পৈতৃক সম্পত্তিতে হিন্দু মেয়েদের অধিকারের দাবি কি খুবই অযৌক্তিক?

0

গোপা মল্লিক:

আমাদের বাবা, ভাই, বন্ধু, স্বামী আর সকল পুরুষজাতিকে বলছি, আচ্ছা, ধরুন কাল সকালে উঠে দেখলেন আপনার বাড়ি আর আপনার নেই। আইনসঙ্গতভাবে অন্য কেউ সেটার মালিকানায় আছে, আর আপনাকে বোঝানো হচ্ছে, এটা আপনারই বাড়ি, আপনাকে এ বাড়ি থেকে বের করে দেয়া হবে না, আজীবন আপনি এখানে থাকতে পারেন… ইত্যাদি… ইত্যাদি। আপনি কি মেনে নেবেন? না তো? একেই বলে ভূগোল বোঝানো।

কিন্তু একটা মেয়েকে এটাই মেনে নিতে হয়। এই নিয়ম/প্রথাটা বহুদিন ধরে চলে আসছে। আর অনেকদিনের অভ্যাসবশত: এটা তাদের অস্থি মজ্জায় মিশে গেছে।

এ যুগে প্রতিটা মেয়েকে বাবা-মা শিক্ষিত করে। সবাই চাকরি না করলেও তাদের কেউ কেউ চাকরিও করে, কিন্তু একইভাবে তার সহোদর ভাইটিও শিক্ষিত হয়, চাকরি করে, অথবা করে না, কিন্তু সে পিতার সম্পত্তির অংশীদার হয়, আর কন্যাটি হয় বঞ্চিত। কারণ সে মেয়ে।

গোপা মল্লিক

আমাদের দেশের আইনে হিন্দু সম্প্রদায়ের মেয়েরা পৈতৃক সম্পত্তিতে অধিকার পায় না। কিন্তু সেই সহোদর ভাইটির যখন দুই/তিনটি মেয়ে হয়, আর কোনো ছেলে সন্তান না থাকে, তখন কিন্তু নিরুপায় হয়ে ভাইটি তার সম্পত্তি মেয়েদের নামে লিখে দেয়। মানে দাঁড়ালো, আপনার বাবার জমি আপনি পেলেন না, পেলো আপনার ভাইজিরা। তাও ভালো।

বাবা-মা দেখে শুনে সব মেয়েকেই ভালো জায়গায় বিয়ে দেয় বা দিতে চায়। অনেক টাকা খরচ করে, লৌতও(যৌতুক) দেয়। অনেকে মেয়েদের সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হবার কারণ হিসেবে এটাকে দাঁড় করান।
তাদের বলছি- এই টাকা কি মেয়ের হাতে/মেয়ের নামে দেয়া হয়? এই টাকা পায় বরপক্ষ। বর অথবা তার বাবা/ভাই, যে গার্ডিয়ান হয়, সে পায়। অর্থাৎ টাকা একজন পুরুষ থেকে অন্য একজন পুরুষের হাতেই গেল। এখানেও কি সুচতুর পুরুষতান্ত্রিকতা! আর নাম হলো মেয়েটার! তাকে শুনতে হয়, এতো টাকা দিয়ে তোকে বিয়ে দিয়েছি, আবার সম্পত্তির ভাগ চাইতে এসেছিস? ভালোই।

মেয়েরা সম্পত্তি রক্ষা করতে পারে না। আসুন এবার এ যুক্তিটাও খণ্ডন করি। মেয়েদের নামে জমি দিয়েও কী হবে? স্বামী/শ্বশুরবাড়ির চাপে যদি সেই জমি বিক্রি করতে হয়! আর যদি কোনো কারণে সেই মেয়ে সেখানে সংসার করতে না পারে, তাহলে বাবার বাড়ি এসে দাঁড়াবার মুখ থাকবে তো? ভালো প্রশ্ন।

এতোক্ষণ যারা বলছিল মেয়েদের অনেক টাকা যৌতুক আর গহনা দিয়ে বিয়ে দেয়া হয়। সেই টাকা আর গহনা যদি স্বামীর বাড়ির লোকজন নষ্ট করে ফেলে, তখন আপনারা কী করবেন? মেয়ে কাঁদতে কাঁদতে বাপের বাড়ি চলে এলে আবার মিমাংসা করে ফেরত পাঠাবেন, নাকি আশ্রিতা করে রেখে দেবেন?
দুঃখিত, আশ্রিতা শব্দটি ব্যবহার করার জন্য।

তবে কি জানেন, যখন পিতামাতা বৃদ্ধ হয় আর সংসারের দায়িত্ব ভাই – ভাই বৌয়ের কাঁধে এসে পড়ে, তখন স্বামী খেদানো বোন সংসারে আশ্রিতার আসনই পায়। অনেকের কাছে বৃদ্ধ বাবা-মা/শ্বশুর-শাশুড়িই সংসারে বাড়তি লোক, সেখানে ননদ বা তার সন্তান তো উটকো ঝামেলা মনে হবেই। ভাইয়ের ইচ্ছা থাকলেও অনেকসময় বৌ সন্তানের কাছে মুখ পান না। সেটা গেল আরও উদারতাবাদের কথা।

মূলত সম্পত্তি নিয়ে ভাইয়ে ভাইয়ে যেভাবে মন কষাকষি, রেষারেষি, মামলা মোকদ্দমা, তাতে আবার বোনকে ভাগ দিতে হবে শুনে পুরুষ সমাজের মাথা ঘেঁটে গেছে। আর এটা অস্বাভাবিক নয়।

স্বামী-স্ত্রীর বয়সের ব্যবধানের দরুণ স্বামীরা সচরাচর আগেই মারা যান। শেষ বয়সে স্ত্রীর সেবাও লাভ করেন। কিন্তু সবচে কষ্ট পায় মেয়েরাই। কারণ একটা দীর্ঘ সময় তাকে নিঃসঙ্গ জীবন কাটাতে হয়। থাকতে হয় ছেলের আশ্রয়ে। বৃদ্ধাকে টেনে ছেলে-ছেলে বৌয়ের লাভ নেই। তাই তার যত্নটাও হয় সেইরকম। বাবাকে দেখেছিল সম্পত্তির লোভে, কথাটা শুনতে খারাপ লাগলেও যারা জীবিতাবস্থায় সম্পত্তি ছেলের নামে লিখে দিয়েছে, এমন বাবাদের কাছে গিয়ে শুনে আসবেন। তারাই আপনাকে বিস্তারিত বলতে পারবে। যে তাদের আজ কী পরিণতি!

আচ্ছা, মেয়েদের সম্পত্তি দেয়া হলেই মেয়েরা কি পারবে বাবা-মাকে দেখতে? পরিবারের দায়িত্ব নিতে? আপনার প্রশ্নটা তুলে রাখুন। উত্তর দিচ্ছি।

দেখুন, দায়িত্ব শব্দটা অনেক ভারী। এই ভার তোলা একা একটা মেয়ের পক্ষে কষ্টকর। তার জন্য স্বামীর সাপোর্ট খুব জরুরি। একটা ছেলেকে যদি বলা হয় তার বৌ তার বাবা-মায়ের দায়িত্ব নিতে পারবে না, তাদের জন্য রাঁধবে না, কাপড়-চোপড় পরিষ্কার পরিছন্ন করে দিতে পারবে না, অসুস্থ হলে সেবা করতে পারবে না, পায়খানা-প্রস্রাব পরিষ্কার করতে পারবে না, কোনো ছেলেই কি এটা মেনে নেবে? না সমাজ বৌটিকে ভালো বলবে? তাহলে একজন ছেলে যখন জামাই হবে, তখন তো তারও উচিত শ্বশুর-শাশুড়ির প্রতি কিছু দায়িত্ব পালন করা!

মেয়েরা যদি শ্বশুর-শাশুড়ির পায়খানা পরিষ্কার করতে পারে, তবে নিজের বাবা মায়েরটা কেন নয়? আপনার প্রশ্নটা এবার সেই পুরুষকে করুন, সেই জামাইকে করুন- পারবেন তো, নিজের বাবা মায়ের মতো নিজের শ্বশুর-শাশুড়ির দায়িত্ব নিতে?

চিরকাল এটা হয়ে আসছে, এটা কোনো যুক্তির কথা নয়। চিরকাল মানুষের একরকম যায় না। সমাজের প্রয়োজনেই নিয়ম বদলায়, আইন বদলায়। দিন বদলের ডাকে সাড়া দিয়ে এবার নিজেকে বদলান, নিজের চিন্তাধারা বদলান। আর কত?

সতীদাহ প্রথা ছিল, বিধবা বিবাহর প্রচলন ছিল না, মেয়েদের পাঠশালায় পাঠানো হতো না, ইংরেজি শেখানো হতো না পাছে সে বিধবা হয়… এমন দিনও তো গেছে। এমন দিন থেকে মুক্তির পথে সমাজই ছিল সবচেয়ে বড় অন্তরায়। কিন্তু হাতে গোনা কজন মানুষ রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রানী রাসমনি এনারা তো গোটা সমাজের বিরুদ্ধে লড়ে গেছেন। তবে কেন এখন কেউ প্রতিবাদ করছে না? কেউ মেয়েদের পাশে এসে দাঁড়াচ্ছে না? সবচেয়ে অবাক করা বিষয় মেয়েরাও মেয়েদের পাশে নেই।

দেশ একটা। সংবিধান একটা। অথচ একই দেশের নাগরিক হয়ে মুসলিম মেয়েরা যে সুবিধা পায় হিন্দু মেয়েরা তা পায় না। এই চেতনাটাই কারো হচ্ছে না। মুসলিম মেয়েরা যদি বাবা-মাকে দেখতে পারে, তবে হিন্দু মেয়েরা কেন পারবে না?

আজকাল মুসলিম মেয়েদের বিয়েতেও অনেক খরচ হয়, কই তাদের বাবারা তো এমন বলে না, তোমার বিয়েতে যথেষ্ট দিয়েছি, এখন আর সম্পত্তি চেয়ো না।

আরেকটা অবাক করা বিষয়- এটা মেয়েদের জন্য আইন, তাদের পক্ষে সমাজপতিরা (পুরুষতান্ত্রিকতা) কেন থাকবে? অথচ এই আইন পাশ করতে গেলে নাকি সমাজপতিদের সমর্থন লাগবে! নাহলে পাশ হবে না!

আমরা হিন্দু মেয়েরাও ভোটের সময় ভোট দিয়েছি। বা দেই। আমাদের ভালো নিয়ে ভাববার অধিকার সরকারের আছে, সরকারের দায়িত্বও এটা। হিন্দু সমাজপতিরা হিন্দু সমাজের পুরুষদের প্রতিনিধিত্ব করে। তারা চাইবে এতোদিন যেভাবে সবকিছু চলে আসছে, তেমনই চলুক। মেয়েরা পদদলিতই থাকুক।

কিন্তু ভুলে গেছে মেয়েরা এখন ডাক্তার হয়, ইঞ্জিনিয়ার হয়, বৈমানিক হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়, আইনজীবী হয়, ব্যাংকার হয়, প্রশাসনে দায়িত্ব পালন করে, ঘর-বাহির একা হাতে সামলায়, স্বামী-সন্তানের জন্য হাত পুড়িয়ে রান্নাও করে। নিজের সম্পত্তি ঠিকই সামলে নেবে। আর যদি কোনো সমস্যা হয় পরামর্শদাতা হয়ে, বন্ধু হয়ে না হয় একটু পাশে থাকলেন। আপনার মেয়েকে ভাগ দিতে হবে বলে কষ্ট পাবেন না। আপনার পুত্রবধূও তো কিছু পাবে। সম্পত্তি কমে যাবে না, বরং সুষম বণ্টন হবে।

মেয়েরা সম্পত্তির অধিকার পাক। মাথা গোঁজার ঠাঁই পাক, তাদের নিজের একটা ঠিকানা হোক। ভাগের প্রশ্নটা আপাতত থাক। সব মেয়েদের সম্পত্তি চাই না। যারা চাই না, যাদের প্রয়োজন নেই, তারা নেবেন না। কিন্তু যারা অসহায়, তারা অন্তত সুবিধাটুকু পাক।

ভারতবর্ষে পৈতৃক সম্পত্তিতে মেয়েদের সমান অধিকার অনেক আগেই চালু হয়েছে। কিন্তু সব মেয়েরা এ সুযোগটা নেয় না। এখানেও হয়তো এমনটাই হবে। আর সমান ভাগ না হোক, কিছু অংশ অন্তত পাক। ধর্মান্তরিত মেয়েদের ক্ষেত্রে বিশেষ নিয়ম রেখেই আইন প্রণয়ন করা হোক।

সন্তান হিসেবে কি মেয়ে এতোটাই ফেলনা যে- আদরের মেয়েটি, যাকে ছোট থেকে ‘মা’ বলে ডেকে এসেছেন, এবেলায় তার পরে এতোটা অবিচার!

শেয়ার করুন:
  • 207
  •  
  •  
  •  
  •  
    207
    Shares

লেখাটি ৪০৯ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.