প্রীতির জন্য ভালোবাসা

PRITI-DAS20130811021739আনিসুল হক: প্রীতির মৃত্যু কি থামাতে পারবে ট্রেনে ঢিল ছোড়ার ছেলেখেলা! চলন্ত ট্রেনে ঢিল ছোড়ার এই ভয়াবহ খেলা এটাই প্রথম নয়, চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড এলাকাতেই একমাত্র নয়, দেশের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন সময়ে চলন্ত ট্রেনে ঢিল ছোড়ার ঘটনা বহুবার ঘটেছে, মানুষ হতাহত হয়েছে। আজ থেকে প্রায় তেরো বছর আগে ২০০০ সালের ২৬ ডিসেম্বর প্রথম আলোর শেষ পাতায় সহকর্মী সুমনা শারমীন যথার্থই লিখেছিলেন, ‘এই নিষ্ঠুর তামাশার কি কোনো শেষ নেই?’ কিন্তু এই সর্বনাশা খেলা আজও বন্ধ হয়নি।

প্রধানত ছেলেপুলের দল মজা করার জন্যই ট্রেনে পাথর ছুড়ে মারে। কার ঢিল জানালা দিয়ে ঢোকে, এই হয়তো খেলার ‘গোল’। ঈশপ যদি আজ বেঁচে থাকতেন, তিনি হয়তো আত্মহত্যা করতেন। বালকের দল পুকুরে ঢিল ছুড়ছিল স্রেফ মজা করার জন্য, তখন একটা ব্যাঙ মাথা তুলে বলল, হে বালকের দল, এই নিষ্ঠুর খেলা বন্ধ করো, তোমাদের জন্য যা খেলা, আমাদের জন্য তা জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন। ঈশপ কি স্বপ্নেও ভাবতে পারতেন, বালকের দল পুকুরে ঢিল ছুড়ছে না, তারা ঢিল ছুড়ছে চলন্ত ট্রেনে, যার ভেতরে আছে মানুষ, টার্গেট এখানে ব্যাঙ নয়, মানুষ। মরলে এখানে সাপ-ব্যাঙ-মাছ নয়, মরবে মানুষ। রেল বিভাগ ‘ট্রেনে ঢিল ছুড়বেন না’ জাতীয় প্রচারাভিযান চালিয়েছে, এর আগে আমাদের চোখে পড়েছে। আমাদের বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন রেলগাড়ির জানালা দিয়ে আসা ঢিলে আহত হয়েছে, সে খবর আমরা পেয়েছি। কিন্তু প্রীতি দাশের মৃত্যুর খবর আমাদের সবাইকে বিপন্ন করে তুলেছে, আমাদের ঈদোত্তর আনন্দময় দিনরাত্রিগুলোকে ঢেকে দিয়েছে শোকের অন্ধকার কালিমায়। আমাদের নিরাপত্তাহীনতার বোধ বাড়িয়ে দিয়েছে, আমাদের করে তুলেছে অসহায়।

প্রীতি দাশ পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট থেকে ডিপ্লোমা করে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভর্তি হয়েছিলেন। তাঁর স্বামী মিন্টু দাশ ঢাকার ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের প্রধান শাখার কর্মকর্তা। চার ভাইয়ের সংসারে প্রীতি দাশ একমাত্র বোন। খুব জাঁকজমক করে মাত্র ১৭ মাস আগে বিয়ে দেওয়া হয়েছিল প্রীতি দাশের। তিনি বাবার বাড়িতে গেছেন ঈদের ছুটিতে। চট্টগ্রামে, পশ্চিম পটিয়ার গ্রামে। ট্রেনে করে ফিরছিলেন ঢাকায় ঈদের পরদিন, ১০ আগস্ট ২০১৩। রাতের ট্রেন। ট্রেন সীতাকুণ্ড উপজেলার ভাটিয়ারি ভাঙা ব্রিজ এলাকায় গেছে মাত্র। একটু আগে প্রীতি মোবাইল ফোনে কথা বলেছেন মা-বাবার সঙ্গে, তাঁদের জানিয়েছেন, ট্রেন ছেড়েছে। যাচ্ছি। মা বলেছেন, ভালোভাবে যাস। সঙ্গে স্বামী। স্বামীর বন্ধু। ট্রেনের জানালার কাচও নামানো। কোনো বিপদ হওয়ার কথা নয়।

কিন্তু সেই সময় চলল পাথর ছুড়ে মারার খেলা। জানালার কাচ ভেঙে পাথর এসে লাগল প্রীতির মাথায়। সঙ্গে সঙ্গে জ্ঞান হারিয়ে ফেললেন প্রীতি। সীতাকুণ্ড হাসপাতালে নেওয়া হলো, তারপর চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। ডাক্তাররা মৃত ঘোষণা করলেন প্রীতিকে। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রীতির বিয়ের ছবির দিকে তাকিয়ে থাকি। মাথায় টায়রা, নাকে নোলক, গলায় হার, লাল-সবুজ শাড়িতে হাস্যোচ্ছল প্রীতিকে কী সুন্দরই না দেখাচ্ছে। এই রকম একজন তরুণী, যিনি স্বপ্ন দেখছেন ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার থেকে হয়ে উঠবেন বিএসসি ইঞ্জিনিয়ার, সে জন্য পড়ছেনও সাউদার্ন ইউনিভার্সিটিতে, এভাবে একেবারে বিনা কারণে মারা যাবেন?
যারা ঢিল ছোড়ে ট্রেনে, তারা কি বোঝে, কী ভয়ংকর খেলা তারা খেলছে?

জীবন খুবই মূল্যবান। মানুষের জীবনের তো কোনো বিনিময়ও হতে পারে না। একবার চলে গেলে জীবনটাকে যে আর ফিরিয়ে আনা যায় না। কী সান্ত্বনা দেব আমরা সন্তানহারা মাকে, বাবাকে? বলা হয়ে থাকে, পৃথিবীতে সবচেয়ে ভারী হলো পিতার কাঁধে সন্তানের লাশ। ওই মা, ওই বাবার বারবার মনে হবে, আহা, যদি মেয়েটাকে আমরা ওই দিন যেতে না দিতাম? যদি সে পরের দিন উঠত ট্রেনে। যদি তারা ট্রেনের জানালার স্টিলের পাল্লাটাই নামিয়ে দিত? যদি তারা ওই কামরায় না বসে আরেকটাতে বসত? যদি মেয়ে আমার নিচের আসনে না বসে মাথার ওপরের বার্থে উঠে বসত? কত কথা মনে হবে। কিন্তু কোনোভাবেই একবার ঘটে যাওয়া ঘটনা আর ফিরিয়ে আনা যাবে না। এটা তো কম্পিউটারের গেমস না যে একবার মরে গিয়ে আবার খেলা নতুনভাবে শুরু করা যায় বা তিনবার পর্যন্ত মরা যায়। যে গেছে, সে আর কোনো দিনও ফিরে আসবে না। ওই দিন সন্ধ্যাতেও প্রীতি মামার বাড়িতে নেমন্তন্ন খেয়েছেন।

এখন প্রীতি শ্মশানের ছাই হয়ে গেছেন। এখন প্রীতি শুধুই স্মৃতি। শুধুই ছবি।
প্রীতি একা নন, ট্রেনে ঢিল ছুড়ে মারার ঘটনা অনেকবারই ঘটেছে এবং তার শিকারে পরিণত হয়েছেন অনেকেই। আমরা যে কেউ এই শিকারে পরিণত হতে পারি যেকোনো দিন। যেকোনো স্থানে। এখন যিনি ট্রেনের কামরায় আছেন, তিনিও হতে পারেন। আপনি, আমি যে কেউ মারা যেতে পারি। যে ঢিল ছুড়ছে, রেলসড়কের পাশে তার অবস্থান, কোনো কোনো দিন সেও ট্রেনে চড়ে, সে নিজেও এই ঢিলের শিকার হতে পারে, শিকার হতে পারে তার স্বজনও।

হরতালের আগের দিন বাসে আগুন দেওয়া হয়। মানুষ মরে যায়। এটা যাঁরা করেন, তাঁরা মানুষকে বাঁচানোর জন্য আন্দোলন করছেন। মানুষ মারা তাঁদের এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে। হরতালের দিন পেট্রল দিয়ে আগুন দেওয়া হয় সিএনজিচালিত ত্রিচক্রযানে, মানুষ পুড়ে অঙ্গার হয়ে যায়। এটা করা হয়, কারণ স্বতঃস্ফূর্ত হরতাল শান্তিপূর্ণভাবে কায়েম করা আমার অধিকার। যত্রতত্র হাতে বানানো বোমা ছোড়া হবে, তাতে কে মরল কে বাঁচল, তা দেখার দায়িত্ব তো আন্দোলনকারীদের নয়। এই পর্যন্ত, অনন্যোপায় অসহায় মানবসন্তান আমরা—জন্মেছি বাংলাদেশে, জন্মই যেখানে আজন্ম পাপ—সেখানে মেনেই তো নিয়েছি। চলন্ত বাস-ট্রেনে বসে আছি কানে সোনার দুল পরে, কানসমেত ছিনিয়ে নিয়ে যাবে ছিনতাইকারীরা, এটা তো তাদের অধিকার। কিন্তু কোনো রাজনৈতিক অভিপ্রায় ছাড়া শুধু ছেলেমানুষি আনন্দ চরিতার্থ করার জন্য ট্রেনে ঢিল ছোড়া হবে, অনেক ক্ষেত্রে বাসে-ট্রাকেও ঢিল ছোড়া হয়, পথের ধারে কোনো পাথরের স্তূপে বসে আছে একদল আদমসন্তান, সময় কাটানোর জন্য তারা বেছে নেয় এই খেলা, পাথর ছুড়ে কে লাগাতে পারে ট্রেনে, কে ঢোকাতে পারে জানালায়—এর কোনো ব্যাখ্যা নেই, এই ঘটনায় হতাহতের কোনো সান্ত্বনা নেই।

এখন প্রীতির মৃত্যু কি আমাদের মূঢ় চৈতন্যকে জাগ্রত করবে? সারা দেশে যেসব জনপদের ভেতর দিয়ে রেললাইন গেছে, সেসব জনপদের মানুষেরা কি একটিবার একটু নড়েচড়ে বসবেন? বিশেষ করে তরুণেরা কি একটু সক্রিয়তা ও সচেতনতার পরিচয় দেবেন? এখনি বের হোন, পাড়ার বন্ধুদের ডাকুন, সমবেত হোন, বোঝান, ছেলেপুলেদের ডেকে জড়ো করে বোঝান, একটা শোভাযাত্রা করুন। দরকার পড়লে চাঁদা তুলে একটা মাইক ভাড়া করে পুলিশের অনুমতি নিয়ে ‘ট্রেনে ঢিল ছুড়বেন না’—এই আবেদন প্রচার করুন। লিফলেট ছাপুন। হাতে লেখা পোস্টার লাগান।

তবে শাস্তিও হতে হবে। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি। যে এলাকায় ঢিলটা ছোড়া হয়েছে, সেই এলাকায় কি পুলিশ একটা অভিযান প্রচার করতে পারে না? বের করতে পারে না কে বা কারা এই ঢিল ছোড়া খেলায় অংশ নিয়েছে? দায়ী ব্যক্তিদের শনাক্ত করা গেলে, তাদের গ্রেপ্তার করা গেলে এবং তাদের শাস্তি দেওয়া গেলে সেটাও কিন্তু ভবিষ্যতে এই ভয়ংকর খুনের খেলাকে নিরুৎসাহিত করবে।

এই দেশে আমাদের অনেক দুঃখ, অনেক কষ্ট। কতগুলো কষ্টের কোনো প্রতিবিধান আমাদের হাতে নেই। যেমন আজ যদি ভূমিকম্প হয়, সেই ভূমিকম্প ঠেকানোর ক্ষমতা আমাদের হাতে নেই। কিন্তু ট্রেনে কেন আমরা ঢিল ছুড়ব?

টেলিভিশনের খবরেই দেখলাম আরেকটা মৃতের বাড়ি। এজাজ নামের একজন যুবকের গল্প। তাঁর বোনের বাড়িতে ঈদ কেমন হচ্ছে, তা-ই দেখানো হচ্ছে। বোনের বাড়িতে এসে উঠেছেন এজাজের সদ্য বিধবা স্ত্রী। বোনের বাড়িতে দেখলাম বড় বড় সোফাসেট, বড় টেলিভিশন। অর্থাত্ কিনা এটা এক সম্পন্ন পরিবারেরই ঘটনা। এজাজ উদ্দিন চৌধুরী কায়কোবাদ (৩৫) চাকরি করতেন একটা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে, ছিলেন ক্রয় ব্যবস্থাপক। গিয়েছিলেন কৌতূহলবশত রানা প্লাজা এলাকায়। তারপর তিনি লেগে পড়েন উদ্ধার অভিযানে। স্ত্রী, সন্তানের মায়া ভুলে তিনি দিনরাত্রি ব্যস্ত থাকেন উদ্ধারকাজে। তাঁর স্ত্রীকে তিনি বলেছিলেন, ‘তুমি যদি ওইখানে ঢুকতা, যদি তুমি শুনতা ওই আবেদন, আমারে উদ্ধার করেন, তাইলে তুমিও বসে থাকতে পারতা না’। তিনি ধ্বংসস্তূপের ভেতরে ঢোকেন, জীবিত ও মৃত ব্যক্তিদের বের করে আনেন। একবার তাঁকেই আনতে হলো স্ট্রেচারে, ওই সুড়ঙ্গের ভেতর থেকে, তাঁর পরনে উদ্ধারকারীর হলুদ জ্যাকেট, তিনি বেরিয়ে এলেন, স্ট্রেচারে শুয়ে—আহত, দগ্ধ। শাহীনাকে উদ্ধার করতে গিয়ে তিনি অগ্নিকাণ্ডের শিকার হন। পরে তাঁর মৃত্যু ঘটে সিঙ্গাপুরের হাসপাতালে।

এই দেশে যেমন অকারণে মানুষ হত্যা করার জন্য ঢিল ছোড়া হাত আছে, তেমনি অনাত্মীয়কে উদ্ধার করতে গিয়ে নিজের জীবন বিলিয়ে দেওয়া মানুষও আছেন। আমাদের ভালো মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি ঘটাতে হবে। প্রতিটি হূদয়কে শুশ্রূষা করে কোমল করে তুলতে হবে। আমরা যেন সবুজ ঘাসে এক বিন্দু শিশির দেখে মুগ্ধ হই, মায়ের কোলে শিশুর হাসি দেখে আবেগাপ্লুত হই। আমরা যেন একটা পিঁপড়ার অকারণ মৃত্যুতেও ব্যথা পাই। তাহলেই আমরা বুঝব, জীবন কত মূল্যবান, এই উপলব্ধি আমার আসবে যে পারলে একজন মানুষের উপকার করব, একজন মানুষেরও ক্ষতি করব না। অকারণ ক্ষতির তো প্রশ্নই আসে না। অকারণে ঢিল ছুড়ে মানুষ হত্যা করা? অসম্ভব, অসম্ভব।

(লেখাটি প্রথম আলো থেকে নেয়া)

আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.