ধর্ষণ, ধর্ষণের সংস্কৃতি এবং আমরা

0

শবনম সায়েমা:

ধর্ষণের উপর একটা গল্প পড়ছিলাম। লেখক অনেক সহানুভূতি নিয়ে লিখেছেন, লেখককে সাধুবাদ জানাই। কিন্তু ধর্ষণের শিকার নারীর প্রতি সমাজের প্রথানির্ধারিত ধারণা থেকে লেখক বের হতে পারেননি বলে পড়াটা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হচ্ছে।

ধর্ষণ অনেক বড় একটা ক্রাইম, কিন্তু তার চেয়ে বড় ক্রাইম হচ্ছে ধর্ষণের শিকার মেয়েটার বিরুদ্ধে আমাদের যে মনোভাব, সেটা। কারণ আমাদের এই দৃষ্টিভঙ্গি সমাজে ধর্ষণকে যৌক্তিকতা দেয়, টিকিয়ে রাখে।

পৃথিবীতে প্রতিদিন খুন হয়, খুনির প্রতি সবাই ঘৃণা পোষণ করে নির্দ্বিধায়। খুনের হাত থেকে কেউ বেঁচে গেলে সে পরিবার আর সবার থেকে সহানুভূতি পায়। অন্যদিকে একটা মেয়ে ধর্ষণের শিকার হলে প্রথমে বলা হয় মেয়েটা তার সম্ভ্রম হারিয়েছে, মেয়েটা নষ্ট হয়েছে, মেয়েটার বেঁচে থাকা অর্থহীন, কেউ তাকে বিয়ে করবে না।

প্রশ্ন হলো মেয়েটার প্রতি অন্যায় করা হয়েছে, তাহলে সম্ভ্রম যদি কেউ হারায় সে তো অপরাধী হারাবে, মেয়েটা কেন? সমাজ একটা মেয়ের সম্মান তার ভার্জিনিটি রক্ষার মধ্যে আটকে রেখেছে তার নিজের স্বার্থে। যেদিন পুরুষের ভার্জিনিটিকে নারীর ভার্জিনিটির সমান মূল্য দেয়া হবে, সেদিন ধর্ষণ পরবর্তি নির্যাতন অর্ধেক কমে যাবে।

ধর্ষণ একটা মেয়েকে অত্যাচার করা, নির্যাতন করা, তাকে নষ্ট করা নয়, অস্পৃশ্য করা নয়। নষ্ট সেই হয় যে অন্যায় করে, যার সাথে অন্যায় হয় সে হয় না। এরপর যে বলা হয় মেয়েটার বেঁচে থাকা অর্থহীন, সেটা কেন? মেয়েটার পুরো জীবনের মূল্য তার ভার্জিনিটি? অথবা স্বামী ব্যতীত অন্য কারো সাথে শারীরিক সম্পর্ক (অনিচ্ছায় হলেও) না করার মধ্যেই সীমিত? এইখানেই সমাজে নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির সর্বোচ্চ রায় হয়ে যায়। আর এই দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে যারা চলেন, তারা প্লিজ ধর্ষণের শিকার মেয়েটার প্রতি সহানুভূতি দেখতে আসবেন না।

আপনার আন্দোলন, সহানুভূতি সব নারীর প্রতি এই দৃষ্টিভঙ্গি টিকিয়ে রাখার জন্য। তাকে মানুষ ভেবে তার প্রতি করা অন্যায়ের প্রতিবাদ জানানোর জন্য না। এরপর বলা হয় তার বিয়ে হবে না। এটাও পূর্ববর্তী দৃষ্টিভঙ্গিরই ধারাবাহিকতা। যেন বিয়ে না হলে বেঁচে থাকার দরকার কী? একটা মেয়ের কাজ হলো বৌ হয়ে স্বামীর সেবা করা, সন্তানের জন্ম দেয়া, তার সেবা করা, (দায়িত্ব নেয়া না)। সেখানে যখন দয়া করে কেউ তাকে বিয়েই করবে না সেখানে তার বেঁচে থাকাই অর্থহীন। নারীর যৌনতা যতোই কাঙ্খিত হোক, অন্যের ব্যবহারের পরে সেটা ‘এঁটো’ হয়ে যায়। সেটা নিজের ব্যবহার করা অসম্মানজনকও বটে।

এরপর শুরু হয় মেয়েটার চরিত্রের পোস্টমর্টেম। মেয়েটা কী পোশাক পরেছিল, কয়টায় বাড়ি ফিরলো, মেয়েটার কয়টা ছেলের সাথে পরিচয় ছিল, মেয়েটার আচরণ কেমন, এরপর মায়ের চরিত্র কেমন? অর্থাৎ প্রমাণ করার চেষ্টা মেয়েটার আচার-ব্যবহার, পোশাকই দায়ী ধর্ষণের জন্য।

অথচ কেউ জানতে চাইবে না ধর্ষক কোন পরিবার থেকে এসেছে, তার বাবা কেমন, পারিবারিক শিক্ষা কেমন, কাদের সাথে মেশে, কী করে? কারণ পূর্বনির্ধারিত ধারণা হলো পুরুষ তো একটু আধটুকু অমন করতেই পারে, পুরুষ হীরার আংটি, পুরুষের গায়ে দোষ লাগে না, এগুলো বয়সের দোষ, অর্থাৎ অন্তৰ্নিহিত কথা হলো, “পুরুষ সবসময়ই ধর্ষণ করতে প্রস্তুত থাকে, নারীর দায়িত্ব এর মাঝে নিজেকে রক্ষা করা”। ভাগ্য ভালো যে সমগ্র পুরুষজাতি এতোটা খারাপ না, যতটা সমাজ তাদের অনুমতি দিয়ে রেখেছে।

আমি বলছি না, যে ধর্ষণের শিকার মেয়েটার প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি বদল হলে ধর্ষণ কমে যাবে, কিন্তু ধর্ষণের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি বদলে গেলেই একমাত্র নারী নিজে তার প্রতি অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাহস নিয়ে দাঁড়াতে পারবে, নারীকে শাস্তি দেয়ার জন্য তাকে ধর্ষণ করাকে সবচেয়ে বড় অস্ত্র ভাবা বন্ধ হবে, আদালতে তাকে দুশ্চরিত্র প্রমাণ করে (যেন দুশ্চরিত্র হলেই তাকে অত্যাচার করার অধিকার যে কারও আছে) ধর্ষককে বাঁচানোর চেষ্টা বন্ধ হবে। আর বিচার হলে যেকোনো অপরাধ একটু হলেও কমে আসার কথা। যদি বিচার হলে অপরাধ নাই কমে, তাহলে তো বিচার ব্যবস্থা থাকারই দরকার নেই।

শেয়ার করুন:
  • 70
  •  
  •  
  •  
  •  
    70
    Shares

লেখাটি ২৭৯ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.