চাকরির নাম যখন বিবাহ!

0

আলহাজ্ব মুফতি আবদুল্লাহ আল মাসুদ:

আমি একবার একজন মুসুল্লিকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, আপনার কয়জন ছেলেমেয়ে? তিনি উত্তরে বললেন, আমার এক ছেলে ও এক মেয়ে। তাদের কার কী পেশা জিজ্ঞেস করতেই তিনি উত্তর দিলেন, ছেলেটি একটি সরকারি চাকরি করে, আর মেয়েকে বিয়ে দিয়েছি।

এই ব্যক্তি নিজেই তার মেয়ে এবং ছেলের পেশাকে স্পষ্ট করে দিয়েছেন। মেয়ের পেশা হচ্ছে ‘বিয়ে’, আর ছেলের পেশা হচ্ছে চাকরি। আমরা স্বাভাবিকভাবেই জানি, পেশাজীবী মানুষ তার শরীর ও মেধা খরচ করেই রোজগার করে।

তাই এ বাবাকে আমার প্রশ্ন করতে মন চাইছিল যিনি তার মেয়ের বিয়েকে পেশা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন – আপনার ছেলে তো তার অফিসে শরীর ও মেধা ব্যয় করে টাকা রোজগার করে, কিন্তু আপনার মেয়ে তার অফিসে (সংসারে) কীসের বিনিময়ে টাকা রোজগার করে?

অবশ্য এটা খুব অসম্মানজনক শোনাবে যে, আপনার মেয়েটি আপনার ছেলেটির মতো মাস শেষে কোনো বেতন পায় না। সে বিয়ে নামক পেশার মাধ্যমে তার শরীর এবং বুদ্ধির পুরোটুকু ব্যয় করার বিনিময়ে পায় থাকা-খাওয়া, জামাকাপড় ও এবং দিনশেষে কিছুটা শারীরিক সুখ। সেই সুখও আবার সবাই পায় না।

আলহাজ্ব মুফতি আবদুল্লাহ আল মাসুদ

যখন থেকে পুরুষত্বের ধ্বজাধারীরা নারীর চাকরি হিসেবে বিয়েকে নির্ধারণ করতে শুরু করেছে, তখন থেকেই নারী তার বিয়ে নামক চাকরির বিষয়ে সচেতন হতে শুরু করেছে। চাকরির জন্য প্রস্তুতিও নিতে শুরু করেছে।

আর তাই আমরা দেখতে পাই মাদ্রাসার মেয়েরা তো বটেই, কলেজ-ইউনিভার্সিটির মেয়েরাও ইদানিং বিয়ে নামক চাকরি পেতে যাতে কোনো সমস্যা না হয় সেজন্য আগে থেকেই প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। তারই অনুষঙ্গ হিসেবে আসে হিজাব ও বোরকা। তবে এ যুগের বেশিরভাগ মেয়েরাই ফ্যাশনেবল বোরকা (যা কোনোভাবেই ইসলামসম্মত নয়) পরে।

ফ্যাশনেবল বোরকাধারীদের আমি দেখি সুবিধাভোগী চাকরিপ্রার্থী হিসেবে। তারা চাকরির প্রস্তুতি হিসেবে বোরকাকেও কাজে লাগাচ্ছে, আবার চাকরিদাতা শ্রেণিকে নিজের প্রতি আকর্ষণ করার জন্য আধুনিকতাকেও কাজে লাগাচ্ছে! এই মেয়েদের ভালো চাকরি পাওয়ার একমাত্র যোগ্যতা হচ্ছে তার শরীর; বিশেষত শরীরের তিনটে বিশেষ গুণ – যৌনাঙ্গ, বুক ও তার গায়ের রংয়ের ঔজ্জ্বল্য। এই তিনটে জিনিসের মান যত ভালো হবে, সে তত দামি কোম্পানিতে চাকরি পাবে, অর্থাৎ পয়সাওয়ালা বর পাবে। শুনতে অশ্লীল শোনালেও এই-ই সত্য যে, আমাদের সমাজের পিতামাতারা তাদের মেয়ের ভবিষ্যৎ চাকরির একমাত্র ‘সম্বল’ হিসেবে মেয়ের যৌনাঙ্গ ও তার গায়ের রংয়ের যত্নআত্তি করতে কোন কসুর করেন না।

মা-বাবাদের মনকে ধর্মের আবরণে এভাবেই তৈরি করা হয়েছে, যে তারা নিজেরা তাদের ছেলেদেরকে মানুষ মনে করলেও মেয়েদেরকে মনে করে ‘মাল।’ আর তাই তারা তাদের মেয়েদেরকে কোনভাবে পেলেপুষে বড় করে চাকরিদাতার (মিস্টার হাজবেন্ডর) হাতে ‘ইনটেক মাল’ তুলে দিতে পারলে যেন বেঁচে যান। সুতরাং কোন মেয়ের বিবাহপূর্ব সম্পর্ক থাকলে কিংবা ধর্ষণের শিকার হলে মনে করা হয় সে চাকরি পেতে ব্যর্থ হবে, কিংবা ভালো চাকরি পাবে না। আর সেজন্য মেয়ে এবং মেয়ের মা-বাবার সে কী আক্ষেপ! তিনি কীভাবে ধর্ষণের শিকার মেয়ের বিয়ে দেবেন? তিনি কীভাবে অন্য পুরুষের সাথে প্রেম করা বা পালিয়ে ফিরে আসা মেয়ের বিয়ে নামক চাকরির ব্যবস্থা করবেন?

তাছাড়া বিয়ের পরেও সব সময়ে আশঙ্কা বয়ে বেড়াতে হয়, কবে জানি বিয়ের পূর্বের সম্পর্ক ফাঁস হয়ে যায়, আর চাকরিদাতা বস মিঃ হাজব্যান্ড চাকরি থেকে তাড়িয়ে দেয় (ডিভোর্স দিয়ে দেয়!)

বাসর রাত্রে পর্দা ফাটানোর মুখরোচক সব গল্প আপনি সমাজে শুনতে পাবেন। আমার সাবেক মোল্লা বন্ধুরা বিয়ের পরপরই পরস্পর আলোচনা করতো কার বউ কত বেশি সতী ছিল তা নিয়ে। বাসর রাতে কার বউয়ের কী পরিমাণ রক্তক্ষরণ হয়েছে, তা নিয়ে। কার বউ বাসর রাতে পা ধরে কেঁদেছে তা নিয়ে। এসব নিয়ে তাদের সেকি গর্ব!

যদিও এর বেশিরভাগই চাপাবাজি। সমাজের অধিকাংশ সাধারণ চাকরিদাতারাও (বরেরা) এ চাপাবাজি করেন যে, তাদের কর্মচারি (স্ত্রী) ইনটেক ছিল, বাসর রাতে প্রচুর রক্তক্ষরণ ঘটেছে! আমি কিন্তু সমাজের নিম্নশ্রেণির কথা বলছি না, হাই সোসাইটিতেও এই ট্রেন্ড আছে। বরং মধ্যবিত্ত ও হাই সোসাইটির মানুষের মধ্যেই এমন মানসিকতা বেশি। বাংলাদেশের বিখ্যাত সুন্দরী মডেল প্রভার বিয়ে হয়েছিল অপূর্ব’র সাথে। প্রভার বিয়ে-পূর্ব একটি সেক্স ভিডিও ফাঁস হওয়ার কারণে অপূর্ব প্রভাকে চাকরিচ্যুত করেছিল।

সাধারণ চাকরির জন্য যেমন চাকরির বিভিন্ন গাইড বুক আছে, রয়েছে ট্রেনিং সেন্টার; ঠিক তেমনি মেয়েদের বিয়ে নামক চাকরির জন্যেও রয়েছে রং ফর্সাকারী ক্রিম, লিপস্টিক, এবং বিউটি পার্লারসমূহ। আপনি যদি কোন বিবাহযোগ্য মেয়ের মা-বাবা ও চাকরিযোগ্য ছেলের মা-বাবাকে দেখেন, তবে আপনি অনুভব করবেন, এই মা-বাবারা যেদিন মেয়ের বিয়ে দেন আর যেদিন ছেলের চাকরি হয় সেদিনই তারা নিজেদেরকে নির্ভার মনে করতে থাকেন।

বিশেষত মেয়ের বিয়ে নামক চাকরিটা তাদের কাছে যেন ছেলের চাকরির চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ছেলের চাকরি যদি হয় সোনার হরিণ, তবে মেয়ের চাকরি তাদের কাছে যেন ডায়মন্ডের হরিণ। এ হিসেবে আমরা আমাদের মা-বাবাদেরকে মেয়েবান্ধব মা-বাবা বলতে পারি!

আমাদের সমাজের একজন পুরুষ যেমন মনে করে যেকোনো মূল্যে চাকরি পেতে হবে, চাকরি বাঁচাতে হবে, জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য থাকে চাকরি থেকেই তার জীবনের চাওয়া পাওয়া গুলো পূরণ করা; ঠিক তেমনই এ সমাজে বেড়ে ওঠা একটি মেয়েও যেকোনো মূল্যে তার বিয়ে নামক চাকরি টিকিয়ে রাখার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে। একটি মেয়ে তার বিয়ে নামক চাকরি বাঁচাতে গিয়ে বস তথা বরের থেকে কখনো পায় আদর, কখনো পায় শাস্তি, কখনো বা শাস্তির কারণে প্রাণটাও হারায়।

অন্য সব চাকরিতে শুধুমাত্র চাকরিজীবীই চাকরি করে, আর বিয়ে নামক চাকরিতে একটি মেয়ের পাশাপাশি তার মা-বাবা, তার বোনভাই তথা পুরো পরিবারই চাকরিতে জড়িয়ে যায়।

এই চাকরি-চক্রের যিনি বস অর্থাৎ মি. হাজব্যান্ড সাহেব যাতে কোনোভাবেই রুষ্ট না হন সেজন্য সজাগ সবাই। চাকরির প্রধান কর্মচারী স্ত্রী যেমন চাকরিদাতা মি. হাজব্যান্ডের মনতুষ্টিতে সদা তৎপর, তার চেয়েও বেশি তৎপর থাকতে হয় তার ভাই ও মা-বাবার, বিশেষত ছোটভাই যেন এখানে কলুর বলদ। বড় বোনের বিয়ে নামক চাকরি বাঁচানোর জন্য দুলাভাইয়ের ফুটফরমাশ খাটা যেন বউয়ের ছোট ভাইয়ের নৈমিত্তিক ব্যাপার।

আর তাই অফিসের দারোয়ান কিংবা পিওনের নামেও কোন গালি তৈরি হয়নি, গালি তৈরি হয়নি কোন গৃহকর্মির নামেও; অথচ বোনের চাকরি বাঁচাতে দায়বদ্ধ ছোট ভাইয়ের সম্পর্কের নামটা দিয়ে তৈরি হয়ে গেল গালি – তার বোনের বৈবাহিক সূত্রে প্রাপ্ত ডাক ‘শালা’ হয়ে গেছে গালি! এ সবই হচ্ছে বিয়ে নামক চাকরির অবশ্যম্ভাবী ফলাফল।

মানবজাতির সমসংখ্যক দুই প্রজাতি বোঝাতে আমরা লিখি নারী-পুরুষ, কিন্তু আমরাই আবার লিখি ছাত্র-ছাত্রী, প্রেমিক-প্রেমিকা, শিক্ষক-শিক্ষিকা, নেতা-নেত্রী, ভাইবোন, ছেলেমেয়ে। ভুল করেও কখনো আমরা লিখি না ছাত্রী-ছাত্র, প্রেমিকা-প্রেমিক, শিক্ষিকা-শিক্ষক, নেত্রী-নেতা, বোন-ভাই কিংবা মেয়ে-ছেলে। এভাবে লেখার সুযোগ বন্ধ করে দিতে আগে থেকেই সজাগ পুরুষকুল – তাই ‘মেয়েছেলে’ শব্দের ভিন্ন অর্থ আগে থেকেই প্রস্তুত করে রেখেছে তারা!

মেয়েছেলে বলে একটি মেয়ে এবং একটি ছেলে না বুঝিয়ে বরং একটি অবলা মেয়েকে বোঝানো হয়ে থাকে। যদি কেউ লেখে ‘ছাত্রী-ছাত্র’ বা ‘বোন-ভাই’ তবে তাকে ক্যাঁক করে ধরবে পুরো সমাজ। এতে সাহিত্যের জাতও নাকি চলে যাবে! মাতা-পিতার ক্ষেত্রে অবশ্য আমরা সাম্য রক্ষা করি। কখনো লিখি মা-বাবা, কখনো লিখি বাবা-মা‌। কারণ আমরা শুধুমাত্র আমাদের মা-বাবাকেই কিছুটা নারী-পুরুষ হিসেবে সমান মর্যাদা দিই। অন্য সকল ক্ষেত্রেই নারী-পুরুষকে সমান ভাবতে আমাদের সমাজের ধার্মিকদের ঘোরতর আপত্তি।

আরবিতে অবশ্য এটুকুও নেই। আরবিতে আলওয়ালিদ শব্দের অর্থ বাবা। মা-বাবা উভয়কেই উদ্দেশ্য করা হয় আল ওয়ালিদাইন শব্দের মাধ্যমে, ঠিক ইংরেজি প্যারেন্টস এর প্রতিশব্দ হচ্ছে আলওয়ালিদাইন। আরবি স্টাইলে ইংরেজিতে কিন্তু মা-বাবা উভয়কে বোঝাতে ‘ফাদারস’ শব্দ ব্যবহার হয়না।

পৃথিবীর প্রধান ধর্মের নাম পুরুষতন্ত্র। অর্গানাইজড রিলিজিয়নগুলি সব পুরুষতন্ত্রেরই শাখা প্রশাখা।

আপনি যখন ধর্মের বিরুদ্ধে কথা বলেন তখন ধর্মযাজকরা ক্ষিপ্ত হয়। এর কারণ যতটা না ঈশ্বর-প্রেম, তার চেয়ে বহুগুণ বেশি হচ্ছে রোজগারে ভাটা পড়ার আশঙ্কা।

পুরুষতন্ত্র এমন একটি মৌলিক ধর্ম যার অনুসারী নারীও হতে পারে, পুরুষও হতে পারে। পুরুষতন্ত্রের শাখাপ্রশাখা, অর্থাৎ অর্গানাইজড রিলিজয়নের অনুসারীও তাই নারী-পুরুষ সমানে সমান। পুরুষতন্ত্র নারীর জন্য বিয়ে নামক আলস্যে ভরা, সৃজনবিমুখ, অপমানসূচক চাকরির ব্যবস্থা করেছে। এই চাকরির দাসত্ব অন্য যেকোনো চাকরির দাসত্বের চেয়ে বহুগুণে জঘন্য, বহুগুণ লাঞ্ছনাকর।

আপনি যখন নারী-স্বাধীনতার কথা বলেন, তখন ধার্মিক নারীও এর বিরুদ্ধে সরব হয়, কারণ সে মনে করে তার শারীরবৃত্তিক যে পেশা, যার পোশাকি নাম হচ্ছে বিয়ে, এবং এই পেশার মাধ্যমে তার যে জীবন ও জীবিকা নির্বাহ হয়, আপনি তার সেই পেশার উপর আঘাত করছেন। সে মনে করে কোনো শিক্ষাগত যোগ্যতা ছাড়াই বা মেধা খরচ করা ছাড়াই যে খাওয়া-পরা সে পাচ্ছে, আপনি সেই খাওয়া-পরায় আঘাত করতে চাইছেন বা তার রিজিক নষ্ট করতে চাইছেন।

ঠিক যেমন একজন মোল্লা আপনি ধর্ম নিয়ে সমালোচনা করলে আপনার ওপর এজন্য ক্ষেপে যায় যে, আপনি তার রুটি-রুজির উপর আঘাত করছেন!

ইসলামের সবচেয়ে বড় সাফল্য হচ্ছে এর রক্ষকেরা ইসলাম দ্বারা যারা সবচেয়ে বেশি নিপীড়িত তাদেরকেই ইসলামের পক্ষে সবচেয়ে সফলভাবে ব্যবহার করতে পারে। যার উদাহরণ হচ্ছে মুসলিম নারী ও মোল্লা পুরুষ। পুরো মুসলিম সোসাইটিতে সবচেয়ে বেশি নিপীড়িত ও শোষিত হচ্ছে এ দুটি শ্রেণী। ইসলাম যেহেতু মনে করে পুরুষ জাত হচ্ছে প্রধান মানুষ, আর নারী হচ্ছে অসম্পূর্ণ মানুষ, তাই ইসলামপন্থীদের নামের শেষে ইবনে বা বিন বা বিনতে দিয়ে বাপের নামের লেজ লাগানো থাকে, যেমন ধরুন – আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (আব্বাসের ছেলে আব্দুল্লাহ), আব্দুর রাজ্জাক বিন ইউসুফ (ইউসুফের ছেলে আব্দুর রাজ্জাক), জাহেদা বিনতে রহমান (রহমানের মেয়ে জাহেদা)।

এভাবেই চলে আসছে যুগ যুগ ধরে। এভাবেই ধর্ম মানুষকে হিঁচড়ে টেনেছে যুগ যুগ ধরে। আস্তিক হোক বা নাস্তিক হোক, আমরা দেখি সন্তানের নামের শেষে তার পিতার নামটাই যুক্ত হয়ে যায়। কারণ কারখানার শ্রমিক যতোই পরিশ্রম করুক না কেন, কৃতিত্ব হয় মালিকের; নামটা দেয়া হয় মালিকের, এবং লোকজন বলে – ‘অমুকের ফ্যাক্টরির মাল এটা।’

এমন দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই ইসলাম পুরুষকে বলে দিয়েছে, “তোমাদের তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীরা গর্ভবতী হলে সন্তান জন্মের আগ পর্যন্ত তার প্রতি খরচ করো। এরপর সন্তান জন্মগ্রহণ করলে সন্তানকে দুধপান করানোর বিনিময়ে স্ত্রীকে পারিশ্রমিক দাও।” পঁয়ষট্টি নম্বর সুরার পাঁচ নম্বর আয়াত পড়লেই পেয়ে যাবেন এ কথাটি।

এমন হুকুম করার কারণটা কি বুঝেছেন? গর্ভবতী স্ত্রীর গর্ভে পুরুষের সন্তান। স্ত্রীর জরায়ুটা এখানে কেবলমাত্র ভাড়া নেয়া একটি স্থান। তাই গর্ভবতী তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রী সন্তানধারণের বিনিময়ে গর্ভাশয়ের ভাড়া পাবে, আবার দুধ পান করানোরও পারিশ্রমিক পাবে।

পৃথিবীর সভ্য দেশগুলো আজও এতোটা সভ্য হয়নি যে নারীকে সেখানে স্বয়ংসম্পূর্ণ সত্তা ভাবা হয়। সেজন্যই বিয়ের পর নারীর নিজস্ব পদবি ঘুচে গিয়ে তার বস তথা মিস্টার হাজবেন্ড এর পদবি তার নামের শেষে জুড়ে যায়। আমরা দেখতে পাই হিলারি রডহাম বিয়ের পরে হিলারি ক্লিনটন হয়ে যায়, মেলানিয়া নার্ভস বিয়ের পর মেলানিয়া ট্রাম্প হয়ে যায়, মিশেল লভান রবিনসন বিয়ের পর মিশেল ওবামা হয়ে যায়। এখানে নারীর পক্ষ থেকে একটা কৃতজ্ঞতাবোধও কাজ করে। একজন বিখ্যাত বা পয়সাওয়ালা পুরুষ যখন তাকে স্ত্রী হিসেবে চাকরি দিয়েছে ,তখন এমন পুরুষের প্রতি কৃতজ্ঞতাবোধ না থেকে কি পারে? সেই কৃতজ্ঞতাবোধ থেকেই নারী নিজের বংশের পদবি ঝেড়ে ফেলে চাকরিদাতার পদবি গ্রহণ করে।

শুধু বিখ্যাত বলেই বা কেন, অখ্যাত বা গরিব পুরুষও যদি তাকে স্ত্রী হওয়ার চাকরি দেয়, তবেও কৃতজ্ঞতাবোধ থাকে। নারী নিজের সন্তানের নামের শেষে নিজের পদবি যুক্ত না করে তার চাকরিদাতার পদবি যুক্ত করে। এ সবই হচ্ছে শ্রেষ্ঠত্ব ও কৃতজ্ঞতার সমন্বয়ের ফলাফল।

এই কৃতজ্ঞতা-বোধসম্পন্ন নারীরা এটাও ভাবে যে, তার চাকরিদাতা হচ্ছেন বিখ্যাত মানুষ, তাই সন্তানের নামের শেষে যদি বিখ্যাত মানুষের পদবিটা থাকে, তবে সমাজে প্রতিষ্ঠা পেতে সহজ হবে। আপনি দেখবেন সাধারণত কোন বিখ্যাত, সুপ্রতিষ্ঠিত, পয়সাওয়ালা নারী তার চেয়ে কম বিখ্যাত কিংবা কম প্রতিষ্ঠিত কিংবা কম পয়সাওয়ালা পুরুষকে বিয়ে করে না। কারণ সে মনে করে তার প্রভু বা চাকরিদাতা তার চেয়ে উঁচু লেভেলের হতে হবে। পক্ষান্তরে ভুরি ভুরি নজির দেখবেন যে, বিখ্যাত ও সুপ্রতিষ্ঠিত পুরুষেরা অখ্যাত, গ্রাম থেকে ধরে আনা, অথবা খুবই সাধারণ মানের কোনো একজনকে স্ত্রী হিসেবে চাকরি দিয়েছে। আপনি খেয়াল করলে দেখবেন, প্রবাসী পুরুষদের বিয়ের পাত্রী হিসেবে প্রথম পছন্দ হচ্ছে গ্রামের মেয়ে এবং কমবয়সী ফর্সা চামড়ার মেয়ে।

আমাদের সমাজে চাকরিদাদাতারা হচ্ছেন প্রথম শ্রেণীর মানুষ, কর্মকর্তারা হচ্ছেন দ্বিতীয় শ্রেণীর মানুষ, আর পিয়ন, দারোয়ান, ড্রাইভার এরা হচ্ছে তৃতীয় শ্রেণীর মানুষ। প্রথম শ্রেণীর মানুষ এবং দ্বিতীয় শ্রেণীর মানুষ একসাথে বসে খেতে পারে, বেড়াতে যেতে পারে, আড্ডা দিতে পারে; কিন্তু প্রথম শ্রেণীর কেউ বা দ্বিতীয় শ্রেণীর কেউ তৃতীয় শ্রেণীর সাথে পূর্ণ দূরত্ব বজায় রেখে রেখে চলেন। আমাদের পুরুষতন্ত্রের তৈরি করা প্রথম শ্রেণীর মানুষ হচ্ছে চাকরিদাতা মি. হাজব্যান্ড, দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হচ্ছে তার কর্মচারী তথা স্ত্রী। তৃতীয় শ্রেণীর মানুষ তাহলে কারা?

এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আপনাদের নজর দিতে হবে আমাদের লেখক ও সাংবাদিকদের ভাষার প্রতি। আমাদের লেখক-সাংবাদিকেরা হিজড়াদেরকে তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে উল্লেখ করে থাকেন। প্রশ্ন হচ্ছে, তাহলে দ্বিতীয় লিঙ্গ কে? প্রথম লিঙ্গ কে? এ কি সচেতন মনের সৃষ্টি নাকি অচেতন মনের সৃষ্টি?

আজ থেকে চৌদ্দশ বছর আগে যদি সৌদি আরবের মক্কায় ‘পুরুষ নবী’ জন্ম গ্রহণ না করে নারী নবী হতো, তবে কি মুসলিমদের চেহারা অন্যরকম হতো না? এমনটি হলে নিশ্চয়ই আমরা দেখতে পেতাম পুরুষের জন্য বোরকার বাধ্যবাধকতা। আমাদেরকে বলা হতো ‘সাবধানে থাকিও পুরুষ বোরকার আড়ালে।’ তখন মসজিদের ইমাম, ওয়াজের বক্তা, মাদ্রাসার শিক্ষক হতো নারী। তখন পুরুষ হতো ধর্ষণের শিকার। সেইসব নির্যাতিত পুরুষের পক্ষে আমরা মানববন্ধন করতাম, চিৎকার করতাম, মিছিল করতাম।

আর নারী হুজুররা তখন বলতো, ধর্ষণের জন্য পুরুষের শর্টকাট পোশাকই দায়ী। তখন নারী হুজুররা বলতো, ভূমিকম্পের জন্য পুরুষদের জিন্সের প্যান্ট পরা দায়ী। তখন নারী হুজুররা বলতো, পুরুষেরা বুক খোলা রেখে চলার কারণেই আজ তারা এতো ধর্ষণ হচ্ছে!

আমার প্রচুর এক্স মুসলিম বন্ধু আছে যাদের স্ত্রীরা ধর্মের বেড়া থেকে বেরোতে পারছে না। তারা কোনভাবেই তাদের স্ত্রীদেরকে ধর্ম নারীকে কত জঘন্যভাবে ট্রিট করেছে সেটা বোঝাতে পারে না। আমার বন্ধুরা তাদের স্ত্রীদেরকে যতই নারী স্বাধীনতার কথা বলুক না কেন, স্ত্রীরা নিজেদেরকে কর্মচারি ভাবতেই বেশি স্বচ্ছন্দ। তারা মনে করে, প্রচলিত প্রথার বিরুদ্ধে গেলে কিংবা নিজের পায়ে দাঁড়াতে গেলে বা নিজে পূর্ণ মানুষ হতে গেলে আছাড় খেয়ে পা ভেঙে যাবে। জন্ম থেকেই যে কারাগারে আছে সে কী করে বুঝবে পৃথিবীটা কতো উন্মুক্ত! তার কাছে তো মনে হবে কারারক্ষীরাই পৃথিবীর সেরা মানুষ, পুলিশই পৃথিবীর রক্ষক।

যে পাখির জন্ম হয়েছে খাঁচায় সে কী করে পাবে মুক্তির স্বাদ? সে কী করে বুঝবে খাঁচার বাইরের পৃথিবীটা কেমন?

শেয়ার করুন:
  • 1K
  •  
  •  
  •  
  •  
    1K
    Shares

লেখাটি ৭,৩২২ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.