মায়েদের একার লড়াইয়ের এই অপমান আর কত!

0

সুপ্রীতি ধর:

গতকাল হঠাত একটি ফেবু পোস্টে চোখ-মন দুটোই আটকে যায়, মায়ের মন অজান্তেই হাহাকার করে ওঠে। লেখকের পায়ের জুতাটা যে আমার অনেক চেনা, একই জুতা পরে আমিও যে পাড়ি দিয়েছি বিস্তীর্ণ জীবন পথ!
আমি জানি কোথায় বিঁধে, কোথায় কাটে, কোথায় কষ্টের রক্ত জমাট বাঁধে, কোথায় সেই রক্ত গলগল করে চুইতে থাকে ফোঁটায় ফোঁটায়, একেকটি রক্তকণা পুরো জীবনকে তছনছ করে দিতে উদ্যত থাকে।
কত ঝড়ঝঞ্ঝা, সমাজের কত রক্তচক্ষু, কত প্রশ্নবাণ, কত তীর্যক মন্তব্য, কত বিনিদ্র রাত, দু:খের মহাসাগর পাড়ি দিতে হয় একজন একাকি মাকে, এটা সেই মা-ই কেবল জানে, যে এই পথে হেঁটেছে একদিন! পুরোটা পথ হেঁটে গিয়েও যখন পিছন ফিরে দেখে যে সবই অন্ত:সারশূন্য, তখন সেই মায়ের আর কিছুই বলার থাকে না, সেটা যে কী অসম্মান আর অপমানের, ‘বুঝিবে সে কীসে, কী যাতনা বিষে, কভু আশীবিষে দংশেনি যারে’।

এক মা তার ছেলেকে নিয়ে জীবনের সাথে লড়াই করে যাচ্ছে গত চারটি বছর ধরে। জন্মদাতা বাবা কোনদিন জানতেও চায়নি ছেলেটি কী খায়, বা না খায়, কী পড়ে বা না পড়ে। আজ যখন সেই মা একটু বাঁচার মতোন বাঁচতে চাওয়ার স্বপ্ন দেখছে, তখনই বাঁধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে সেই পিতৃত্ব।
‘আমি জন্মদাতা, আমার একফোঁটা বীর্যই আমাকে মহান করে রেখেছে ধর্ম ও আইনে, আমারই একচ্ছত্র অধিকার আমার সন্তানের ওপর, মা আবার কে!’-পুরুষতান্ত্রিক এই সমাজে একবিংশ শতকে দাঁড়িয়েও আমাদের মেয়েদের সাথে স্রেফ প্রতারণা চলছে এই একটিমাত্র বাক্য দিয়েই। তাও আবার সন্তানটি যদি কন্যা হয়, তখন কিন্তু পিতৃত্ব এভাবে জাগে না, যতোটা জাগে ছেলে সন্তানের বেলায়!

ধর্ম, আইন এবং সমাজের কোথাও মেয়েদের এই মাতৃত্বের লড়াইটাকে সম্মান জানাচ্ছে না, জানপ্রাণ দিয়ে সবদিক থেকে লড়াই চালিয়ে যেতে হচ্ছে আমাদের মেয়েদের। জন্ম দেয়া থেকে শুরু করে তিল তিল করে সন্তানকে বড় করে তোলার প্রতিটা দায়িত্ব পালনের পরও যখন অভিভাবকত্বের প্রশ্নে সেই মাকে পিছিয়ে দেয়া হয়, তখন এর চেয়ে অসম্মানের আর কিছুই হতে পারে না।

প্রতিটা ঘটনায় আমার মনে হয়, এটাই হোক শেষ লড়াই, মেয়েরা পাক মাতৃত্বের একচ্ছত্র অধিকার, তাকে যেন আর সন্তানহীন করতে না পারে কেউ! কিন্তু হায়, আবারও সেই একই ঘটনার অবতারণা হয় নতুন করে। সবাই এখন পর্যন্ত ব্যক্তিগত পর্যায়েই লড়াই করছে, সামষ্টিক লড়াইটা যখন বড্ড বেশি প্রয়োজন।

আমার ফেসবুক বন্ধু এমন অনেক একাকি মা আছে, যারা তাদের ছেলে সন্তানের কাস্টডির জন্য রীতিমতো জানবাজি রেখে লড়াই করেছে, বা এখনও করেই যাচ্ছে। কেউ কেউ সফলও হয়েছে সেই লড়াইয়ে। কিন্তু সেই লড়াইটা এতোটাই নি:স্ব করে দেয় একজন মাকে, সর্বোপরি একজন নারীকে সবদিক থেকে যে তাকে আবার মাথা তুলে দাঁড়াতে বেগই পেতে হয়।

মাঝে মাঝে মনে হয়, সবাই একমত হলে যেকোনো একটা ঘটনা ধরে আমরা সকলে মিলেই না হয় লড়াইটা চালিয়ে যাই, যদি পরের প্রজন্ম কিছুটা হলেও ন্যায্য অধিকার পায় জীবনে, তাহলে আমাদের সেই লড়াই সার্থক হবে! কিন্তু জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে আমাদের সবার ব্যক্তিগত, সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় এতো এতো লড়াইয়ের মাঝে এই লড়াইটা আর সব লড়াইয়ের মতোই তার গন্তব্য হারিয়ে ফেলে, দুর্বল বা গৌণ হয়ে যায় একটা সময়, আমরা ঠিক ধরে রাখতে পারি না। কিন্তু এমনটা আসলে হওয়ার কথা ছিল না। কথা ছিল, আমাদের এক থাকার, শক্তিশালী থাকার, সিদ্ধান্তে স্থির থাকার। নিজেকে তখন অসহায় লাগে, কিছু করতে না পারার আক্রোশ দানা বাঁধে।

ফারজানা সিরাজ শীলা

ফারজানা সিরাজ শীলাও আমার ফেসবুক বন্ধু। তার লেখাটি নিচে তুলে ধরলাম আংশিক পরিবর্তনসহ। তাকে কথা দিয়েছি, তার এই লড়াইয়ে হাতটি শক্ত করে ধরে থাকবো সবাই মিলে। লড়াইটা একসাথে লড়বো।

লেখাটি দিলাম এখানে-

২০১৫ সালে ছেলে ইবুকে নিয়ে আমার একার পথচলার শুরু। এক কাপড়ে মা আর ছেলে চলে এসেছিলাম। সেই থেকে আমি আমার সাধ্যমতো ইবুকে আগলে রাখার চেষ্টা করেছি। তার জন্মদাতা বাবা কখনও তার জন্য এক টাকাও খরচ করেনি, প্রথম দেড় বছর সে তার কোন খোঁজও রাখেনি।

একবার চরম ডায়রিয়া হলে আমার মা তাকে ফোন করেছিলো, তার উত্তর ছিলো, ডাক্তার দেখান, মরে তো যায়নি, আমি কী করবো! ইবুর চোখ বাঁকা ছিলো, আমি রাতদিন পরিশ্রম করে খেয়ে না খেয়ে ওর চোখের অপারেশন করিয়েছিলাম। গত চার বছরে কোনদিন বলেনি ইবুর দায়িত্ব তারা নিতে চায়। ইবুর আজ অব্দি কোন প্রয়োজন তারা মেটায়নি। ঈদে পর্যন্ত কখনও কাপড়-চোপড় কিছু দেয় না।
কাল পারিবারিকভাবে যখন তাদেরকে জানানো হলো যে আমি ইবুকে নিয়ে দেশের বাইরে যেতে চাই, কাজেই কোর্ট অর্ডার লাগবে, তখনই তাদের বক্তব্য, “আমাদের ছেলে আমরা দেবো না, এতো সুন্দর করে দাদা বলে ডাকে, এতো সুন্দর ছেলে, ওর মা গেলে চলে যেতে বলেন, আমাদের ছেলে আমরা রাখবো।”

আমার আসলে কিছু বলার নেই কাউকে। দেশের আইনে সাত বছর হলে বা মা দ্বিতীয় বিয়ে করলে ছেলে পাবে না। সাত বছরের একটা বাচ্চা কতটুকু? আর আমার ছেলে তো বাপের কাছে যেতেই চায় না। তাহলে কি আমার উচিত ওর ব্যাগ গুছিয়ে বাপের কাছে দিয়ে আসা? যে বাপ কোনো দায়িত্ব পালন করেনি, একজন পটেনশিয়াল রেপিস্ট যদি ছেলেকে দাবি করতে পারে আর সমাজ তাকে সাপোর্ট করে, তাহলে আমার মাতৃত্বকে আমি শতধিক জানাই। আমার সমস্ত কিছু বৃথা। আমি আর কখনো মা হতে চাই না। যদি মাতৃত্ব মানেটা এমন হয়!সমস্ত কিছু আমি করেছি, যে সন্তানের জন্য আমি নিজের জন্য কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারিনি, আজ তাকে কোথাও নিয়ে যেতে হলে বাপকে লাগবে? কেন লাগবে? শুধু স্পার্ম ডোনেট করেছে বলে?
আমার সমস্ত রাত জাগা, পরিশ্রম, ইফোর্ট সব বৃথা? তাহলে আমি শুধু একজন আয়া ছিলাম? তাও আবার আনপেইড!
চুয়াডাঙ্গাতে উকিলের কাছে গেলে তারা বলেছেন, আমরা এক উকিল আরেক উকিলের বিপক্ষে যাই না। তাহলে আইনকে জিম্মি রেখে উকিলের ছেলে রেপিস্ট হলেও তাকে জামাই আদর করা যায়?
আমি দ্বিতীয় বিয়ে করেছি বলে আমার ছেলেকে তার বাপ পাবে? বাপ তো কোনদিন নিয়ে যেতে আসেনি, বাপ কোনদিন বলেনি আমি ছেলে নিতে চাই। বা মুখের ওপর টাকা ছুঁড়ে মেরে বলেনি, এই নে, আমার ছেলে সাত বছর পর্যন্ত তোর কাছে থাকবে, তার জন্য ১০/২০ হাজার প্রতি মাসে যা লাগে আমি দেবো, সাত বছর হলে নিয়ে যাবো।
তাহলে আজ যখন আমি আমার ছেলেকে নিয়ে সেটেল হতে চাচ্ছি, তখন সমস্যাটা কোথায় হলো? তার ইগো আর পৌরুষের বলি হবে ইবু? সে কি জানে ছেলে কখন খায়, কী খায়, কীভাবে ঘুমায়, কোন কাত হয়ে শোয়, ছেলের কী পছন্দ, সে যে অন্ধকারে জোরে শব্দে ভয় পায়, তার বিড়াল বা ফুল পছন্দ!
কী করে দাবি করে, কি করে বলে যে মা নিতে পারবে না ছেলেকে?

একটা ছোট বাচ্চা ঘুরে ঘুরে বার বার আমাকে বলে, “আমি জানি আমাকে রেখে তুমি কোথাও যাবে না, আমরা লুকিয়ে চলে যাবো, আমাকে ব্যাগের ভেতরে করে নিয়ে যাবে তুমি”। সেই বাচ্চা আজ সকালে উঠে বলছে, “চলো, আমরা পুলিশের কাছে যাই, আমি গিয়ে বলবো, আমি মাম্মির কাছে থাকবো, প্লিজ আমাকে বাবার কাছে দিও না”।

আমার মাতৃত্বকে দোষ দিই আমি, সিঙ্গেল মাদার আর কেউ না হোক, এটাই চাই। স্বামী খারাপ হোক, মাতাল হোক, রেপিস্ট হোক, তাও সন্তানের খাতিরে তার পা ধরে থাকাই মহান করবে, সেফ করবে আপনার মাতৃত্বকে!

…শীলার লেখাটা পড়ছিলাম আর চোখের সামনে ভাসছিল ওর ছেলেটার মুখ। এই ছোট্ট মনে সে নির্ভর করতে চাইছে পুলিশের ওপর, সে তো জানে না মায়ের কাছে তার থাকাটা কতোটা অনিশ্চিত করে দিতে পারে এইদেশের আইন! সে যে আজ এই ট্রমার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, সারা জীবন সে বয়ে বেড়াবে এটা। ভাবতেও পারছি না আমি, একটা রাষ্ট্র, একটা সমাজব্যবস্থা নারীদের কতোটা হেয় বিবেচনা করে, কতোটা অশান্ত করে তোলে তাদের জীবন!

কবে আমরা সভ্য রাষ্ট্র হবো? কবে?

শেয়ার করুন:
  • 183
  •  
  •  
  •  
  •  
    183
    Shares

লেখাটি ৮৭৮ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.