই দুষ্টচক্রের সাহস আরো কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিচ্ছেন। কাজেই আপনার অপরাধ রাস্তার ঐ নেশাখোর বাউণ্ডুলে বিকৃত মানুষগুলোর চেয়ে কোন অংশেই কম না কিন্তু।

আর হ্যাঁ, আমাদের শান্তির শহর, আমাদের শহরের নামে কেউ কিছু বললে তার জিভ টেনে ছিঁড়ে ফেলবো, এই ধরনের কথা বলার আগে বাড়ি গিয়ে নিজের মা-বোনকে জিজ্ঞেস করে নেবেন, তারা কখনও এই শান্তির শহরে চলাফেরা করতে শান্তিপ্রিয় মানুষদের ভেতরেই বিকৃত অঙ্গের স্পর্শ পেয়েছে কিনা? কেন, এই শহরে ছিনতাই হয় না? চুরি-ডাকাতি হয়নি কোনদিন? মানুষ খুন হয়নি? কই, সেসব সময়ে তো আপনাদের এমন ইজম মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে না! শুধু একটা মেয়ে হ্যারাসমেন্টের কথা প্রকাশ করলেই আপনাদের ইজমে আঘাত লাগে?
এ শহরের কত কত মেয়ে-মহিলা শুধু এইসব অযাচিত স্পর্শ এড়াতে ডাবলেরও বেশি খরচ করে অটো এড়িয়ে রিক্সায় চড়ে, সে খবর রাখেন? সবার তো সে সামর্থ্য থাকে না। তারা কী করবে? চিৎকার করবে না, প্রতিবাদ করবে না। নিজেদের শরীর এগিয়ে দেবে ওদের লালসা পূরণের জন্য? কী করবে বলুন? আমার কথা বিশ্বাস হচ্ছে না তো! মাত্র এক সপ্তাহ আপনার শহরে মেয়ে সেজে অটোতে ঘোরাফেরা করুন। তারপর বড় করে বুক ফুলিয়ে বলবেন, ‘আমাদের শান্তির শহরে সবখানে শান্তি’।

বালির ভেতরে মুখ গুঁজে অনেক সময় তো পার করলেন! এইবার একটু নড়েচড়ে বসুন দেখি। পরিষ্কার পানি দিয়ে চোখটা ধুয়ে চারপাশটা দেখে ভবিষ্যৎটা নির্ধারণ করুন। ভিক্টিমকে সাপোর্ট দেয়ার বদলে তাকে মানসিক নিপীড়ন করে পক্ষান্তরে তাকে আপনি বিকল্প পথ দেখিয়ে দিচ্ছেন। আমি ভেবেছিলাম, বর্তমান জেনারেশন আমাদের চেয়ে অনেক বেশি প্রগতিশীল । আমার ধারণা ভুল প্রমাণিত হলো। আমাদের সময়ে অন্তত: আমাদের একটা চিৎকারে দশটা মানুষ দৌড়ে এসেছে। মানসিক সাপোর্ট দিতে না পারলেও ভিক্টিমকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছে। এই জেনারেশন তো তাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে!

হ্যাঁ, বর্তমান জেনারেশনকে বলছি। এখনও সময় আছে বাছারা, ঘুরে দাঁড়াও। আজ এক মেয়ের ঘটনা দেখছো। তোমরা প্রতিবাদ না করে, মেয়েটাকে সাপোর্ট না দিয়ে পক্ষান্তরে এইরকম ঘটনার পৃষ্ঠপোষকতা করছো। পাপ করছো, পাপ। তোমাদের পরোক্ষ সমর্থনে কাল কিন্তু তোমার মা, তোমার স্ত্রী, তোমার বোন, তোমার কন্যা যে কারো সাথে এর চেয়ে ভয়ানক ঘটনা ঘটতে পারে। সেদিনের জন্য প্রস্তুত আছো তো?

ওদের কানে কানে বরং ফিসফিসিয়ে শিখিয়ে দিও, যাই ঘটুক তারা যেন প্রতিবাদ না করে চুপ করে থাকে। কেননা, নিজের, নিজের পরিবারের, নিজের প্রতিষ্ঠানের, নিজের শহরের সম্মান রক্ষা করতে এটাই তো সবার কাম্য!

শেয়ার করুন:
  • 1.2K
  •  
  •  
  •  
  •  
    1.2K
    Shares

লেখাটি ২,৯৫৭ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.