মলিনতামুক্ত শব্দ চাই প্রতিবাদে

0

কানিজ আকলিমা সুলতানা:

চাকরির আভিধানিক অর্থ – বেতন ভাতা নিয়ে নিয়মিত কাজ করার দায়িত্ব। যারা চাকরি করে তাদেরকে চাকরিজীবী বলে। মানে হল একজন চাকরিজীবী চাকরির মাধ্যমে তার জীবিকা নির্বাহ করে। চাকরির নানা পদ থাকে। কাজের ধরণ অনুযায়ী পদ ও বেতন ভাতা নির্ধারিত হয়। ইংরেজিতে চাকরি হল সার্ভিস আর যিনি সার্ভিস করেন তিনি সারভেন্ট (যেমন গভর্মেন্ট সার্ভিস ও গভর্মেন্ট সারভেন্ট)। সারভেন্ট এর বাংলা চাকর। যদিও বাংলাটা এমন কিন্তু চাকুরিজীবীদের কেউ চাকর বলেনা। বলে শুধু গৃহে যারা কাজ করে তাদেরকে। বলে বলা ভুল হবে, বলতো। আগে চাকর-চাকরাণীই বলা হতো। তুচ্ছার্থে চাকর-বাকর! এই বলায় তখন কেউ কিছু মনে করতোনা বা মনে করার প্রশ্নই আসতো না।

তবে এখন এমনটা নয়। চাকর শব্দের সাথে ছোট করে দেখার (look down) একটা যোগ ছিল বিধায় এটাকে বর্জন করতে বহুজন বহুদিন কাজ করেছে। তাদের প্রচেষ্টায় সমাজে চাকর শব্দ এখন অপাংক্তেয়। কাজটা একই আছে কিন্তু চাকরের সাথে মেথর বলাও বদলেছে। চাকর হয়েছে গৃহকর্মী, মেথর হয়েছে পরিচ্ছন্নতাকর্মী। গভর্মেন্ট সারভেন্ট বললেও কেউ সরকারি চাকর/পাবলিক চাকর বলেনা (আগেও বলতো না। কেউ হয়তো রস করে বলতো, বা রেগে গেলে)। সরকারি চাকরি মানে সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারি।

মানুষকে হেয় না করার এই প্রয়াস সমাজ আন্তরিকভাবে গ্রহন করেছে। যিনি যে পদেই কাজ করুক সেটা সন্মানিত হচ্ছে। ফলে কেউ যদি এর বাত্যয় ঘটায় তবে তা ধৃষ্টতা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সেই সূত্রেই গত পরশুদিন এক গৃহকর্ত্রী, যিনি আবার মানবাধিকার কর্মীও(?) তার গৃহকর্মীকে চাকর বলায় সবাই বিস্মিত হয়েছে, ক্ষোভ ও প্রতিবাদ জানিয়েছে।

দেশের ১৬ কোটি মানুষের সবাই অপরাধ করে না বা নিন্দনীয় আচরণ করে না। কেউ কেউ করে আর বাকিরা তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। এটাই আলোকিত সমাজের প্রতিফলন এবং আনন্দ ও আশার কথা। কিন্তু বেদনার ব্যাপার হলো, চাকর শব্দটার উচ্চারণ কমলেও বহুলাংশের মাথার ভিতর সেটা গেঁথেই আছে। যখন তখনই তা লেখায় বা উচ্চারণে বেরিয়ে আসে। এমনকি যারা উল্লিখিত গৃহকর্ত্রীর ‘চাকর’ শব্দে আপত্তি জানিয়েছে ,তারাও সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারিদের চাকর বলে।

কোনো কোনো সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারির আচরণে অনেকেই সরকারি চাকুরজীবীদের বলে জনগণের পয়সার চাকর। জনগণের টাকায়ই সরকার তার জনবলের বেতন ভাতা মিটায়। সেই হিসেবে কথাটা মিথ্যা নয় বা আভিধানিক অর্থে ঠিকই আছে। কিন্তু সামাজিক রীতিনীতির অর্থে ঠিক নেই। সভ্যতার মাপকাঠিতেও এমন মানসিকতা গ্রহনযোগ্য নয়। যাদেরকে চাকর বলে হেয় করা হয় তারা কেউ দান নেয়না। তারা চাকরির শর্তানুসারে দায়িত্ব পালন করে আর সমাজেও চাকর শব্দ অগ্রণযোগ্য। সেদিন যে গৃহকর্ত্রীর চাকর বলা আমরা অপছন্দ করেছি তার গৃহকর্মীর বেতন ভাতা সে ই দেয়, কিন্তু তারমানে এই নয় যে সে তাকে চাকর বলবে!

অনেক কিছুই আমরা না বুঝে, রেগে গিয়ে বা আতংকে বলি বা করি। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এর কুফল ধর্তব্যেই আনিনা। সেদিন যেমন ডেংগু আতংকেই হারপিক ব্যবহারের কথাটা এত ছড়িয়েছে। কিন্তু সেদিন যদি কাজটা করা হতো তবে পরিবেশের কি সর্বনাশটাই না হতো! মশা মারতে সত্যি কামান দাগা হতো। মশার লার্ভা হয়তো কিছু মরতো কিন্তু পরোক্ষ বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হতো জীববৈচিত্র্য থেকে মৎসকূল এবং নদীর পানি ব্যবহারে বেঁচে থাকা গাছপালা ও অন্যান্য প্রাণীদের প্রাণ!

নিচু কর্ম, নিচু মানসিকতা, নিচু উচ্চারণ- এই সবই সমাজকে অবক্ষয়ের দিকে নিয়ে যেতে থাকে। বর্তমান কালটা আমরা অবক্ষয়ের ভিতর দিয়েই পার করছি। এতে আরও কালি যোগ হতে থাকলে আলো না এসে ক্রমাগত অন্ধকারই বাড়তে থাকবে। সব অন্যায় অপরাধের বিরুদ্ধে জোর গলায় কথা বলতেই হবে। বলবো, কিন্তু শ্রেণি আক্রমণ করে, বা একটা সমাজকে হেয় করে তা করা উচিত নয় বলে মনে করি। সেদিন যেমন একজন গৃহকর্ত্রী তার গৃহকর্মীকে ‘চাকর’ বলেছে বলে আমরা সব গৃহকর্ত্রীদের বিরুদ্ধে ঢালাও মন্তব্য করিনি, তেমনি একজন সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারির অন্যায় অপরাধে এই চাকরিজীবীদের ‘আমাদের পয়সার চাকর’ বলাটাও সমীচীন নয়। নির্দ্দিষ্ট অপরাধের বিস্তার বা অপরাধীকে বিবেচনায় এনেই যৌক্তিক বিচার দাবি করা দরকার।

সময়ের সাথে সাথে সমাজ আলোকিত হবে, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা হবে এবং জাতি আরও সভ্যতার দিকে এগিয়ে যাবে, এই প্রত্যাশা পূরণ করতে আমাদের আচরণ ও প্রতিবাদ আরও জোরালো হোক, তবে মলিনতামুক্ত হোক।

শেয়ার করুন:
  • 104
  •  
  •  
  •  
  •  
    104
    Shares

লেখাটি ৩০২ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.