বেনেভোলেন্ট সেক্সিজম এর কথা শুনেছেন কেউ?

0

সুমিত রায়:

সেক্সিজম বলতে সেক্স ও জেন্ডার সম্পর্কিত বৈষম্য ও পূর্বসংস্কার (prejudice) বোঝায়।
সেক্সিজম কেবল বৈষম্য নয়, যাকে সেক্সুয়াল ডিসক্রিমিনেশন বা লিঙ্গবৈষম্য দিয়ে প্রকাশ করা হয়। এই সেক্সিজম এর দ্বারা সেক্স ও জেন্ডার বিষয়ক বিভিন্ন প্রিজুডিসকেও বোঝানো হয়, যা অনেক সময় আমাদের মনের গভীরে লুকিয়ে থাকে, এই বিষয়টিকে কেবল “লিঙ্গবৈষম্য” শব্দটি দিয়ে প্রকাশ করা যায় না, তাই সেক্সিজম নামে একটি নতুন ধারণার দরকার হয়।
এর বাংলা পরিভাষা করা হয়েছে “লিঙ্গবাদ” (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এর দর্শন বিভাগের ডক্টর প্রদীপ রায় ও সংস্কৃত বিভাগের মালবিকা বিশ্বাস এর সম্পাদিত “পরিভাষা অভিধান: কলা ও সামাজিক বিজ্ঞান” বইটি থেকে এই “লিঙ্গবাদ” শব্দটি পেয়েছি)।

সেক্সিজম শব্দটির সাথে আমরা প্রথম পরিচিত হই ১৯৬৫ সালে ফ্রেড শাপিরো এর দ্বারা। তিনি সেক্স ও জেন্ডার বিষয়ক প্রিজুডিস এর দিকে নজর দিয়েছিলেন। আর প্রিজুডিস সম্পর্কে আমরা জানতে পারি ১৯২০ সাল থেকে, তখন হোয়াইট সুপ্রিমেসি নিয়ে চর্চা শুরু হয়েছিল একাডেমিক অঙ্গনে। যাই হোক ১৯৫৪ সালে আলপোর্ট প্রিজুডিসকে “antipathy based upon a faulty and inflexible generalization” হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেন। অর্থাৎ তিনি বলেন, ভুল ও অনমনীয় সরলীকরণ এর উপর ভিত্তি করে তৈরি হওয়া বিদ্বেষই প্রিজুডিস।

তবে বিষয়টা যখন সেক্সিজম তখন এই প্রিজুডিস এর অর্থ যেন একটা নতুন মাত্রা লাভ করে। এখানে সেক্স ও জেন্ডার সম্পর্কিত প্রিজুডিসগুলো সবসময় প্রত্যক্ষ এন্টিপ্যাথি বা বিদ্বেষ থেকেই আসে না। পিটার ফ্লিক ও সুজান ফ্লিস্কে তাদের গবেষণায় এরকম কিছু উদাহরণ দেন, যেমন তারা বলেন, যখন পুরুষ তার নারী কো-ওয়ার্কার বা অধস্তনকে তার কাজগুলো নিয়ে কোন মূল্যায়ন না করে তার চেহারা, সৌন্দর্য ইত্যাদির ভিত্তিতে মূল্যায়ন করে, তখন তা সেই নারীকে চাকরির ক্ষেত্রে কিছু সুবিধা দান করতে পারে; আবার যখন কেউ বলেন, “পুরুষের দায়িত্ব নারীর খেয়াল রাখা, নারীর দায়িত্ব নেয়া” তখন আপাতভাবে কোন নারী নিরাপত্তা বোধ করতে পারে।

কিন্তু আসলে এইসব কথার ভেতরে গতানুগতিক স্টেরিওটাইপিং ও পুরুষ আধিপত্য নিহিত থাকে। গ্লিক ও ফিসকে বলেন, এগুলোকে পূর্বসংস্কার এর প্রমাণ সংজ্ঞায় ফেলা যায় না, কিন্তু এগুলোও লিঙ্গবাদ। গ্লিক ও ফিস্কে তাদের ১৯৯৬ সালের পেপারে লিঙ্গবাদের এই এম্বিভ্যালেন্স বা দ্বিমুখিতার বিষয়টি সামনে আনেন, আর এই দ্বিমুখিতার উপর ভিত্তি করে তারা লিঙ্গবাদকে দুইভাগে ভাগ করেন, হস্টাইল সেক্সিজম (প্রতিকূল লিঙ্গবাদ) ও বেনেভোলেন্ট সেক্সিজম (অনুকূল লিঙ্গবাদ)।

সুমিত রায়

বেনেভোলেন্ট সেক্সিজম বা অনুকূল লিঙ্গবাদ শব্দযুথকে দেখে এটা মনে করার কারণ নেই যে শব্দটার দ্বারা লিঙ্গবাদের কিছু উপাদানকে নারীর জন্য উপকারী বলে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে, ব্যাপারটা বরং উলটো। গ্লিক ও ফিস্কে নিজেরাই একে নেতিবাচক হিসেবে দেখতেন, আপাতভাবে উপকারি আচরণে যে লিঙ্গবাদ লুকিয়ে থাকে সেই বিষয়ে আলোকপাত করাই গ্লিক ও ফিস্কের উদ্দেশ্য ছিল।

গ্লিক ও ফিস্কের কাজ খুবই ইন্টারেস্টিং। তবে এতো কিছু নিয়ে লেখা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু একটা বিশেষ বিষয় নিয়ে লিখতে চাই, যাকে অনেক গবেষকই পরবর্তিকালে তাদের গবেষণায় ব্যবহার করেছিলেন। এটি হচ্ছে এম্বিভ্যালেন্ট সেক্সিজম ইনভেন্টরি। এই ইনভেন্টরিতে হস্টাইল সেক্সিজমের জন্য ১১টি ফ্যাক্টর ও বেনেভলেন্ট সেক্সিজমের জন্য ১১টি ফ্যাক্টর রয়েছে। এই ফ্যাক্টরগুলোকে মানুষ কীভাবে গ্রহণ করছে, তার উপর ভিত্তি করে তাদের মধ্যকার সেক্সিজম এর একটি স্কোর দাঁড় করানো হয়, যা হিসাব করে নির্ণয় করা যায় একটি স্যাম্পলের সেক্সিজমের মাত্রা। এই মোট ২২টা ফ্যাক্টর জানলে প্রতিকূল ও অনুকূল লিঙ্গবাদকে খুব সহজেই বোঝা যায়।

শেয়ার করুন:
  • 23
  •  
  •  
  •  
  •  
    23
    Shares

লেখাটি ৩১৩ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.