নারীবাদ নারীর অন্যায় প্রশ্রয় দেয় না

0

প্রবীর কুমার:

অনেকের মধ্যেই একটা ভুল ধারণা আছে– তারা ভাবেন নারীবাদীরা নারীর অন্যায় এড়িয়ে যান, নারীর দোষ ঢেকে রাখার চেষ্টা করেন। এটা সম্পূর্ণ ভুল ধারণা।

আসলে নারীবাদের সাথে নারীর দোষ ঢেকে রাখার কোন সম্পর্ক নেই।

নারীবাদ হলো নারীর অধিকার কিংবা সমধিকারের কথা বলা, আন্দোলন করা, মানুষকে সচেতন করা; নারীকে পুরুষের মতো স্বতন্ত্র ভাবা, ক্ষমতা ও অধিকারের স্বাতন্ত্র্য দেওয়া।

অর্থাৎ একজন পুরুষ যে সামাজিক-রাস্ট্রীয়-মনস্তাত্ত্বিক অধিকার-সুযোগ ভোগ করবে, একজন নারীও সেই অধিকার-সুযোগ ভোগ করবে।

প্রবীর কুমার

একজন মানুষ হিসাবে নারী অন্যায়, ভুল, অত্যাচার করতেই পারে; এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে পুরুষের তুলনায় কম হলেও তা নিয়মিতভাবেই করে। রাখঢাক না ক’রে এই সত্যি মেনে নেওয়া উচিত। আমাদের চারপাশে তাকালে এই সত্যিরও সত্যতা মিলবে।

কিন্তু এই অন্যায়ের দায় কোনভাবেই নারীবাদের উপর বর্তায় না। যে নারী অন্যায় বা ভুল করেছে সে দায় সম্পূর্ণই তার। এক্ষেত্রে নারীবাদের দিকে আঙুল তোলা বুদ্ধির স্থুলতা মাত্র। নারীবাদ নারীদের অন্যায় করতে প্রোমোট করেনা, অধিকার সচেতন হতে বলে।

আর একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো– কোন নারীবাদী যদি কোন মেয়ের অন্যায়ের কথা তুলে ধরে, তার বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, তাহলে সেই নারীবাদীর নারীবাদ বাতিল হ’য়ে যায় না। বরং এটা আরো ইতিবাচক যে সে লৈঙ্গিক বৈষম্য না করে শুধু অন্যায়ের বিরুদ্ধেই দাঁড়িয়েছে।

খুব তিক্ত হলেও সত্যি যে–

★ আমাদের সমাজে কিছু নারী আছেন যারা মনে করে থাকেন, অন্যায় করেও “আমি নারী” বলে সিম্প্যাথি পাওয়া যাবে, এবং অনেক সময় সেটা পেয়েও যান।

★ কিছু নারীবাদী অনেক সময় হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে অন্ধভাবে কোন নারীর দোষ-ত্রুটি বিচার না ক’রে ওই নারীর পক্ষালম্বন করেন। তারা ভাবেন নারী হ’য়ে নারীর সমর্থন না করলে বুঝি তাদের নারীবাদ প্রশ্নবিদ্ধ হবে।

এই দুটি স্থুল ভাবনা নারীবাদের অন্তরায়।

এক্ষেত্রে মনে রাখা উচিত, নারীর প্রতি অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে আমরা দাঁড়াবো, কিন্তু সমধিকার আর মানবাধিকারের কথা মাথায় রাখতে হবে, একটা নারীও অন্যায় করতে পারে সেটাও মাথায় রাখতে হবে, একজন পুরুষ অন্যায়ের শিকার হলেও তার পক্ষে দাঁড়াতে হবে।

প্রখ্যাত নারীবাদী তসলিমা নাসরিনও তাঁর একটা লেখায় লিখেছিলেন– তিনি তাঁর জীবনে নারীদের দ্বারাই সবচেয়ে বেশি অন্যায়-অবিচারের শিকার হয়েছেন।

আমার ব্যক্তিগত জীবনেও এমনটা হয়েছে– সবচেয়ে বেশি শত্রুতা, হিংসা আর জঘন্য মিথ্যাচারের শিকার হয়েছি নারীর দ্বারাই।

তেমনি অনেক নারী-পুরুষও ঠিক এভাবেই অন্যায়-অত্যাচারের শিকার হয়েছেন নারীর দ্বারাই।

এর অর্থ এই নয় যে তসলিমা নাসরিন কিংবা আমি নারীবাদী নই, নারীর অধিকারের কথা বলি না, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধ’রে পুরুষ কতৃক নারীর উপর অন্যায়-অত্যাচারের কথা বিশ্বাস করি না।

প্রায় সভ্যতার শুরু থেকেই পুরুষেরা নারীদের দুর্বল মনে করে, পুরুষের স্বার্থ আর প্রভুত্ব বজায় রাখতে নষ্ট পুরুষতন্ত্রের জন্ম দিয়েছে। সেই ধারা এখনো চলমান। প্রায় সবক্ষেত্রে নারীরাই সবচেয়ে বেশি বা আশংকাজনকভাবে বৈষম্য আর নিপীড়নের শিকার। যে কোন বিবেকবান মানুষ কিংবা নারীবাদী এসবের বিরুদ্ধে কথা বলবে, এই বৈষম্যের বিলোপ চাইবে। এটাই স্বাভাবিক।

নারীবাদকে নিছক ট্রেন্ড না ভেবে, ট্রেন্ড হিসেবে নারীবাদে গা না ভাসিয়ে, নারীবাদ সম্পর্কে ভালো ক’রে জানা উচিত; তাহলেই বৈষম্য দূরীকরণ ত্বরান্বিত হবে। প্রয়োজনে পড়াশোনা করা উচিত।

শেয়ার করুন:
  • 126
  •  
  •  
  •  
  •  
    126
    Shares

লেখাটি ২৯২ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.