অগাস্ট!

mourn picতানিয়া মোর্শেদ: টিভিতে একটি ব্যান্ডের মিউজিক/গানের অনুষ্ঠান হচ্ছে। গান যতটা না ভাল লাগছিল, মিউজিক বেশ ভালো লাগছিল। আমার পছন্দের মিউজিক জ্যাজ বাজছিল, (বাংলা গানের সাথে) তাই হয়ত! অভ্যাসবশত পায়ে তাল দিচ্ছিলাম। আর মনে মনে কী ভাবছিলাম!

আশ্চর্য হয়ে আবিষ্কার করলাম, ভাবছিলাম এই অগাস্টে কে কে অন্য ভুবনে চলে গেছেন! ব্যক্তিগত থেকে জাতিগতভাবে কাঁদিয়ে যাওয়া মানুষগুলো। জীবনের প্রথম মৃত্যু (কাছ থেকে দেখা), ১৯৭১-এ লিটন ভাই (কাজিন)।

মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে পালাতে যেয়ে পায়ে খেঁজুরের কাঁটা বিঁধে টিটেনাসে মৃত্যু। মুক্তিযুদ্ধের প্রথম দিকে একমাস বাঘা, রাজশাহীর একগ্রামে (মা’র দূর সম্পর্কের আত্মীয়ের বাড়ী) ছিলাম। দোতলা কাঠের একটি ঘরে শহর থেকে আসা প্রায় এক’শ জন!! সেই ঘরেই লিটন ভাই অসুস্থ হয়ে চলে যান। এরপর মৃত্যু জানা হয় এক ভোরে। স্কুল যাবার প্রস্তুতি নেবো, বাবা রেডিও শুনে স্তব্ধ, চোখ লাল। জানলাম বংগবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান ও তাঁর পরিবারকে হত্যা করা হয়েছে। সবাইকে? শেখ রাসেল’কেও? ১৯৭৫ এর ১৫-ই আগস্ট!

১৩-ই আগস্ট ২০০৭, সকালে উদয়ের ফোন। আমি ঘুমাচ্ছিলাম। “ধ্রুব নেই!” নেই মানে কী!? আমি নিজে তার প্রায় বৎসর খানেক আগে থেকে মৃত্যুর কড়া নাড়া শোনা শুরু করেছি। ও সবাইকে ফাঁকি দিয়ে চলে গেলো!! কত বৎসর আগে শেষ দেখা হয়েছিল?! হিসেব মিলাতে পারিনি। একই দেশে বাস করেও দেখা হয়নি। একবার ও দেশে, আমিও গেলাম। দেখা হলো না। আমি যাবার দু’দিন পরই ও চলে এসেছিল। ভাবতাম টেক্সাসে গেলেই তো দেখা হবে! একবার গিয়েওছিলাম অস্টিনে দু’দিনের জন্য। কেন যে ডালাস যাইনি তখন! শুভ’কে জন্মদিনের শুভেচ্ছা সবাই জানালেও আমি পারি না। ধ্রুব-শুভ’র জন্মদিন অগাস্টেই। খালা-খালু (ওদের বাবা-মা) সব সময় “ধ্রুব শুভ” বলে ডাকতেন। আমরা সবাই তাই ডাকতাম। অনেক অনেক মানুষই ওদের আলাদা করতে পারতেন না। আমরা ভাই-বোনরা ঠিকই চিনতাম, কে ধ্রুব আর কে শুভ। আমি-দীপন-ধ্রুব-শুভ এই চারজন শুধু কাজিন ভাই-বোনই নই। ছোট্টবেলার বন্ধু! বন্ধু হারানোর অনুভূতি বেশী বলা যায় না! থাকে মনের গভীরে। স্মৃতি নড়ে চড়ে উঠলে, বাঁধ ভেঙ্গে বন্যা নামে!

সেজ খালার বাড়িতে আমাকে কেউ দেখে যদি জিজ্ঞাসা করতেন, “ও কে?” খালার উত্তর, “আমাদের মেয়ে।” অনেকবার জিজ্ঞাসা করবার পর জানতে পারতেন, আমি তাঁর বোনের মেয়ে! আমার অন্যান্য খালারাও এভাবেই বলেন অবশ্য। খালা, ধ্রুব চলে যাবার পর কীভাবে বেঁচেছিলেন জানি না! দেশে যেয়ে তাকাতে পারতাম না বেশীক্ষণ তাঁর দিকে। না, বেশী বার তাকাতে হয়নি। চলে গেছেন ধ্রুব আর খালুর কাছে। খালুর মত এত ভালবাসা প্রকাশ করা মানুষ কম পেয়েছি জীবনে। খালাও চলে গেছেন অগাস্টে। ধ্রুব শুভ’র জন্মদিনের পরদিন।

দু’ বৎসর আগে দেশে মিজানের ডেংগু, স্কয়ার হাস্পাতালে ছিল। যেদিন রিলিজ করে দিল, ব্লাড টেস্ট করা ইত্যাদির জন্য বসে আছি, টিভিতে ব্রেকিং নিউজ, “তারেক মাসুদ, মিশুক মুনীর ……।” আমি মিশুক মুনীরকে তখন চিনতাম না। তবে কেন যেন মনে হচ্ছিল, মুনীর চৌধুরীর কেউ নন তো! আমি তারেক মাসুদ নাম দেখে কপালে হাত দিয়ে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছিলাম। মানুষজন তাকাচ্ছে দেখে দীপ্ত এসে বলেছিল, “মা তুমি বস। এমন করছো কেন? মানুষ তাকাচ্ছে।” দেশে ওর এই জিনিসটা খুব অপছন্দ, মানুষ এমনি এমনি নারীদের দিকে (যে বয়সীই হোক না কেন) তাকিয়ে থাকে! আমি বলেছিলাম, “আই ডোন্ট কেয়ার এনিথিং নাও।” পরে বলেছিলাম, কী হারিয়েছি আমরা! আমরা হাসপাতাল থেকে চলে আসবার পর পরই ক্যাথেরিন মাসুদ ও অন্যান্যদের সেখানে আনা হয়। আমি ক’দিন ধরে মনে মনে প্রার্থনা করেছি, “ক্যাথেরিনকে বাঁচিয়ে দাও, অবোধ শিশুটির জন্য!”

সামিনা আমার কিছু বড়। কাজিনের কাজিন। এক/দু’বার খালার বাসায় দেখা হয়েছে অল্প সময়ের জন্য, অনেক মানুষের ভিড়ে। সেভাবে আলাপ নেই। সে আজ বা কাল চলে যাবে! কীভাবে জানলাম? সে একজন ক্যান্সার যোদ্ধা! ক্যান্সার যুদ্ধের এই জিনিসটাকে আমি সবচেয়ে অপছন্দ করি! সবাইকে জানান দিয়ে মৃত্যুর সাক্ষাৎ! সামিনা যুদ্ধ শুরু করবার পর ওঁর সম্পর্কে খালার কাছ থেকে জেনেছি। খুব ভালো একজন মানুষ। গতকাল কাজিন ওঁর নোট পোস্ট করেছে। কথা বলতে পারছে না। অনেক কষ্টে লেখা! “আই লাভ ইউ অল ভেরি মাচ!”

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.