আমার শিক্ষকগণ (২য় পর্ব)

0

আনন্দময়ী মজুমদার:

অনুভূতির জমিন – ড্যানিয়েল ও রবীন্দ্রনাথ

১) কী হতে চাও? ডাক্তার না ইঞ্জিনিয়ার? এরকম প্রশ্ন ৮০’র দশকে শুনেছি, এখনো আছে। হতে চাওয়া, মানে পেশার জগত আর জীবিকা আমাদের একটা বড়ো জায়গা অধিকার করে রাখে সন্দেহ নেই।

খুব জরুরি, সে ব্যাপারেও সন্দেহ নেই।

আমার বাবা এক সময় সার্কাসের এক্রোব্যাট হতে চাইতেন। আমি জিমন্যাস্ট হতে চাইতাম। আমার ছেলে বিজ্ঞানী হতে চাইতো। এই চাওয়ার মধ্যে যে আন্তরিকতা আছে, সেটা আছে।

২) “কী হতে চাও?” কথাটার মধ্যে একটা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, এবং অনিশ্চয়তা আছে। এমন যেন আমরা ভাঙা মূর্তি, মাটির ঢেলা। নিজেদের গড়তে হবে। অথচ আজকের শিক্ষা বলছে – শিশুরা নিটোল বীজ। শুধু যত্ন দরকার। যা হবার সবটুকু তাদের বুকের মধ্যেই আছে।

“হতে” যে পারে না, বা পারেনি, এরকম লোকের সংখ্যা নেহাত কম না। আমিও হয়তো তাঁদের দলে পড়ি। আমি জিমন্যাস্ট নই সেটা মানতেই হবে।

মা-বাবা সমাজ পরিবারকে খুশি করতে না পারা আর হতে না পারা একরকম একই। ব্যর্থতা একটা সামাজিক লেবেল। সেই লেবেল আমেরিকার মতো সমাজে আসে ‘লুজার’ (loser) তকমার সঙ্গে। কারো অহংবোধ এবং সংবেদনে এতোটুকু ঘা ফেলার জন্য ওই কথাটা যথেষ্ট।

৩) রূপকথার জগতে সিন্ডারেলা পায় প্রিন্স চারমিং-কে, রেপাঞ্জেল পায় উদ্ধারকর্তাকে, স্লিপিং বিউটির ব্যাপারও তথৈবচ। আর পুরুষরা পায় রাজকন্যা, অনেক সময় রাজত্ব ইত্যাদি। বস্তুকেন্দ্রিক পাওয়ার বিষয়টা আমরা বুঝতে পারি। হাতে হাতে চুকে যায়। গল্প ফুরায় আর নটে গাছ মুড়ায়। আমরা গল্পই চাই। রূপকথা।

তারপর কী হলো? ‘এভার আফটার’ বলে কিছু আছে কিনা, ছোটো বেলায় রূপকথা বলার পর এই প্রশ্নটা আসে না, তাই বড়ো বেলাতেও সেই প্রশ্ন আসে না।

৪) অনেক আগে মিষ্টি খাবার প্রতি লোভ মনে পড়ে। যতই খাই, খাই মেটে না। অথচ আমার ধারণা ওই মিষ্টি খেলেই আমার মন ভরবে। কিন্তু মিষ্টির স্বাদ মুখে ফুরিয়ে যায়। হয়তো মিষ্টি না, অন্য কিছু চাইছিলাম আমরা। অন্য কোনো অনুভূতি। যেটা অন্য কিছুর মাধ্যমে পাওয়া যেত। হয়তো প্রিয় বন্ধুর সঙ্গে এক ঘণ্টা ব্যাডমিন্টন প্র্যাক্টিস করে। বা সূর্যাস্ত দেখে।

একটা নতুন গাড়ি পাবার আকাঙ্ক্ষা কি গাড়ির জন্যই, নাকি একটু ‘অনন্ত’ হবার অনুভূতির জন্য, অথবা ক্ষমতাবান হবার অনুভূতির জন্য? অনেক সময় গাড়িটাই আমাদের দরকার। আবার অনেক সময় তা নাও হতে পারে। গাড়িটা পেয়ে গেলে কি সেই অনুভূতিটিকে ঠিক ঠিক খুঁজে পাওয়া যাবে এবং গল্প শেষ হয়ে যাবে? নাকি রেশ থেকে যাবে সেই চাওয়ার? গাড়িটা পেয়েও সেই অনুভূতি হাতেনাতে পাবার ক্ষুধা নিভতে নাও পারে। ‘অনন্ত’ হবার অনুভুতির জন্য ভোরবেলা পদ্মার ধারে পাখি দেখলেও মিলতে পারে। যার যেভাবে মেলে।

৫) আজকাল মনোবিজ্ঞানীরা শিশুদের অনেক কম উপকরণ আর খেলনা কিনে দেবার পক্ষপাতী। শিশুরা খেলনার জন্য আবদার করে। এবং পায়। এই আবদার আর পাওয়ার সূত্রে গল্প শেষ হয় না। ক্ষুধা মেটে না। একটা চাহিদা-সম্পন্ন সমাজ তৈরি হয়, যারা হয়ত নিজের ভিতরে কী গভীর চাওয়া আছে, সেটা জানে না।

৬) আমার আরেকজন শিক্ষক ড্যানিয়েল লাপোর্ট। যার কাছে এসেছিলাম, যেমন মিউজকে খুঁজে পায় পাখি, বা যমজকে খুঁজে পায় বোন। আসতেই হতো, ব্যাপারটা যেন এমন। তাঁর লেখার হাত প্রবল। আমার কাছে মনে হয় আকাশের গায়ে বিদ্যুৎ-লেখার মতোন। অমোঘ, নিবিড়, প্রাকৃতিক। আমি তাঁর সব লেখাই পড়েছি। এমন কিছু মানুষকে আমাদের অনেক সময় মনে হয় বিছড়ে যাওয়া বন্ধন।

তো, ড্যানিয়েল একজন শাদা অগ্নিকন্যা। মানে White Hot Truth নিয়ে তাঁর একটা বই আছে।

আমি তাঁর কাছ থেকে শিখেছি, প্রত্যেক মানুষের কেন্দ্রে একটা গলিত তপ্ত শাদা সত্যময় ব্যাপার আছে। সাদা রঙের মধ্যে থাকে সকল রঙ। খুব বেশি গরম হলে আর কোনো রঙ দেখা যায় না, শাদা ছাড়া।

সেই গনগন করা শাদা সত্যের জায়গায় আছে তার ডিজায়ার, বা গভীর আশা সমূহ।

গভীর আশার রূপ অনেক সময় বস্তুর মতো দেখায় — জুতো, জামা, গয়নাগাটি, বাড়ি, গাড়ি, সঙ্গীসাথি, সন্তান, টাকাপয়সা, নামডাক, চাকুরি, এই রকম।

৭) তবে গভীর আশারা আসলে অবিমিশ্রভাবে শুধু অনুভূতি – বস্তু না।

একজনের গভীর আশা আরেকজনের সঙ্গে মিলে যাবে এমন কোনো কথা নেই। আবার আমাদের গভীর আশা আজ যা কাল তাই-ই থাকবে এমন কোনো কথা নেই।

অনেক গভীর আশার মধ্যে মূল কয়েকটা গভীর আশাকে শনাক্ত করলে ব্যাপারটা এরকম দাঁড়ায়, যে আমার কেন্দ্রে তারা যে থাকে (“তোমার ঘরে বসত করে কয় জনা, মন জানো না”), আর তাদের চেহারাসুরত যেন আমার কাছে স্বচ্ছ হয়ে যায়।

আমি অনেক দিন আমার গভীর আশাদের খুঁজতে চেয়েছি। অতঃপর একে একে তারা আমার সামনে হাজির হয়েছেন, হয়তো কাল পাল্টেও যেতে পারেন। তারা হলেন সুরেলা (Harmony), শান্তি (peace), পূর্ণা (plenty), স্বাধীন (free), অনন্ত (Limitless).

এই গভীর আশারা আমার প্রাণকে সচল রাখেন এবং সব কাজে, সব চাওয়ায় ঘুরে ফিরে এদের আমরা চাই।

৮) কোনো বন্ধুর সঙ্গে দেখা হবার বাসনা — গভীর অর্থে সেই সংযোগের আশা, যেখানে হয়ত harmony, একাত্মতা অনুভব করতে পারি। অথচ বন্ধুর সঙ্গে দেখা হলে যদি গভীর আশার কথা মনে না থাকে, তাহলে সেই মুহূর্ত নষ্ট করে ফেলাও এমন কিছু কঠিন নয়। তখন সুর না মেলার সম্ভাবনা থেকে যায়, আর বন্ধুকে পেলেও মন তুষ্ট হয় না।

একইভাবে কেউ নেপাল ট্রিপে যেতে চাই কারণ আমাদের এই বিমান ভ্রমণ হয়তোবা “স্বাধীন” অনুভূতিকে পূর্ণ করবে বলে আমরা মনে করছি। কিন্তু টাকাপয়সা না থাকায় অন্যভাবেও সেই স্বাধীনতার পুলক আর আশাকে আমরা কাছে ডেকে নিতে পারি। লিখে বা জারনালিং করেই সে ‘স্বাধীন’ অনুভূতি আসে কারো কাছে। শুধু বোঝার অপেক্ষা।

৯) সঙ্গত কারণে ড্যানিয়েলের পাঠকগোষ্ঠী বিশাল।

অনেকে বুঝতে পারছেন পরিবেশ, গাছ, অরণ্য এইসব ক্ষয় করে বস্তুর পেছনে ছোটার চেয়ে একটা ছোটো গৃহকোণ, সামান্য উপকরণ আর সরল জীবন, আন্তরিক সঙ্গীসাথি (গাছ ও প্রাণীও হতে পারে) নিয়েই গভীর আশাকে খুঁজে পাওয়া কঠিন না। বড়ো আশা পূরণের জন্য বড়ো টাকা আর বেবাক খরচের দরকার হয় না। পরিবেশের ক্ষতি অথবা কার্বন ফুটপ্রিন্ট বাড়ানোর দরকার করে না।

বিপদের কথা হলো, গভীর আশা যখন পরাহত, তখন আমাদের কেন্দ্রে শাদা গনগন সত্যটা আমরা পাই না।

রবীন্দ্রনাথের কোনো এক গানে গভীর আশার কথা আছে বলে শব্দবন্ধটা ব্যবহার করলাম। ‘অন্তরে যে গভীর আশা বয়ে বেড়াই’।

১০) রবীন্দ্রনাথ যে আমাদের শিক্ষক সেটা আর আলাদা করে বলার কী বা আছে। আর এই ছোটো পরিসরে তাঁকে নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি না করলেও চলে।

বরং এই যুগের ক্যানেডিয়ান লেখক ড্যানিয়েলের এই গভীর আশার ব্যাপারটা আর কবেকার কোন যুগের রবীন্দ্রনাথের ভাষা আর কাজের মধ্যে মিল পেয়ে গেলাম যেন।

১১) কিছুদিন আগে রবীন্দ্রনাথের গানের ভাব নিয়ে একটা ওয়ার্কশপ হয়। সেখানে কোন গান কার মনে কী ধরণের অনুভূতি জাগিয়ে তোলে (সময় আর মানুষনির্ভর) সেটা একটা ওয়ার্কশিট তৈরি করে জিজ্ঞেস করেছিলাম।

দেখা গেল গানের সঙ্গে আমাদের মনে নানা অনুভূতির খেলা চলতে থাকে।

মোটা দাগের অনুভূতি আমরা শনাক্ত করতে পারি, এবং এক এক জনের কাছে সেই সব এক এক রকম।

আবার কোনও অনুভূতিকে ডেকে আনার জন্য আমরা এক এক ধরনের গান করি, বা শুনি। প্রত্যেকের ক্ষেত্রে এই সিলেকশন এবং প্রক্রিয়া আলাদাই।

যেমন ধরা যাক ‘আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে’। গানটা আমরা হাজার বার শুনেছি। কিন্তু কোনো এক মুহূর্তে হেমন্তের গলায়, অন্য এক মুহূর্তে নিজের গলায়, আবার আরেক মুহূর্তে আরেকজনের গলায় শোনার অনুভূতি আলাদা।

আমার স্বজনের মৃত্যুর পর যখন এই গান করা হলো, ‘আমার এই দেহখানি তুলে ধরো তোমার ওই দেবালয়ের প্রদীপ করো।’ তাঁর দেহ দাহ হয়ে যাচ্ছে, আগুনের পোড়া শব্দের সঙ্গে ধোঁয়া আকাশে যাচ্ছে, আর এই লাইন যে অন্য কোনো মানে আছে, সেই অদ্ভুত অনুভূতি আমার প্রথমবার হলো। তাই গানের ব্যাপারে কোনো অনুভূতি চরম, বা শেষ কথা নয়। এর সম্ভাবনা বিস্তর, আর রবীন্দ্রনাথের পরে শ্রোতা আর শিল্পীর কাছে সেই সম্ভাবনা অপার হয়ে যায়।

নিভৃতে বসে যখন গান গাই, তখন সে মুহূর্তের কাছে সমর্পিত হলে বুঝতে পারি ঠিক কী কী অনুভূতি আমাদের টানছে। রবীন্দ্রনাথের গানের ক্ষেত্রে বলা যায়, সেরকম অনুভূতির গান আমাদের কাছে এসে বন্ধুর মত দেখা দেয়, পাশে এসে বসে।

১২) তো, জীবনে কী হতে চাই? আর কী পেতে চাই? এর উত্তরে এতোগুলো কথা এসে গেল। শেষ পর্যন্ত যদি স্ট্যাটাস কুয়োর ফাঁদে ধরা না পড়ে নিজের গভীর আশাদের কাছাকাছি রাখতে চাই, তাহলে হয়তো অনুভূতির রাজ্যে যেতে হবে।

3 idiots থেকে মনে পড়ে গেল, যে ছেলে ওয়াইল্ড লাইফ ভালোবাসে, ছবি তোলা যার ধ্যানজ্ঞান, তাকে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে পাঠিয়ে কী অবস্থাটা না হয়েছিল!

১৩) আমার এক স্বজন ছিলেন – তিনি বলেছিলেন, কোনো কিছু না বুঝে করো না। আমি তাঁর কথা রাখতে পারিনি সব সময়। অনেক সময় গভীর আশাদের সঙ্গে আলোচনা না করেই কাজকর্ম করে ফেলেছি। এখনো করে থাকি।

১৪) শিশুকে খাওয়ার সময় বা কিছু বেছে নেবার সময় তাই প্রশ্ন করি, তুমি কী চাও? কোনটা তোমার পছন্দ? সেটাই তুমি নেবে। শিশুর অনুভূতি মূল্যবান এবং স্বতন্ত্র, সেটা জানি। শিশুও আমি যে স্বতন্ত্র অনুভূতির ব্যক্তি সেটা মেনে চলে। আমরা পরস্পর অনুভূতিগুলিকে লালন করার চেষ্টা করি, আলাদা হলেও।

শেয়ার করুন:
  • 177
  •  
  •  
  •  
  •  
    177
    Shares

লেখাটি ৭৯৬ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.