টিজিং এর শহর যখন রাজশাহী!

সাদিয়া রহমান:

গেলো ইদ ছুটির মাঝে যেই সংবাদটি সকলের নজর কেড়েছে সেটি হলো- “স্ত্রীর সম্মান রক্ষা করতে গিয়ে লাঞ্ছিত হলেন রুয়েট শিক্ষক”। এর পরপরই একটি টিভি চ্যানেল থেকে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয় রাজশাহী শহরে বখাটেদের উৎপাত বিষয়ে।

যাক দেরিতে হলেও সেই প্রতিবেদনটি হলো যেটি অনেক আগে হওয়া উচিত ছিলো। কেননা শান্তির শহর আর বিশ্বের সবচেয়ে নির্মল বায়ুর শহর রাজশাহী এখানকার মেয়েদের জন্য কতখানি নির্মল, তা নিয়ে গবেষণা করা আসলেই প্রয়োজন।

তবে শুধু রাজশাহী না, এদেশের কোন শহরটা নারীদের ন্যুনতম নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে তা একটা ভাবার বিষয় বটে।

আজ রাজশাহীরটা সামনে আসলো, তাই সেইখানকার মেয়েরা একটু কথা বলছে। ঢাকা শহরে বাসে, বাইকে হয়রানির কথা তো যত বলা হবে ততই কম।
তবু ঢাকার বাইরে অব্যস্ত শহরগুলোর চিত্র সম্ভবত এক ধরনের। রাজশাহীর সংবাদ আগে প্রকাশিত হলো বলে এর চিত্রকে অন্যান্য শহরের প্রতিনিধিত্বকারী হিসেবে ধরা যেতে পারে।

সাদিয়া রহমান

যেমন উঠতি বয়সে কম বেশি সব মেয়েই এলাকার মোড়ে মোড়ে টিজিং এর শিকার হয়। কেউ কেউ বাসায় জানানোর পর অভিভাবকেরা বুঝতে পারেন যে মেয়ে বড় হয়ে গেছে।

হ্যাঁ, এভাবেই অসুস্থ একটা চর্চাকে স্বাভাবিক করে ফেলা হয়। যেনো এটাই স্বাভাবিক যে মেয়েরা এলাকার মোড়ে টিজিং এর শিকার হবে। যেনো এটাই স্বাভাবিক যে মেয়েদেরকে তাড়া করে বখাটেরা ঘর পর্যন্ত আসবে।
“ভালো ঘরের মেয়েরা ওদিকে কান দেয় না”, “তোমাকে বলছে, তুমি শুনবা না বা পাত্তা দিবা না!”, “কাল থেকে তোমার ভাইয়া/আব্বু যাবে” মোটামুটি এগুলোই হচ্ছে সেইসব সমস্যার সমাধান।

কিন্তু যাদের ভাইয়া নাই, আব্বু নাই, তাদের কী হবে? কিন্তু যারা বাইক নিয়ে বসে মেয়েদের স্কুল ছুটির অপেক্ষা করে তাদের কী হবে? তাদেরকে কি কখনো কিছু বলা হবে না?

আমার যে অভিজ্ঞতা তা নগণ্যই বলা চলে বৈকি! সময়টা ২০১৬। স্বাস্থ্য বিষয়ক নানা জটিলতায় ওজন কমানো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ভাবলাম ক্যাম্পাস থেকে ফেরার পথে অর্ধেক রাস্তা থেকে হেঁটে বাড়ি ফেরা শুরু করবো।
সেটা শুরু করার আগে পর্যন্ত আমার কল্পনাতেও ছিলো না একটা মেয়ে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়াটা এতো ‘অস্বাভাবিক’ একটা ব্যাপার হতে পারে!

প্রথম কয়েকদিনের টোন, টিজ, টিপ্পনির পর জিদ চেপে গেলো। “আমার শহর, আমার এলাকা, আমি হাঁটবো দেখি কে কী করে”! ভুলেই গেছিলাম “মাইয়ায়ায়ায়া মানুষ” প্রজাতির আমার বলে কিছু নাই!

প্রায়ই লোকজন পিছু নেয়, ডেকে জিজ্ঞেস করে, হাঁটছি কেনো, কোনো দরকার কিনা! অদ্ভুত বিষয় এই যে, যুগ যুগ ধরে এই অসুস্থ অযাচিত কৌতুহলকে আমরা মানুষের আন্তরিকতারই অংশ হিসেবে ধরে নিয়েছি। এখানকার মানুষ আসলেই আন্তরিক, কিন্তু এই কৌতুহল, এই অকারণ জিজ্ঞাসাবাদ কখনো সেই আন্তরিকতার অংশ না এবং হতে পারে না। আগের প্রজন্মের অনেকেই বুঝতেই পারেন না রাস্তা দিয়ে হেঁটে গেলে কেনো তার ঠিকুজি জিজ্ঞেস করা যাবে না। সমস্যা হয়ে গেছে এখনকার প্রজন্ম এই ধরনের অযাচিত কৌতুহলকে অযাচিত কৌতুহলই মনে করে।

একদিন তো নিউমার্কেট থেকে লক্ষীপুর পর্যন্ত এক বাইক ফলো করে নিয়ে আসলো, লোকটা স্যুট পরা ছিলো এবং লক্ষীপুর পৌঁছে ঘুরে দাঁড়িয়েছি যে আমি কথা বলবো। সেই সময় তার ইঙ্গিতে আমি বুঝলাম রাস্তায় হেঁটে যাওয়া সব মেয়ে যে ‘বেশ্যা’ না, এটা তার ধারণার বাইরে!

রাজশাহী লালন মঞ্চ ঘাটের ভিড়ে মেয়েদের পিছনের বিশেষ স্থান টার্গেট করে ইট, পাথর ছুঁড়ে মারা, বিশেষ করে সন্ধ্যার পর অটোর ভিতরে গায়ের ওপর হামলে পড়ার চেষ্টা করা বা সাহেব বাজার ভিড়ের মাঝে ওড়না ধরে টান দেয়ার কথা তো বাদই দিলাম।

মেয়ে তোমারে ওড়না পরে প্রতিটা ইঞ্চি তো ঢাকতে হবেই, বাতাসেও তোমার ওড়না উড়ে যাওয়া যাবে না। অটোতে বেঁধে, রিকশাতে আটকে জীবন চলে যাক, তবু ওড়না ঠিক জায়গায় রাখতে হবে! এবং তা না হলে দাদার বয়সী পদ্মা আবাসিকের (রাজশাহীর গুলশান) জেন্টলম্যান থেকে শুরু করে ভুবন মোহন পার্কের স্যান্ডেলের দোকানের নতুন জয়েন করা সদ্য গোঁফের রেখা দেখা যাওয়া ছেলেটাও মেয়েটার শরীর নিয়ে মন্তব্য করাটা নিজেদের মৌলিক অধিকারের অংশ ভেবে নেয়।

প্রত্যেকদিন রুয়েটের শিক্ষকের বউ এর মতন করেই মেয়েরা ভিড়ে এবং ভিড়ের বাইরে হ্যারাজড হয়। চুপ করে থাকে। কারণ সেকথা প্রকাশ করলে আবার তারই মান সম্মান চলে যাবে কিনা!

আমি রাজশাহী মিস করি। অনেক মিস করি। নদী পাড়ের মানুষ আমি, নদী মিস করি। সবাই বলে রাজশাহীতে যান্ত্রিকতা নাই, আন্তরিকতা আছে শান্তির শহর। আমি চুপ করে হাসি।

রাজশাহীতে জীবন যাত্রা সহজ। পেটের ক্ষুধা মিটাতে কাউকে অনেক বেশি খাটতে হয় না। শহরের সৌন্দর্য তারা থোড়াই বুঝে! রকে বসে অন্যের জীবনে নাক গলানোর অফুরন্ত সময়।

আরেকটা সমস্যা আছে, আমি জানি না অন্য অঞ্চলে কেমন। এই অঞ্চলে ছেলের মায়েরা মনে করে তাদের ছেলে, স্বামী, সন্তান ধোয়া তুলসী পাতা, তারা কিছুই করতে পারে না। আবার ক্ষেত্র বিশেষে তারা যোগ দিতেও ভুলেন না!
তাই দেখা যায়, কোনো ঝামেলা হলে মেয়েটা কী করে ছেলেটারেই ছলে-বলে কৌশলে ফাঁসিয়েছে সেই আলোচনা মুখ্য হয়ে যায়। শুরু হয় নতুন হ্যারাজমেন্টের সার্কেল!

ইশ! আমাদের মেয়েগুলো যদি একটু মানুষের মত করে বাঁচতে পারতো!
আর হ্যাঁ, এই প্রতিবেদন বা লেখা যদি কারো এলাকানূভুতিতে লেগে যায় তবে দেরি না করে আদা জল মিশিয়ে চট করে পান করে নেন।

শহর শান্তির শুধু পুরুষে নদীর ধারে চ্যাগায়ে বসে আড্ডা দিতে পারলে হয় না। শহর শান্তির হতে সেইখানকার নারীদেরকেও শান্তিতে বাস করতে দিতে হয়।
তাই এসব সস্তা অনুভূতির ঊর্ধ্বে যেয়ে সমস্যা স্বীকার করে সেই সমস্যা সমাধান করলে তবেই আপনাদের যে এলাকাভিত্তিক কাল্পনিক অযৌক্তিক গর্ব আছে, সেই গর্ব করার অধিকার ফিরে পাবেন।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.