কেউ মোল্লা হয়ে জন্মে না, ক্রমেই মোল্লা বানানো হয়

0

আলহাজ্ব মুফতি আবদুল্লাহ আল মাসুদ:

মোল্লা হয়ে কেউ জন্মে না, ক্রমেই মোল্লা হয়ে ওঠে। শিশুর শৈশবকে খুন করে তাকে মোল্লা করে গড়ে তোলা হয়। শৈশবে কেউই মোল্লা হতে চায়নি। এমনকি আহমদ শফী, বাবুনগরী, মুফতি হান্নান, শায়খ রহমান, জসীমউদ্দিন রাহমানী, রাজ্জাক বিন ইউসুফ, মাসুদ আজহার, হাফিজ সাঈদ কেউই মোল্লা হতে চায়নি।

আমি আমার মাদ্রাসা নামক কারাগারে থাকাকালীন ‘মৃত শৈশবে’ দেখেছি একটি ছেলেও মাদ্রাসায় পড়তে চায়নি। এমনকি আমার যে ক্লাসমেটরা এখন প্রতি শুক্রবার নাস্তিকদের ‘কতল’ করার ফতোয়া দেয়, তারাও সবাই শৈশবে মাদ্রাসা নামক কারাগার থেকে বার বার পালিয়েছে। মোল্লা বানানোর জন্য তাদের প্রত্যেকের শৈশবকে খুন করা হয়েছে।

শৈশবকে পিটিয়ে, ধর্ষণ করে খুন করা ছাড়া কাউকে মাদ্রাসায় রাখা সম্ভব নয়। পুরো সমাজের সেকুলার রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, সুশীল শ্রেণী মিলে গণধর্ষণ করে খুন করে মাদ্রাসা-পড়ুয়া শিশুর শৈশবকে। যদিও ধর্ষণের জন্য ব্যবহৃত হয় হুজুরের শিশ্ন, যদিও পিটুনির জন্য ব্যবহার করা হয় হুজুরের লাঠি; কিন্তু এই হুজুর তো নিজেও নিহত, সে নিজেও সমাজ কর্তৃক ধর্ষিত, সে নিজেও ধর্ষিত হয়েছিল তার শৈশবে তারই হুজুরের মাধ্যমে। আসলে এই মৃত হুজুরের শিশ্ন ও লাঠি পরিচালিত হয় সেকুলার রাজনীতিবিদ ও সেকুলার সুশীলদের ইন্ধন ও অর্থায়নেই।

ধর্ষণে ব্যবহৃত শিশ্নধারী হুজুর, পিটুনিতে ব্যবহৃত লাঠিধারী হুজুর এরা কেউই জীবিত নয়, এরা সবাই নিহত। জীবিত আছে কেবল তাদের প্রেতাত্মা, যে প্রেতাত্মা সমাজ কর্তৃক তার নিজের শৈশবকে খুন হতে দেখেছে; যে প্রেতাত্মা সমাজের অন্যদের শৈশবকেও খুন করার জন্য তাই উঠেপড়ে লেগেছে। নিজের শৈশব খুন হওয়ার কারণে সে কারোর শৈশবই আর রাখতে চাইছে না। সে খুন করতে চাইছে সমাজের প্রতিটি শিশুর শৈশবকে। আর সেজন্যই বাংলাদেশের আহমদ শফী, রাজ্জাক, চরমোনাই পীর, ভারতের বদরুদ্দীন আজমল, আসাদুদ্দীন ওয়াইসি, ফুরফুরার পীর মেয়েদের স্কুলে যাওয়ার বিরুদ্ধে ফতোয়া দেয়, ছেলেদের মাদ্রাসায় পড়ানোর ফতোয়া দেয়। তারা কারোরই সুস্থ ও জীবিত শৈশব চায় না।

নিহত মানুষ যদি ভূত হয়ে আপনার গলা টিপে ধরে, যদি প্রতিশোধ নেয় তবে আপনি কী করবেন? আপনি আজকের তেঁতুল শফী ও আজমলদের মতো মোল্লাদের যে শৈশবকে মাদ্রাসার কারাগারে তিলে তিলে নৃশংসভাবে খুন করেছিলেন, তারা কি এর প্রতিশোধ নেবে না? তারা কি তাদের খুন হওয়া শৈশবের কারাগারে প্রাপ্ত জিহাদের শিক্ষা আপনার উপরেও প্রয়োগ করবে না? নাকি আপনি পায়খানার কমোড থেকে হাসনাহেনার সুবাস আশা করছেন? আপনি যে মল ত্যাগ করেছেন কমোডে তা নিশ্চয়ই হাসনাহেনা হয়ে যাবে না? আপনি যে বিষবৃক্ষ রোপন করেছেন, তার গোড়ায় জল ঢেলেছেন তা নিশ্চয়ই ফুলগাছ হয়ে আপনাকে গন্ধ বিলোবে না?

কয়েকদিন আগে আমি উইমেন চ্যাপ্টারে ‘চাকরির নাম যখন বিবাহ’ শিরোনামে একটি লেখা পোস্ট করেছিলাম। সে লেখাটির পক্ষে-বিপক্ষে মন্তব্য পেয়েছি।

বিপক্ষে যারা মন্তব্য করেছেন, তাদের অনেকে গঠনমূলক সমালোচনা করলেও কয়েকজনের মন্তব্যের মধ্যে আমি এক ধরনের সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদের ছায়া দেখতে পেয়েছি। তাদের কথা পড়ে মনে হয়েছে পুরুষ হয়ে নারীবাদ নিয়ে কথা বলাটা যেনতেন অপরাধ নয়, রীতিমতো ‘ক্রিমিনাল অফেন্স!’

এই যে আমি আমার নিজেকে ‘পুরুষ’ বললাম, আসলে কি পুরুষই আমার বড় পরিচয় নাকি মানুষ আমার বড় পরিচয়? কেউ নিজেকে নারী বলছেন। নারী কি বড় পরিচয়, নাকি মানুষ বড় পরিচয়?
মানুষের প্রথম পরিচয় হচ্ছে সে মানুষ, দ্বিতীয় পরিচয় হতে পারে সে নারী বা পুরুষ। বা প্রথম দ্বিতীয় না হয়ে সেটা লৈঙ্গিক পরিচয় হতে পারে। কারণ নারী এবং পুরুষের অস্তিত্ব আছে। কারোরই প্রথম, দ্বিতীয় বা তৃতীয় কোন পরিচয়ই হতে পারে না তার ধর্ম।

আপনি মানুষের শারীরিক গঠন ও কন্ঠস্বর দিয়ে চিনতে পারেন সে নারী নাকি পুরুষ। কিছুক্ষেত্রে এতেও ব্যত্যয় ঘটে। যদিও এ পার্থক্য কারো মর্যাদাবৃদ্ধি বা মর্যাদাহানির কারণ হতে পারে না, তবু এ পার্থক্যকে আমরা কেউ অস্বীকার করতে পারি না। অস্বীকার করতে পারি বৈষম্য। বরং বৈষম্যকে অস্বীকার করতেই হবে। বর্ণের, লিঙ্গের, স্থান ও কালের পার্থক্য বৈচিত্র্য আনে, বৈষম্য নয়।

আমাদের পূর্বেকার রাজা-রাজরাগণ ও তাদের উত্তরসূরী রাজনীতিকেরা আদিকাল হতে মানুষের শারীরিক গঠনের পার্থক্য, বর্ণের পার্থক্য, অঞ্চলের পার্থক্য দিয়ে মানুষের মাঝে বিভাজন তৈরি করেছে। পার্থক্যগুলোকে তারা বিশেষভাবে চিত্রিত করার চেষ্টা করেছে। পার্থক্যের ওপর রং চড়িয়েছে। রং চড়াতে বানিয়েছে গল্প। গল্প ভালোভাবে পাকাতে ফেঁদেছে ঈশ্বর নামক পুরুষকে। পুরুষ ঈশ্বর রক্ষা করেছে পুরুষের স্বার্থ, আর নষ্ট করেছে নারীর অধিকার। পুরুষতন্ত্র যত পোক্ত হয়েছে, ঈশ্বরের পুরুষত্বও তত শক্ত হয়েছে। এজন্যই আমরা ইসলামের ঈশ্বর আল্লাহকে দেখতে পাই সবচেয়ে ক্ষমতাধর পুরুষ হিসেবে, সবচেয়ে বদরাগী পুরুষ হিসেবে; কারণ ইসলাম হচ্ছে ঈশ্বর নামক রাজনৈতিক অস্ত্রের মধ্যে নবীনতম।

আল্লাহ নামক বদরাগী, নারীবিদ্বেষী অথচ নারীলোলুপ ও প্রতিশোধ পরায়ণ এক পুরুষ ঈশ্বরকে তৈরি করা হয়েছিল চৌদ্দশো বছর আগে। এতো বছরের পুরনো আল্লাহ আজ পর্যন্ত লাস্টিং করার কথা না, কিন্তু লাস্টিং করেছে। কারণ তাকে জিইয়ে রেখেছে এবং আজও রাখছে তামাম দুনিয়ার পুরুষতান্ত্রিক পুরুষ ও পুরুষতান্ত্রিকতার তাঁবেদার নারী রাজনীতিকেরা।

আল্লাহ হচ্ছে একটি রাজনীতিবান্ধব, পুরুষবান্ধব চরিত্র। আল্লাহর নামে নারীকে শোষণ করা যায়, তাতে প্রতিবাদ হয় না তেমন। কেউ প্রতিবাদ করলেও তাকে পরকাল নামক মূলা আর ইহকাল নামক কলা ধরিয়ে দেয়া হয়। আল্লাহর নামে মুসলিমদের জুলুম করতেও সুবিধা হয়, কারণ আল্লাহর নামে জুলুম করলে শুধু নির্যাতিত শ্রেণী চিৎকার করলেও বাকিরা নীরব থাকে। আল্লাহর নামে নরনারী, শিশু ও বুড়োদেরকে খুন করলে খুনিদের পক্ষে সাফাই গাওয়ার প্রচুর লোক পাওয়া যায় বিনা পয়সায়। এর তরতাজা উদাহরণ হচ্ছে সৌদি আরব কর্তৃক আল্লাহর নামে ইয়েমেনি মুসলিমদের উপর চলমান গণহত্যা ও এর বিরুদ্ধে মুসলিমদের নিরবতা।

ইসলামের প্রধান শিকার মুসলিম নারীরা, দ্বিতীয় শিকার মোল্লারা, আর তৃতীয় শিকার অন্য ধর্মের মানুষেরা। মুসলিম রাজনীতিবিদরা এবং মুসলিম ভোটব্যাংকের রাজনীতিবিদরা মোল্লাদের সামনে নারীকে তুলে ধরে বড়শির টোপ হিসেবে যা লেখা আছে তার কোরআনে, এরপর মোল্লার দ্বারা শাসন ও শোষণ করে পুরো মুসলিম কমিউনিটিকে। মোল্লা আবার সাধারণ মুসলিম পুরুষদের বশে আনার জন্য নারীকে বড়শির কেঁচো হিসেবে তুলে ধরে, এই কেঁচো দেখে লোভাতুর মুসলিম পুরুষ খুবলে খেতে চায় তাদের নারীদেরকে; আর ঠিক এই খাবলাখাবলিকে পুঁজি করেই মুসলিম বা মুসলিম-ভোটব্যাংকের রাজনীতিবিদ শিকার করে সাধারণ মুসলিমদের।

মানুষকে বশীভূত করার রাজনৈতিক সিস্টেম হচ্ছে মানুষের মধ্যে অপরাধপ্রবণতা তৈরি তরে দেয়া। অপরাধ যত বাড়বে ব্ল্যাকমেইলের সুযোগ তত প্রশস্ত হবে। আমাদের রাজনীতিবিদেরা মানুষের জন্য বানায় আইন, আর তাদের পোষ্য মোল্লারা মানুষের জন্য বানায় পাপ। আইন আর পাপের ফাঁপড়ে পড়ে নিষ্পেষিত হয় মানুষ, দু’কুল সামলাতে না পেরে অপরাধপ্রবণ হয় মানুষ। একদিকে ঈশ্বর আরেকদিকে আদালত, এ দুটোকে সামলাতে না পেরে মানুষ খোঁজে মুক্তির উপায়; কিন্তু আক্ষেপ এই যে, মুক্তির উপায় হিসেবে এবার তার সামনে তুলে ধরা হয় হুজুগ। নিষ্পেষিত মানুষ এবারও রাজনীতিবিদ ও তাদের সৃষ্ট মোল্লাদের ফাঁদেই পা দেয়।

এজন্যই আমরা দেখতে পাই নারী নির্যাতক সাধারণ মুসলিম পুরুষেরাও তাদের ধর্মগুরু ও রাজনীতিকদের যেকোনো ধর্মীয় উস্কানিতে মৌমাছির মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে; কারণ তারা সবাই যার যার অবস্থানে থেকেই শোষিত হওয়ার পাশাপাশি শোষকও। যার যার অবস্থানে থেকেই তারা ব্ল্যাকমেইলের শিকার। নিজ অবস্থানে প্রত্যেক পুরুষের ‘শোষণের শখ’ পূরণ করার জন্যই তার হাতে তুলে দেয়া হয় এক বা একাধিক নারীকে। আর তাই কর্মজীবী মুসলিম পুরুষ যেমন তার কর্মজীবী মুসলিম স্ত্রীকে উৎপীড়ন করে, তেমনি একজন ভিখারি মুসলিম পুরুষও তার ভিখারি মুসলিম স্ত্রীকে উৎপীড়ন করে। উৎপীড়ন ও নিপীড়ন যতো শক্তপোক্ত হয়, হুজুগের প্রতি আকর্ষণও ততো বাড়তে থাকে। কারণ অত্যাচার অত্যাচারীকে কখনোই সুস্থির থাকতে দেয় না।
অস্থির মানুষ সাময়িক সান্ত্বনা খোঁজে হুজুগের মধ্যে। আর হুজুগ তৈরিতে হুজুরদের জুড়ি মেলা ভার। পুরুষ কর্তৃক নিপীড়িত নারী, মোল্লা কর্তৃক নিপীড়িত জনসাধারণ আর রাজনীতিবিদ কর্তৃক কোনঠাসা মোল্লারা চায় হুজুগ। হুজুরদের আন্দোলিত হুজুগে বাতাস বর্ষণ করতে জনগণের নেতারা। হুজুগ-পাগল জনসাধারণের মধ্যে এমন সময়েই ইসলামি শাসনের প্রতি উন্মাদনা বাড়তে থাকে। অথচ জনগণের শাসকরা তথা রাজনীতিকেরা নিজেরাও ক্ষমতা হাতছাড়া হওয়ার আশন্কায় ইসলামি শাসন মনেপ্রাণে চায় না! শাসকেরা (আসলে হবে শোষকেরা) জাস্ট হুজুগের জিকিরে লোকদের বসিয়ে দিয়ে দেদারসে চালাতে থাকে সীমাহীন দুর্নীতি।

হুজুগের পালে হাওয়া দেয় সংখ্যাতত্ত্ব। মুসলিম-প্রধান দেশের মুসলিম জনগণকে নিয়ে চলে সংখ্যার বড়াই আর অমুসলিম-প্রধান দেশের মুসলিম জনগোষ্ঠীকে নিয়ে চলে সংখ্যালঘুত্বের করুণা, আর এর উপর ভিত্তি করেই চলে রাজনীতি। এই রাজনীতি করতে গিয়ে যেকোনোভাবেই মানুষকে তার ধর্মীয় পরিচয় ধারণ করে রাখতে বলে রাজনীতিবিদেরা। জনগণকে বোঝানো হয়, ধর্মীয় পরিচয় হারিয়ে ফেললেই তুমি শেষ, তোমার সব শেষ! ভোটের হিসাবের সুবিধার কারণে মানুষকে বানিয়ে ফেলা হয় বাজারের চিংড়ি মাছের ভাগা। ভোটের মাছবাজারে চলে মানুষ-বিক্রির ধুম। এই ভাগাভাগির কবলে পড়ে সবচেয়ে শোষিত হয়েছে মুসলিম নারীরা, আজও শোষিত হচ্ছে তারা। শুধু বাংলাদেশ বা পাকিস্তান নয়, ভারতেও চিরকাল ধরে চলেছে এই রাজনীতি। সবসময় ক্ষতি করা হয়েছে নারীর, রাজনীতি করা হয়েছে নারীর অধিকার নিয়ে। কেউ দাড়িটুপি পরে, কেউবা কোট-টাই পরে, আর কেউবা গেরুয়া পরে করেছে রাজনীতি – নারীকে খেলনা মনে করেই এরা সবাই করেছে রাজনীতি।

যে বৈষম্য কোরআনের মাধ্যমে নারীর উপর সরাসরি চাপিয়ে দেয়া হয়েছে পুরুষের সুবিধার্থে, পুরুষের ভোট ভাগাভাগির সুবিধার্থে, তার দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পুরুষও। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পৃথিবীর অগ্রগতি, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে জীবজগত ও প্রকৃতি।

আমি আমার পূর্ববর্তী লেখাটিতে সমালোচনা করেছি পুরুষতন্ত্র কর্তৃক নারীর পণ্যায়নের। যে পণ্যায়ন নারীর বিয়েকে দেহবিক্রির সমান মর্যাদা (?) দেয়, যে পণ্যায়ন স্ত্রীর চরমতম অপমানকে চরমতম নারীত্ব হিসেবে চিত্রিত করে। যে বৈষম্য নারীকে নারীত্বের মধ্যেই সীমাবদ্ধ করে, আর পুরুষকে করে সীমাহীন, বল্গাহীন ও নীতিহীন। আঘাত করতে চেয়েছি সমাজের সেই সকল কুৎসিত মনোবৃত্তির বিরুদ্ধে যে মনোবৃত্তি নারীকে পণ্য বানাতে বাধ্য করে। যে মনোবৃত্তির ধারক ও বাহক আমাদেরই মা-বাবারাও। যদিও নিজের অজ্ঞাতেই মা-বাবারা পুরুষতন্ত্রের চাপিয়ে দেয়া সিস্টেমকে ধারণ করেন, যদিও মা-বাবারা আমাদের শ্রদ্ধেয় তবুও কি এই মা-বাবাদেরকে সচেতন করা আমার দায়িত্ব নয়? নাকি অজ্ঞাতকে অজ্ঞাত থাকতে দেয়াই আপনাদের কারো কারো দৃষ্টিতে চরম নৈতিকতা?

মানবজাতির দুটো সমান সংখ্যক প্রজাতি সারা পৃথিবী গড়তে যাদের অবদান সমান, তাদের মধ্যে কেন বৈষম্য করা হবে? অবশ্য সংখ্যা অধিকারের মানদন্ড হতে পারে না কখনোই। কেন শোষক শ্রেণির চাপিয়ে দেয়া বৈষম্যকে নিজের অজ্ঞাতেই প্রতিপালন করবে মা এবং বাবারা?

আমি মূলত আমার পূর্বের লেখাটিতে আমাদের মা-বাবাদের রাজনীতিকদের ফাঁদে পড়ার বিষয়ে আলোকপাত করতে চেয়েছি। আমি সমাজের সেই ভয়ঙ্কর চেহারা তুলে ধরতে চেয়েছি যে নগ্ন চেহারা আড়াল করার চেষ্টা করা হয় অধিকাংশ সময়ে বা সর্বদা। আমি সে সকল মানুষের চেতনায় আঘাত করতে চাই যারা নিজের দুটো সন্তান – একটি ছেলে একটি মেয়ের মাঝে বৈষম্য করে। আমি তাদের ভাবনার জগতে আন্দোলন সৃষ্টি করতে চাই যারা তাদের ছেলের চাকরি বা কর্মকে এক দৃষ্টিতে দেখেন, আর মেয়ের চাকরি বা কর্মকে অন্য দৃষ্টিতে দেখেন। যারা ছেলেদের জন্য ছোটকালে খেলনা পিস্তল কিনে নিয়ে আসেন আর মেয়েদের জন্য কিনে আনেন লিপস্টিক।
আমি চোখে আঙ্গুল দিতে চেয়েছি তাদের যারা নিজ ছেলেদেরকে মাঠে নিয়ে ফুটবল, ক্রিকেট খেলতে দেন, আর মেয়েদেরকে দেন মেকআপ বক্স।
যারা ছেলেদেরকে বলেন, তুমি তো ছেলে, তুমি কেন ভয় পাবে?
যারা মেয়েদেরকে বলেন, তুমি তো মেয়ে, তোমাকে পদে পদে ভয় পেতে হবে।

যাদের ছেলেরা জোরে কথা বললে, দৌড়ঝাঁপ করলে হিরো বনে যায়; আর মেয়েরা জোরে কথা বললে, দৌড়ঝাঁপ করলে সর্বনাশ হয়ে যায়! শৈশব হতে নিজেদের অজান্তেই মেয়েদেরকে নিরাপত্তাহীন করে তৈরি করছেন আমাদের সমাজের ধার্মিক মা-বাবারা। তাদের ভুল পরিচালন ও প্রতিপালনের কারণে শৈশব হতেই তাদের মেয়েরা মেরুদণ্ড সোজা করতে শেখে না।

ভুলের রাজ্যে বসবাস করা মানুষের ভাবনার জগতে আঘাত করার অধিকার আমার আছে। আপনি বাঁধা দিলেও সে অধিকার আমার আছে, না দিলেও আছে। বোরকা নামক দাসত্বের বিরুদ্ধে আপনি খুশি হলেও কথা বলবো, নাখোশ হলেও বলবো। বোরকা নারীর উপর চাপিয়ে দেয়া দাসত্ব, যার মূল থিম হচ্ছে নারীকে পণ্য বানানো। বোরখার বিরুদ্ধে দেনমোহরপন্থীরা কোমল হলেও আমি কোমল নই। ঠিক যেমন আমি কোমল নই রাজনীতিকদের নষ্টামির ফসল মোল্লাদের সন্ত্রাসের পোশাক ও সন্ত্রাসী কার্যকলাপের ব্যাপারে।

হিজাব দিয়ে যেভাবে নারীকে পিছিয়ে রাখা হয়েছে যুগের পর যুগ, ঠিক সেরকমই দাড়ি-টুপি, জোব্বা-পায়জামা তথা ধর্মীয় পোশাক দিয়ে মোল্লাদেরকেও পিছিয়ে রাখা হয়েছে যুগের পর যুগ। রাজনীতিবিদেরা বোরকা পরিয়ে যেমন নারীকে মোল্লা বানিয়ে রাখে তাদের দিয়ে অন্য নারীকে পিছিয়ে রাখার জন্য, ঠিক তেমনিভাবেই তারা দাড়ি-টুপি, জোব্বা-পাগড়ি পরিয়ে একদল পুরুষকেও মোল্লা বানিয়ে রাখে যার উদ্দেশ্য হচ্ছে নারীকে পিছিয়ে রাখা। পুরুষ মোল্লা আর নারী মোল্লা উভয়ের উদ্দেশ্য যেহেতু নারীকেই পিছিয়ে রাখা, তাই ক্রমশ সমাজের ও দেশের আপামর জনগণকে ভয় দেখানো, জনগণের মধ্যে ত্রাসের সৃষ্টি করা, ধর্মীয় উন্মাদনা তৈরি করে বিভাজন তৈরি করা, বিভাজনের মাধ্যমে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা করা এসব কিছু করানোর ক্ষেত্রে আমাদের রাজনীতিবিদরা নারী মোল্লার চেয়ে পুরুষ মোল্লাদেরকে ব্যবহার করতে পারে বহুগুণ বেশি।
কারণ নারী মোল্লা তথা বোরকাধারীরা নিজেরা পশ্চাৎপদ থাকা আর অন্য নারীকেও পশ্চাতে টেনে ধরে রাখাটাই হচ্ছে তাদের সারা জীবনের সাধনা; এজন্যই তাদের কর্ম ও এর পরিধি খুবই ছোট। পক্ষান্তরে পুরুষ মোল্লাদের ক্ষেত্র ও কর্মপরিধি অনেক বড়। তারা অন্য মোল্লাদেরকে পশ্চাতে টানে ঠিক, কিন্তু পুরো সমাজের নারীদেরকে পেছন দিকে টানাটানি করাও তাদের অন্যতম দায়িত্ব। আমজনতাকে টানাটানি করাও তাদের রাজনৈতিক-ধর্মীয় পবিত্র কর্তব্য। ক্ষমতা বেশি হয়ে গেলে তারা তাদের সৃষ্টিকর্তা রাজনীতিবিদদের হাঁটুর কাপড় ধরেও টানাটানি করে!

আশ্চর্যের বিষয় এই যে, নারী মোল্লারাও পুরুষের শ্রেষ্ঠত্বের পক্ষেই গান গায়, আর পুরুষ মোল্লারাও পুরুষের শ্রেষ্ঠত্বের পক্ষেই গান গায়। পুরুষকে তারা শ্রেষ্ঠত্ব দিতে বদ্ধপরিকর। পুরুষকে দিতে চাওয়া এই শ্রেষ্ঠত্বের অন্তর্গত হচ্ছে পুরুষ কর্তৃক বহু বিবাহ, তালাকের ওপর পুরুষের একচ্ছত্র আধিপত্য, নারীকে ধর্ষণ করা, দাসীকামিতা ও শিশুকামিতাসহ পুরুষের যৌন যথেচ্ছাচার ও বিকৃতাচারের বৈধতাদান।

নারী মোল্লা হোক আর পুরুষ মোল্লা হোক, কেউই মোল্লা হয়ে জন্মায় না। জন্মের পর ছেলেদেরকে মাদ্রাসা নামক কারাগারে আটকে রেখে তাদেরকে রাজনীতিবিদেরা জঙ্গিবাদের স্পিকার বানায়, আর এই জঙ্গিবাদী স্পিকাররাই মাদ্রাসা নামক কারাগারের ভেতরে যে কুশিক্ষা গ্রহণ করে কারাগার থেকে বেরিয়ে সেটা সমাজে ছড়িয়ে দেয়। আর সেই কুশিক্ষার আগুনে পুড়তে থাকে সমাজ, পুড়তে থাকে নারী, পুড়তে থাকে সমাজের সাধারণ পুরুষ; এমনকি তাদের সৃষ্টিকর্তা রাজনীতিবিদরাও সে আগুনের লেলিহান শিখা থেকে বাঁচতে পারে না।

পৃথিবীর রাজনীতিবিদ ও তাদের পোষ্য মোল্লা-ঠাকুর-পুরোহিতদের বিকৃতাচারের অপদর্শনের বিরুদ্ধে যুগে যুগে সরব হয়েছে বহু নারী, বহু পুরুষও; কিন্তু বিকৃতাচারীদের নিষ্ঠুরতা ও অধিকাংশ নারীদের পশ্চাদপদতা নারীমুক্তির আন্দোলনে বেগ আনতে দেয়নি। তথ্যের অপ্রতুলতাও এক্ষেত্রে কিছুটা দায়ী হতে পারে। এখন সময় বদলেছে, তথ্য মানুষের হাতের নাগালে এসেছে, বিকৃতাচারী পুরুষতন্ত্রের অপদর্শন সম্পর্কে আমরা জানতে পারছি; তাই এখন আর ‘রয়ে-সয়ে কথা বলার’ সুযোগ নেই।

এখন কবিগুরুর কবিতার লাইনের মতো ‘লহরীর পরে লহরী তুলিয়া আঘাতের পর আঘাত’ করার সময়। মেরি ওলস্টোনক্রাফট, বেগম রোকেয়া, সিমোন দ্যা বোভোয়ার বহুদিন আগেই পুরুষতন্ত্রের গালে সপাটে চড় দিয়েছেন। তসলিমা নাসরিন এখনও কষে চড় মেরে চলছেন পুরুষতন্ত্রের গালে। এখন পুরুষতন্ত্রের পিঠে আদরের পরশ দিয়ে চড়ের শোধ দেয়ার দরকার নেই। বরং একাধারে আঘাত করে করেই ভেঙে ফেলতে হবে পুরুষতন্ত্রের দেয়াল, ছিন্ন করতে হবে তার জিঞ্জির।

সত্যকে রয়ে সয়ে, লুকিয়ে চুকিয়ে, ইনিয়েবিনিয়ে বলার সময় নেই আর। ইনিয়েবিনিয়ে সত্য বললে সেটা সত্যের অপলাপ হয়, সত্য সেখান থেকে গুম হয়ে যায়। হুমায়ুন আজাদ তার নারী বইয়ে লিখেছিলেন, ‘আমাদের নারী-অধিকারবাদীরা নারীর অধিকারের চেয়ে স্ত্রীর অধিকার নিয়েই বেশি ব্যস্ত, তারা স্ত্রীবাদী বা ভদ্রমহিলাবাদী। আমাদের অঞ্চলের দুটি গোত্র – হিন্দু ও মুসলমান – পুরুষতন্ত্রের প্রচণ্ড পুরোধা।’

আমি অবশ্য একদল শারীরিক হিজাবি ও মানসিক হিজাবিদের মধ্যে দেখতে পাচ্ছি আরেক ধরনের প্রবণতা, যাকে আমি ‘দেনমোহরবাদী নারীবাদ’ নাম দিয়েছি। দেনমোহরবাদীরা নারীবাদ নিয়ে যতই চেঁচামেচি করুক না কেন, বিবাহের মঞ্চে তারা দেনমোহরের পক্ষে সাংঘাতিক উচ্চকন্ঠী। অথচ দেনমোহরের মাধ্যমেই নারীর প্রতি সবচেয়ে নিকৃষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করেছে ইসলাম।

কোরআনের আয়াতসমূহে দেনমোহরের যে আরবি প্রতিশব্দ ব্যবহার করা হয়েছে তা হচ্ছে ‘উজুর।’ উজুর শব্দটি আজর এর বহুবচন, যার অর্থ হচ্ছে পারিশ্রমিক। শারীরিক শ্রমের বিনিময়ে যে অর্থ, খাদ্য বা সাহায্য পাওয়া যায় তাকেই আরবিতে আজর বলা হয়। কোরআনের অনুবাদকেরা সবাই আজর বা উজুর এর অর্থ লিখেছে দেনমোহর। সূরা আন নিসা’র ২৪ নং আয়াতে বলা হয়েছে, “তোমরা স্ত্রীদের যৌনাঙ্গকে উপভোগ করতে চাইলে তাদেরকে তাদের পারিশ্রমিক (দেহমূল্য) দিয়ে দাও।” এই পারিশ্রমিককেই দেনমোহর হিসেবে অনুবাদ করেছে কোরআনের সব অনুবাদকেরা, যা একটি রাজনৈতিক চাতুর্য ছাড়া কিছু নয়। সম্ভব হলে সূরা আন নিসা’র ২৪ নং আয়াত পুরোটা তাফসীর সহ পড়ে ফেলবেন। পড়তে গিয়ে কেঁচোর বদলে সাপ পেলে আমি দায়ী নই (আগেই বলে দিলুম!)

ইসলামের চার মাজহাব, সালাফি, সুফী ও শিয়া সহ সব শাখা-প্রশাখার মোল্লাদের ফতোয়া হচ্ছে বিবাহের দেনমোহরের মাধ্যমে একজন স্ত্রীর যৌনাঙ্গ তার বরের কাছে বিক্রি করা হয়ে থাকে। আর সেজন্যই এদের সবার লিডার পুরুষতন্ত্রের ভয়ঙ্কর প্রবক্তা ও আনুষ্ঠানিক রূপদাতা মোহাম্মদ বলেছিল, যদি কোন পুরুষ তার স্ত্রীকে বিছানায় ডাকে আর স্ত্রী সে ডাকে সাড়া না দেয় তবে সারারাত আল্লাহর ফেরেশতারা স্ত্রীকে অভিশাপ দিতে থাকে। আপনারা মোহাম্মদের এই কথা পেয়ে যাবেন বুখারীর ৩২৩৭ নম্বর হাদিস ও মুসলিমের ৩৪৩৩ নম্বর হাদিসে।

পুরুষতান্ত্রিক মোহাম্মদ নারীর জন্য ধার্য করেছে বিনা বেতনের চাকরি, যার নাম ইসলামিক বিবাহ। এ চাকরিতে চাহিবামাত্র বসকে দেহ দিতে বাধ্য থাকতে হয়, দেহ না দিতে চাইলে বস কর্তৃক পিটুনি খেতে বাধ্য থাকতে হয়, এ চাকরিতে কর্মচারী কেবল বসের সন্তান উৎপাদনের একটি শস্যক্ষেত্র বা জমি ছাড়া আর কিছু নয়। আমার কথা বিশ্বাস করার দরকার নেই, বরং মোহাম্মদের তৈরিকৃত কোরআনের ০৪/৩৪, ০২/২২৩ নং আয়াত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ সহ পাঠ করুন।

ইসলামিক বিবাহ নামক চাকরিতে ‘বস’ মুখে তালাক বলামাত্রই বৌয়ের ‘স্ত্রীত্বের চাকরি’ নট হয়ে যায়। পৃথিবীর চাকরির ইতিহাসে এমন জঘন্যতম চাকরি আর ছিল না, এখনো নেই। খুলে দেখুন কোরআনের সূরা আল বাকারার ২২৮ থেকে ২৪২ আয়াত, তারপর যাচাই করুন মোহাম্মদের মানসিকতাকে। পুরুষতান্ত্রিক মোহাম্মদ নারীর জরায়ুকে বানিয়েছে পুরুষের সন্তান জন্মানোর জন্য ভাড়া নেয়া ঘর, আর সেজন্যই মোহাম্মদ তালাকপ্রাপ্তা গর্ভবতী নারীকে সন্তান জন্মদানের আগ পর্যন্ত তালাকদাতা পুরুষ কর্তৃক ভরণপোষণ দিতে বলে গিয়েছে। সেজন্যই ইসলাম নিজ সন্তানকে দুধপান করানোর বিনিময়ে তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীকে পারিশ্রমিক দিতে বলে। সেজন্যই ইসলাম তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীর সাথে বনিবনা না হলে মায়ের কাছ থেকে দুধের বাচ্চাকে কেড়ে নিয়ে পুরুষকে নির্দেশ দেয় অন্য মহিলা কর্তৃক দুধপান করানোর। সেজন্যই ইসলামের কোরআন পুরুষকে সেকেন্ড পারসন হিসেবে সবখানে ‘তুমি’, ‘তোমরা’, ‘তোমাদের’ বলে সম্বোধন করলেও নারীকে সবখানে ‘সে’, ‘তারা’, ‘তাদের’ বলে সম্বোধন করেছে। বিশ্বাস না হলে ইসলামের আইনের প্রধান বই কোরআনের ৬৫ নং সূরার ৫, ৬, ৭ নং আয়াতের অনুবাদ দেখুন। বিশ্বাস না হলে কোরআনের সূরাসমূহে নারী ও পুরুষকে করা সম্বোধনগুলি খুঁজে দেখুন। আর কেঁচো খুঁড়ে সাপ পেতে হলে ৬৫ নং সূরা তথা সূরা আত তালাক পুরোটা, সূরা আন নিসা পুরোটা, সূরা আহজাব পুরোটা পড়ুন অর্থসহ। বিশেষত সূরা আন নিসা’র ১৩ থেকে ২৫ আয়াত পর্যন্ত মনোযোগ দিয়ে পড়ুন।

কেউ যদি বুঝতে পারে অন্যায়ভাবে তাকে কারাগারে আটকে রাখা হয়েছে, আর সে চাইলেই কারামুক্ত হতে পারে, তারপরেও যদি সে কারাগার থেকে বের হতে না চায়, তবে তার জন্য আমি কী করতে পারি? অন্যায়ভাবে কারাগারে আটক কয়েদি কারামুক্ত হওয়ার পরেও কারাগারে থাকা দিনগুলোর অভ্যাসের মতো করে যদি নিজেকে দেখতে চায়, বা এখনও নিজেকে কারাবন্দি ভাবতে চায়, তবে তার আচরণ দেখে শুধুমাত্র করুণা ছাড়া কী করতে পারি আমি!

আমি মাদ্রাসা নামক কারাগারের একজন সাবেক বন্দি এবং পরবর্তীতে এ কারাগারেরই রক্ষী ছিলাম। আমি মসজিদ নামক কারাগারের একজন সাবেক কয়েদি এবং পরবর্তীতে রক্ষী ছিলাম। কয়েদি এবং কারারক্ষী হিসেবে আমি কারারক্ষীদের ভূমিকা সম্পর্কে কিছুটা হলেও জানি। এই কারারক্ষীদের লালনকর্তা হচ্ছে রাজনীতিবিদ, বিশেষত সেকুলারিজমের মুখোশ পরা রাজনীতিবিদ।

তারা ছেলেদেরকে শিশুকাল থেকে মাদ্রাসা নামক কারাগারে আটকে রেখে মোল্লা বানিয়ে তাদের দ্বারা নারীকে শিকার করে, নারীর স্বকীয়তাকে পিছিয়ে রাখে। তারা পুরুষদের পাশাপাশি নারীদের মধ্যেও মোল্লা বানায়, যাদেরকে আমরা বলি হিজাবি বা বোরকাওয়ালী। শোষিতদের দিয়েই শোষিতদের শায়েস্তা করা রাজন্যবর্গের পুরনো স্বভাব। মানুষে মানুষে বিভেদ তৈরি করে, মানুষে মানুষে দেশ, জাত-পাত-ধর্ম-বর্ণ সৃষ্টি করে মানুষকে শোষণ করার অভ্যেসও রাজনীতিবিদদের হাজার বছরের পুরনো চর্চারই অংশ।

আমি হিন্দু ধর্মের বর্বরতা ও গোরক্ষকদের তাণ্ডবের বিরুদ্ধে পোস্ট করলেই দেখতে পাই ভারতীয় হিন্দুত্ববাদী ও গোরক্ষকদের মনের চেহারা। তাদের কমেন্ট পড়লেই বোঝা যায়, এরা আমাকে মেরে চিবিয়ে খেতে পারলেও তাদের মনের ঝাল মিটবে না। আমার পোস্টের কমেন্টে তাদের বক্তব্য শুনে মনে হয়েছে, একজন বাংলাদেশী হিসেবে আমি ভারতের গোরক্ষকদের সমালোচনা করতে পারি না। তারা একথাও দাবি করেছে, একজন ‘অহিন্দু’ হিসেবে আমি কোনভাবেই হিন্দু ধর্মের সমালোচনা করার অধিকার রাখি না। গোরক্ষকের দল আমার সাথে যুক্তিতে না পেরে শেষ পর্যন্ত আমাকে ইসলামিক জঙ্গি, তালেবান নেতা, ইত্যাদি আখ্যা দিতেও কার্পণ্য করেনি।

লৈঙ্গিক পরিচয়ে পুরুষ হয়েছি বলে কি আমি নারীবাদ নিয়ে কথা বলতে পারবো না? নারীর অধিকার নিয়ে আমার মতামত ব্যক্ত করতে পারবো না? বাংলাদেশি হয়েছি বলে কি আমি ভারত নিয়ে কথা বলতে পারবো না?
আসলে আমরা যারা নিজেদেরকে মানবজাতির সদস্য মনে করি, তারা কি কোন দেশ, লিঙ্গ, বর্ণ এসব কিছুর বৃত্তে নিজেদেরকে আবদ্ধ রাখতে পারি? আমাদের ভাবনাগুলো যদি এই হয় যে, ব্যক্তি নারী হয়েছে বলে কোনো পুরুষের সমালোচনা করতে পারবে না, পুরুষ হয়েছে বলে কোনো নারীর সমালোচনা করতে পারবে না, ভারতীয় হয়েছে বলে বাংলাদেশে ঘটিত কোনো অনাচারের সমালোচনা করতে পারবে না, বাংলাদেশি হয়েছে বলে ভারতে ঘটমান কোনো অবিচারের সমালোচনা করতে পারবে না, আফ্রিকান হয়েছে বলে আমেরিকায় সংঘটিত কোনো হিংসার সমালোচনা করতে পারবে না, আমেরিকান হয়েছে বলে আফ্রিকায় চলমান কোনো অন্যায়ের সমালোচনা করতে পারবে না, তাহলে এটিও কি ধর্মের মতোই জঘন্য মনোবৃত্তি নয়?

সংকীর্ণতা নিয়ে মুক্তির সংগ্রাম হয় না, এটা আমরা যত তাড়াতাড়ি বুঝব ততই আমাদের মঙ্গল ত্বরান্বিত হবে।

শেয়ার করুন:
  • 2.5K
  •  
  •  
  •  
  •  
    2.5K
    Shares

লেখাটি ২,৯০৭ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.