কন্যা জায়া জননীর ঈদ উৎসব

0

শাহরিয়া দিনা:

মানুষের জন্ম সম্পর্কে, মানুষ বাঁচে সম্পর্কে। কিছু সম্পর্ক আমরা জন্মসূত্রে পাই, কিছু অর্জন করি। জন্মসূত্রে প্রাপ্ত সম্পর্ক নিয়মিত পরিচর্যায় অটুট থাকে, অর্জিত সম্পর্ক ধরে রাখতে পরিচর্যার পাশাপাশি নিয়তির সাপোর্ট লাগে। যথাযথ প্রতিদান মিলুক আর না মিলুক প্রতিটা সম্পর্কই গুরুত্বপূর্ণ। সময়ের সাথে সাথে বদলে যায় সম্পর্কের ধরন। কেউ কেউ হারিয়ে যায় কেউ নতুন যোগ হয় এটাই স্বাভাবিক নিয়ম। একটা মেয়ের জীবনে সম্পর্ক বিভাজনের তিনটি প্রধান চরিত্র থাকে। কন্যা, জায়া, জননী।

কন্যাকালের ঈদটা ঝলমলে। নতুন জামা, নতুন ক্লিপ,নতুন জুতো শুধু ম্যাচিং হল কিনা ঠিকঠাক সেইটুকুই টেনশন। আর পরিকল্পনা বলতে, বন্ধু-বান্ধবী কে কে আসবে, কার কার বাসায় যেতে হবে তা। কাজ বলতে টুকটাক ঘর গোছানো, জানালার পর্দাটা ঠিকমতো পরিস্কার আছে কিনা, সোফার কুশনটা গুছিয়ে রাখা হলো কিনা এমনসব বিষয় লক্ষ্য রাখা। ঈদের দিনে আত্মীয়-স্বজনের আগমন; মন চাইলে খাবার পরিবেশনে মা’কে সাহায্য করো, নয়তো গল্প করেই খালাস।

বিয়ের পর খুব স্বাভাবিকভাবেই বদলে যায় চারপাশ। চেনা ঈদ উৎসবে চেনামুখের সাথে যোগ হয় বাড়তি কিছু নতুন মুখ আর অনেকটা দায়িত্ব। বিবাহিত জীবনের প্রথম ঈদের কথা না বললেই না, চিরচেনা ঈদ সকাল থেকে এই ঈদটা ভিন্ন। অনেক সময় দুই বাড়ির কালচারেও থাকে বিস্তার ফারাক। এখানে সে মেয়ে নয় বউ। বউদের কাজটা শুরু হয় সকাল থেকেই। আনাড়ি হাতে বেশীরভাগ মেয়েরই আন্তরিক চেষ্টা থাকে সবকিছু যেন পারফেক্ট হয়। প্রিয়তম স্বামী যে এই মুহূর্তে পৃথিবীর সব থেকে আপনজন। যার জন্য একটা অচেনা পরিবার নিজের পরিবার হয়, সে যেন বিস্ময়ের বিস্ফোরিত চোখে তাকিয়ে বলে, “তুমি এতোকিছু এমন সুন্দর করে করলে কীভাবে বলতো”? অথবা শ্বাশুড়ি যেন গর্ব করে গল্প করে, রান্না না জানা মেয়েটাও আজ কত কী রান্না করছে!

সারাদিনের ক্লান্তি আর পরিশ্রমে এসব এক চিলতে প্রশান্তি। কিন্তু সবার এমন বর বা শাশুড়ি জোটে না। শত আন্তরিকতার পরও ‘এটা এমন কেন হলো, ওটা রাখোনি কেন’ ‘কিছুই শিখে আসোনি’? এমন সব শব্দবাণে মনে টান লাগে, আমার শৈশব! আমার ঈদ!

বাধ্যতামূলক সখ্যতাটা যখন করতেই হয় খুন্তি-কড়াইয়ের সাথে, মেয়েদের ঈদের খুশি তখন থেকেই বর্নিল থেকে ফিকে হতে শুরু করে। দায়িত্ব পালনই যখন একমাত্র লক্ষ্য, আনন্দ তখন গৌণ। একটা মেয়ে যখন বউ হয়ে আসে সে তার একটা জীবনকে পেছনে ফেলে নতুন আরেকটি ধাপে প্রবেশ করে। সে অচেনা ধাপটা সহজ কোন কিছু না। ছেলেরা এক্ষেত্রে তুলনামূলক বেশ ভালো অবস্থানে থাকেন। নিজের বাড়ির আদরের পাশাপাশি শ্বশুরবাড়ির জামাই আদরের ব্যাপারটা যোগ হয়। আরেকটু বাড়তি যত্ন, ভিন্ন ভিন্ন খাবারে পদ মন্দ তো নাহ!

অথচ একটু আন্তরিকতা, পরস্পরের সহযোগিতায় আজীবনই ঈদগুলো একই রকম আনন্দময় হতে পারে। বউও একটা মানুষ, সেও কারো আদরের সন্তান। সমস্যা হলো, অনেকেই বউ মানেই ভিন্ন ধরনের এক প্রাণী আশা করেন। সর্বগুণে গুণান্বিতা হতে হবে তাকে। রান্নায় মাস্টার শেফ, সামাজিকতায় চ্যাম্পিয়ন, দেখতে বিউটি, বিছানায় পারদর্শী।

আমরা কেউ-ই পারফেক্ট নই, দোষ-ত্রুটি/দুর্বলতা আমাদের সবার মাঝেই আছে। এমনও হয় এক ফ্যামিলির কালচারে যা তিল অন্য ফ্যামিলির কালচারে তা তাল। বউয়ের বাবা’র বাড়ির দাওয়াত থেকে শুরু করে, পাঠানো উপহার মনমতো নাহলে দুই-চার কথার অপমানও মেয়েটাকেই সইতে হয়।

ধীরে ধীরে সংসার বড় হয় বউটাও মা হয়। দায়িত্ব বাড়ে সমানতালে। এখন সে পরিপক্ক অনেকটাই, সুতরাং তার কিছুতে ভুল হওয়া চলবে না। উৎসবের বাজার থেকে মেহমানদের লিস্ট, খাবারের মেনু থেকে তৃপ্তমুখে মেহমানদের বিদায় সব তদারকির দায়িত্ব তার। ঈদের আগে থেকেই যেন ঘুম হারাম। সফলভাবে সবকিছু শেষ হলে প্রসংশার দাবিদার হলেও সেটা জুটুক বা নাই জুটুক ভুলচুকের সমালোচনার একমাত্র ভাগীদার সে।

ভুল না ধরে আমরা বরং নিজেরা শুদ্ধ হই। বাড়ির, কন্যা,বউ, মা’কে এইসব উৎসবরে বাড়তি কাজের দিনগুলো সাধ্যমতো সাহায্য করি। সে ঠিকমতো খেলো কিনা, তার কিছু লাগবে কিনা জিজ্ঞেস করেই দেখুন তো! তার মুখে হাসির রেখা দেখতে পান কীনা!

প্রিয়জনদের পাশে থাকায় সহমর্মিতা আর ভালোবাসায় কাজটা আর কাজ থাকে না, কাজ হয়ে যায় আনন্দ। একটা পরিশ্রান্ত দিনের শেষে বাহুটা বাড়িয়ে দিন মাথাটা রাখতে দিন নির্ভরতা আর প্রশান্তিতে। উৎসব হোক সত্যিকার অর্থেই আনন্দের।

শেয়ার করুন:
  • 791
  •  
  •  
  •  
  •  
    791
    Shares

লেখাটি ১,৮৫৯ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.